করোনাভাইরাসে ঝুঁকির মুখে চীন ও বিশ্ববাজার | Nobobarta

করোনাভাইরাসে ঝুঁকির মুখে চীন ও বিশ্ববাজার

রাবেয়া আশরাফী পিংকি : বিশ্ববাজার এখন অদৃশ্য এক শত্রুর সামনে দাঁড়িয়ে, যার নাম ‘করোনাভাইরাস’। এক মাসেরও বেশি সময় আগে চীনের উহান শহরে এই ভাইরাসটি প্রথম শনাক্ত হয়। উহানের এক বাজারে সামুদ্রিক খাবার অথবা মাংস থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে চীনে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে ৬৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ৩১ হাজার ১৬১ জন মানুষ সংক্রমিত হয়েছে।

করোনা আতঙ্কে চীনের জনজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। যার প্রভাব পড়ছে শেয়ারবাজারেও। গত ২৩ জানুয়ারি চীনের শেয়ারবাজার আটমাসের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক দিনটি অতিক্রম করে। এদিন সাংহাই কম্পোজিট ইনডেক্সের ২.৭৫ শতাংশ পতন ঘটে। এটি ছিল গত মে মাসের পর থেকে সূচকটির একদিনের মধ্যে সর্বোচ্চ পতন। হংকংয়ের হ্যাং সেং ইনডেক্স ১.৫ শতাংশ সূচক হারায়। চীনে এ ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ ঘনীভূত হওয়ার প্রভাব পড়ছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারেও। এরইমধ্যে জাপানের নিক্কেই হারিয়েছে ১ শতাংশ ও কস্পি ০.৯ শতাংশ।

প্রায় দুই দশক আগে এ রকমই একটি ভাইরাস পুরো এশিয়াকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সিভিয়ার একিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম (সার্স) নামের ভাইরাসটি মোট আট হাজার ৯৮ জনকে আক্রান্ত করেছিল, মারা গিয়েছিলেন ৭৭৪ জন। এই ভাইরাসটি পুরো বিশ্বে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। যার পরিসমাপ্তি গড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ব্যাপক লোকসানের মধ্য দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের সাবেক এক বিশ্লেষক মনে করেন, নতুন ভাইরাসটির কারণেও এই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

২০০২ সালের শেষের দিকে চীন থেকে খুব দ্রুত পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে সার্স। ভাইরাসটি মোট ৩০টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এসঅ্যান্ডপি৫০০ এবং ডাও জোনস উভয় সূচকেই এই ভাইরাসের উত্তাপ লাগে। বিশেষ করে ভ্রমণ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সার্স আতঙ্কে পর্যটকরা ভ্রমণ পরিকল্পনা বাদ দেয়ার কারণে বিপুল পরিমাণ লোকসান গুনতে হয় বিভিন্ন উড়োজাহাজ সংস্থা, হোটেল ও ভ্রমণ গন্তব্যগুলোকে। চীন ও হংকংয়ের কোম্পানিগুলোর বিক্রি ও আয় কমে যায়।

Rudra Amin Books

মার্কিন কোম্পানিগুলোর রাজস্বের ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব পড়ে। বিশ্ব বাজারে চার হাজার কোটি ডলার ক্ষতি করে ২০০৩ সালে সার্সের প্রাদুর্ভাব বন্ধ হয়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক অঙ্কটি ছিল ৭০০ কোটি ডলারেরও বেশি। ২০০৩ সালের মার্চ পর্যন্ত এসঅ্যান্ডপি৫০০ ১৬.২ শতাংশ পয়েন্ট হারায়। ডাও জোনসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র- ২০০২ সালের নভেম্বর থেকে ২০০৩ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৭ শতাংশ পয়েন্ট হারায়।

সার্সের কারণে ২০০৩ সালে সিঙ্গাপুর ০.৫ শতাংশ এবং হংকং প্রায় ২.৫ শতাংশ জিডিপি হারায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে। নতুন ভাইরাসের কারণেও আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারের গতিবিধি নতুন মোড় নেবে বলে ধারণা করছেন তারা। চান্দ্র নববর্ষের উদযাপন মুহূর্তে করোনার প্রকোপ চীনের জন্য বড় ধরনের দুঃসংবাদ বয়ে এনেছে। কারণ নতুন বছরের লম্বা ছুটি উপলক্ষে বিশ্বে সবচেয়ে বড় পর্যটনের ঢেউ শুরু হয়। এই উৎসব উদযাপনে শামিল হতে প্রতি বছরই এ সময় হাজার হাজার বিদেশি পর্যটক চীনে আসেন। ফলে এ সময়টা চীনের এয়ারলাইন্স সংস্থাগুলোর জন্য চরম ব্যস্ততার। এ বছরই চান্দ্র নববর্ষ উদযাপনের জন্য ৩০০ কোটিরও বেশি ট্রিপ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে এই ট্রিপগুলোর বেশিরভাগ বাতিল হয়ে যেতে পারে। ফলে সার্সের সময়কালীনের চেয়েও চীন আরো বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।

