গুজব : পলাশ মাহবুব | Nobobarta

আজ শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ০৫:০৯ অপরাহ্ন

গুজব : পলাশ মাহবুব

গুজব : পলাশ মাহবুব

Gujob

Rudra Amin Books

আমাদের ময়না ভাই সিদ্ধান্ত বদলালেন। এতে অবশ্য আমাদের তেমন ভাবান্তর হলো না। হওয়ার কথাও নয়। কারণ ময়না ভাই সিদ্ধান্ত নেনই সেটি বদলানোর জন্য।

এর আগে ময়না ভাই ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি লেখক হবেন। মেতে উঠবেন সৃষ্টিসুখের উল্লাসে। সে সময় ময়না ভাইয়ের কল্যাণেই আমরা জানতে পারি, লেখকরা নাকি ‘ফাদার অব অল সৃষ্টিশীলতা’ মানে সব সৃষ্টিশীলের আব্বা। আমরা বাহবা বলে ময়না ভাইয়ের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই।

এর পর যথারীতি লেখক হওয়া নিয়ে ময়না ভাইয়ের মধ্যে কিছুদিন তুমুল উত্তেজনা বিরাজ করল। নিজের পড়ার ঘর রবীন্দ্র-নজরুল, সুকান্ত-মাইকেলের ছবি দিয়ে ভরে ফেললেন তিনি। লাইব্রেরি থেকে নানা ধরনের বইপত্র, দামি কাগজ-কলম এনে টেবিল সাজালেন। বেশ আটঘাট বাঁধলেন। কিন্তু তার সেই তুমুল উত্তেজনার গিঁট ছুটতে বেশি সময় লাগল না। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নেতিয়ে পড়লেন ময়না ভাই।

নারে, লেখালেখি করে এই দেশে কিছু হবে না।
ময়না ভাইয়ের নতুন কেনা বইপত্র আর খাতা-কলম নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করতে করতে আমরা জানতে চাইলাম, কেন হবে না ময়না ভাই?
ময়না ভাই হতাশ গলায় বললেন, পরিবেশ নাইরে। পরিবেশ নাই।
পরিবেশ যেহেতু নেই আমরা তাই ময়না ভাইকে আর জোরাজুরি করি না। এরও আগে ময়না ভাই ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি গায়ক হবেন।
‘গান গাই আমার মনরে বুঝাই, মন থাকে পাগলপারা/ আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া।’

শাহ আবদুল করিমের গানের দুই লাইন শুনিয়ে ময়না ভাই তার মনের কথা আমাদের জানিয়ে দিলেন। আমরাও সেই সময় ময়না ভাইয়ের গায়ক হওয়ার সিদ্ধান্তকে সুরে সুর মিলিয়ে স্বাগত জানিয়েছিলাম। কারণ প্রথমত, ময়না ভাইয়ের গানের গলা মন্দ না। তার ওপর তার নাম ময়না। এমন মেলবন্ধন সাধারণত হয় না। ময়নার সঙ্গে গানটা বেশ যায়। আমরা তাই ময়না ভাইকে উৎসাহ দিলাম। ময়না ভাইও তুমুল উৎসাহে নতুন হারমোনিয়াম কিনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

এর পর কদিন সকালবেলা ময়না ভাইয়ের জীবনমুখী গানের রেওয়াজে আমাদের কারও কারও ঘুম ভাঙল। আর তারও অল্প কয়েকদিন পর স্বয়ং ময়না ভাইয়ের ভুল ভাঙল।
আবারও ময়না ভাইয়ের উৎসাহে ভাটা। নতুন কেনা হারমোনিয়ামটা অল্প দামে বিক্রি করে ময়না ভাইয়ের নতুন ঘোষণা, এসব গান-ফান দিয়ে কিচ্ছু হবে না।

