গল্প : মানব মনের মোড় | Nobobarta

আজ শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ০৫:১২ অপরাহ্ন

গল্প : মানব মনের মোড়

গল্প : মানব মনের মোড়

Rudra Amin Books

: সৌহার্দ্যকে মোটেও পছন্দ করে না সৌরি। কিন্তু সৌরির মা সুতপা সৌহার্দ্যকেই নিজের মেয়ের যোগ্য মনে করেন। এ কারণে সৌরির সাথে মায়ের বেশ অঘোষিত সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছে। সৌরি আক্ষেপ করে বললো, তোমাদের হাতে কি আর কোন সুপুত্র নেই?

সুতপা বললেন, আছে বৈকি! কিন্তু সৌহার্দ্যর মতো উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আর কারো নেই।
সৌরি বললো, ও কালো! কত কালো!
সুতপা মেয়ের কথা শেষ না হতেই বললেন, তোর বাবা কি পরিষ্কার?
বাবার কথা উঠতেই সৌরি চুপ হয়ে গেলো। অপলকে মায়ের দিকে চেয়ে থাকলো। সুতপা বললেন, অনেক পরিষ্কার ছেলে রাস্তায় রিক্সা টানে। রংটা আসল নয়, সুখের জন্য সুন্দর মন দরকার। যা সৌহার্দ্যর ভেতর আমি দেখি। কত ভাল ছেলে, কত ভদ্র।
সৌরি মায়ের কথার উত্তর দিতে পারলো না। সোজা নিজের ঘরে চলে গেলো। মা পিছন পিছন এলেন। সৌরি বললো, সৌসির স্বামী কত সুন্দর দেখতে! কত দারুন ওদের দেখতে লাগে!

সুতপা বললেন, তবে সৌসি মামলা করেছিলো কেন? ওদের মাঝে কি বোঝাপড়া আছে? সারাক্ষণ ঝগড়া করে। কেউ কাউকে পাত্তা দেয় না, সমীহ করে না।
সৌরি এবার বললো, মা, আমি কি তোমাদের ঘরে অতিরিক্ত হয়ে গেছি? আমাকে বিদায় করার জন্য এত উতালা হয়েছো কেন?
সুতপা বললেন, সৌহার্দ্য মাত্র কদিনের ছুটিতে এসেছে। তোকে বৌ করে নিয়েই ফিরবে।
সৌরি আশ্চর্য হয়ে বলে, বিয়ে কি এতই মামুলি বিষয়? আমি পড়াশোনা করছি। বিয়ের কথা ভাবনাতেও নেইনি। মা, বিয়ের জন্য প্রস্তুতি লাগে।
সুতপা আর বেশি বললেন না। একদিনে বেশি বোঝালে হিতে আবার বিপরীত হবে। সৌরি ঘরে কিছুক্ষণ ভাবলো, তারপর মিনিট দুই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদলো।
মনের বিরুদ্ধে কিছু চলে গেলে মন মেনে নিতে চায় না। আবার পিতা মাতার দিক বিবেচনা করলেও নিজের মত স্থির থাকে না। নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ বেঁধে গেলো। সৌচিন্দ্রীয়াকে ফোন দিলো, সৌহার্দ্য দাদাকে চিনিস না? ঐ যে কালো করে…

সৌচিন্দ্রীয়া বললো, হ্যাঁ হ্যাঁ, ভাল চাকরি পেয়েছেন শুনলাম।
সৌরি বললো, বাবা তার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছে। কলেজে কত কথা বলার চেষ্টা করতেন, কোন দিন পাত্তা দিছি বল্?
সৌচিন্দ্রীয়া বললো, ভাল চাকরি পেয়েছে বলে ওমন একটা কালো ছেলেকে বিয়ে করবি? দুদিন কথা বলা যায়, গোটা জীবন সংসার করা যায়?
এমন সময় বাবা সৌমিত্র ঘরে ঢুকলেন। সৌরি বাবাকে দেখে ফোন কেটে দিলো। সৌমিত্র বললেন, ছেলেটা আমার তোর সবার চেনা। চেনা জানা প্রতিষ্ঠিত ছেলে। আর জানার বাকি থাকে না।

