দীর্ঘায়ুর অভিমান : সৌমেন দেবনাথ | Nobobarta

আজ শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ০৬:০৪ অপরাহ্ন

দীর্ঘায়ুর অভিমান : সৌমেন দেবনাথ

দীর্ঘায়ুর অভিমান : সৌমেন দেবনাথ

Shawmen Kumar

Rudra Amin Books

ঐশ্বর্যের প্রতি চিরকালই মনোরমা উদাসীনা। অনুপমের ধন সম্পদের দিকে তার কোন খেয়ালই নেই। ওর একটাই কামনা বাসনা অনুপমকেই ঘিরে। আর ওর প্রেম ঠুনকো নয় যে ঝুরঝুর করে ঝরে যাবে। স্বামীর থেকে দুঃখ পেলেও পুষ্পের হাসি ঠোঁটে রেখে সময় পার করে, কেননা স্বামী তার ভুল বুঝে টেনে নেবে বুকের নিগূঢ় তলে। প্রতিটি দিনই অপেক্ষা করে কাটে। বসে থাকে অধীর আগ্রহে মন ভ্রমরাকে খাওয়াবে বলে নিমফুলের মধু। কর্মযজ্ঞ শেষ করে অনুপম বাড়ি এলেই মনোরমা অনুপমের বুকের পশমে মুখ লুকায়। অনুপম মিষ্টি হেসে বলে, একদম পোষা প্রাণীর মত আল্লাদে তুমি।

মনোরমা মুখ তুলে বলে, কত ঘণ্টা তোমাকে না দেখে থাকতে হয় বলো তো? পথ পানে চেয়ে থাকি এই বুঝি এলে…
অনুপম বললো, এখনো এত দেখার কি আছে? পুরাতন হয়ে গেছি তো!
মনোরমা বললো, স্বামী কখনো পুরানো হয়? সব সময় নতুন তুমি, প্রতিটি নতুন দিনের মত উজ্জ্বল।
অনুপম বললো, এবার না হয় ছাড়ো!
মনোরমা বললো, না। আমার এখনো তৃপ্তি কমেনি। তোমার বুকে লুকালে আমি স্বপ্নে বিভোর হই।
অনুপম না বিরক্ত না মধুরতার মধ্য থেকে বললো, আমি তো ক্লান্ত। কত বার ঘেমেছে শরীর।
মনোরমা বললো, তোমার দেহের ঘামের গন্ধের সাথে পৃথিবীর সবচেয়ে সুগন্ধ পারফিউমের গন্ধের তুলনাও চলে না।
অনুপম মনোরমাকে বুকের থেকে তুলে বললো, বেশি বেশি পড়তাম, মা বলতো পাগল হয়ে যাবো। পাগল হইনি। এবার পাগল হবো, তুমি পাগল করে দেবে।
মনোরমা মুখ গোমড়া করে বললো, তোমার প্রতি আমার অপেক্ষার তোমার কাছে কোন মূল্য নেই? যাও আর পথ চেয়ে থাকবো না।
অনুপম বললো, আমি কি বলেছি আমার বৌ খুব মন্দ? এমন লক্ষ্মী বৌ কজনের হয়?
মনোরমা বললো, লক্ষ্মী বৌ না ছাই। লক্ষ্মী বৌকে কদিন আদর দিয়েছো?
এই বলে মনোরমা রান্না ঘরের দিকে গেলো। বেশক্ষণ মনোরমাকে ভেবে ভেবে অনুপম ফ্রেশ হতে চলে গেলো।
অনুপমকে খেতে দিয়ে মনোরমা বললো, তরকারি কুটার সময় তোমার কথা মনে পড়ে, হাতের চুড়ি কিভাবে নড়ে তোমার নজর এড়ায় না। তরকারি রান্নার সময় তোমার কথা মনে পড়ে, রান্নার সময় তোমার খুঁনসুটি খুব মিস করি।
অনুপম বললো, কিন্তু তোমার রান্নার তো আমি প্রশংসাই করি না।
মনোরমা বললো, রান্না খারাপ হয়েছে তাও তো কোনদিন বলোনি। তুমি বলো না, কিন্তু আমি বুঝে নিই। তুমি সহজ না, কিন্তু সহজ করে নিই। তুমি খুব শক্ত, কিন্তু মন্দ না।

অনুপম বললো, আমায় ভেবে ভেবে রান্না করো, রান্না কি খারাপ হতে পারে?
মনোরমা আক্ষেপ করে বললো, শুধু রান্না দিয়ে কি স্বামীদের মন জয় করা যায়? নারীরা তো তবে রাজত্ব করতো, দাসত্ব না।
কথাটি বলেই মনোরমা চলে গেলো। অনুপম কিছুক্ষণ থমকে থাকলো। তবে কথাটি খুব গুরুত্বের সাথে নিলো না।
রাতে ঘুমের দেশে হারানোর জন্য সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনুপম বললো, তখন বললে লক্ষ্মী বৌকে কদিনই আদর দিয়েছো? আমি কি সত্যিই তোমাকে আদর দিই না?
মনোরমা বললো, যখন সব কাজ থেকে মুক্তি নিয়ে এই রাতে একটু আমার কাছে আসো, তখন মন ভুলানো দুটো কথা বলো। এটা কি আদর?
অনুপম অাশ্চর্য হয়ে বললো, মানে কি? বুঝিয়ে বলো তো।

