বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ০৫:৫৮ অপরাহ্ন

English Version
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর আজ ৬২তম জন্মদিন

কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর আজ ৬২তম জন্মদিন

Rudra Muhammad Shahidullah



  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আজ ১৬ অক্টোবর কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র ৬২তম জন্মবার্ষিকী। কবির জন্মদিনে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে নববার্তা ডট কম’র পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী। বাংলাদেশের কবিতায় এক অবিসস্মরণীয় নাম। মাটি ও মানুষের প্রতি আমূল দায়বদ্ধ এই কবির শিল্পমগ্ন উচ্চারণ তাকে দিয়েছে সত্তরের অন্যতম কবি-স্বীকৃতি। অকাল প্রয়াত এই কবি তার কাব্যযাত্রায় যুগপৎ ধারণ করেছেন দ্রোহ ও প্রেম, স্বপ্ন ও সংগ্রামের শিল্পভাষ্য। সাহস ও স্বপ্নে, শিল্প ও সংগ্রামে আপদমস্তক সমর্পিত এই কবি তার স্বল্পায়ু জীবনকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তারুণ্যের দীপ্র সড়কে। নিজেকে মিলিয়ে নিয়েছিলেন আপামর নির্যাতিত মানুষের আত্মার সঙ্গে; হয়ে উঠেছিলেন তাদেরই কন্ঠস্বর।

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অতি আধুনিক বাংলা কবিতা নির্মাণে নিজের সংবেদনশীল কবি সত্বাকে রুপায়ন করেছেন নিজস্ব নির্মাণ কৌশলে। তাইতো তিনি দ্রোহের কবি, চেতনায় জাতিসত্বার কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। একাধারে কবি ও গীতিকার যিনি প্রতিবাদী রোমান্টিক হিসাবে খ্যাত রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ।

একজন প্রয়াত বাংলাদেশি রোমান্টিক কবি ও গীতিকার যিনি ‘প্রতিবাদী রোমান্টিক’ হিসাবে খ্যাত। আশির দশকে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠে যে কজন কবি বাংলাদেশি শ্রোতাদের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি তাদের মধ্যমণি।তার কবিতার মধ্যে অন্যতম “যে মাঠ থেকে এসেছিল স্বাধীনতার ডাক, সে মাঠে আজ বসে নেশার হাট”, “বাতাসে লাশের গন্ধ”।প্রয়াত সালমান শাহের লিপে গাওয়া ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ গানের জন্য লাখো প্রেমিক তরুণ-তরুণীদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করেন রুদ্র। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর জন্ম তাঁর পিতার কর্মস্থল বরিশাল জেলায় ১৯৫৬সালের ১৬ই অক্টোবর। তাঁর মূল বাড়ি বাগেরহাট জেলার মংলা উপজেলার মিঠেখালি গ্রামে। উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম।

হেসে খেলে শৈশব কেটে যায় খুলনার মংলায় মিঠেখালি গ্রামে। সুন্দরবনের কাছাকাছি থাকলেও সবাই বাঘ হয় না, কিন্তু রুদ্র বাঘের চেয়ে শক্তিমান ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। সক্রিয়ভাবে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন সাথে যুক্ত ছিলেন। ডাকসুর ইলেকশনে করে হেরেছিলেন আপন বন্ধুর কাছে। চূড়ান্ত বাউন্ডুলে এই কবির বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা ছিল তার নিজেরও অজানা। তিনি ছিলেন এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম অংশীদার। আর এই আন্দোলনের খাতিরেই গড়ে তোলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। কবি এরশাদ ও তার ভাড়াটে কবিরা তাদের বাহাদুরি দেখাতে ঢাকায় যখন করেন এশীয় কবিতা উত্সব করে, বিপরীতে রুদ্র দাড়িয়ে যান “জাতীয় কবিতা উত্সব” নিয়ে।

শিক্ষাজীবন:
ঢাকা ওয়েস্ট এ্যান্ড হাইস্কুল থেকে ১৯৭৪ সালে এস এস সি এবং ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৭৬ সালে এইচ এস সি পাস করেন। অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৮০ সালে সম্মানসহ বি এ এবং ১৯৮৩ সালে এম এ ডিগ্রি লাভ।