এরই মধ্যে দেশটির বিমান চলাচল খাত চাপের মধ্যে পড়েছে। দেশটির এয়ারলাইন্স রেগুলেটর নির্দেশ দিয়েছে কোনো যাত্রী উহানে যাওয়ার ফ্লাইট বাতিলের আবেদন করলে তা যেন জরিমানা ছাড়াই গ্রহণ করা হয়। অন্য আরো অনেক শহরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে করে সবচেয়ে চাপে পড়েছে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো, এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর নামছে হু হু করে। উহানে ৩০ শতাংশ ফ্লাইট পরিচালনাকারী সংস্থা সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের শেয়ারদর গত বৃহস্পতিবার হংকং ও সাংহাইয়ের বাজারে ৩.৫ শতাংশের বেশি অবনমন ঘটে। এয়ার চায়না ও চায়না ইস্টার্নের মতো অন্যান্য প্রথম সারির উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোরও শেয়ার দরে এদিন পতন ঘটেছে। এছাড়া হংকংয়ের ক্যাথে প্যাসেফিকের শেয়ার দর কমেছে ২.১ শতাংশ। বিক্ষোভ ও করোনা আতঙ্ক- এ দুইয়ে মিলিয়ে চলতি বছরের এ সময়ের মধ্যে এই পতাকাবাহী উড়োজাহাজ সংস্থাটির শেয়ার দরে ১২ শতাংশ অবনমন ঘটল।

মুডিস ইনভেস্টর সার্ভিসের এক নোটে বলা হয়েছে, ‘২০০৩ সালে সার্স মহামারির সময়ের মতো পুরো অঞ্চলের ভ্রমণখাত যদি করোনা আতঙ্কে নিমজ্জিত হয়, তাহলে যন্ত্রণা আরো বাড়বে। এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যের মধ্যে বিশেষ করে চীন ও অস্ট্রেলিয়ার পর্যটন খাত আগামী কয়েক প্রান্তিক সবচেয়ে ভুগবে।’ করোনার প্রভাব পড়বে তেলের বাজারেও। গোল্ডম্যান স্যাকসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক ভ্রমণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনার কারণে জেট ফুয়েলের দামও কমে যেতে পারে। ফলে গোটা তেলের বাজারেই নিম্নমুখী চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

কোয়ান্টাম ইকোনমিকসের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাটি গ্রিনস্প্যান মনে করেন, নতুন করোনাভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে খুবই নেতিবাচকভাবে প্রভাব ফেলবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে তিনি এ কথা জানান। এখন পর্যন্ত শেয়ারবাজারে করোনার প্রভাব সীমিত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। এরইমধ্যে চীনে ভ্রমণ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে করোনার প্রভাব পড়েছে। ভাইরাসটির সংক্রমণ অব্যাহত থাকলে তা অন্যান্য কোম্পানির ওপরও প্রভাব ফেলবে।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, করোনাভাইরাস চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ করে দিবে। চীনের অর্থনীতিতে কোনো সমস্যা হলে, তা গোটা বিশ্বের অর্থনীতিকেই ভোগাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এতে করে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজার ঝুঁকিতে পড়বে, এশিয়ার শেয়ারবাজারে সূচক পতনের ঝড় চলঝুঁব, তামা ও তেলের মতো পণ্যের দাম কমবে। আর এ ধরনের পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে উদ্বিগ্ন বিনিয়োগকারীরা মার্কিন ট্রেজারি ও জার্মান বন্ডের মতো নিরাপদ বিনিয়োগে ঝুঁকবেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

ওয়ালস্ট্রিটের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগকারী ও কৌশলবিদরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা যখন বেশি ভ্যালুয়েশন নিয়ে উদ্বিগ্নতায় দিন কাটাচ্ছেন, তখনই করোনার সংক্রমণ আন্তর্জাতিক বাজারে চলমান অনিশ্চয়তাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ গারেথ লেথার এ প্রসঙ্গে জানান, ‘এখন পর্যন্ত অর্থনীতি নিয়ে আমাদের প্রাক্কলন অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে ভাইরাসটি যে হারে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে অনেক ঝুঁকি তৈরি হবে। আমরা খুব নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘যদি ভাইরাসটি আরো ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে চীনা পর্যটকদের উপর নির্ভরশীল দেশগুলো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চীন তো অবশ্যই, হংকংয়ের ক্ষতির মাত্রাও কম হবে না। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.