নারী ও শিশু ধর্ষণের উৎসব চলছে সারা দেশে, এখনি লাগাম টেনে ধরতে হবে | Nobobarta

আজ সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২০, ০২:০৪ পূর্বাহ্ন

নারী ও শিশু ধর্ষণের উৎসব চলছে সারা দেশে, এখনি লাগাম টেনে ধরতে হবে

নারী ও শিশু ধর্ষণের উৎসব চলছে সারা দেশে, এখনি লাগাম টেনে ধরতে হবে

Rudra Amin Books

: দিন দিন নারী ও শিশুদের জন্য সারা দেশটাই কেনো যেন অনিরাপদ হয়ে যাচ্ছে। সমাজে অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা, এসিডে জ¦লসানো বিভৎস শরীর দেখে মনে হতেই পারে এ যেন এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটে যাচ্ছে নিরবেই। গলিত, অর্ধগলিত বা অজ্ঞাত লাশের মিছিল, খুন, ধর্ষণের মতো চরম অপরাধ বেড়েই চলেছে।

এক সময় বিশ^বিদ্যায়ে ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেলেও বর্তমানে স্কুল/কলেজ এমনকি মাদ্রাসায় নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে। যেখানে মানুষ বানানোর জন্য বাবা-মা বাচ্চাদের পাঠিয়ে দেন, সেখানেও যদি বাচ্চারা নিরাপদ না থাকে, তবে আর কোথায় নিরাপদ থাকবে? সম্প্রতি বরগুনায় কলেজের সামনেই দিনে দুপুরে চাপাতির আঘাতে কতো নির্মমভাবে রিফাতকে হত্যা করা হলো। মিডিয়া ও টেকনোলোজির কল্যাণে সারা বিশে^র মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। এর আগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, বাবার বয়সের কুলাঙ্গার কর্তৃক যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করায় নুসরাতকে গায়ে কেরোসিনে জ¦লসিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তারও আগে খাদিজা’কে চাপাতির আঘাতে দিনে কুপিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল তারই পরিচিত ও এক সময়ের গৃহশিক্ষক। যদিও খাদিজা প্রাণে বেঁচে যায় খোদার কৃপায়। তারও আগে জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের সামনে বিশ^জিৎকে চাপাতির আঘাতে কুপিয়ে হত্যার দৃশ্য যারা দেখেছেন, তারাই বলতে পারবেন কতো অমানবিক ছিল সেসব দৃশ্য। এরই মধ্যে যোগ হয়েছে চলন্ত বাসে/ট্রেনে নারী/শিশু ধর্ষণ। শুধু তাই নয় ধর্ষণের পর হত্যা যে কতো ভয়াবহরূপ লাভ করেছে চারিদিকে, যা কল্পনা করা যায় না। প্রতিদিনই কোনো না কোনো ধর্ষণ অথবা ধর্ষণের পর নারী অথবা শিশুকে হত্যার খবর পত্রিকায় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।

তিন বছরের কন্যা শিশু থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বৃদ্ধা, প্রতিবন্ধী নারী, কেউই বাদ যাচ্ছে না ধর্ষকদের হাত থেকে। ধর্ষণ বা গণধর্ষণ যেন এক ব্যাধির নাম। এক উম্মাদ খেলায় মেতে ওঠেছে কিছু ধর্ষকরূপী হায়েনারা। শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীদের যৌন হয়রানি একটি নৈমত্তিক ঘটনা। যাদের নৈতিক শিক্ষার আলো নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে দেশ ও দশের সেবা করার কথা। তারা আজ নিরাপত্তাহীন এক পাশবিক পরিবেশে জীবন অতিবাহিত করে বেড়ে ওঠছে। দেখার যেন কেউ নেই। ক্ষমতাসীন দলের আর্শীবাদপুষ্ট হয়ে কেউ কেউ ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। ধর্ষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে গর্ববোধ করছে। কেউ ১০/২০ জনকে ধর্ষণ আবার কেউ নারী ধর্ষণে সেঞ্চুরী করার রের্কডও পত্রিকার পাতায় দেখা যায়। সারা দেশে একটা ভীতিকর এক পরিবেশ তৈরী করেছে কিছু বিকৃত মানসিকতার লোক। যারা আইনের প্রতি কোনোরূপ তোয়াক্কা না করে এসব করছে। পড়া-লেখার পরিবেশকে যারা কলুষিত করছে তারা আবার বীর দর্পে চষে বেড়াচ্ছে সমাজে। পাড়ায় মহল্লায় নির্বিচারে চলছে ধর্ষণের মহোৎসব। তুফান মেইল বেগে যে নগ্ন খেলায় মেতে ওঠেছে কিছু দুষ্কৃতিকারী, তা সমাজকে কোথায় নিয়ে যাবে সেটাই দেখার বিষয় এবং চিন্তার বিষয়।