কেন হবে না ময়না ভাই?
ময়না ভাই হতাশ গলায় বললেন, পরিবেশ নাইরে। সংগীত দিয়ে সমাজ বদলের দিন শেষ।
তা হলে কি দিয়ে হবে ময়না ভাই?
আমাদের চোখে-মুখে এমন জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে ময়না ভাই বললেন, সমাজ বদলের জন্য চাই কঠিন হাতিয়ার। যে যুগের যে চল, বুঝলি না।
আমাদের বন্ধু পুটু আবার ফোড়ন কাটায় বেশ পটু। যে কারণে তার নাম থেকে একটা হ্রস্ব উ কমে গিয়ে নাম দাঁড়িয়েছে পটু।

পটু বলল, হাতিয়ার কি লাইসেন্স করে নিতে হবে নাকি অবৈধ হলেও চলবে ময়না ভাই?
পটুর দিকে কটু চোখে তাকান ময়না ভাই। সমাজ বদল একটা গঠনমূলক কাজ। এর মধ্যে তুই অবৈধ হাতিয়ার ঢোকাতে চাস কোন সাহসে!
পটু কাঁচুমাঁচু করে বলল, না মানে, তুমিই তো বললে যে যুগের যে চল। এখন তো বৈধ উপায়ে কিছু করা মুশকিল। সেজন্য জানতে চাইলাম।

পটুর কথায় বিরক্ত ময়না ভাই কিছুক্ষণ নাক দিয়ে ফোঁস ফোঁস করেন। তার বিরক্তি কিছুটা কমে এলে আমি মুখ খুলি।

ময়না ভাই, রাগ না করলে একটা কথা ছিল।

হুম বল।

অনেকে যে বলেন আমাদের চারপাশে আগে যে সমাজ ব্যবস্থাটা ছিল সেই সমাজই নাকি এখন আর নেই? ময়না ভাই হতাশ ভঙ্গিতে দুদিকে মাথা নাড়েন। হুম। ঠিকই বলে। সেই সমাজ এখন দুষ্প্রাপ্য।

তা হলে যে সমাজ নেই সেই সমাজ তুমি বদলাবে কীভাবে? ঠিক বুঝতে পারছি না।

ভালো প্রশ্ন শুনলে ময়না ভাইয়ের চোখে এক ধরনের হাসি ফোটে। ময়না ভাইয়ের চোখে-মুখে সেই হাসি।

এই তো টু দ্য পয়েন্টে নোঙর করেছিস। বর্তমানে সমাজব্যবস্থা বিলীন হওয়ার পথে এ কথা যেমন সত্য, আবার এটাও সত্যÑ আমাদের দেশে এক সময় সুন্দর একটা সমাজব্যবস্থা ছিল। স্কুলে ছিল পরিবেশ পরিচিতি সমাজের বই।

পটু পাশ থেকে বলল, সমাজ বই এখনো আছে ময়না ভাই। সেইটা বিলীন হয় নাই।

পটুর খোঁচা দেওয়া কথায় ময়না ভাই খ্যাক করে ওঠেন।

সমাজকে কি তুই কাজির গরু পেয়েছিস যে কিতাবে আছে গোয়ালে নাই। সব জায়গাতেই সমাজের উপস্থিতি থাকতে হবে। কারণ সুন্দর দেহের জন্য যেমন একটা সুস্থ মন দরকার, তেমনি সুস্থ রাষ্ট্রের জন্য দরকার একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাজব্যবস্থা। বুঝতে পেরেছিস?

আমরা একযোগে মাথা নাড়ি।

তা তুমি কী করতে চাও ময়না ভাই?

ময়না ভাই ভাবুক ভঙ্গিতে কিছু সময় মাথা দোলান। তার পর মুখ খোলেনÑ সমাজকে আগের মতো সুন্দর অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। আর সেজন্য আমি ঠিক করেছি পত্রিকায় কলাম লিখব। এক কলামে মাইল পার।

কলাম লিখবে!

ইয়েস। কলাম মানে হচ্ছে পিলার। প্রতিটি সাকসেসের পেছনে অনেকগুলো পিলার লাগে। পত্রিকার কলাম দিয়ে সমাজের কলামে আমি কুঠারাঘাত করব। বুঝতে পেরেছিস?