মনোরমা বললো, পৃথিবীর সব পুরুষ এই রাতের বেলাতেই সবচেয়ে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে। ধন সম্পদ, জমি, টাকা, অলংকার সব দিতে চায়। দিনের আলোয় সব ভুলে যায়। শখের জন্য কাছে আসে, শখ মিটে গেলে সব ভুলে যায়।
অনুপম ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে বললো, ধন সম্পদ, অলংকার তুমি কি চাও? আর আমি তোমাকে কবে প্রলোভন দেখালাম?
মনোরমা বললো, তুমি তোমার ব্যস্ততম সময়ে আমাকে পাত্তাই দাও না। কল কেটে দাও। বা অনাগ্রহের সুরে কথা বলো। মিষ্টি মিষ্টি কথা যখন বলো বুঝতে পারি মুখের কথা, মনের কথা না।
অনুপম এক প্রকার মনোক্ষুণ্ণ হয়ে ঘুমিয়ে গেলো।
অনুপম সকালে ঘুম থেকে উঠে দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে অফিসে চলে যাচ্ছে। মনোরমা বাঁধা দিয়ে বললো, সকাল থেকে তুমি আমাকে এড়িয়ে চলছো কেন?
অনুপম বললো, অফিসে কাজের চাপ। এখন তোমার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সময় নেই।

মনোরমা বললো, ও আচ্ছা। খেয়ে যাবে না?
অনুপম বললো, খাবো যে রুচি থাকা লাগে না? তোমার তীক্ষ্ণ কথা শুনে শুনে আমার পেট ভরে গেছে।
মনোরমা আশ্চর্য হয়ে বললো, মানে?
অনুপম বললো, বাড়ি জুড়ে রাজত্ব করো, তাও তোমার মনে হয় দাসত্ব। নিজের ঘরের কাজ করাটা কি দাসত্ব হয়?
অনুপম অফিসে চলে গেলো। অনুপম বাইরে যেতেই মনোরমা ফোন দিলো, বাইরে খেয়ে নিও, খেয়ে যখন ফোন দেবে তখনই আমি খাবো।
অনুপম বললো, আমি খেয়েই গাড়িতে উঠেছি। তুমি খেয়ে নাও।
মনোরমা মন খারাপ করে বললো, তোমার সুন্দর সংসারে আমিই শুধু অসুন্দর মানুষ!
অনুপম বললো, খর গাঙে চর পড়ে জলদি। অতি সুখের সংসারে অতি শীঘ্র দুঃখ নামে।
মনোরমা কান্না করতে করতে বললো, আমি কি তোমার মত শিক্ষিত? আমার ভুল হতেই পারে। আমার উপর রাগ করে থাকো কেন? আর তুমি আমার উপর রাগ করো কি করে?
অনুপম মনোরমাকে শান্ত করার জন্য বললো, কান্না করো না। আমি রাগ করিনি।
এভাবে মনোরমাকে বোঝাতে লাগলো যতক্ষণ না তার মুখে হাসি ফুটলো।

ঘরের বধূর আচল তলে ঢাকা অনুপম মনোরমার কারণেই পেয়েছে অমিয় শক্তি। হৃদয় ও শরীরে শিহরণ দিয়েছে। মনোরমা মানসিক ভাবে প্রস্তুত না হয়ে সন্তান নেবে না, সে কথা আজো অনুপম পালন করে চলেছে। যদিও মনোরমা যৌবনের মধুটুকু দিতে কার্পণ্য করেনি।
অনুপম মনোরমার পাশে পাশে ঘেষে থাকে। ইয়ারকির ছলে মনোরমা বললো, বাঘ নরমাংসের স্বাদ পেলে ঐ পথেই বেশি বেশি যাতায়াত করে এবং ঐ পথ ছাড়ে না।
অনুপম বিব্রত হয়ে কিছুটা সরে বললো, আমি কি বাঘ? তুমি কি আমার শিকার?
মনোরমা হেসে পরিবেশটাকে হালকা করার চেষ্টা করে বললো, তুমি তো আমার বাঘই, তবে আমি তোমার শিকার না, বাঘিনী।
অনুপম বলে তুমি মানবী থেকে দেবী হয়েছো যোগ্যতা বলে। যোগ্যতা কি? সংসারমনা, শ্বাশুড়ির প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি, প্রতিবেশিদের প্রতি অমৃত আচরণ। যদিও প্রতিবেশিরা সুন্দরী এই বৌটাকে সুন্দর চোখে দেখেন না। মনোরমার যত ভালো গুণ সেগুলো অন্যান্যদের শুভ বুদ্ধিকে গ্রাস করে।
মনোরমার শ্বাশুড়ির সাথে এক প্রতিবেশি গল্প করছেন। শ্বাশুড়ী মা বললেন, আমার বৌমাটা খুব লক্ষ্মী। সংসারটাকে সাজিয়ে স্বর্গ করে তুলেছেন।
প্রতিবেশিনী বললেন, ঘরের বৌমা যত ভালোই হোক, ভালো বললেন না। খারাপ হয়ে যাবে।
শ্বাশুড়ি মা বললেন, ভালো ভালোর দলে থাকলে খারাপ হবে না। বৌমাকে তো অন্যের মেয়ে না, নিজের মেয়ে করে রেখেছি। আমি তাকে বৌমা বলে ডাকি না, মা বলে ডাকি।