জানুয়ারি থেকে জুন ২০১৯ পর্যন্ত ছয় মাসে সারা দেশে ৩৯৯ শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার স্বীকার হয়েচে। ধর্ষণের পরে ১৫ মেয়ে শিশু ও ১ ছেলে শিশু হত্যাকে হত্যা করা হয়। একই সময়ে ৬৩০ জন নারী ধর্ষণের স্বীকার হয়, যা পূর্বের যেকোনো রেকর্ডকে অতিক্রম করেছে (আসক/ডেইলি স্টার)। ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ/চাকুরী দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নিরীহ, দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। বিদ্যালয়ে/কোচিংয়ে বেশি নম্বর পাইয়ে দেয়ার নামে ধর্ষিত হচ্ছে মেয়েরা। প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হলে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা আর কি হতে পারে? ধর্ষণের ঘটনা ভিড়িও/মোবাইলে ধারণ করে পরবর্তীতে ব্লাকমেইল করে দীর্ঘদিন ধর্ষণ করার নজিরও আছে। স্বেচ্ছায় সম্পর্কের কারণে ধর্ষিত হলে কাউকে বলারও কিছু থাকে না। ফলে নিরবে সহ্য করা ছাড়া আর কি করার থাকে? ছকোলেট/আইসক্রিম অথবা খাবার-এর প্রলোভন দেখিয়ে যেখানে নারী/শিশু ধর্ষণ করা যাচ্ছে সেখানে ভাবতেই অবাক লাগে আমরা নাকি ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছি! আমরা নাকি উন্নয়নের মহাসড়কে পৌঁছে গেছি, অবশ্য এসব কিছু মন্ত্রী মহোদয়ের মুখে প্রায়শ শোনা যায়! আর যদি তাই হয়ে থাকে তবে এ উন্নয়ন নিশ্চয় প্রত্যাশিত নয়। জনবান্ধব নয়। যে উন্নয়ন মানুষকে বাসা-বাড়িতে নিরাপত্তা দিতে পারে না। মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করতে শেখায় না, তবে সে উন্নয়ন অবশ্যই কাঙ্খিত নয়। রাতের আঁধারে কিংবা দিনে দুপুরে বলিউড/হলিউডের সিনেমা স্টাইলে মানুষ হত্যা। যেন নজির বিহীন এক ভূতুড়ে পরিবেশে বেড়ে ওঠছে আমাদের কোমলমতি শিশুরা। উন্নয়নের সূচক যেমনটি উন্নয়ন হবে, ঠিক তেমন করে মানবিক মূল্যবোধেরও উন্নয়ন হতে হবে, মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বীকার করার মানসিকতা তৈরী হতে হবে। নচেৎ টেকসই উন্নয়ন কল্পনাই থেকে যাবে।

তবে মনে রাখতে হবে পাড়া-মহল্লার অনেক ধর্ষণের খবর পত্রিকায় আসে না। অনেকেই মামলা করতে চান না, বিভিন্ন রকমের হয়রানির জন্য। কিছু অসাধু পুলিশও অনেক সময় মামলা নিতে গড়িমসি করে। ধর্ষকদের ক্ষমতা ও হুমকির মুখে সবই যেন অকার্যকর ও নিরব দর্শক। ধর্ষিতাকে দায়ী করে মানসিকভাবে দূর্বল করার চেষ্টাতো আছেই। গ্রামের প্রভাবশালীরা সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার নামে চলে আরেক অমানবিক নির্যাতন। ধর্ষকের পক্ষে রায় দিয়ে অর্থ আদায় তো নিয়মিত ব্যাপার। আবার উল্টো ধর্ষিতা দায়ি করে অথবা খারাপ মেয়ে আখ্যা দিয়ে মাথার চুল ন্যাড়া করা/এক ঘর করে রাখা/প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত, সমাজ থেকে বের করে দেয়ার ঘটনাও আছে বিস্তর। বিচার না পেয়ে অপমান সহ্য করতে না পেরে অনেকেই এলাকা ছেড়ে দেয় অথবা আত্মহত্যার পথে পাড়ি দেয়। পুলিশ অনেক আসামীকে গ্রেফতার করে। কিন্তু প্রয়োজনীয় আলামত, যথাযথভাবে মামলা পরিচালনা অথবা প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ার কারণে আসামীরা খালাস পেয়ে যায়।

