সোমবার, ১২ নভেম্বর ২০১৮, ১১:৩১ অপরাহ্ন

English Version
ফয়সাল হাবিব সানি’র কবিতা ও জীবনধর্মী সাক্ষাৎকার

ফয়সাল হাবিব সানি’র কবিতা ও জীবনধর্মী সাক্ষাৎকার

Foysal Habib sunny



  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দীর্ঘ সাত বছর ধরে লেখালেখি করেও বয়স এখনও মাত্র একুশ। অনেকদিন অবধি পাঠকের অাড়ালে থাকলেও বর্তমান সময়ে এসে বাংলা কবিতায় ঘটিয়েছে নব বিপ্লব; নতুন বিস্ময়রূপে অাবির্ভূত হয়েছে নতুন প্রজন্মের তারুণ্য ও প্রেমের কবি হিসেবে। প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থের সংখ্যা চার; রয়েছে দ্বিতীয় সংস্করণও। অনেকের মতে, গ্রন্থ সংখ্যা পাঁচ। সবকয়টি গ্রন্থই কবিতার; ইতোমধ্যে পাঠকমহলেও ফেলেছে ইতিবাচক সাড়া। বলছিলাম, সমসাময়িক বাংলা কবিতার অন্যতম তরুণ কবি ফয়সাল হাবিব সানি’র কথা। অাজ এ তরুণ কবি’র জীবনের নানা দিক ও কবিতায় তার সংগ্রামী পথচলা শীর্ষক নাতিদীর্ঘ একান্ত সাক্ষাৎকার।

প্রশ্নঃ অাপনাকে এ সময়ের প্রেমের ও তারুণ্যের কবি হিসেবেই অভিহিত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে অাপনার অভিমত কি?

উত্তরঃ দেখুন, মানুষ তার ভালোলাগার জায়গা থেকে ভালো কিছু করতে চায়। কালক্ষেপণে খারাপ কিছুও। অামি মনে করি, ভালোলাগার জায়গাটা থেকেই ধীরে ধীরে ভালোবাসার জায়গা তৈরি হয়। কবিতাও অামার কাছে এখন অত্যন্ত ভালোবাসার জায়গাটা দখল করে নিয়েছে। অামার কর্মই প্রমাণ করবে অামি কি? `অামি কে? তা নয় কিন্তু’। অামার লেখা মানুষের ভালো লাগলে মানুষ তার ভালোলাগার জায়গা থেকে কিছু বলতেই পারে, এমনকি সমালোচনাও করতে পারে। অর্থাৎ, ভালোবাসার জায়গাটা থেকেই হয়ত তারা অামাকে এ সময়ের তারুণ্য ও প্রেমের কবি বলে থাকছে। অামার উদ্দেশ্য তাদের ভালোবাসার জায়গাটাকে ধরে রাখা, তাদের ভালোবাসাকে যথাযথভাবে সম্মমানন দদেখানো। ভালোবাসা কিন্তু চাাইলেই সকলে পায় না। তাই নিঃসন্দেহে এখন অামার লক্ষ্য অারও ভালো কিছু করার প্রত্যয় মনের মধ্য পুষে সেইটাকে উপযুক্তভাবে কাজে লাগানো।

প্রশ্নঃ কবিতা দিয়ে অাপনার সাহিত্যে অাসা। এমনকি অামাদের জানা মতে, অাপনি কবিতা ছাড়া অার কিছুই লেখেন না। এই যে কবিতার প্রতি এত ভালোবাসা সৃষ্টির কারণটা কি?

উত্তরঃ অামার কাছে মনে হয়েছে, কবিতা মানুষকে বাঁচতে শেখায়, জানতে শেখায়, ভাবতে শেখায়। কবিতা সাহিত্যের অন্যতম সম্পদ। কবিতা যতটুকু নিজের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তা-চেতনাকে ও নিজের ভাবনাগুলোকে অালোড়িত করতে পারে, সাহিত্যের অন্যান্য শাখা হয়তবা তেমনটা পারে না। কবিতা এক সুবিস্তৃত, সুপরিশীলিত, সুসংবদ্ধ বোধের বহিঃপ্রকাশ। যেখানে বোধ নেই, সেখানে কবিতা নেই। বোধের গভীর কোনো স্তরের ভাবনাময় উৎকর্ষতাই অামার কাছে কবিতা। হয়ত এ সকল কারণেই কবিতা অামার কাছে এত বেশি প্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে অামি মনে করেছি, কবিতা দিয়ে পাঠকের চিত্তে নিজের জন্য একটা স্থান গড়ে তোলা। অামি পাঠকপ্রিয়তা চায়নি, তবে অামার লেখা যদি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে না পারি, মানুষের কাছে পৌঁছাতে অপারগ হয়- তবে তা অামার জন্য চরম ব্যর্থতা ও দুর্ভাগ্য হবে। তাই অামি বারবার ভেবে দেখি, অামার লেখা শুধু কবিতাগুলোই-ই অামি মানুষের কাছে কতটা পৌঁছে দিতে পেরেছি। মানুষ কতটা তা গ্রহণ করবে সেইটা মুখ্য বিষয় না। ধরুন, অামি কবিতা ছাড়াও সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় লেখালেখি করলাম, কিন্তু মানুষ তা জানলোই না, তাহলে অামার লেখার অর্থ দাঁড়ালো কি? অনেকে বলে থাকেন, লেখালেখিটা অনেকটা নিজের জন্যও, অন্যকে জানানোরই বা কি অাছে? অন্যকে জানতেই বা হবে কেন? কিন্তু দেখুন, অামি যতটা না অামার জন্য লিখছি, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের জন্য লিখছি। এইটাই অামার ভাবনা। মানুষের মাঝে অামার লেখার বিস্তৃতি না ঘটলে অামি তাকে নেহাৎ অ লেখায় বলব। তাই হয়ত এই দুর্ভাবনা থেকেই সাহিত্যের এত শাখায় বিচরণ না করে অাপাতত কবিতা নিয়েই পড়ে অাছি।

