আজ শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৪:৩২ পূর্বাহ্ন

৩০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৬ই রবিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী
National Election
সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা : আইনের বাস্তবায়ন জরুরি!

সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা : আইনের বাস্তবায়ন জরুরি!

Road accident

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আবুল বাশার শেখ # দেশের সড়ক-মহাসড়গুলোতে কিছুতেই যেন মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহত হওয়ার ঘটনা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। কোনোভাবেই সড়কগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরে আসছে না।

গত ২৯ জুলাই বেপরোয়া বাসের চাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর জেরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের পর সড়ক পরিবহণ আইন মন্ত্রিসভার অনুমোদন পায়। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে যানজটমুক্ত নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা জমা দিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশও দেয়া হয়। এর আগে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গত জুনে ছয় দফা নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু সেসব কতটা বাস্তবায়ন বা কার্যকর হয়েছে তা বলাই বাহুল্য।

গত কয়েক দিনের সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র থেকে বলা যায় অবস্থা সেই প্রায় আগের মতোই। বেশি যাত্রী তোলা ও একই রুটের বাসের আগে যাওয়ার জন্য রেষারেষি বন্ধ হয়নি। মালিক-শ্রমিক নেতাদের ঘোষণাও মানছেন না অনেকে। এর মধ্যেই ১৯ সেপ্টেম্বর বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির (এনসিপিএসআরআর) নিয়মিত মাসিক জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকাশ করে যে গত আট মাসে ৩ হাজার ১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১১ নারী ও ৪৫৩ শিশুসহ ৩ হাজার ২০২ জন নিহত ও ৭ হাজার ৮৮৩ জন আহত হয়েছে। জাতীয় মহাসড়ক, আন্ত:জেলা সড়ক ও আঞ্চলিক সড়কসমূহে এসব প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে। তবে জুলাই মাসের তুলনায় আগস্টে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি- দুটিই কমেছে। ২২টি বাংলা ও ইংরেজি জাতীয় দৈনিক, ১০টি আঞ্চলিক সংবাদপত্র এবং আটটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সংবাদ সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৯ জুলাই থেকে সপ্তাহব্যাপি রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনাবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহণ খাতে বিশৃঙ্খলা কমতে শুরু করেছে। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাইয়ে ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় ৪৪ নারী ও ৬৭ শিশুসহ ৩৭৪ জন নিহত হয়। চলতি বছরের আগস্টে ৩১৪টি দুর্ঘটনায় ৫০ নারী ও ৬০ শিশুসহ নিহত হয় ৩৫৭ জন। তবে জুলাইয়ে আহতের সংখ্যা ৯০২ হলেও আগস্টে তা বেড়ে ১ হাজার ৬ জন হয়েছে। এছাড়া দুর্ঘটনা রোধসহ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতা অনেক বাড়লেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

জাতীয় কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, খোদ রাজধানীতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে বেপরোয়া গাড়ি চলাচল, ভাঙা অবকাঠামোযুক্ত রঙচটা বাসে যাত্রী পরিবহণ, অপ্রাপ্তবয়স্কদের দিয়ে লেগুনা ও ইজিবাইক চালানো, ফুটপাতের ওপর দিয়ে মোটরসাইকেল চলাচল এবং সড়ক পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে মহাসড়কে তিন-চাকার যানবাহন চলাচলের ঘটনা অহরহ ঘটছে। তবে বিআরটিএ ও পুলিশের বর্তমান তৎপরতা বছরজুড়ে অব্যাহত থাকলেও নিকট ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা ও সড়কের বিশৃঙ্খলা অনেক কমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জানুয়ারিতে ৪০৩টি দুর্ঘটনায় ৫৪ নারী ও ৩০ শিশুসহ ৪২৫ জন নিহত ও ৯৩৩ জন আহত হয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৩ দুর্ঘটনায় ৫৩ নারী ও ৪৮ শিশুসহ ৪১৩ জন নিহত ও ৯৯৫ জন আহত হয়েছেন। মার্চে ৩৭৯টি দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত হয়েছেন যথাক্রমে ৩৮৫ ও ৯৭১ জন, নিহতের তালিকায় ৫৩ নারী ও ৭৯ শিশু রয়েছে। এপ্রিলে ৪০৮টি দুর্ঘটনায় ৫০ নারী ও ৫০ শিশুসহ ৩৮৯ জন নিহত ও ১ হাজার ৩২ জন নিহত হয়েছে। মে মাসে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩৬৩টি। এতে ৪০ নারী ও ৫১ শিশুসহ নিহত হয়েছেন ৩৮১ জন এবং আহত হয়েছেন ৮৪৬ জন। জুনে ৪২৭টি দুর্ঘটনায় ৬৭ নারী ও ৬৮ শিশুসহ ৪৭৮ জন নিহত ১,১৯৮ জন আহত হয়েছেন।

