মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন

English Version
নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন, সামাজিক দায়বদ্ধতা কোন পথে!

নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন, সামাজিক দায়বদ্ধতা কোন পথে!



  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আবুল বাশার শেখ # আমাদের দেশে দিনকে দিন আশঙ্কাজনক হাওে বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতন। একই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনাও। গত ৫ বছওে প্রতিদিন গড়ে ৮ জন শিশুএবং ৩ জন নারী সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই ভয়াবহতা দিনকে দিন শুধু বেড়েই চলছে। প্রতিরোধ করার সঠিক কার্যকরী কোন রাস্তা এখনো আবিষ্কার করতে পারেনি এই দেশের নারীবাদী কিংবা নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধকারী সংগঠন গুলোর কেউই। তাই নারী ও শিশুর প্রতি এই নির্মম নির্মমতা ও ন্যক্কারজনক নির্যাতনের চিত্র ভারী হতে দেখেও নিরুপায় হয়ে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে তথা কথিত বুদ্ধিজী বিবিবেকবান মানুষ। এই অবস্থায় জোড়ালো কোন পদক্ষেপ তারা নিচ্ছে না বলেই এখন প্রতিয়মান হয়। তারপরও কিছ ুবিবেকবানের বিবেক নিরবেই ধিক্কার জানায় এই সব কর্মকান্ডকে। আমাদের এদেশের সমাজব্যবস্থা বর্তমানে প্রকৃতপক্ষে কোন দিকে যাচ্ছে তা সত্যিই ভাবনার বিষয়। এই সমাজ নিয়ে কত জনচিন্তাশীল কাজ করছে তারও একটা সমীক্ষা করা দরকার।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে মোট ২ হাজার ৬৩ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫৯২টি। তন্মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৯৮ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৯ জনকে, এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৬১ জনকে।

সম্প্রতি মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মালেকা বানু এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, পরিষদের লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদে সংরক্ষিত ১৪টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুসাওে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। মহিলা পরিষদ মনে করে, নারী নির্যাতনের সকল ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় না। তাই প্রকৃত নারী নির্যাতনের ঘটনা আরও অনেক বেশি। প্রকাশিত প্রতিবেদন মতে উক্ত সময়ে ২৩ জন নারী শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬৫ জননারী ও কন্যাশিশু। উক্ত সময়ে এসিড দগ্ধ হয়েছে ১০ জন নারী। তন্মধ্যে এসিড দগ্ধের কারণে মৃত্যু হয় ২ জনের। অগ্নিদগ্ধের ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি। তন্মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১০ জন নারীর। একই সময় অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৭৭টি। ১৩ জন নারী ও শিশু পাচার করা হয়েছে। তন্মধ্যে পতিতালয়ে বিক্রি করা হয়েছে ৪ জনকে। উক্ত সময়ে বিভিন্ন কারণে ২৬৮ জন নারী ও কন্যা শিশুকে হত্যা করা হয়েছে এবং আরও ২৭ জনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। গত ছয় মাসে ১৩ জন গৃহপরিচারিকাকে নির্যাতন করা হয়েছে। তন্মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ৩ জনকে এবং নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ২ জন গৃহপরিচারিকা।

একই সময় যৌতুকের জন্য হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১১৩ জন নারী ও কন্যাশিশু। তন্মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ৫১ জনকে। প্রতিবেদনে দেখা যায় এ সময় উত্ত্যক্ত করা হয়েছে ৯০ জননারী ও কন্যাকে। তন্মধ্যে উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে ১১ জন। বিভিন্ন নির্যাতনের কারণে ১৫৪ জন আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন ৯ জন নারী ও কন্যা শিশু এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়া হয় ১৫ জনকে। উক্ত সময় ১৮৮ জনের রহস্য জনক মৃত্যু হয়েছে। বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে ৮৪ কিশোরী। শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে ১৭১ জনকে। একই সময় বেআইনি ফতোয়ার ঘটনা ঘটেছে ৭টি। পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩ জন। ২০ জনের জোরপূর্বক বিয়ের ঘটনা ঘটেছে। এয়াড়া এসময় ৬৮টি অন্যান্য নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এই চিত্র কতটা ভয়াবহ একটি দেশের জন্য সেটা অন্তত এশবার হলেও আমাদের ভাবা উচিত। এবার এই বিষয়টি নিয়ে একট ুভিন্নভাবে আলোকপাত করা যাক।

বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন বিষয়ক যেসব তথ্য ও সার্বিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, তার বেশির ভাগই প্রতিদিনের সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের উপর ভিত্তি কওে হয়ে থাকে। নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা কিছু সংগঠন তাদের সামর্থ্যের উপর ভিত্তি কওে কয়েকটি পত্রিকার কনটেন্ট বা আধার বিশ্লেষণ করে এই কলেবরের গবেষণা গুলো রির্পোট আকাওে জনসাধারণের জন্য উপস্থাপন করে থাকেন। এতে দেশের সার্বিক নারী ও শিশু নির্যাতন পরিস্থিতির একটা ধারণা পাওয়া যায় সত্য, কিন্তু এই পরিসংখ্যানের মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতন পরিস্থিতির যথাযথ প্রতিরূপ অথবা পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। অর্থাৎ প্রতিদিনের পত্রিকা যেমন সার্বিক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতে পারেনা, ঠিক তেমনি ভাবে এ ধরনের বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাওয়া নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র ও বাংলাদেশের সার্বিক নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র হয়ে উঠেনা। তারপরও যেটুকু পাওয়া যায় সেটাই তো মহামারী আকার ধারণা করে। একটু বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিতে দেখলে দেখা যাবে আমাদের দেশে ন্যায্য বিচার না পাওয়ার কারণে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণ ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কুশিক্ষা নারী নির্যাতনের নেপথ্যের বড় কারণ। আইনের দিকবিবেচনা করলে দ্রুত বিচার না হওয়াকে এ ক্ষেত্রে দায়ী করা যেতে পারে। এদেশের নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র এমন এশটি অবস্থায় বিরাজ করছে যে চোখের সামনে নারী ও শিশু নির্যাতন হলেও কেউ এগিয়ে আসছে না। কোনো নারী যদি তার ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেন, তাহলে সমাজ পতিরা তাকে নানা ভাবে হেয়প্রতিপন্ন করে।

সামাজিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অভাব ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে নারী নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কা জনক হাওে বাড়ছে। স্কুল, কলেজ, কোচিং, এমনকি নিজ বাড়িতেও নিরাপদ নয় নারী ও শিশু-কিশোরীরা। নির্যাতনের ঘঁনায় ভয়ে মামলা না করা, ক্রটিপূর্ণ তদন্ত, বিচারে দীর্ঘ প্রক্রিয়া, সামাজিক ও প্রশাসনের নির্লিপ্ততাসহ নানা কারণে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ বন্ধ হচ্ছে না।

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে সরকারিবা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই রাতারাতি এর পরিবর্তন সম্ভব নয়। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের সবাইকে যারযার অবস্থান থেকে পদক্ষেপ গস্খহণ করতে হবে। নারীদের সাহস কওে প্রতিবাদ করতে হবে। সঠিক আইনের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে হবে। সরকারের সার্বিক সহযোগিতা নিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে নাগরিক সচেতনতার মাত্রা বৃদ্ধি করতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডার গার্টেন, উচ্চ বিদ্যালয় এমনকি কলেজ বা মহাবিদ্যালয় গুলোকে এই সচেতনতা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি পরিবারকে যুক্ত করতে হবে। চোখে আঙ্গুল দিয়ে মা, বোন, স্ত্রী, কন্যা কি সেটা বুঝিয়ে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ বা ওয়ার্ড কাউন্সিল একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তারা এই সচেুনার বার্তাটি অতিদ্রুত জনসাধণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারবেন। সাধারণত কর্মজীবী শিশুরা অধিক নির্যাতনের শিকার হয় বলে বাজাওে বাজাওে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সচেতন করতে হবে। অপর দিকে সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন ও সিনেমাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে বিভিন্ন সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রকাশ ও প্রচার করা যেতে পারে।

লাইক দিন

Please Share This Post in Your Social Media




Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com