প্রশ্নঃ কবিতা লেখার পেছনের কাহিনীটা যদি একটু বলেন?

উত্তরঃ প্রকৃতপক্ষে, `অামার খুব বড় হবার স্বপ্ন ছিল, কবি হবার নয়। কবি হবার স্বপ্ন অামি কখনোই দেখিনি। তবে কেন যেন অামি কবি।’ তবে ছোটবেলা থেকেই অামি ভাবতাম অামাকে একদিন অনেক বড় হতে হবে, এমনকি বিখ্যাতও। শৈশব থেকেই বিখ্যাত হবার প্রবল স্বপ্ন ছিল অামার। অামি মনে মনে ভাবতাম, অামি এমন কিছু করব যাতে করে পুরো বিশ্ব অামাকে চিনবে। মানুষ নশ্বর, কিন্তু অামি অবিনশ্বর অর্থাৎ অমর হতে চেয়েছিলাম। যদিও তা শরীরে নয়, মননে। অামি চেয়েছিলাম এমন কিছু করে দেখাতে যার ফলস্বরূপ অামার মৃত্যুর পরও মানুষের হৃদয়ে যেন অামি বেঁচে থাকি; পৃথিবী অামায় মনে রাখে। অামার একসময় বিজ্ঞানী হবার প্রবল ইচ্ছা ছিল। তখন অামি তৃতীয় কিংবা চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। অামি প্রচন্ড টেলিভিশন দেখতাম তখন। টেলিভিশনে বড্ড অাসক্তি তখন অামার। অামি ডিশ অ্যান্টেনা অাবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়েছিলাম সেই সময়ে। চুম্বক, তার, অারও ইলেকট্রিক সরঞ্জাম একত্রিত করে তা অাবিষ্কারের বেশ চেষ্টাও করেছিলাম। কিন্তু সফল হতে পারিনি। অামি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠামাত্র একটু বেশিই পড়াশুনা করতাম। অামার অংকের প্রতিও ঝোঁক ছিলো। গণিতবিদ হবারও ইচ্ছে ছিল একসময়। তারপর ইচ্ছে জেগেছিল ক্রিকেটার হবার। তখন অামি নবম শ্রেণির ছাত্র, অামাদের দেশে তখন ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলা হয়েছিলো। দেশের প্রতি কী যেন এক প্রবল টান থেকে ক্রিকেটার হবার ইচ্ছেটা খুবই বেশি ঘাড়ে চেপে বসল। অার অাশ্চর্য হলেও সত্যি, অার এই বড় ক্রিকেটার হবার স্বপ্ন থেকেই অামার কবিতা লেখার হাতেখড়ি। ক্রিকেট খেলার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি চেয়ে একদিন স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক বরাবর অাবেদন করেছিলাম। তিনি অামাকে অাশ্বস্তও করেছিলেন। এই অাবেদনপত্রটির গুণগান গেয়েছিল স্কুলের শিক্ষক-সহপাঠী সহ অনেকেই। ভীষণভাবে উৎসাহিত হয়েছিলাম সেদিন। রাতে এসে ভেবেছিলাম, অামি নাকি এত সুন্দর করে অাবেদনপত্র লিখতে পারলাম! অামি কি অন্য কিছু লিখতে পারিনা? কি লিখব? গল্প নাকি অন্যকিছু? মাথায় কবিতা লেখার চিন্তা এসেছিল। এমনকি অামি চেয়েছিলাম ৫০০ লাইনের একটি সুবৃহৎ কবিতা লিখব যা অামাকে পৃথিবীতে বিখ্যত করে তুলবে। অার কোনোদিন কবিতা না লিখলেও চলবে, এই একটি কবিতাতেই অামি বিখ্যত হব। সেই সুবাদেই সেই রাতে জন্ম নেয় অামার লেখা ৭৬ লাইনের প্রথম সুবৃহৎ কবিতা “স্বাধীনতার মর্মকথা”। তারপরের পথচলাটা ছিল খুবই করুণ ও হতাশার।

প্রশ্নঃ তারপরের পথচলাটা করুণ ও হতাশার বললেন কেন?

