পর্যটনের অপার সম্ভাবনা হিমালয়কন্যা উত্তরের তেঁতুলিয়া শ্বেতশুভ্র | Nobobarta
Manobata

আজ রবিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২০, ০৪:৩২ অপরাহ্ন

পর্যটনের অপার সম্ভাবনা হিমালয়কন্যা উত্তরের তেঁতুলিয়া শ্বেতশুভ্র
হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপের হাতছানি

পর্যটনের অপার সম্ভাবনা হিমালয়কন্যা উত্তরের তেঁতুলিয়া শ্বেতশুভ্র

এস কে দোয়েল : দেশের মাটিতে দাঁড়িয়েই কাছ থেকে দেখা মেলে বিশ্বের সুউচ্চ পর্বত হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘা। লাগে না কোনপ্রকার পাসপোর্ট-ভিসা। যেতে হয় না পাহাড়কন্যা নেপাল। নীল আকাশের নিচে তুষার আচ্ছাদিত শ্বেতশুভ্র হিমালয় পর্বত আর কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায় উত্তরের সীমান্তবর্তী উপজেলা তেঁতুলিয়া আসলেই। মেঘ আর কুয়াশামুক্ত উত্তর-পশ্চিম আকাশে দৃশ্যমান হয়ে উঠে সাদা পাহাড়। ভোরের আকাশে বরফ আচ্ছাদিত নয়নাভিরাম পর্বতটি হয়ে উঠে বেশ উপভোগ্য। কখনও তা রূপালি চকচকে রূপ ধারণ করে। শেষ বিকেলে সূর্যকিরণ যখন তির্যক হয়ে বরফের পাহাড়ে পড়ে তখন অনিন্দ্য সুন্দর হয়ে ধরা দেয় এর সুউচ্চ চূড়া। এই মনোমুগ্ধকর মোহনীয় রূপ দেখতে প্রতিদিন ছুটে আসছেন নানান শ্রেণির পর্যটক। এই শীতে হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পর্যটকদের আগমনে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করেছে পর্যটনকেন্দ্রগুলো।

কেন এতো কাছে হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘা! রাজধানী ঢাকা হতে প্রায় পাঁচশো কিলোমিটার দূরে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। হিমালয় পর্বত কাছে থাকায় এ জেলাটি হিমালয়কন্যা হিসেবে সর্বাধিক পরিচিতি পেয়েছে। এ জেলার পর্যটনের সৌন্দর্যবধু হচ্ছে তেঁতুলিয়া। এখানে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহত্তম স্থলবন্দর বাংলাবান্ধা। এখান হতে নেপাল মাত্র ৬১ কিলোমিটার আর এভারেস্ট শৃঙ্গ অর্থাৎ হিমালয় পর্বতের দূরত্ব মাত্র ৭৫ কিলোমিটার। যার উচ্চতা মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৮ মিটার। আর এ স্থলবন্দর হতে কাঞ্চনজঙ্ঘার দূরত্ব মাত্র ১১ কিলোমিটার। যার উচ্চতা ৮ হাজার ৫শ ৮৫ মিটার। দুটিই পর্বত। কাঞ্চনজঙ্ঘা বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। এ দুটি পর্বত এ অঞ্চল হতে অতি নিকটবর্তী হওয়ার কারণে কাছ থেকে দেখার সুযোগ ঘটছে পর্যটকদের। এছাড়া এ বন্দর হতে ভুটান ৬৪ কিলোমিটার, চীন ২০০ কিলোমিটার, ভারতের দার্জিলিং ৫৮ কিলোমিটার, শিলিগুড়ি ৮ কিলোমিটার।

হিমালয় পর্বতশৃঙ্গ : সৌন্দর্যের তুষার দেশ বলা হয় হিমালয়কন্যা নেপালকে। প্রকৃতির এক আশ্চর্য আবিষ্কার হিমালয়। তুষার পরিহিত পাহাড়-পর্বত, অত্যাশ্চার্য উদ্ভিদ এবং প্রাণী, নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের হিমালয়ে অন্যরকম জীবনের উৎস মেলে এখানকার মানুষের মাঝে। ২ হাজার ১শ ৯৫ কিলোমিটার বা ৭ হাজার ২০০ ফিট ওপরে বাস করে হিমালয়ান অধিবাসীরা। ঘন মেঘ, লুকোনো সূর্য, তুষার ঝরা ঋতু আর বরফের চাদরে বাস করে তারা। ৫০ লক্ষ মানুষের বাড়ি এই মেঘের দেশে। তাদের ইতিহাস, বিশ্বাস, পেশা এবং জীবনযাত্রা একেবারেই আলাদা বাহিরের পৃথিবী থেকে। নেপালের নাগরকোটের হিমালয়ানদের প্রতিবেশি হল মাউন্ট এভারেস্ট। উত্তর পূর্ব ভারতের সিকিম, নেপাল, ভুটান, আসাম, অরুণাচলে হিমালয়ান উপজাতিরা বাস করে। শুধুমাত্র অরুণাচল প্রদেশেই ৮০টি উপজাতি বাস করে। তারা ইন্দো-মঙ্গোলয়েড জাতির অন্তর্গত। হিমালয়ান উপজাতিরা তিন ভাগে বিভক্ত, আরাকান, মঙ্গোলয়েড এবং নেগোরিড।