সৌরি বললো, বাবা, আমার অপছন্দের তোমাদের কাছে কোন মূল্য নেই?
মেয়ের রাগ দেখে সৌমিত্র বললেন, বাবা মাকে সম্মান না করলে কেউ সুখী হয় না। বাবা মা সন্তানের অমঙ্গল কোন দিন চায় না।
সৌরি নাছোড়বান্দার মত করে উত্তর করলো, কোন বাবা মা সন্তানের উপর কখনো কোন কিছু চাপিয়ে দেয় না। আমার জীবনের সিদ্ধান্তে আমার মতকে তোমাদের গুরুত্ব দেয়া উচিত।
মেয়ের উক্তিতে বাবা কষ্ট পেলেন। কিন্তু আশা ত্যাগ করলেন না। নিজের ঘরে চলে গেলেন। সুতপা স্বামীর মুখ দেখে বুঝলেন, বললেন, ওকে আমরা ভাববার সময়টুকু না হয় দিই!
সৌমিত্র বললেন, জোরারোপে কিছু হয় না। আজীবন মেয়েটা জেদী। আমি সৌভিককে না বলে দেই?
সুতপা না সূচক মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, অপেক্ষা করো। সৌরিকে আমি দেখবো। রাজী না হয়ে যাবে কই!
পরদিন সৌরি কলেজে গেলো। সৌচিন্দ্রীয়া সৌরিকে দেখতে পেয়ে সৌমিন্দ্রীয়াকে টেনে সৌরির কাছে এলো। সৌমিন্দ্রীয়া বললো, মন খারাপ কেন? কি হয়েছে?
সৌরির উত্তর সৌচিন্দ্রীয়ায় দিলো, সৌহার্দ্য দাদার সাথে ওর বাবা ওর বিয়ে ঠিক করেছেন!

সৌমিন্দ্রিয়া বললো, ভাল তো। দাদা তো দারুন ছেলে। কলেজে তাঁর কত সুনাম ছিলো। কত ভাল জব পেয়েছেন! কপাল তোর সৌরি!
সৌচিন্দ্রীয়া ব্যঙ্গ করে বললো,কত ভাল ছেলে! অত্যাধুনিক কৃষ্ণ! কৃষ্ণ জোটে কজনের কপালে! ব্লাক ডায়মন্ড!
সৌমিন্দ্রীয়া বললো, কালোয় তোর নজর পড়লো? তাঁর গুণ তোর নজর এড়ালো? রূপের কদর দুদিনের, গুণের কদর আজীবন।
সৌচিন্দ্রিয়া বললো, শোন টাকায় ট্রাংক ভরে, রূপে মন ভরে। ট্রাংক ভরা টাকা থাকলো, মন থাকলো খালি, ও টাকা তখন মাত্র কাগজই।
সৌরি সৌচিন্দ্রীয়ার কটাক্ষ উচ্চারণ বুঝতে পারলো আর বুঝলো এ বিবাহ হলে সারা জীবন ওকে এমন কথা শুনতে হবে। সৌচিন্দ্রীয়া আবার বললো, সৌখিনকে পাত্তা দিলি না, সৌমিককে পাত্তা দিলি না। শেষ পর্যন্ত সৌহার্দ্যে নোঙর? মানুষ দেখলেই বললে টাকার লোভে বিয়ে করেছিস!
কান মাথা ধরে এলো সৌরির। দু বান্ধবীকে চলে যেতে বললো । একা থাকতে চাইলো ও। যাওয়ার সময় সৌচিন্দ্রীয়া বললো, মানাবে ভালো। মানিক জোড় হবে!
সৌরির চোখ জলে ভিজে গেলো। এ হাসি তামাশা তাকে বিদ্ধ করতে থাকলো। পরিবেশ মনের অনুকূলে না। চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছা হলো৷ বাবা মা তার বিরুদ্ধে। এই বিরুদ্ধস্রোত ও রুখবে কি করে? এই বিরুদ্ধস্রোতে ও হেরে গেলে পরিবেশ তাকে হাজারো ঘৃণ্য চিৎকার শোনাবে।
সৌরি এসে নিজ ঘরে চলে গেলো। সুতপা এসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন আর বললেন, তুই এত ভেঙে পড়ছিস কেন? বিষণ্ন থাকিস। শ্যামলা টুকু বাদ দে, দেখ আর সব ভাল। মানুষ কি সব দিক থেকে শত ভাগ পারফেক্ট হয়? ওরা তোকে পছন্দ করেন, যারা যেচে নিচ্ছেন তাদের বাসায় তুই সম্মানের সাথেই থাকবি।
মাকে থামিয়ে দিয়ে সৌরি বললো, তোমরা কি মা আমাকে বুঝবে না?