প্রতিবেশিনী নাক সিটকে বললেন, পরের মেয়ে নিজের মেয়ে হয় কখনো? পর পরই, আপন আপনই। পর কখনো আপন হয় না। পর আপন সাজে তখনই যখন তার ভেতর স্বার্থ বাস করে।
নরক থেকে স্বর্গের কাউকে দেখলে নরক যন্ত্রণা আরো বাড়ে। প্রতিবেশিনী ফোঁসফোঁস করতে করতে চলে গেলেন।
মনোরমা শ্বাশুড়ি মায়ের কাছে এলো। মা তাকে ডেকে চুলে তেল মাখিয়ে দিচ্ছে। যদিও চুলে মনোরমা তেল দেয়া পছন্দ করে না। তবুও মায়ের আবদার ফেলতে পারলো না। মা বললেন, বাড়ির বাইরে কম যাবে। মানুষ কানে বিষ ঢেলে দেবে। সব হিংসুটে।
মনোরমা বললো, অন্যের কথা শুনে নিজ সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করবো, ভাবলেন কি করে মা?
মা বললেন, মিথ্যে শুনতে শুনতে একদিন মিথ্যে সত্য হয়ে যায়। পরবুলি শুনতে শুনতে পরবুলি আপনবুলি হয়ে যায়। পরকে তখন আপন মনে হয়, আপন হয়ে যায় পর।

ঝিনুক সদৃশ মনোরমার দেহ মাঝে অমূল্য মুক্তার ঝলক। তাক হারিয়ে ফেলে অনুপম। ঐ মুক্তোকণা সাপের মাথার মণি হয়ে অহরহ প্রলোভন দেখায়। শান্ত হৃদয় নদীর জলে ঢেউয়ের পাহাড় হয়। বেপরোয়া না হয়ে পারে না অনুপম। রাগ করে মনোরমা বলে, এটা কি অসভ্যতা?
অনুপম অন্য এক ভঙ্গি করে বলে, মত্ত হয়ে যাবো গো। তুমি একটু নির্লজ্জ হও না গো, দেখবো তোমার দেহ-সৌষ্ঠব, দেহ পল্লবে কি আছে না আছে। গবেষণা করে আমি যে ফল পাই না। গুগল ম্যাপ ঘেটে আমি সারা বিশ্ব চিনে ফেলি কিন্তু কাটা কম্পাস টেনেও তোমার রূপের কূল কিনারা পাই না।
প্রচণ্ড রাগ হলো মনোরমার, সে বললো, শেষ পর্যন্ত তোমার চোখও শকুনের চোখের ভূমিকা নিলো?
অনুপম কিঞ্চিৎ হেসে বললো, তোমার তাঁতানো যৌবনের ঝাঁঝ চলার পথের এক অলঙ্ঘনীয় পাহাড়। তোমার হাসি দেখলে আমি বিলীন হয়ে যাই। কেন তোমার শরীরের বাঁকে বাঁকে এত চুম্বকীয় আবেশ?

মনোরমা দুই কোমরে দুই হাত রেখে কর্কশকণ্ঠে বললো, তোমার প্রতি আমার বিশ্বাসের পাঁচিল ভেঙে গেলো বুঝি। ঠোঁটে এত লালসার ঝোল কেন? মনের মাঝে এত নীচ ধারণা, এত কুটিলতা কেন?
অনুপম গড়িয়ে যাওয়া জলের মত খলখলিয়ে বললো, সুখ কি কেবল মুখেই দিয়ে যাবে? রৌদ্রের রঞ্জণরশ্মির প্রকোপ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছি তোমার যৌবন ঝলমল শরীরকে। বিনিময়ে চাই কেবল তোমার যৌবনের পরাগ রেণুতে চঞ্চল অলিটি স্পর্শ করতে।
মনোরমা কথাগুলো সহ্য করতে পারলো না। না পেরে বললো, পুরুষ জাতই এমন। মায়া দিয়ে ভোলানো যায় না। মায়া বোঝে না। এত অসম্মান আর না। আমি মায়ের কাছে চলে যাবো।

অনুপম বললো, আমি আঙুল চুসবো? তুমি চলে গেলে খরস্রোতা নদী কোথায় পাবো? আমি তো খরস্রোতা নদীর বুকে পাখনা মেলে সাঁতার কাটবো।
অভিমানে, রাগে, ক্রোধে অধর যুগল স্ফূরিত হলো মনোরমার। ও বললো, বিচিত্র সব চিন্তা ভাবনায় দোলে তোমার মন। ভুল কাননে মন বিলিয়ে পুড়ি তাই দহনে। প্রতারক, হৃদয় হন্তারক, তোমার কথায় আমি উগ্রতার গন্ধ পাচ্ছি।
মনোরমার প্রচণ্ড রাগ হলো। বাঁকা চাহনি। চোখ দুটো রক্তিম। ঘেমে গেছে এক প্রকার। উড়নাও স্থানচ্যুৎ হয়েছে। অনুপমের ধূর্ত চোখের মণিযুগল সেখানে গিয়ে আটকে গেলো। নির্বাক নিষ্পলকে চেয়ে অনুপম। যৌবন ভোরের ঊষার মত উঁকি মারছে। দেখে চোখ টাটায়।
মনোরমার রক্তিম চোখে বাঁকা দৃষ্টি, বললো, হিংস্র হায়েনা, তাজা মাংস দেখেও দূরে কেন? এসো বুকের মৃত্তিকায় হলি খেলো। লালা ঝরাও কুকুরের মত। আমি কেন বাঁধা দেবো? আমি তোমার দখলে থেকে কেন বেদখলে থাকবো? এসেছি তো তোমায় আস্বাদন দিতে, তুষিতে। মায়া তো বোঝ না, কায়াই দেখো। আকাশ কাঁপানো বিদ্যুতের চমক।