কাঞ্চনজঙ্ঘা : কাঞ্চনজঙ্ঘা নেপাল ও সিকিমের সীমান্তে অবস্থিত। কাঞ্চনজঙ্ঘার উচ্চতা ৮ হাজার ৫৮৬ মিটার বা ২৮ হাজার ১৬৯ ফুট। এক অপরূপ সৌন্দর্য। প্রথমে কালচে, এরপর ক্রমে টুকটুকে লাল, কমলা, হলুদ ও সাদা রঙ ধারণ করে এটি। উত্তরের আকাশে নয়নাভিরাম হিমালয় মূলত বরফে ঢাকা সাদা মেঘের মতোই। সেই সঙ্গে রয়েছে পিরামিডের মতো কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পর্যটকরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলা শহরের টাইগার হিলে ভিড় করেন। পর্বতটির চূড়া দেখার সবচেয়ে জুতসই জায়গা এটাই। কেউ কেউ সান্দাকপু বা ফালুট যান। অনেকে সরাসরি নেপালে গিয়ে এটি উপভোগ করেন। এটা অবশ্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ব্যাপার। যাদের এই ব্যয় করার সামর্থ নেই তারা তেঁতুলিয়া আসলেই এই পর্যটন মৌসুমে মেঘমুক্ত আকাশে দেখে নিতে পারেন অপরূপ সৌন্দর্যের কাঞ্চনজঙ্ঘা।

বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন : পর্যটন মৌসুমে পর্যটকদের সমাগমে মুখরিত হয়ে উঠে দেশের অন্যতম স্থলবন্দর বাংলাবান্ধা। দেশের মানচিত্রের উত্তরের কোণে প্রথম যে গ্রামটি সেটি এখানে। গ্রামটির নাম ‘ঝাড়–য়াপাড়া’। সীমানা শেষ হয়ে দর্শন মেলে জিরোফলকের ‘জিরোপয়েন্ট’। এই জিরোপয়েন্ট দেখতে প্রচুর সমাগম ঘটে পর্যটকদের ভিড়ে। ঘুরছেন, ছবি তুলছেন আর দেখছেন ত্রী-সীমান্তে ভারতের কাটাতারের বেড়া দুই বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সেই সাথে প্রতিদিন অপরাহ্নে বিজিবি-বিএসএফ জয়েন্ট রিট্রিট প্যারেডে মুখরিত ইমিগ্রেশন চেকপোষ্ট ঘেঁষা বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টটি। উভয় দেশের অসংখ্য পর্যটক শুধুমাত্র এই রিট্রিট প্যারেডটিকে দেখার জন্য একত্রিত হন। বিউগলের সুরে সামরিক মর্যাদায় উভয় দেশের জাতীয় পতাকা অবতরণের চিত্র সকল পর্যটকদের মনে নিজ নিজ দেশের প্রতি ভালবাসার অনুভূতিকে আরও দৃঢ় করে যা পর্যটন নগরীর সৌন্দর্য্যকে বাড়িয়ে তুলেছে বহুগুণে। এ বন্দরটির সাথে চারদেশের সাথে যোগাযোগ থাকায় ইমিগ্রেশন সুবিধায় প্রতিদিন প্রচুর পর্যটক এপার-ওপার হচ্ছে। ভারতের সিকিম, দার্জিলিং, ডুয়ার্স, নেপালের লুম্বিনী, পোখরা, ভুটানের থিম্পু, পারো দর্শনে পর্যটকরা ছুটছেন। অনেকে চিকিৎসা নিতে ছুটছেন বেঙ্গালোর, চেন্নাই, মুম্বাই, কলকাতায়। নেপাল, ভুটান ও ভারতের শিক্ষার্থীরা পড়ছেন বাংলাদেশে। আর বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরাও শিলিগুড়ি, দার্জিলিংসহ বিভিন্ন স্থানে পড়াশোনা করতে এ ইমিগ্রেশন ব্যবহার করছেন।