সুতপা বললেন, কালো তাতে কি? দেখতে খারাপ? কালো জগতের আলো।
সৌরি ক্ষেপে গিয়ে বললো, কবিতা পাঠের আসরে যেয়ে বলো, কালো জগতে আলো। জীবন কবিতার মত ছন্দ মিলের না।
সুতপা বললেন, তুই খুব জেদী, জেদের ফল ভালো হয় না।
সৌরি বললো, দয়া করে আমার বিয়ে নিয়ে ভাবনা বন্ধ করো। আমি বাঁচবো না।
সুতপা নিরাশ হয়ে নিজের ঘরে এলেন। সৌহার্দ্যকে তিনি হাত ছাড়া করতে চান না। কালো মানুষ উদার মনের হয় তা তিনি দীর্ঘ সংসার জীবনে বুঝেছেন।
সৌমিত্র দিন শেষে কর্মক্ষেত্র থেকে বাড়ি এলেন। বললেন, সৌভিকের সাথে দেখা হয়েছিল। কত আন্তরিক তিনি! কত গল্প করলেন! ছেলে পক্ষ কখনো এত উৎসাহী হয় না। আমি তাঁদের নিরাশ করি কি করে?
সুতপা বললেন, মেয়ের মতের দরকার নেই। পাকা কথা দিয়েছো, কথা রাখবে।

সৌমিত্র বললেন, যে জেদী মেয়ে, তার মতের বিরুদ্ধে কিছু করলে না জানি কি করে বসে। এত আদর দিয়ে বাচ্চা মানুষ করা ঠিক না। অবাধ্য হয়ে যায়।
সৌমিত্র বাবু মেয়ের কাছে এলেন, মা, তোর চোখ স্বর্ণকারের চোখ নয়, তাই সোনাকে তামাজ্ঞান করছিস। তোর চিন্তা জুড়ে যে সৌন্দর্য বিরাজ করছে মূলত সেটা প্রকৃত সৌন্দর্য না। তোর যে সীমাবদ্ধ জ্ঞান তাতে অলীক আর ভেককেই বেশি সৌন্দর্য মনে হয়। সুন্দরের সংগা শুধু সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ তা নয়। সুন্দরের সংগা অনেক হ্যাঁয়ের সমষ্টি।
সৌরির রাগ চরমে উঠলো, বললো, বাবা, তুমি সুন্দর খুঁজছো না, তুমি তোমার মেয়েকে অর্থের মাঝে ভাসিয়ে দিচ্ছো। তুমি তোমার মেয়েকে অর্থের কাছে বিসর্জন দিচ্ছো।
সৌমিত্র মেয়ের কথা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। সুতপাও সৌরির কথা শুনলেন। সৌরি বললো, আমার বিয়ে দেয়া তোমাদের কাছে এতই জরুরি হলে, আমি তোমাদের বসে বসে অন্ন ধ্বংস করলে বলে দাও, আমি কালই ঘর ছেড়ে চলে যাবো।
বাবা মা মেয়ের ঘর থেকে অথর্ব হয়ে ফিরে এলেন। পরদিন কলেজে গেলো। কোথা থেকে সৌচিন্দ্রীয়া দৌঁড়ে এলো, কী খবর বল্? তোর মা বাবা কি এখনো মনস্থির করে আছেন?
সৌরি বললো, কত ভাবে সৌভিক দাদা আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করতেন, কোন দিন কি সুযোগ দিছি? এখন তার ঘরে যদি যেতে হয় এর চেয়ে কি পরাজয় আছে?