গোলাপী ঠোঁট দুটো ওর কাঁপছে। চোখ দুটো জলে টইটম্বুর হবে বোধ হয়। অনুপম ধরা খেয়ে গেলো, ভাবলো, একটু দুষ্টমিও বোঝ না? স্বামীর থেকে এমন কথা স্ত্রীর জন্য আশাতীত, অকল্পনীয়? বুঝেছি, বেশি ধরা দিয়ে ভুল করেছি। হৃদয়ের সবটুকু শক্তি দিয়ে বাঁধলাম, আর আজ এতগুলো কথা বিনিময়ে শুনিয়ে দিলে? বাইরের চোখ অপেক্ষা তোমার ভেতরের চোখটা আরো বেশি দুর্বল। তোমার পাহাড় সম উচ্চ হৃদয়টা, সাগরের মত গভীর মনটা আর উদার আকাশের মত বিশালতর ভালোবাসার হৃদয় এই নির্ণয় করলো?
এমন অজস্র প্রশ্ন ওর মনে দানা বাঁধলো। সামনের বাস্তব ওকে বিবর্ণ করে দিলো। বীভৎস যেন ও মনোরমার চোখে। অনুপম ঘুরে বিড়ালের মত সন্তর্পণে বাইরে চলে গেলো।
ধূসর প্রান্তর। সূর্যের নির্দয় খরতাপে চৌচির ধরিত্রী। শুষ্ক বায়ু। নিষ্ঠুর আকাশ। ধূধূ বিস্তীর্ণ বৃক্ষহীন প্রান্তর। প্রকৃতি মৃতপ্রায়। ধীরে ধীরে সুন্দর ধরিত্রী যে এগুচ্ছে মারাত্মক মরুময় এক অধ্যায়ের দিকে এ তারই চিত্র। লু লু হাওয়া এসে লাগছে অনুপমের শরীরে। অপ্রীতিকর ঘটনা আর বিড়ম্বনায় আজ তার ঝুলি ভরে গেছে।
পেছন থেকে অলস ভঙ্গিতে চেয়ে থাকে অনুপমের দিকে মনোরমা। দীপ্ত চেহারা মলিনপ্রায়। হাসির ফোয়ারা নেই ঠোঁটে। বুকটা হু হু করছে। কেউ যেন পাজড় খালি করে চলে গেছে। মনের বহমান নদী বুজে গেছে সেখানে যেন অবিশ্বাসের কালো দাগ। ছত্রাক আর শ্যাওলা। তবুও নীরব নিরুক্তাপ মানুষ অনুপমের জন্য হৃদয়ে মায়ার উদ্রেক হলো। বুকের পাজড়ে না জানা গুমোট ব্যথাটা ধোঁয়ার মত ঘুরপাক খাওয়া সত্ত্বেও ও স্বামীর দিকে এগুচ্ছে। যেন রহস্যময়ীর রং ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। অনুপম কাঁধে কোমল হাতের ছোঁয়া পেলো। এ কারোর হাত নয়, মনোরমার হাত। না ফিরেই অনুপম বললো, হাত সরাও।
মনোরমার হাতটি অজান্তেই সরে গেলো। অনুপম বললো, যাও, সরে যাও। শিয়াল কুকুরের কাছে থেকো না। বিবেককে প্রশ্ন করো তো, আজ যা তুমি করলে আমাকে খুন করার জন্য কি যথেষ্ঠ নয়? একটা বছর আমার ঘরে এলে, তুমি যেমন আমিও তেমন উভয়ই মানুষ চিনতে ভুল করেছি। যথেষ্ঠ উজাড় করে দিয়েছো আজ।
মনোরমা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো। অনুপম আবারো বললো, কত বেশি কার্পণ্য তোমার মাঝে বুঝতে বাকী নেই। উজাড় করে দিয়েও দাও না। জানো বক্রোক্তি। কেন দেখায়েছিলে পূর্ণিমার আলো, ভালোই তো ছিলো আমার কৃষ্ণপক্ষের অমানিশা। হাড় মাংস মস্তিষ্কে ঢুকে গেছে প্রণয়াশ্রিত কামনার বিষ। গভীর বেদনায় নীলাভ শিখা চোখের সামনে। তোমার তীক্ষ্ণ আর সূচালো কথাগুলো করাতের ফলার মতো হয়ে হৃদয়টাকে দ্বিখণ্ডিত করে দিয়েছে। তোমার সাথে সখ্যতা আজ থেকে শেষ। কেবল বৌ তুমি আমার। আর কিছু নও, ঘরে যাও।

মনোরমা পাথরের মত নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। কত ভারী ভারী কথা বলছে আজ অনুপম। সর্ব শরীর ওর অবশ হয়ে গেছে। কী ভুলই না করেছে আজ সে। মনোরমার না যাওয়া দেখে অনুপম নিজেই সরে গেলো। আকাশ ভেঙে পড়লো যেন মনোরমার মাথায়।
শ্বাশুড়ি মা বৌমার নিষ্প্রভতা দেখে বললেন, কি হয়েছে মা?
মনোরমা নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বললো, না মা, কিছু হয়নি।
মা বললেন, বুঝেছি অনুপ কিছু বলেছে। আমার ছেলের খুব ছেলেমি আছে। আবার রেগে গেলে চেনা যায় না। ওর ছেলেমি সহ্য করতে পারলে খুব ভালো, আর রেগে গেলে খুব খারাপ।
মনোরমা বললো, কিছু থেকে কিছু হলেই যদি রেগে যায় তবে কি করে হবে, মা?
মা বললেন, আগুনে জল দিলে তার সমস্ত দাহ হিমশীতল হয়ে যাবে, যখন সে রেগে যাবে তখন তার কথা শুনবে। বলছি না ওর বশীভূত হয়ে থাকো, তবে সময়ে বশীভূত হলে সময় তোমার হাতেই থাকবে।
ছেলে বাড়ি এলেই মা ধরলেন। বললেন, বৌমাকে কষ্ট দেয়া সহজ বলেই কষ্ট দিবি? ও আমার বৌমা না, মেয়ে।
অনুপম বললো, তোমার বৌমার সাথে আমার কিছু ঘটেনি। আর ওকে কষ্ট দেবো কেন?
মা বললেন, তোদের মাঝে অঘোষিত যুদ্ধ চলছে, আমি সব বুঝতে পারছি। সব মিটমাট করে ফেল।
অনুপম বললো, যুদ্ধ? যার শুরু নেই তার শেষও নেই। আমরা ঠিক আছি, মা।
মা বললেন, আমার সংসারে কোন গুমড়া মুখের ঠাঁই নেই। সবার মুখে সব সময় হাসি দেখতে চাই।