উত্তরঃ তারপর অামি নিয়মিত কবিতা লিখে চলেছিলাম। কিন্তু প্রকাশের কোনো মাধ্যম পায়নি। বিভিন্ন পত্রিকার জেলা প্রতিনিধিদের কাছেও ধর্না দিতাম। কিন্তু তারা অামার কবিতা না দেখেই অল্প বয়সের ছেলে ভেবেই ফিরিয়ে দিত। এমনকি পারিবারিক কোনো সাপোর্টও ছিল না। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অামি অামার কবিতা তেমন কোথাও ছাপাতেও পারিনি। যাই হোক, সেই হতাশা, কষ্ট অার ক্লিষ্টের কাহিনী অাজ নাই বা শুনালাম।

প্রশ্নঃ অাপনি সবেমাত্র অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। পড়াশুনা করছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই সময়েই অাপনার চারটি কবিতাগ্রন্থ। পূর্বে প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থের বেরিয়েছে দ্বিতীয় সংস্করণও। অামার জানা মতে, যা দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যলয়ের ছাত্রই করে দেখাতে পারেনি। কবিতায় এ সময়ে এসে অাপনি নতুন বিপ্লব ঘটালেন। এক্ষেত্রে অাপনার অনুভূতিটা কেমন?

উত্তরঃ এই বিষয়টাকে অামি খুব বেশি প্রধান্য দেওয়ার কিছু মনে করিনা। অামি অামার কাজ করে গেছি, হয়তো লিখেছি অনেক। তাই গ্রন্থসংখ্যও বেশি। এটা অাসলে অাহামরি কোনো বিষয় নয়। তবে ভালোলাগা তো অবশ্যই কাজ করে। বাড়তি উৎসাহ ও প্রেরণার উৎস বলতে পারেন।

প্রশ্নঃ অাপনি বাংলাদেশ ছাড়া ভারতেও পাঠক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। এইটা কি এত অল্প বয়সে অাপনার জন্য অনেক বেশিই প্রাপ্তি না?

উত্তরঃ হ্যাঁ, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের ম্যাগাজিনে অামার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। ভারতীয় বাংলা সাহিত্য ওয়েবেও অামি লিখে থাকি। অামার বই প্রকাশের সময় ভারতের কিছু কবি, সাহিত্যিক ও পাঠকমহলের কাছ থেকেও অনেকটা উৎসাহিত হয়েছি। তারা অামার লেখা পড়ে এবং অনেকেই অামার লেখায় বেশ পঞ্চমুখ। এছাড়াও সবিশেষ বড় কথা, অামার প্রকাশিত গ্রন্থগুলোরও ভূমিকা লিখেছেন ভারতের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কবি-সাহিত্যিক যা একজন উঠতি তরুণ কবি হিসেবে অামার কাছে অত্যন্ত বড় পাওয়া।

প্রশ্নঃ সবশেষে অাপনার বই সম্পর্কে জানতে চাই এবং সামনের একুশে বইমেলায় কি নতুন কোনো বই অাসবে অাপনার এবং অাসলেও সেইগুলো কিসের উপর লেখা হবে?

উত্তরঃ অামার চারটি কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে গেল অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ফেব্রুয়ারিতে। গ্রন্থগুলো যথাক্রমে দাবানল (২য় সংস্করন)",নির্বাচিত ১০১ কবিতা”, নির্বাচিত পঞ্চাশ প্রেমের কবিতা" ওঅপ্রকাশিত কথন”। সবগুলো বই-ই কবিতার এবং সবগুলোই প্রকাশ করেছে নব সাহিত্য প্রকাশনী। বইগুলোর নামশুনেই হয়ত বুঝতে পারছেন, এ কবিতার বইগুলোর কিসের উপর লেখা। অার সামনের বইমেলায় অামার তিনটি কবিতার বই প্রকাশের সম্ভাবনা অাছে। এর মধ্যে গবেষণাধর্মী কবিতার বই একটা, পুরোনো কবিতাগুলো মিলিয়ে কবিতাসমগ্রের বই একটা এবং অন্যটি প্রতিবাদের ৫০ কবিতা নিয়ে নতুন বই অাসতে পারে। উল্লেখ্য, প্রতিবাদের ৫০ কবিতা বইটির প্রত্যেকটি কবিতাই ১০০ লাইন করে লিখবার ইচ্ছে অাছে। অর্থাৎ, সবকয়টি কবিতাই দীর্ঘ কবিতা হবে।

প্রশ্নঃ অনেক ধন্যবাদ অাপনাক সময় দেওয়ার জন্য। অাপনার লেখালেখির সাফল্য এবং সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করছি। ভালো থাকবেন।

উত্তরঃ ধন্যবাদ, ভাই। অাপনিও ভালো থাকবেন।

লাইক দিন

Please Share This Post in Your Social Media




Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com