বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ০৫:৫০ অপরাহ্ন

English Version
মানব জীবনে ফেসবুকের প্রভাব

মানব জীবনে ফেসবুকের প্রভাব



  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আজহার মাহমুদ : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বলতে এখন ফেসবুক, টুইটার, লিঙ্কডইন এবং আরো কত কিছু আমাদের সামনে উঠে আসে। এ মাধ্যমগুলো আমাদের খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে দুনিয়ার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তের তাজা খবরগুলো পৌঁছে দেয়। শুধু সংবাদই নয়, এর মাধ্যমে স্থিরচিত্র বা ধারণকৃত ভিডিও পাঠানোও খুব সহজলভ্য। আগেকার দিনে একটি পোস্টকার্ড, এনভেলাপ, টেলিগ্রাম বা ওয়্যারলেস ব্যবস্থাই ছিল মানুষের যোগাযোগের বড় মাধ্যম। এখন দেশে বা বিদেশে মোবাইল ঘোরালেই আপনজনের সঙ্গে কথা বলা খুব সহজ। মোবাইলেও রয়েছে নানা ধরনের কম খরচের ব্যবস্থা ইমো, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, স্কাইপি ও টুইটার ইত্যাদি।

গবেষণায় দেখা গেছে, ফেসবুকে অন্য বন্ধুদের সুখী জীবন দেখে অনেকে ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়েন। ফেসবুকের লাইক পাওয়ার আশা এ ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে। গবেষণা বলছে, অন্যরা বেশি লাইক পেলে ৪২ শতাংশ মানুষ ঈর্ষাকাতর হন। রাশিয়ার অ্যান্টি ভাইরাস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ক্যাসপারস্কি ল্যাব বিশ্বের ১৬ হাজার ৭৫০ ব্যক্তিকে নিয়ে একটি সমীক্ষা চালিয়েছে। ওই সমীক্ষার ফল অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে। আমরা হয়তো জানি, এই জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ২০০ কোটিরও বেশি ব্যবহারকারীর মাইলফলক ছুঁয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বের এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ এখন ফেসবুক ব্যবহার করে। ফেসবুকের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জুকারবার্গ ইউএসএ টুডেতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ২০০ কোটি ছাড়ালেও আমরা এখনো সবাইকে সংযুক্ত করতে পারিনি। সবচেয়ে যে বিষয়টি তিনি বলেন, তা হলো সবাইকে সংযুক্ত করা।

হ্যাঁ, বিশ্বের সবাই ফেসবুকে সংযুক্ত হবে। কিন্তু আমাদের এও জানতে হবে যে, ফেসবুকে বাড়ে বিষণ্নতা। যারা দীর্ঘক্ষণ ফেসবুকে অপরের পোস্ট করা ছবি দেখে সময় কাটান, তাদের ব্যক্তিজীবনে বিষণ্নতা বৃদ্ধি পায়। ঈর্ষা, হিংসা, বিদ্বেষও কম ছড়াচ্ছে না ফেসবুকের মাধ্যমে। এই সময়ের প্র্যাকটিসিং মনোরোগ চিকিৎসকরা অনেকেই বলছেন, অতিরিক্ত ফেসবুকাসক্তি এখন মনোরোগে রূপ নিতে চলেছে। এমন অনেকের মুখোমুখি হচ্ছি এখন মধ্যরাত, শেষ রাত অবধি মেতে রয়েছেন ফেসবুক নিয়ে। ফেসবুক মানুষের অতি প্রিয় ঘুমটাকেও এখন কেড়ে নিয়েছে। মানুষ এখন ঘুমানোর সময় ফেসবুক চালায় আর কাজের সময় ঘুমায়।

বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭০টিরও বেশি ভাষায় ফেসবুক ব্যবহার করা হচ্ছে। ফেসবুকে প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে প্রায় দুই লাখ নতুন ব্যবহারকারী। সম্মিলিতভাবে ব্যবহারকারীরা প্রতিমাসে ফেসবুকে সময় কাটান ৭০ হাজার কোটি মিনিট। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সাইট হচ্ছে এই ফেসবুক। ডেনমার্কের এক গবেষণা ফলাফলে দেখা গেছে, যারা ফেসবুক বা অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের কার্যক্রম দেখে ঈর্ষান্বিত হন, তাদের ক্ষেত্রে ফেসবুক ব্যবহার থেকে বিরত থেকে বিষণ্নতা কমার প্রমাণ পাওয়া গেছে। নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার আমাদের জীবন নিয়ে আত্মতুষ্টির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে মানুষের মধ্যে অবাস্তব আর্থ-সামাজিক তুলনা করার মানসিকতা বৃদ্ধি পায়। ফেসবুকে সক্রিয়ভাবে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার মানসিকতা মানুষের মনে ইতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে। কিন্তু যারা নীরবে অন্যের পোস্ট দেখে সময় কাটান, তাদের প্রতি রয়েছে সতর্কবাণী। দীর্ঘক্ষণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলে এবং সে সময় শুধু অপরের পোস্ট কিংবা ছবিগুলোতে ঘুরে বেড়ালে মনে হিংসার উদ্রেকও হয়। আর পরবর্তী সময়ে জীবনে নেমে আসে বিষণ্নতা।

আজকের এই যুগে ব্যস্ততার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জীবনকে সহজ থেকে সহজতর করে দেওয়ার প্রচেষ্টা। বিশাল বিশ্ব এখন আমাদের ক্ষুদ্র হাতের মুঠোয়। আর এ কারণেই বর্তমানে ছেলেমেয়ে লালন-পালনের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের চিন্তার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে নতুন বিষয় ইন্টারনেট ও ফেসবুক। মা-বাবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন ছেলেমেয়েরাও সময়ে-অসময়ে ব্যবহার করছে ইন্টারনেট। এগুলো ব্যবহার করে বিভিন্ন ভুল তথ্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেক শিশু কিশোর-তরুণ নিজেদের ঠেলে দিচ্ছে নানা অন্যায়-অপকর্মের দিকে। যার ফলে তারা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে নৈতিকতা-মূল্যবোধ থেকে। আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাৎ, খোঁজখবর নেওয়ার সংস্কৃতি আগে ছিল। এখন তো কেবল সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো ছাড়া এই দেখা-সাক্ষাতের বিষয়টি আর প্রত্যক্ষ হয় না। মুঠোফোনে এসএমএস পাঠিয়ে কিংবা বড়জোর ফোনালাপে শুভেচ্ছা জ্ঞাপনে সামাজিক দায়িত্ব পালনের অদ্ভুত সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। যতটুকু দেখা যায় তা দায় মেটানোর সীমাবদ্ধতা। এও যেন ফেসবুকের দান! ফেসবুক একটি সামাজিক মাধ্যম। একটি চলন্ত বই। একে ইতিবাচক কল্যাণের কাজে ব্যবহার করতে হবে। ফেসবুক ব্যবহারে আমাদের আরো সচেতন হতে হবে এবং একই সঙ্গে আগামী প্রজন্মকে ফেসবুকাসক্ত থেকে বিরত রাখা জরুরি।

লেখক : আজহার মাহমুদ
প্রবন্ধিক ও ছড়াকার।
শিক্ষার্থী: বিবিএ. (অনার্স), হিসাববিজ্ঞান বিভাগ (২য় বর্ষ), ওমরগনী এমইএস কলেজ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

লাইক দিন

Please Share This Post in Your Social Media




Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com