সন্ধ্যায় মনমরা হয়ে বসে আছে মনোরমা। কাজের মেয়ে মালিকা এলো। সে বাড়ি দেখাশোনা করে, রান্না করে দেয়। কুঁচিয়ে শাড়ি পরেছে, দেখেই গায়ে জ্বালা দিয়ে উঠলো মনোরমার। মনোরমা বললো, কি জন্য এসেছিস?
মালিকা বললো, বৌদি, মাছ দিয়ে পটল দিয়ে রান্না করবো, না পটল ভাজবো? মাছ দিয়ে বেগুন দিয়ে রাঁধবো, না বেগুন ভাজবো? না, পটল, বেগুন, মাছ একত্রে রান্না করবো?
এত হিসাব মনোরমার মাথায় খেললো না, বললো, আজ তোর ছুটি। আমি রান্না করবো।
মালিকা নাক সিটকে চলে গেলো। বেশ রাতে ফিরলো অনুপম। মনোরমা তার জন্য কত প্রিয় খাবার রান্না করে রেখেছে। দেখেও না দেখার ভান করলো অনুপম। মনোরমা বললো, আমি তোমার শখ সাজিয়েছি সামনে। যেন তুমি দেখছোই না, উন্মনা।
অনুপম বললো, শখের খাবারে শখ নেই। শখের জনেও বিতৃষ্ণা। সব বিষ বিষ বোধ হচ্ছে।
মনোরমা বললো, তাকাও, চোখে তাকাও, হৃদয় লুটপাট হয়ে যাবে, তাকাও।
অনুপম বিরক্ত হয়ে বললো, সংযত হও, শরীরী আগুন জ্বেলে আর অঙ্গার করতে পারবে না। নেশা ধরিয়ে লাভ নেই, আমার মাদকতা নেই।
মনোরমা স্থির হয়ে শুনলো। আর বললো, তোমাকে নেশা ধরানোর ইচ্ছা নেই। থাকো তুমি শুল্কাপক্ষের ধবল জ্যোৎস্নায়। কৃষ্ণপক্ষের তারার প্রদীপই আমার যথেষ্ট।
মনোরমার চোখে জল এলো। দেখে অনুপম বললো, একই অস্ত্রের বারবার ব্যবহার করলে অস্ত্রের ধার কমে যায়। একই অস্ত্র কারো হৃদয়ে বারবার রেখাপাত করে না।
মনোরমা বললো, কান্না করে জেতার ইচ্ছা আমার নেই। কান্না আমার অস্ত্রও না। তোমার জয় হোক, তোমার জেদের জয় হোক, তোমার হিংসার জয় হোক। আমার ক্ষত, বেদনা, ব্যথা গতকালের পেপার ভেবে কেজি দরে বিক্রি করে দেবো।
মনোরমা ওখান থেকে সরে গেলো। ড্রেসিং টেবিলে সাজতে বসলো। ও সাজতে বসলে অনুপম পিছন থেকে এসে হাজারো খুঁনসুটি করতো। অনুপম দূর থেকে তা দেখে ভাবলো, ওর মন আজ কত খারাপ, অথচ সাজতে বসেছে। খুব শক্ত মনের ও।
মনোরমা ভাবলো, একটু সাজলে ও চোখ থেকে চোখ নামাতো না। অথচ এখন চেয়েও দেখে না। থাক, না দেখুক। হয়েছি না হয় অভাগা, তাই বলে সাজবো না? হয়েছি না হয় একটু কুঁজো, তাই বলে কি চিৎ হয়ে শুতে পারবো না?
পিছন থেকে অনুপমও ঘরে এলো। বললো, এই রাতে কোথাও যাবে নাকি?