দুই ঈদে দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, ১২ জুন থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত ১৩ দিনে ঈদ-যাতায়াতে (ঈদুল ফিতর) ২১১টি দুর্ঘটনায় ৩৭ নারী ও ৩২ শিশুসহ মোট ২৪৮ জন নিহত ও ৭১৭ জন আহত হয়েছেন। ১৫ আগস্ট থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ১১ দিনে ঈদ-যাতায়াতে (ঈদুল আজহা) দুর্ঘটনা ঘটেছে ৯৬টি। এসব দুর্ঘটনায় ২২ নারী ও ২১ শিশুসহ মোট ১৪২ জন নিহত ও ৩১৮ জন আহত হয়েছেন।

গত ৩ আগস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, সারা দেশে এখন ত্রুটিপূর্ণ ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। আর যানবাহনের তুলনায় লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা নয় লাখ কম। অর্থাৎ নয় লাখ যানবাহন চালাচ্ছেন অদক্ষ লাইসেন্সহীন ভুয়া চালক। একদিকে ভুয়া অদক্ষ লাইসেন্স বিহীন চালক আর অপর দিকে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন। এই দুইয়ে মিলে সড়ক-মহা সড়ক অনিরাপদ করে তুলেছে। ঐ প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা ইনিস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। শতকরা ৯০ ভাগ দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতি আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে। এছাড়া যানবাহনে ত্রুটি, পরিবেশ পরিস্থিতি ও অন্যান্য কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ১০ শতাংশ। (সূত্র- প্রথম আলো, ৩ আগস্ট, ২০১৮) লাইসেন্সহীন অদক্ষ চালকরা যখন লক্কড়ঝক্কড়, চ্যাপা, রং নেই, গ্লাস ভাংগা, পোড়া গন্ধ এমন যানবাহন বেপরোয়া গতীতে চালান, তখন দুর্ঘটনা ঘটবে না তো কী?

বিষয়টি খেয়াল করুন নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকালে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যা যা করা দরকার তার সবকিছুই করা হবে। সে প্রতিশ্রুতি পূরণের অংশ হিসেবে রাজধানীসহ সারা দেশের সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে গত ২৭ আগস্ট সড়ক পরিবহণ উপদেষ্টা পরিষদের সভায় ১৮টি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এসব সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেয়া হয়। মহাসড়কে ৮০ কিলোমিটার গতির ওপরে যানবাহন চালানোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ঢাকায় বাসগুলোর প্রতিযোগিতা বন্ধে চুক্তিভিত্তিক চলাচল বন্ধ করার আগের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হবে। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বাস, ট্রাকচালকদের জন্য বিশ্রামাগার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়া মহাসড়ক থেকে নসিমন, করিমন, ভটভটি, অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বা নেয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সেসব সিদ্ধান্ত যেন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে। বাস্তবায়নে জোর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না হামেশা। বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া যানবাহন চালানো অপরাধ। এ জন্য জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু হাজার হাজার অদক্ষ চালক ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই যানবাহন চালাচ্ছেন। এ জন্য কারও শাস্তি কিংবা জেল-জরিমানা হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। বিচার ও শাস্তি হয় না বলে বেপরোয়া চালকদের দৌরাত্ম্যও কমছে না।

কয়েকদিন আগে যাত্রীকল্যাণ সমিতি সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে কিছু বিষয় তুলে ধরেছে। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধে চলাচল, অদক্ষ, লাইসেন্সবিহীন চালকের বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানো, পণ্যবাহী যানবাহনেও বিপজ্জনকভাবে যাত্রী পরিবহণকে তারা সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিভিন্ন সময় বিশেষজ্ঞরাও প্রায় একই ধরনের কারণের কথা বলেছেন।

দুর্ঘটনা ঘটার এসব কারণগুলো দূর করা মোটেও কঠিন কিছু নয়। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন, সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও কর্মকর্তাদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করা। তা না করলে জবাবদিহি ও শাস্তির ব্যবস্থা থাকা অবশ্যই জরুরি। পরিশেষে বলা যায়, একটি দুর্ঘটনা ঘটার পর আমরা মর্মাহত হই, দুঃখ প্রকাশ করি ক্ষমতা থাকলে আন্দোলন করি। এসব করেই কী দায়-দায়িত্ব শেষ! কেন হচ্ছে এসব! সড়কে মৃত্যুর মিছিল কেন থামছে না? এতে কি কারো মাথা ব্যাথা আছে! কেউ কি আছেন চালকদের নিয়ন্ত্রণ করার! দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে ছাত্ররা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, যারা এসব নিয়ন্ত্রণ করার কথা, তারা বেখবর। তাদের গাড়িরই কাগজ নাই, চালকের লাইসেন্স নাই, তারাও লেন ছাড়া উল্টো পথে চলেন তোয়াক্কা করেনা আইনের। আইনের প্রতি সবার শ্রদ্ধাশীল হওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে যারা আইন প্রয়োগ করবেন তাদেরকেও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলসহ সকল নাগরিক যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হন, আইনের প্রতি হন শ্রদ্ধাশীল, তাহলে দেশে কোনো অনিয়ম থাকবে না। কমবে দুর্ঘটনা, অকালে ঝরে পরা থেকে বাঁচবে অসংখ্য মানুষের জীবন।

আবুল বাশার শেখ : সাংবাদিক

লাইক দিন

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Nobobarta on Twitter

© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com