‘নো টেস্ট, নো করোনা’- এই নীতিতেই বাংলাদেশ? | Nobobarta

আজ বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২০, ০১:২১ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম:
প্রথম রাতে ৩৭শ পরিবার পেলো খাদ্যসামগ্রী : সিসিক বস্তিতে ভরা দুপুরে কন্ঠশিল্পী নয়ন দয়া ও হাজী আরমান ৬৫ হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেবে সিসিক ভালুকায় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করলেন সাদিকুর রহমান ঝালকাঠি করোনা প্রতিরোধে রক্ত কণিকা ফাউন্ডেশন জীবাণুনাশক স্প্রে করোনাঃ দুস্থদের খাদ্য দিলো কুড়িগ্রাম জেলা ছাত্রলীগ সিরাজদিখানে দেড় হাজার পরিবারের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ রাজাপুরে সাইদুর রহমান এডুকেশন ওয়েল ফেয়ার ট্রাষ্ট’র হতদারিদ্রদের মাঝে ত্রান বিতরণ রাজাপুরে পল্লী বিদ্যুত সমিতির গরীব মানুষদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ রাজাপুরে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে খাদ্য সামগ্রী বিতরন করলেন ইউপি সদস্য
‘নো টেস্ট, নো করোনা’- এই নীতিতেই বাংলাদেশ?

‘নো টেস্ট, নো করোনা’- এই নীতিতেই বাংলাদেশ?

Rudra Amin Books

এক করোনা ভাইরাসই প্রমান করে দিলো বাংলাদেশের উন্নয়ন কোন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে? কতটুকু মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে আর জিডিপির হার বৃদ্ধির অর্থ আসলে কি?
প্রায় তিন মাস পূর্বে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকেই চীনে করোনা ভাইরাস নিয়ে কথাবার্তা শুনতে পাওয়া যাচ্ছিলো। যা জানুয়ারি মাসে এসে তীব্র আকার ধারন করে এবং মহামারীতে রূপান্তরিত হয়। ক্রমান্বয়ে অনেক দেশেই ছড়িয়ে পড়ে। এখন প্রায় এমন কোন দেশ নেই যে এই করোনা ভাইরাসের ছোঁয়া পায় নাই। এমনকি উন্নত বিশ্বের দেশগুলো এই ভাইরাসের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে হিমশিম খাচ্ছে। চীন, ইতালী, স্পেন, ইরান, কানাডা, জার্মানি, আমেরিকাসহ প্রায় বিশ্বের ১১২ টি দেশে মহামারী রুপ নিয়েছে এই কোভিড-১৯।
যখন চীনে এই ভাইরাসের প্রকোপ শুরু হয়েছিলো তখন অনেকের মুখেই এমন কথা বাতাসে উড়িয়ে বেড়াচ্ছিলো যে, চীনের লোকজন সাপ, ব্যাং, কুচো জাতীয় প্রানী খায় তাই তাদের এই ভাইরাস আক্রান্ত করেছে বাংলাদেশের লোকজন সাধু এবং ইসলাম ধর্মের অনুসারী তাই এই দেশে এসব কিছু আসবেনা। কিন্তু বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষন বলে যে, এশিয়া প্যাসিফিকের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই ভাইরাসের ঝুঁকিতে ছিলো। ২০০৮ সালে প্রাকৃতিক একটি আর্টিকেল প্রকাশ পেয়েছিলো যেখানে বলা হয়েছিলো, Emerging infectious diseases এর গ্লোবাল ট্রেন্ড অনুসারে এশিয়া প্যাসিফিকের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে আছে। Emerging infectious diseases চারটি ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন- (১) Zoonosis (যেসকল রোগ প্রানী থেকে হয়) from wild life, (2) Zoonosis from non-wild life. (3) Drug resistance pathogens (4) Vector borne diseases- এই প্রতিটি রোগের ক্ষেত্রেই বাংলদেশ খুব ঝুঁকিতে আছে।
পুজিবাদের এই যুগে বিশ্বায়নের প্রভাবে পুরো বিশ্ব একটা গ্রামের মত। যেখানে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যাওয়ার জন্য আকাশপথে যোগাযোগ অতীব সহজ এবং খুব কম সময়ের মধ্যমেই হয়ে থাকে। আর করোনা ভাইরাসের রোগী প্রায় সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে থাকার কারনে বাংলাদেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে খুব দ্রুতই।
ডিসেম্বর, ২০১৯ এর মাঝামাঝি থেকে ৮-ই মার্চ, ২০২০ প্রায় চার মাস ব্যবধানে করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয়েছে বাংলাদেশে যা ঘোষিত হয়েছিলো আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরার মাধ্যমে।
প্রায় চার মাস সময় পেয়েছিলো বাংলাদেশ এই ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার। এখন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কতটুকু প্রস্তুত কিংবা কতটুকু প্রস্তুতি নিতে পেরেছে? এই প্রেক্ষিতে আগে কিছু ঘটনা বলে নেয়া দরকার বলে মনে করছি- (১) এবছরের ২৫ ফেব্রুয়ারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র আতিকা রমার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, তিনি ১২ দিন যাবত প্রচন্ড জ্বর, গলা ব্যথা, মাথা ব্যথা, শ্বাস-কষ্ট, শুকনা কাশি, কফ, পেট ব্যথায় ভুগছেন। তার হিস্ট্রিতে তিনি বলেছেন, ভারত থেকে তার কিছু গেস্ট এসেছিলো যাদের তিনি এয়ারপোর্ট পর্যন্ত দিয়ে এসেছেন। তাদের ট্রলিটা তিনি খালি হাতে ধরে ইমিগ্রেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এসেছেন। এটি ছিল ১০ মার্চের ঘটনা। এরপর থেকে তার উপরিউক্ত লক্ষণগুলো দেখা দিতে শুরু করে। তিনি নিজে আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা এর সাথে কথা বলেছেন কিন্তু কোন লাভ হয় নাই। তিনি আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু বলে নানান ধানাইপানাই করেই চলেছেন। ২৫ মার্চ অব্দি আতিকা রমার কোন কোভিড-১৯ টেস্ট করা হয়নি। প্রচন্ড সাহসী এবং শক্তিশালী নারী বলেই আজো তিনি কোভিড-১৯ এর সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন।