সবুজ চা, পাথর ও প্রাচীন পুরাকীর্তি নিদর্শনঃ শ্বেতশুভ্র হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ-মাধুর্যের পাশাপাশি পর্যটকদের দৃষ্টি কাঁড়ছে সবুজ চা বাগান, দুই বাংলার বুক চিরে প্রবাহিত মহানন্দা নদীতে দলবাঁধা শ্রমিকদের পাথর উত্তোলন, মোহনীয় সূর্যাস্ত, কাটাতারের বেড়ায় ভারতীয় সার্চলাইটের মুগ্ধকর সন্ধ্যা, আধুনিকতায় গড়া জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর পিকনিক কর্ণারে স্থাপিত বিভিন্ন ভাস্কর্য, ওয়াচ টাওয়ার, জেমকন গ্রুপের রওশনপুরে আনন্দধারা, ডাহুক, করতোয়া, ভিতরগড়ের হেরিটেজ স্থাপনা প্রতœতত্ত্বনগরী, রাজা পৃথুরাজের শালবন, মহারাজা দিঘী, পাথরের জাদুঘর, হিমালয়পার্ক, দেবীগঞ্জের গোলকধাম মন্দির, ময়নামতির চর, চীন-মৈত্রী সেতু, বোদার মহাপীঠ বদেশ্বেরী মন্দির, আটোয়ারীর বার আউলিয়া মাজার, শাহী মসজিদ, জগবন্ধু ঠাকুরবাড়ীর মতো দর্শনীয় স্থানগুলো।

আসতে পারেন আপনিও : এ পর্যটন মৌসুমে উত্তরের পর্যটন বিনোদনে ব্যস্ততার ক্লান্তি ঘুচিয়ে চলে আসতে পারেন আপনিও। শহরের যান্ত্রিকতা ফেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে ঘুরে আসতে পারেন উত্তরের হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘার নিবির সৌন্দর্যের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। নিবির শান্ত জনপদের নির্মল প্রকৃতির সৌন্দর্য আপনাকে এনে দিবে ভ্রমণে তৃপ্তির স্বাদ।

যেভাবে আসবেন : ঢাকা থেকে পঞ্চগড় কিংবা তেঁতুলিয়া অথবা বাংলাবান্ধায় সরাসরি দূরপাল্লার কোচ (দিবারাত্রি) যাতায়াত করে। ঢাকা থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী বা নাবিল পরিবহন এবং বিআরটিসির এসি/নন-এসি বাস রয়েছে। এসব যানবাহনে চড়ে তেঁতুলিয়ায় চলে আসা যায়। বিকল্প হিসেবে ঢাকা থেকে আকাশপথে সৈয়দপুর পর্যন্ত আসা যায়। এরপর বাস, মাইক্রোবাস বা প্রাইভেট কারে যেতে হবে তেঁতুলিয়া বাংলাবান্ধা পর্যন্ত। যাত্রাপথে সময় ব্যয় হবে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা। খরচ পড়বে জনপ্রতি ৫০০-১৫০০ টাকা। ট্রেনের ক্ষেত্রে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, একতা বা দ্রুতযান এক্সপ্রেসে চলে আসতে পারেন পঞ্চগড়। তারপর বাস, মাইক্রোবাস, কার বা যেকোনও যানবাহনে চড়ে তেঁতুলিয়া যাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন : রাতে থাকার জন্য তেঁতুলিয়ায় সরকারি তিনটি ডাকবাংলোর পাশাপাশি আবাসিক হোটেলও আছে। ডাকবাংলোয় থাকতে হলে আগেভাগে উপজেলা বা জেলা প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া চাই। থাকতে পারেন আশেপাশে আবাসিক হোটেলেও। কাজী ব্রাদার্স আবাসিক হোটেল, সীমান্তের পাড় হোটেল কাছাকাছি থাকায় আসার আগে যোগাযোগ করে আসতে পারেন। আর এ জন্য হেল্প নিতে পারেন পর্যটক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান “তেঁতুলিয়া ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজম” এর। যোগাযোগ মোবাইল-০১৭৫০-১৪০৯১৯, ০১৭৫৫-৪৯০৮৯৪।

খাওয়ার হোটেল ও ঘুরাফেরায় যানবাহন : থাকার পাশাপাশি ঘরোয়ার খাবার খেতে চাইলে বাংলা হোটেল ও নুরজাহান হোটেল পাবেন। এই শীত মৌসুমে পর্যটন স্পটের নিকটস্থ বাজারগুলোতে শীতকালিন পিঠা পাওয়া যাবে। ফারুক টি স্টলে রং চা, রফিকের হোটেলে দু’চায়ের তৃপ্তিটা মিলবে। ঘুরাফেরার জন্য ব্যাটারিচালিত ভ্যান, ইজিবাইক, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস পাওয়া যাবে। আর ভারত, নেপাল ও ভুটানের পর্যটনস্পটগুলোতে যেতে হলে বাংলাবান্ধা জিরোপয়েন্টে অ্যাপল ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস” এর সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে। তারা আপনার কাংখিত সেবা প্রদানে যথেষ্ট সহযোগিতা করবেন।


Leave a Reply



Nobobarta © 2020। about Contact PolicyAdvertisingOur Family DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com