মনোরমা বললো, সাজতে দেখলেই কি মনে হয় ঘুরতে যাবো? আমার কি খুব বিনোদনের দরকার? গাঙচিল মন তোমার, তুমি উড়ে বেড়াও নীলে নীলে।
না খেয়ে অনুপম ঘুমিয়ে গেলো। মনোরমা বললো, মালিকা রান্না করেছে। যত অভিমান তো আমার উপর। আমার হাতের রান্না না। দুটো খেয়ে ঘুমাও।
চোখের কোণে জল জমেছে মনোরমার। তা দেখে অনুপম বললো, বাচ্চা মানুষ? এত মায়া কান্না কেন?
চোখের জল আর ধরে রাখতে পারলো না মনোরমা। অবাধ্য জল চোখের বাঁধা অগ্রাহ্য করে পল্লব ডিঙিয়ে বের হতে লাগলো অঝোরে। অনুপম বললো, কি মুশকিল! কান্না করে সাময়িক ভাবে জয় পাওয়া যায়। দীর্ঘ মেয়াদী জয়ের জন্য কান্নার চেয়ে বড় প্রীতি। যা তোমার ভেতর নেই, অর্জনেরও চেষ্টা করোনি।
মনোরমা বললো, এত শক্ত শক্ত কথা বলো কি করে? এত শক্ত শক্ত কথা শিখলে কি করে?
অনুপম বললো, তুমি শিখিয়েছো। আমার হৃদয়টাকে পাথর করে দিয়েছো। ডিনামাইটেও ফাঁটবে না।
মনোরমা বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো, তোমার জীবনে এতই যদি আমি নিষ্প্রয়োজনের হই, আমি তোমার সাথে আর থাকবো না। কালই মায়ের কাছে চলে যাবো।
অনুপম বললো, যাও, তোমাকে বাঁধা দেয়ার সে অধিকার আমি হারিয়েছি। তোমার জন্য হৃদয়ে আমার মায়া নেই। আমার হৃদয় শুকিয়ে মরু হয়ে গেছে।
মনোরমা বললো, সত্যি আমাকে হারাবার ভয় তোমার নেই? আমার শূন্যতা তোমাকে ভাবাবে না?
অনুপম দৃঢ়চিত্তে বললো, না।

মনোরমা এবার বললো, তবে আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখবে না। আমি ঘুমিয়ে গেলে আমার গায়ে হাত দেবে না। অফিসে যাওয়ার আগে কই তুমি কই তুমি করবে না। আমি কেন হাসি বা মলিন থাকি জানার চেষ্টাও করবে না। আর হ্যাঁ, আমি যখন স্নানাগারে যাবো, পিছ পিছ ঢুকবে না।
এসব বলে মনোরমা ঘুরে ঘুমিয়ে গেলো। অনুপম বাম হাতটা মনোরমার গায়ে তুলে দিলো। মনোরমা সরিয়ে দিলো। অনুপম আবারো হাত তুলে দিলো। মনোরমা হাত সরিয়ে দিলো। তৃতীয় বার আর হাত দিলো না অনুপম।

সকালে ঘুম থেকে উঠে অনুপম নিজেকে তৈরি করছে। নিজে এতই ব্যস্ত যে পাশে পাশে যে মনোরমা আছে খেয়ালেই নেই। মনোরমা দীর্ঘশ্বাস কেটে বললো, সারাদিন সুন্দর সুন্দর মেয়ে দেখো তো আমাতে তোমার মন ভরে না। কত অগুরুত্বপূর্ণ আমি। অন্য মেয়ের মাঝে যা দেখো আমার মাঝে তাতো পাও না। এক শার্ট যেমন দুদিন পরলে ভালো লাগে না। এক নারীতেও পুরুষের মন ভরে না। নতুবা তুমি রাগ করলে আমি রাগ ভাঙাতে পারি না কেন? তুমি অভিমান করলে আমি অভিমান ভাঙাতে পারি না কেন? হতে পারি আমি নারী, আমার ভেতর নারীত্ব নেই। হতে পারি নারী, কিন্তু তোমার জীবনে ফুল হয়ে ফুঁটতে পারিনি।
অনুপম বললো, মানুষ সুখে থাকলে ভুলে যায় অসুখ কি? মানুষ ভুলে যায় তার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি কি? শ্রেষ্ঠ মুকুটের জন্য মানুষ দৌঁড়ায়। অথচ পাশেই পড়ে থাকে কত অনাদরে শ্রেষ্ঠ সম্পদ। একান্ত ক্ষণে এক মনে ভেবে দেখো, আমি না থাকলে কি তোমার মূল্য, কি তোমার জীবনের মধ্য গগনের মূল্য? জীবনের জন্য জীবন, জীবন্মৃতের জন্য জীবন নয়।

