প্রকৃতিকন্যা জাফলংয়ে একদিন | Nobobarta

আজ বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২০, ০৮:৩৩ পূর্বাহ্ন

প্রকৃতিকন্যা জাফলংয়ে একদিন

প্রকৃতিকন্যা জাফলংয়ে একদিন

Rudra Amin Books

জিএ মিল্টন # মঙ্গলবার। সকাল ৭টা। আমরা আমাদের হোস্টেল ‘বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’ থেকে খাওয়া-দাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়ি জাফলংয়ের উদ্দেশে। আগে থেকেই আমাদের বাস রিজার্ভ করা ছিল। তবে একটা নয়, দুটি। কারণ আমরা ছিলাম ৫৭ জন। যাদের মধ্যে ছিলেন দুজন গুণী শিক্ষক। একজন অধ্যাপক ড. মোবাররা সিদ্দিকা, অন্যজন সহকারী অধ্যাপক ড. রতন কুমার। যারা ক্ষেত্রসমীক্ষার দশ দিনেই নিজের সন্তানের মতো আমাদের আগলে রেখেছিলেন।

একটু বলে নেওয়া দরকারÑ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগ প্রতিবছরই ক্ষেত্রসমীক্ষার জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় পাড়ি জমায়। বাধ্যতামূলক একটি কোর্সের জন্য এই কাজ করতে হয় তাদের। যেখানে বিভাগের দুজন তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক থাকেন। তাই এবার আমরা ক্ষেত্রসমীক্ষার জন্য গিয়েছিলাম সিলেট জেলায়। যার জন্য দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল সেই প্রকৃতি কন্যা জাফলংকে।

বাস আমাদের ইনস্টিটিউট গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। আমরা হৈ-হুল্লোড় করতে করতে বাসে উঠে চেপে বসি। সবাই ঠিকমতো বাসে উঠেছে কিনা খোঁজখবর নিয়ে তবেই বাস ছাড়ার আদেশ দিলেন রতন স্যার। কয়েকজন ছাড়া আমরা সবাই ছেলেদের বাসে ছিলাম। আমাদের বাসচালক মনের সুখে বাস চালাচ্ছিলেন আর আমরাও মনের সুখে গান গাচ্ছিলাম। সে যেন গান নয়, এক অজানা সুর। আহা কি আনন্দ আকাশে-বাতাসে। যে জীবনে কখনো গাইত না সেও যেন আনন্দের উচ্ছ্বাস ভেঙে ভাঙা কণ্ঠে সবার সঙ্গে গাইছে। তবে এবার বাসে কেউ বমি করেনি। গান গাইতে গাইতে কখন যে আমরা সেই সিলেটের আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে জাফলংয়ে পৌঁছাই তা বলতেই পারিনি। দীর্ঘ তিন ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে আমরা সেখানে পৌঁছাই।

জাফলংয়ে পৌঁছার পরই সবাই তড়িঘড়ি করে নামছিলেন; সেই প্রকৃতি কন্যার দৃশ্যকে ধারণ করার জন্য। সবার মোবাইল ক্যামেরা ও ডিএসএলআর থেকে যেন একটাই শব্দ কানে ভেসে আসছে ক্লিক ক্লিক। সবাই যেন ছবি তোলার নেশায় পড়েছে। কেউ একে অন্যের ছবি আবার কেউ সেলফি। কেউ বন্ধুকে, কেউ বান্ধবীকে আবার কেউ বা শিক্ষকদের সঙ্গে তুলছে প্রকৃতি কন্যার লীলার দৃশ্য। ঠিক কিছুক্ষণ পর অনেকেই জাফলংয়ের পাথর কুড়াতে শুরু করেছে। চকচকে সাদা পাথর কুড়াতেই সবাই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। এখানকার পাথর যেন মূল্যবান রতœ। পেছনে তাকিয়ে দেখি আমাদের প্রিয় শিক্ষক রতন স্যার তিন-চারটি পাথর কুড়িয়েছে। এদিকে মোবাররা মেমসহ বন্ধুদের অনেকেই ব্যাগে ভরে নিয়েছে অনেক পাথর। তবে মেম পাথরগুলো নিজের কাছে না রেখে আমাদের বন্ধুদের কাছে হস্তান্তর করেছেন পরে নিয়ে নেবেন বলে। পাথর কুড়ানো যে কী মজা তা সেখানে পাথর না কুড়ালে কেউ বুঝতে পারবে না। ছবি তুলতে তুলতে আর পাথর কুড়াতে কুড়াতে হঠাৎ করে বৃষ্টি নামল। এ যেন অন্যরকম এক অনুভূতি। মনে হচ্ছে যেন পাহাড় ভেঙে পাথর থেকে বৃষ্টি নামছে। বৃষ্টি নামা দেখে অনেকেই ছাতা ফুটাল আবার অনেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল জাফলংয়ের পানিতে। সেই পানিতে গোসল করা কি যে অনুভূতি তা গোসল না করলে কখনো বোঝা যাবে না। তবে আশ্চর্য হলাম যে, সেখানে আকাশে এক মিনিটে মেঘ জমে বৃষ্টি হয়ে পাঁচ-সাত মিনিটেই উধাও হয়ে যায়। জাফলংয়ের মাঝখানে প্রবাহিত ঝরনাধারা। আর দুপাশে পাহাড়। সেই পাহাড়গুলোকে ঢেকে রেখেছে সবুজ গাছপালা। সব মিলে এক অপরূপ সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে সেখানে। কিছুদূর থেকে তাকালে দেখা যায় যে, আকাশের যত মেঘ সেখানে ভেসে যাচ্ছে। সব গিয়ে জাফলংয়ের পাহাড়ের ধাক্কায় জড়ো হয়ে জটলা পাকাচ্ছে, দেখতে মনে হচ্ছে যেন সাদা ধোঁয়ার কু-লী পাকাচ্ছে। আর তৎক্ষণাৎ বৃষ্টি নামছে। এ যেন আকাশ, মেঘ আর পাহাড় এক হয়ে মিশে আছে। প্রকৃতির কি অপরূপ লীলা সেখানে বিরাজ করছে; না দেখলে সত্যিই উপলব্ধি করতে পারতাম না। জাফলংকে প্রকৃতি কন্যা বলতে সত্যিই কোনো দ্বিধা নেই।

যেভাবে যাবেন সিলেটের জাফলংয়ে : ঢাকা থেকে বাস কিংবা ট্রেনে একদিন আগে যেতে হবে। কেননা ওইদিন গিয়েই জাফলংয়ের প্রকৃতি সবটা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তবে উড়োজাহাজে গেলে এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে যাওয়া যায় বলে দেখা সম্ভব। সাধারণত ট্রেনে যাওয়াই সবচেয়ে ভালো। সেখানে যেতে প্রায় ৩৫০ টাকা ট্রেনে আর বাসে লাগবে ৫০০ টাকা। এদিকে জাফলংয়ে ছবি তোলার জন্য ডিএসএলআর ক্যামেরা ভাড়া পাওয়া যায়। তবে তারা অনেকে ভাড়া নিয়ে ঝামেলা করতে পারে। তাই পারলে আগে থেকে ঠিক করে নিতে হবে অথবা ক্যামেরা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে।


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.






Nobobarta © 2020 । About Contact Privacy-PolicyAdsFamily
Developed By Nobobarta