মজার ব্যাপার হলো মীরজাদি আজো ঘোষণা দিয়েই চলেছেন, নতুন করে আর কোন করোনা রোগী সনাক্ত হয়নি। শুধু একজনের মৃত্যু হয়েছে। সরকার কি তাহলে “নো টেস্ট, নো করোনা এমন নীতিতেই এগুচ্ছে?”

এই ঘটনার দিকে তাকালে দেখা যায় ডিসেম্বরে চীনে করোনা সনাক্ত হয়েছে। আর এই ভাইরাস মানুষের মাধ্যেই ছড়াচ্ছে। কিন্তু ১০ মার্চ ও বাংলাদেশ সরকার তার বিমান চলাচল বন্ধ করেননি।

(২) গত মঙ্গলবার উইমেন চ্যাপ্টারে একটা লাইভ দেখছিলাম করোনা নিয়ে যেখানে অথিতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইন্সটিটিউট এর সিনিয়র চিকিৎসক ডঃ কাজী বেননুর। তিনি বলছিলেন, গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে ১০ হাজার পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইক্যুপমেন্টের জন্য চাহিদাপত্র দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু এখন মাত্র ৩০০ তাদের হাতে এসে পৌছায়। কিন্তু তাদের হাসপাতালে ফ্রন্টলাইন ডাক্তারই আছে ৮০ জন। এছাড়া ও আয়া, ওয়ার্ড বয় আর অন্যান্য ডাক্তাররা তো আছেনই। তাছাড়া এই ইক্যুপমেন্ট আবার পূনঃব্যবহারযোগ্য নয়। তাহলে কিভাবে চিকিৎসা দিবেন? তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, আমাদেরকে যদি আগে জানাতেন তাহলে হয়তো আমরা আমাদের মত করে এতোদিনে চেষ্টা করতাম। কিন্তু এই চরম সময়ে যেখানে এক মূহূর্ত সময় নষ্ট করার মত নেই সেখানে আর কি করতে পারি?
আমার অনেক ডাক্তার বন্ধু সবারই একই ধরনের মন্তব্য পিপিই (PPE) ব্যতীত তারা কিভাবে সেবা দিবেন? মিরপুর ডেলটা হাসপাতাল, কক্সবাজার হাসপাতাল একজন রোগী সনাক্ত হবার পর পুর ইমার্জেন্সি ইউনিটের সকল ডাক্তারকে হোম কোয়ারেন্টাইন এ যেতে হয়েছে। তাহলে কি করে সামনে যদি কোভিড-১৯ মহামারি আকার ধারন করে তার চিকিৎসা বাংলাদেশ সরকার নিশ্চিত করবে তা আমার বোধগম্য নয়, বোধকরি কারোই বোধগম্য হবার কথা নয়।