মনোরমা বললো, আমরা কেউ কাউকে উজাড় করে ভালোবাসিনি। আমরা কেউ কাউকে সহ্য দিয়ে গ্রহণ করিনি।
অনুপম বললো, ভুল। আমি তোমাকে যত কাছে করতে চেয়েছি তত তুমি সরে গেছো। যত ধরতে চেয়েছি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ফিরেছি।
মনোরমা বললো, তুমি ধরতে চেয়েছো, আমি ধরতে দিইনি, আমি কি অধরা? তুমি দখল করতে চেয়েছো, আমি দখলদারিত্ব দিইনি, আমি কি বেদখলে?
অনুপম বললো, আকাশটা শূন্য সঙ্গিহীন, আমিও শূন্য সঙ্গিহীন। তুমি আমার সম্মুখে অস্তিত্বসর্বস্ব, নামে নামে।
মনোরমা বললো, বুঝেছি, যত দোষ আমার। আমার মন অসুন্দর। আমি চেহারাতেও তো অসুন্দর। অসুন্দর কখনো কারো কামনার বস্তু হতে পারে না।
অনুপম বললো, তোমার শত্রুও কখনো তোমাকে অসুন্দর বলতে পারবে না। সুন্দরী মেয়েরা সহজে কাউকে কাছের করে না। সহজে কাউকে সত্যিকারের ভালোবাসাটা দেয় না। তাই ভালোবাসাটা কি জানেও না।
এমন মুহূর্তে মা এলেন। এসেই বললেন, তখন থেকে তর্কতর্কি করছিস। আমার সংসারে কোন তর্কতর্কি চলবে না। কোন অশান্তির বাস আমার সংসারে চলবে না। অনুপ, যা বৌমার হাতটা ধর।
অনুপম বললো, মা, আমাকে আরো সময় দাও, আরো একটু সামর্থ্য হোক, তবেই না হয় ওর হাত ধরবো।
মা বলরেন, বৌমা, তুমি যাও, অনুপের হাত ধরো।
মনোরমা বললো, মা, আরো একটু না হয় নিজেকে উন্নত করি, তবেই না হয় হাত ধরি, যেন সে হাত ধরার অমর্যাদা না হয়।
মা বললেন, পরস্পর পরস্পরকে সহ্য করো। কথাতেও আনো সৌন্দর্য। বৌমা, যাও, ওকে খেতে দাও। অফিসে যাবে।
খেতে বসে অনুপম বললো, কি মায়ের কাছে কখন যাচ্ছো?
মনোরমা অাশ্চর্য চোখে অনুপমের দিকে তাকালো আর বললো, গেলে খুশী হবে তো?
অনুপম বললো, ঘরের পোষা প্রাণীটির প্রতিও মায়া জন্মে। আর তুমি তো বৌ। যেতে চাচ্ছো, বাঁধা দেবো না। না গেলে বুঝবো আমার মায়ারও দাম আছে।
মনোরমা বললো, আমার জন্য তোমার কোন দরদ নেই। কোন মায়া নেই। সব নামে নামে।
মনোরমা ঘরে চলে গেলো। নিজের জিনিসপত্র সব গোছাতে লাগলো। আর অনুপমের শার্ট প্যান্ট সামনে এলেই দূরে ছুঁড়ে মারছে। পিছন পিছন অনুপম এলো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মনোরমার রাগাগ্নি মুখটা দেখছে। মনোরমা অনুপমকে না দেখার ভান করে বললো, যাবো তো যাবোই। আর কোন দিন আসবো না। যে বাঁধনে বল নেই সে বাঁধনে মিছে জড়িয়ে থেকে লাভ নেই।

অনুপম মনোরমাকে আরো দেখিয়ে দিচ্ছে, এটাতো নিলে না। ওটা নাও। ঐ যে নিচে একটা শাড়ি থেকে গেলো।
মনোরমা ব্যাগ গুছানো বাদ রেখে বললো, তুমি কত নিষ্ঠুর? একটি বার আমাকে বাঁধা দিচ্ছো না, বরং যাওয়ার জন্য উৎসাহ দিচ্ছো!
অনুপম বললো, তুমি সহজে পালাতে পারবে না, পোষা পাখির মতো তোমাকে পালা যাবে।
মনোরমা বললো, তোমার ধারণা ভুল। আজ অফিস থেকে এসে দেখবে আমি নেই। খালি বাড়িতে মহোৎসব করতে পারবে।
মা আবার এলেন। দেখলেন বৌমা ব্যাগ গুছিয়েছে। মা বললেন, বৌমা কোথাও যাবে? অনুপ, আমাকে তো বলিসনি!
অনুপম বললো, মা, যাকে মা মা বলে ডাকো সে তোমার অনুমতি না নিয়েই এ বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছে।
মা খুব আশ্চর্য হয়ে বললেন, মানে? তোদের ঝগড়া তবে থামে নি?
মা ওদের দু হাত এক করে দিয়ে বললেন, এভাবে বসে গল্প কর। আজ তোর অফিস যাওয়া বন্ধ। এক ঘণ্টা পর এসে দেখি যেন এভাবেই হাত ধরে গল্প করছিস।
মা চলে গেলেন। অনুপম মনোরমার হাতে হাত রেখে বললো, হাত ধরতে দাও না। আমার হাতে হাত, কি শান্তি পাচ্ছো না?
মনোরমা বললো, আমাকে আড়ালে রাখতে পারলে তোমার যত শান্তি। আর তাই মায়ের কাছে যেতে চাইলেও বাঁধা পাই না। আমি রাগ করলে আমার রাগ নিয়েই আমাকে থাকতে হয়, আমার রাগ ভাঙাও না। তোমাকে পুরুষ করে তুলতে আমাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে।
অনুপম শিশুটির মতো করে বললো, ধরে আছি তোমার হাত, ধরে আছো আমার হাত। এভাবে হাত ধরেও কি তর্কযুদ্ধ মানায়? নিজেদের দুঃখ কষ্ট কেনো আমরা বাড়াচ্ছি?

মনোরমা বললো, যখন কেউ বুঝে ফেলে কেউ পালাতে পারবে না তখন তার উপর কষাঘাত করা সহজ। যখন কেউ বুঝে ফেলে কোন নারী তাকে খুব ভালোবাসে তখন সেই নারীর প্রতি টান কমে, অসুন্দর মনে হয়, হয়ে যায় চরম অপছন্দের। তখন তার কাজ কি, হাসিও ভালো লাগে না।
অনুপম বললো, আমি শক্ত পাত, আমাকে পুড়িয়ে তোমার মনের মতো করে গড়ে নিও।
মনোরমা বললো, দুদিন পর তুমি সব ভুলে যাবে। ভুলে যাওয়া রোগ তোমার। আমার মতো করে তোমাকে গড়তে পারবো না। তোমার মতো করেই নিজেকে তৈরি করবো। তোমার অন্যায় আবদারে নিজেকে সঁপে দেবো। তোমার বাড়াবাড়ির মধ্যেই সুখ খুঁজবো, তোমার জিদের কাছেই হেরে যাবো। তোমার হাসি মুখের জন্য তোমার দোষ আর দেখবো না, তোমার বেখেয়ালিপনাকেই মেনে নেবো।
কথাগুলো শুনে অনুপমের খুব রাগ হলেও চুপ থাকলো। ঝড় থেমে গেছে, কিন্তু সব কিছু ওলোট পালোট করে দিয়েই। পরস্পর পরস্পরের কত কাছে অথচ দু মনে কত দূরত্ব। মনোরমা হাত ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করলো। অনুপম হাত ছাড়লো না। বললো, তুমি না বললে আমার জিদের কাছে হেরে থাকবে, তবে হাত ছাড়িয়ে নিচ্ছো কেনো, আমি হাত ছাড়বো না।