সাহিত্য সংস্কৃতি ও আন্দোলন:
৭৫ থেকে ৯০ পর্যন্ত দেশে এমন কোনো আন্দোলন নাই যাতে রুদ্রর সশরীর অংশগ্রহণ ছিলো না। কবিতা, গল্প, কাব্যনাট্য, প্রবন্ধ, গান যেখানেই শিল্প সাহিত্য সেখানেই রুদ্র। কবিতা আর বিদ্রোহ ছিলো রক্তে। ৭৯ সালে বের হয় প্রথম বই “উপদ্রুত উপকূলে” প্রথম বইতেই “বাতাসে লাশের গন্ধ” লিখে সব মনোযোগ, পাঠক আর কবিশত্রু কেড়ে নেন। বলেন- “আমি কবি নই- শব্দশ্রমিক/শব্দের লাল হাতুড়ি পেটাই ভুল বোধে ভুল চেতনায়।” দ্বিতীয় বই “ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম”। তারপর একে একে “মানুষের মানচিত্র” (৮৪), “ছোবল” (৮৬), “গল্প” (৮৭), “দিয়েছিলে সকল আকাশ” (৮৮), “মৌলিক মুখোশ” (৯০)। ৭টি কবিতার বই। আর মৃত্যুর পর বের হয় নাট্যকাব্য “বিষ বিরিক্ষের বীজ”। জীবন নিয়ে রুদ্র যতো হেলাফেলাই করুক, কবিতা নিয়ে কখনো করেননি। কবিতায় তিনি সুস্থ ছিলেন, নিষ্ঠ ছিলেন, স্বপ্নময় ছিলেন।

তিনি ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা। জাতীয় কবিতা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সম্পাদক। ১৯৭৫ সালের পরের সবকটি সরকারবিরোধী ও স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। প্রতিবাদী কবি হিসেবে খ্যাত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, দেশাত্মবোধ, গণআন্দোলন, ধর্মনিরপেক্ষতা, ও অসাম্প্রদায়িকতা তার কবিতায় বলিষ্ঠভাবে উপস্থিত। এছাড়া স্বৈরতন্ত্র ও ধর্মের ধ্বজাধারীদের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ ছিল উচ্চকিত। রাজনৈতিক সচেতন কবি হিসেবে রুদ্র ১৯৬৯ : উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান। কিশোর শহিদুল্লাহ যোগ দেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গণআন্দোলনের কর্মসূচিতে। হরতাল, মিছিল, মিটিংয়ে নিয়মিত অংশ নেন।

জীবন যেখানে যেমন:
“ভালো আছি ভালো থেকো আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো”র মতো অসম্ভব সুন্দর আর জনপ্রিয় গান লিখেছেন। গানের দল গড়েছেন “অন্তর বাজাও” নামে। শেষ জীবনে ফিল্ম বানাতে চেয়েছিলেন। মৃত্যু ঠেকিয়ে দিলো। ভীষণ এক খামখেয়ালীর জীবন ছিলো তাঁর। পারিবারিক স্বচ্ছলতা ছিলো, সেপথে যাননি। চাকরির প্রাতিষ্ঠানিকতায় নিজেকে বাঁধেননি । কয়েকটা রিক্সা ছিলো, তা থেকে যা আয় হতো তাতেই চলতেন। ঠিকাদারী করেছেন, চিঙড়ির খামার করেছেন। আর দুহাতে টাকা উড়িয়েছেন। পাঞ্জাবী আর জিন্সের যুগলবন্দী তখন বোধহয় তিনি একাই ছিলেন। পরে জেমস যেটা জনপ্রিয় করেন। ঋত্বিকের মতোই ছিলো তার মদ্যপ্রীতি। প্রতিসন্ধ্যায় হাটখোলার নন্দের দোকানে হাজিরা দিতেই হতো। জল বিনা তার যে চলে না। হুইস্কির বাংলাকরণ করেছিলেন “সোনালী শিশির”। এই নামে একটা গল্পও লিখেছিলেন। শেষদিকে ইসলাম ত্যাগ করে মানবধর্ম গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন কাগজে কলমে। উকিলের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন। কিন্তু তার আগেই মৃত্যু তাকে ডেকে নিয়ে গেল গভীর এক ঘুমের দেশে।

প্রেম ভালবাসা ও বিয়ে:
অনেক ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন তসলিমা নাসরিনকে। তখনো তসলিমা নাসরিন নামে খ্যাতি পাননি। সে বিয়ে টেকেনি। অবশ্য ৯০’র শেষদিকে তসলিমার সঙ্গে আবার প্রেম শুরু হয়েছিলো। কিন্তু সেটা ছিলো তসলিমার দ্বিতীয় বিবাহ থেকে তৃতীয় বিবাহে উত্তরণের মধ্য সময়ে। ফলে সে প্রেমও টিকলো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্যামা তরুণী শিমুলের সঙ্গে প্রেম হলো। কিন্তু নায়িকার অভিভাবক রাজী না। সে সম্পর্কও চুকে বুকে গেলো।