মামলার রায়ের দীর্ঘসূত্রতা। আইনের ফাঁক-ফোকর। ধর্ষণের শাস্তির আইন অনেক পুরাতন। ধর্ষিতাকেই প্রমাণ করতে হয় যে, সে ধর্ষিত হয়েছে। মেডিক্যাল চেকআপ, তদন্ত কমিটি কর্তৃক তদন্ত করতে গিয়ে যে সব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় ধর্ষিতাকে/তার পরিবারকে। এরকম কতোগুলো প্রক্রিয়া চালু আছে, তাতে পুনরায় ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটে। যা একজন ধর্ষিতাকে এবং তার পরিবারকে সামাজিকভাবে খাটো/হেয়পতিপন্ন করা ছাড়াও এক বিভ্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়া হয়। এসবই ধর্ষকদের জন্য একটা অনুকুল পরিবেশ যেন রাষ্ট্রই করে দিয়েছে। আর ধর্ষিতাকে সব সময় একটা ভয়ংকর ও অনিরাপদ পরিবেশ-এর দিকে নিক্ষেপ করা হয়। নারীরা কবে নিরাপদ পরিবেশ পাবে এই দেশে? ধর্ষিতদের পূর্নবাসন ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সহযোগিতার জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে কিছু সেল্টার হোম্স আছে। যা প্রয়োজনের তুলনা অপ্রতুল। সেখানেও থাকার পরিবেশ ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগ আছে বিস্তর।

সমাজে ধর্ষিতাকে কেউ ভালো চোখে দেখে না। ধর্ষিতাকে কেউ বিয়ে করতে চায় না অথবা পরিবার কর্তৃক নিগৃহীত হয়ে এক নারকীয় জীবন যাপন করতে হয়। পরিবার-সমাজ এখনো ধর্ষককে ঘৃণা না করে বরং ধর্ষিতাকেই ঘৃণার চোখে দেখে। নানান রকমের অপবাদ দিয়ে ধর্ষিতাকে আরো মানসিক চাপের মধ্যে রাখে। ফলে অনেক ধর্ষিতার স্বাভাবিক জীবন যাপন ব্যাহত করে মারাত্মকভাবে। সম্প্রতি ‘ব্রাকে’র এক গবেষণায় দেখা গেছে ৯৯% ধর্ষণের মামলার রায় হয় না। ২০-২২ বছর ধরে চলার পরও মামলার রায় হয় না এমন রেকর্ডও আছে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও মামলার সুরাহা না হওয়া। মামলার বাদী আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে একসময় বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দেয়া। এছাড়াও মামলার সাক্ষী উপস্থিত করতে না পারা। আপোষ-মিমাংসা, নিরাপত্তার অভাব’সহ বিবাদীদের হুমকি ও নানান জটিলতাতো আছেই। আর এসব কারণে মামলার রায় পিছিয়ে যায়।

ক্ষমতাসীন দলের ব্যানারে থাকলে দলীয় প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে অনেকেই বিভিন্ন অপরাধ-এর সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে থাকে। মেয়েদের কোনো মানুষ মনে করে না অনেকে। আবার নারী ধর্ষণে অন্য নারী কর্তৃক সহযোগিতা করতেও দেখা যায়। এই চিত্র অত্যান্ত ভয়াবহ। ক্ষমতার দাপট ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণের সংখ্যা আশংকাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। ভুক্তভোগীরাই বুঝবেন এ এক মারাত্মক অনাচার। পরিবারের অভিভাবকদের সময় কাটে সব সময় দুশ্চিন্তায়। ধর্ষণের শাস্তি অনেক কঠোর আইন আছে আমাদের দেশে। কিন্তু আইনের সেইভাবে প্রয়োগ যদি শতভাগ নিশ্চিত করা যেত, তবে এত ধর্ষণের ঘটনা ঘটত না।

ছাত্র-ছাত্রীদের প্রকৃত বুদ্ধিদীপ্ত জ্ঞান চর্চার পরিবেশ ও কর্মমূখী শিক্ষা এবং ও মানসিক বিকাশের সুযোগ দিতে হবে। যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষকদের চাকুরিচ্যুতিসহ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষমতার দাপটে কোনো ছাত্র কর্তৃক ছাত্রীদের যৌন হয়রানির অভিযোগ আসলে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামে/শহরে কোন নিরীহ দরিদ্র মেয়ে নির্যাতিত হলে তাৎক্ষণিক যেন প্রশাসন কর্তৃক প্রয়োজনীয় সহায়তা ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে পারলে নারী ধর্ষণের ঘটনা অনেক কমবে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন। ক্ষমতায় থাকলে/দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি চালু আছে, তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে যাতে কেউ বের হতে না পারে সেইজন্য প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করা উচিৎ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থারকে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। কন্যা শিশু অথবা নারীরা আপনার/আমার পরিবারের সদস্য। পরিবারের সবাইকে নারীদের প্রতি নজর বাড়াতে হবে। মনমানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে পুরুষদের। মেয়েদের আরো সচেতন হতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলো নারী ও শিশু ধর্ষণ/নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি আরো বাড়াতে হবে। মানবিক মূল্যবোধের উন্মেষ ঘটুক, সে প্রত্যাশায়।

 

(লেখক: আবুল খায়ের- কবি, কলামিস্ট ও ঊন্নয়ন কর্মী).


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.






Nobobarta © 2020 । About Contact Privacy-PolicyAdsFamily
Developed By Nobobarta