মনোরমা বললো, যে হাত ধরার মধ্যে মাধুর্য নেই, প্রতিশ্রুতি নেই, সে হাত ধরাতে তুমি সুখ পেতে পারো, আমার তাতে সুখ নেই।
অনুপম এ কথা শুনে হাত ছেড়ে দিলো। ঠিক ঐ মুহুর্তে মা বাইরে থেকে সুউচ্চ কণ্ঠে বললেন, তোরা কি এখনো ঝগড়া করছিস?
অনুপম দ্রুত মনোরমার দু হাত ধরে মনোরমাকে বললো, মায়ের কথার উত্তর দাও।
মনোরমা অনুপমের হাত ধরার কাণ্ডে ঠোঁটে হেসে মাকে উদ্দেশ্য করে বললো, মা, আপনার মতো নিরপেক্ষ রেফারি থাকলে অনলেও ফুল ফুঁটবে। পথ চলতে চলতে পথ ভুল হয়ে গেলে শাসনের ভার আপনার কাছেই থাকবে, আপনার শাসনে থেকেই জীবন পাড়ি দেবো।
মা নিশ্চিন্ত মনে নিজের ঘরে চলে গেলেন। অনুপম বললো, মাকে তো আশার বাণী শোনালে, আমাকে আশার বাণী শোনাবে না?
মনোরমা বললো, রশি তো তোমার হাতেই, ঘুড়ির জন্য এত চিন্তা করে কি হবে?
অনুপম বললো, রশি দিয়ে ঘুড়ি বেঁধে রাখা বীরপুরুষের কাজ না। তুমি ঘুড়িই, আমার আকাশে উড়বে কিন্তু রশি বাদেই।
মনোরমা বললো, ঘুড়ির উড়ে যাওয়ার ভয়টা যদি মনের মধ্যে থাকতো তবে ঘুড়ির প্রতি অবিচার কমই করতে।
অনুপম অাশাহত হয়ে বললো, যত দোষ আমার, যত অপরাধ আমার। তোমার কষ্টের কারণ আমি। তোমার দুঃখের কারণ আমি। আমার জন্য তোমার চোখে জল আসে। আমার জন্য তোমার চোখের ঘুম চলে যায়। আমি তোমায় পুড়িয়ে অঙ্গার করি। আমার জন্যই যত তোমার অপেক্ষায় দহন। থাকো। চলে গেলাম।
অনুপম চলে যাচ্ছিলো। মনোরমা বাঁধা দিলো আর ভ্রূ নাচিয়ে বললো, চলে গেলে শান্তি পাবে? যাওয়ার জন্য যে যাওয়া নয়, আসার জন্য যে যাওয়া, সে যাওয়া তো যাওয়া না। আমি মালিকাকে আজ ছুটি দিয়ে দেবো। এখন রান্না করতে যাবো। তরকারি কুটবো, তুমি বসে বসে আমার হাতের চুড়ি নড়া দেখবে। আমি এখন রান্না করবো, তুমি আমার সাথে খুঁনসুটি করবে।

অনুপম মনোরমার এ আবেগি কথাতে কর্ণপাত না করে বাঁধা ডিঙিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে পড়লো। পিছন থেকে মনোরমা বললো, এত অভিমান কোথা থেকে শিখেছো? আমি মন ভাঙানোর পাঠশালায় ভর্তি হবো মন ভাঙানোর কৌশল আয়ত্ব করার জন্য। আর তাড়াতাড়ি ফিরো, তোমার সাথে ঝগড়া করতে আমার ভালই লাগে। তোমার অভিমানে ভরা মুখটা দেখতেও আমার ভালো লাগে।
ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুঁটিয়ে মনোরমার দিকে অনুপম ধেয়ে আসছিলো যাতে এমন একটা ভাব তোমায় আজ সাজা দেবো। মনোরমা দরজা বন্ধ করে দিয়ে জানালা দিয়ে বললো, বাজালে কি এত বাজতে হয়? আমার না হয় একটু বাজানোর স্বভাব আছে!
অনুপম মনোরমার চোখে মুখে চেয়ে বললো, কি তুমি জানি না। না সুখ পাই তোমাতে, না দুঃখ। না তুমি মধু, না বিষ। কাছেও নাও না, দূরেও যেতে দাও না।
মনোরমা অনুপমের চোখের মণিতে একটু সময় তাকিয়ে থাকলো। পরক্ষণেই শব্দ শুনতে পেলো মা তাঁর ঘরের দরজা খুলছে। এভাবে অনুপমকে বাইরে রেখেছে জানতে পারলে মনোরমার খবর আছে। তাই দ্রুত দরজা খুলে দিলো। অনুপম ঘরে যেতে চাচ্ছিলো না, মনোরমা তাকে টেনে ঘরের মধ্যে নিলো, হৃদয় ঘরেও।


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.






Nobobarta © 2020 । About Contact Privacy-PolicyAdsFamily
Developed By Nobobarta