শতাব্দির কবি:
প্রেমে আর দ্রোহে, সবখানে – স্বাধীনতা পরবর্তী কবিদের মধ্যে রুদ্রর চেয়ে শক্তিমান কেউ নাই। রুদ্রকে অনেকে ৭০ দশকের কবি বলেন। শুনতে খুব খারাপ লাগে। সব বাঁধা ছিঁড়ে যে কবি বেরিয়ে এসেছেন, তাঁর কাঁধে কেন দশকের জোয়াল! নির্ভেজাল এই মানুষটি ভণ্ডামি এবং ভণ্ডদের পছন্দ করতেন না। তাই নব্বই’র পরে যখন কবিরা সব দলে দলে বিভিন্ন ঝাণ্ডার তলে আশ্রয় নিতে লাগলেন। তখন রুদ্র একা হয়ে গেলেন। প্রতিবাদে অনেকের অপ্রিয় হয়ে গেলেন। অবশ্য মৃত্যুর পর দেখা গেছে তারাই সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ রুদ্রর বন্ধুত্ব প্রচারে। শেষদিকে খুব নিঃসঙ্গ হয়ে গেছিলেন। এই ব্রম্মান্ডের ভেতর একটি বিন্দুর মতো একা। নীলক্ষেতে কবি অসীম সাহার ইত্যাদি প্রেসে একটা চেয়ার বরাদ্দ ছিলো। সেখানেই বসতেন। আড্ডা হতো। নতুন কাগজের স্বপ্ন দেখতেন। রুদ্রকে চিনতে হলে রুদ্র পড়ে চিনতে হবে।

মাটি ও মানুষের প্রতি আমূল দায়বদ্ধ এই কবির শিল্পমগ্ন উচ্চারণ তাঁকে দিয়েছে সত্তরের অন্যতম কবি-স্বীকৃতি। অকালপ্রয়াত এই কবি তাঁর কাব্যযাত্রায় যুগপত্ ধারণ করেছেন দ্রোহ ও প্রেম, স্বপ্ন ও সংগ্রামের শিল্পভাষ্য। ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন’—এই নির্মম সত্য অবলোকনের পাশাপাশি ততধিক স্পর্ধায় তিনি উচ্চারণ করেছেন—‘ভুল মানুষের কাছে নতজানু নই’। যাবতীয় অসাম্য, শোষণ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে অনমনীয় অবস্থান তাঁকে পরিণত করেছে ‘তারুণ্যের দীপ্ত প্রতীকে। একই সঙ্গে তাঁর কাব্যের আরেক প্রান্তর জুড়ে রয়েছে স্বপ্ন, প্রেম ও সুন্দরের মগ্নতা। মাত্র ৩৪ বছরের স্বল্পায়ু জীবনে তিনি সাতটি কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও গল্প, কাব্যনাট্য এবং ‘ভালো আছি ভালো থেকো’সহ অর্ধশতাধিক গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ:
কবিতা:
উপদ্রুত উপকূল (১৯৭৯)
ফিরে পাই স্বর্ণগ্রাম ১৯৮২
মানুষের মানচিত্র (১৯৮৪)
ছোবল (১৯৮৬)
গল্প (১৯৮৭)
দিয়েছিলে সকল আকাশ (১৯৮৮)
মৌলিক মুখোশ (১৯৯০)
ছোটগল্প:
সোনালি শিশির
নাট্যকাব্য:
বিষ বিরিক্ষের বীজ

পুরস্কার: ১৯৮০মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার লাভ করেন । তার বিখ্যাত ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ গানটির জন্য তিনি বাংলাদেশ চলচিত্র সাংবাদিক সমিতি প্রদত্ত ১৯৯৭ সালের শ্রেষ্ঠ গীতিকারের (মরনোত্তর) সম্মাননা লাভ করেন।

শেষজীবন: তসলিমা নাসরিনের সাথে সম্পর্কের অবনতির পরে রুদ্র আরো বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে যান। ভেতরে ভেতরে একা হয়ে যেতে লাগলেন। ক্ষয়ে যেতে লাগলেন। অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতা ফল সরুপ আলসারে পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পায়ের আঙ্গুলে রোগ বাসা বেধেছিল। ডাক্তার বলেছিলো পা বাঁচাতে হলে সিগারেট ছাড়তে হবে। তিনি পা ছেড়ে সিগারেট নিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। ফলসরুপ স্থান হল হলি ফ্যামিলির ২৩১ নম্বর কেবিনে। ৯১ সালের ২০ জুন ভালো হয়ে পশ্চিম রাজাবাজারের বাড়িতে ফিরেও গেলেন। কিন্তু ২১ জুন ভোরে দাঁত ব্রাশ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, বাংলা ভাষায় অসামান্য কবি রুদ্র।

লাইক দিন

Please Share This Post in Your Social Media




Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com