(৩) সরকার গত ২৬ তারিখ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষনা করেছে আমি সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এই চরম দূর্যোগের সময়ে কেন এটাকে সাধারণ ছুটি হিসেবে ঘোষনা করা হলো। এটাকে বিশেষ ছুটি কেন ঘোষনা করা হলো না? কেন ছুটি ঘোষনা করার আগেই সকল কিছু বন্ধ করে তারপর ঘোষনা করা হলোনা? বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশে অধিকাংশ মানুষই দিন আনে দিন খায়।অনেকেই ঢাকা শহরে একা থাকে কিংবা যেখানে চাকুরির সুবাদে থাকেন সেখানে একা থাকেন তারা এরকম একটা ছুটিতে বাড়ি যাবার এক ধরনের চেষ্টা করবেন এটা খুব স্বাভাবিক। এই সুযোগ কেন সরকার তাদের দিলো? এইটা কি খুব সুচারু রাজনীতির ফলাফল নাকি একান্তই নির্বুদ্ধিতা? সরকার কি তার রাজনীতির খেলায় মেতে জনগণের জীবন নিয়ে খেলতে শুরু করেছেন?
এই কয়েকদিনে বাংলাদেশে প্রায় বহু সংখ্যক প্রবাসী এসেছেন। প্রবাসীরা এই দেশের রেমিটেন্স যোদ্ধা। এই দেশের নাগরিক। তারা দেশে আসবেই। কিন্তু সরকার তাদের প্রোপ্রার কোয়ারেন্টাইন, আইসলেশান নিশ্চিত না করে কেন আনলেন? আর কেনই বা গত এক সপ্তাহ পূর্ব অব্দি বিদেশী নাগরিক ও বাংলাদেশে আসার অনুমতি দেয়া হলো?
এত এত প্রশ্ন মাথায় সবসময় ঘুরপাক খাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্তত এই দেশকে ভালোবাসেন, দেশের মানুষকে ভালোবাসেন তাহলে তিনি কেন এমন সব সিদ্ধান্ত নিলেন যা কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার জন্য সহায়ক। অন্যদিকে কোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা তো নেনইনি আবার উল্টোপাল্টা কথা বলেই চলেছেন তার মন্ত্রী মিনিস্টাররা।
প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর একটায় আমার কাছে মনে হয়েছে তা হলো বাংলাদেশ সরকারের স্বদিচ্ছা আর সমন্বয়তার অভাব। বাংলাদেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে এই মিথ্যা বিষয়টাকে সরকার জোর করে টিকিয়ে রাখতে চাইছে। আর তাই বলেই চলেছে আমাদের এই আছে সেই আছে আমরা প্রস্তুত এই করোনা যুদ্ধ মোকাবেলায় কিন্তু বাস্তবে তা শুন্য। সরকার বুঝতে পারছেনা এইটা জীবনযুদ্ধ! প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে বিলবোর্ডের উন্নয়ন দেখানো যায়। কিন্তু জীবন রক্ষা হয়না।

এটি একটি ক্ষুদ্র জীবাণু প্রথমেই রাষ্ট্রের উচিত ছিলো পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞদের সাথে সমন্বয় করার। তাহলে কোভিড-১৯ নিয়ে একটা ধারনা অন্তত পেত। কি উপায়ে এটা প্রতিরোধ করা যায় তা অন্তত কিছুটা হলে ও সঠিক পথে এগুতে পারতো। এরপর সকল বেসরকারি সংস্থার সাথে সমন্বয় করার দরকার ছিলো। তাহলে অন্তত টাকার অভাব হতোনা, পিপিই এর অভাব হতোনা। এমনকি এইযে সকল দরিদ্র, অতিদরিদ্র মানুষগুলো কেবল পেটের কথা চিন্তা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নামছেন তা করতনা। আমার তিনবেলা খাবার, চিকিৎসা নিশ্চিত থাকলে আমি কেন রাস্তায় নামবো? আমি এতো বোকা নই? আমার জীবনের ভয় আছে?বাংলাদেশের মানুষও নামত না বলেই আমি বিশ্বাস করি?কিন্তু রাষ্ট্র এগুলো কিছুই না করে ১২ লাখ প্রবাসীকে গ্রাম পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে করোনা ছড়িয়ে দেবার জন্য। আবারো কোন কিছু বন্ধ না করে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে আর ছড়িয়ে দিলো বলেই আমি মনে করি। কিন্তু কেন ছড়িয়ে দিলো? গ্রামে গেলে করোনায় আক্রান্ত হলেও টেস্টের সুযোগ থাকবেনা এজন্যই কি?
তাহলে কি রাষ্ট্র “নো টেস্ট, নো করোনা” নীতিতে এগুনোর রাজনীতি শুরু করেছে সকল ধরনের অপারগতাকে ঢাকার জন্য। তাহলে কি এক করোনার কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে না বাংলাদেশের উন্নয়ন?


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.






Nobobarta © 2020 । About Contact Privacy-PolicyAdsFamily
Developed By Nobobarta