সৌচিন্দ্রীয়া বললো, যার বন্ধুদের মধ্যে কেউ কালো নেই, তার জীবন সঙ্গী হবে কালো! ফেসবুকে তোকে নিয়ে শোরগোল পড়ে যাবে। ধিক্কার দেবে সবাই।
সৌমিন্দ্রীয়া বললো, মেয়েদের জীবনটাই তাই। বাবা মা যার কাছে তুলে দেবে তার ঘরেই যেতে হয়।
সৌচিন্দ্রীয়া কথা কেড়ে নিয়ে বললো, তাই বলে কানা, খোড়া, বধির ঠিক করলেও? নিজস্ব মতের দাম নেই? যত সব জ্ঞানী কথা।
সৌরি ক্লাস না করে ফিরে এলো। বাবা মা ওকে নিয়েই কথা বলছিলেন। ও জানালায় দাঁড়িয়ে শুনছে। সৌমিত্র বললেন, মনের উপর জোর দিয়ে ফল ভালো পাওয়া যায় না। যে মেয়ে আজীবন আমার কথাকে উপদেশ ভেবে গ্রহণ করেছে, সে কথা শুনছে না। আমি বিয়ে ভেঙে দেবো।
সুতপা বললেন, অদৃষ্ট মন্দ হলে এমনই হয়। তোমার মেয়ে সৌহার্দ্যকে অপছন্দ করার মধ্য দিয়ে এটাই বোঝালো ও তোমাকেও ভালোবাসে না। তুমি বাবা বলে ও বাবা বলে ডাকে, নতুবা ও তোমাকে নমস্কারও দিতো না।

এ পর্যন্ত শুনে সৌরি ঘরে চলে গেলো। মনটা ওর খুব ভেঙে গেলো। সৌচিন্দ্রীয়া ফোন দিলো, কিরে হবু বরকে নিয়ে স্বপ্নজাল বুনছিস?
সৌরি বিরক্তি প্রকাশ করে ফোন কেটে দিলো। সৌচিন্দ্রীয়া আবার ফোন দিলো আর বললো, তোর বাবা অর্থলোভী, নতুবা এমন একটা বিশ্রী চেহারার ছেলের সাথে তোর মত রূপধন্যাকে বিয়ে দিতে চান? শোন, বাবা মা সত্য, কিন্তু সব সময় তারা সত্য থাকেন না। বাবা মায়ের চেয়ে আপন কেউ নেই। তাই বলে তারা যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই কি স্বতঃসিদ্ধ সঠিক?
সৌচিন্দ্রীয়ার কল ধরে রাখলো না সৌরি। শুধু চিন্তাকে সে নিজের বশে আনার চেষ্টা করছে। হ্যাঁ-বোধক ভাবনায় নিমগ্ন করতে চাইলো নিজের অবাধ্য মনকে।
ওদিকে সৌমিত্র বাবু সৌভিককে ফোন দিলেন, বললেন, খুব আশা ছিলো দাদা, কিন্তু বিশেষ কারণে বিয়েটা হচ্ছে না। কথা দেয়ার জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।

বিবাহটা ভেঙে গেলো। সুতপা আঁচলে মুখ ঢাকলেন। সৌমিত্র বাবুও বাকশূন্য।
সৌরিকে অস্বস্তি ছেয়ে ধরলো। মায়ের কথাগুলো ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। একটু পরে সুতপা এলেন, বললেন, আর মন খারাপ করে থাকিস না। তোর বাবা বিয়ে ভেঙে দেছে।
সৌরি মুখ তুলে তাকালো। সুতপা বললেন, আমাদের একমাত্র মেয়ে তুই। আমাদের যত স্বপ্ন তোকে ঘিরে। তোর সুখ আমাদের সুখ। তোর চাওয়া পাওয়ার মূল্য তাই আমাদের কাছে অনেক।
সুতপা নিজের ঘরে চলে গেলেন। চরম সিদ্ধান্তহীনতায় পড়লো সৌরি। সারারাত ভাবলো। ভেবে ও সিদ্ধান্তে পৌঁছালো। মাকে রাজী হওয়ার কথা বলবে বলে ঠিক করলো। কিন্তু বলবে বলবে করে বেশ কটা দিন চলে গেলো।
সৌহার্দ্যর ছুটি শেষ প্রায়। ধূমধাম করে রাজকীয় ভাবে বিবাহ করলো। সৌরি সৌচিন্দ্রীয়াকে ফোন দিলো, তুই সৌহার্দ্যকে বিয়ে করলি কেন?
সৌচিন্দ্রীয়া বললো, আর বলিস না, ঝটফট করে কিভাবে কি সব হয়ে গেলো।
কথাটি শুনে সৌরির ঠোঁটে একটু হাসি জাগলো। বড় কষ্টের হাসি। বড় মিষ্টি হাসি। মোনালিসা হাসি।


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.






Nobobarta © 2020 । About Contact Privacy-PolicyAdsFamily
Developed By Nobobarta