তা পেরেছি। কিন্তু কুঠারাঘাত করলে তো কলাম উল্টো ভেঙে পড়বে ময়না ভাই।

আহা! এই কুঠার হচ্ছে রূপক। এ আঘাত হচ্ছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা কূপম-ূকতার ওপর আঘাত। সেজন্য আমি ঠিক করেছি অবিলম্বে কলাম লেখা শুরু করব। কিছু কারেন্ট টপিকও ঠিক করে ফেলেছি। যেমনÑ ধর্ষণ, ডেঙ্গু, সড়কে নরক ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে আমার প্রথম কলামের বিষয় হবেÑ পদ্মা সেতু।

পদ্মা সেতু! কেন? ওটা তো সমাজের বাইরে, নদীতে। আমার কথা শুনে ময়না ভাই পুনরায় হাসেন। আরে গাধার ভাই উজবুক বলে কী। নদী কি সমাজের বাইরে নাকি? সমাজ বইয়ে পদ্মা নদীর আত্মকাহিনি পড়িসনি। হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে পদ্মা নদী উৎপত্তি হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে…

আমি মাথা চুলকাই। তা পড়েছি। কিন্তু এর সঙ্গে সমাজ বদলের যোগ কোথায়? তোমার প্রথম কলামের বিষয় পদ্মা সেতু কী কারণে সেটা বুঝতে পারছি না।

সেটা বুঝিয়ে বললেই বুঝতে পারবি। শোন, আমি আমার কলাম দিয়ে পদ্মা সেতুর কলাম মানে পিলারে আঘাত করব।

এবার আমার চোখ কপালে। পদ্মা সেতু তো আমাদের গর্বের স্থাপনা হতে চলেছে ময়না ভাই। তুমি তার পিলারে আঘাত করবে কোন যুক্তিতে! পিলার কী দোষ করেছে! ময়না ভাই হাসেন। একে বলে রূপক আঘাত। বুঝবি না।

আমরা রূপক বোঝার চেষ্টা করি।

শোন, একে একে পদ্মা সেতুর পিলার যেমন দৃশ্যমান হচ্ছে তেমনি একই সঙ্গে কিছু গুজবের পিলারও কিন্তু দৃশ্যমান হচ্ছে। টের পাচ্ছিস?

গুজবের পিলার!

হু। গুজব ছড়িয়েছে শুনিসনি? পদ্মা সেতুর পিলারে নাকি মানুষের কাটা মু-ু দেওয়া হচ্ছে? আর এজন্য অসংখ্য মানুষের মু-ু দরকার। আশপাশে যাকেই পাচ্ছে তার ঘাড়েই কোপ। কি, শুনেছিস এ খবর?

আমরা মাথা নাড়ি। শুনেছি তো। এ নিয়ে তো চারপাশে ফিসফাস।

হুম। এই ফিসফাসই হচ্ছে গুজব। যারা ফিসফাস করছে তারা গুজবে কান দিচ্ছে। এ রকম হাস্যকর বিষয়ে যারা বিশ্বাস করে বুঝতে হবে তাদের চিন্তার পিলারে ঘুণ ধরেছে। আমি আমার লেখার কলাম মানে পিলার দিয়ে এসব গুজবের পিলারে আঘাত করব এবং আঘাতে আঘাতে এক সময় সমাজের প্রতিটি পিলার হবে ঘুণমুক্ত। কি, আইডিয়া কেমন?

ঠোঁটকাটা পটু পট করে বলল, আইডিয়া তো খুবই চমৎকার। কিন্তু ময়না ভাই, তার আগে মনে হয় তোমার ধৈর্যের পিলারকে ঘুণমুক্ত করতে হবে। কারণ তোমার ধৈর্য ভীষণ কম। দুদিন পরেই তো তুমি ভুলে যাবে।

পটুর কথা শুনে ময়না ভাই এবার হেসে উঠে বললেন, ধৈর্যের পিলারে পাইলিং চলছে।

 

: কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার উপসম্পাদক, সারাবাংলা


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.






Nobobarta © 2020 । About Contact Privacy-PolicyAdsFamily
Developed By Nobobarta