আজ শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯, ০৫:৪৩ পূর্বাহ্ন

প্রতিবাদী চেতনার কবি সুকান্তের ৭২ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রতিবাদী চেতনার কবি সুকান্তের ৭২ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Sukanta Bhattacharya

  • 42
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
    42
    Shares

মোঃ আমিনুল ইসলাম রুদ্র: পূর্ণিমা চাঁদকে যিনি ‘ঝলসানো রুটি’ বলে অশ্রুতপূর্ব উপমায় ভূষিত করেছিলেন, ‘কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি’ বলে চলে গিয়েছিলেন অকালে, সেই কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের আজ প্রয়াণ দিন। ১৯৪৭ সালের এই দিনে মাত্র ২১ বছর বয়সে কলকাতার জয়দবেপুরের ১১৯ লাউডট ট্রিষ্ট্রের রেড এড কিওর হোমে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আজ ১৩ মে তার ৭২ তম মৃত্যুবার্ষিকী।

ভারতে জন্মগ্রহণ করলেও কবির পিতৃপুরুষের নিবাস গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের উনশিয়া গ্রামে। সুকান্তের পিতা নিবারণ ভট্টাচার্য কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের ব্যবসা করতেন। দীর্ঘদিন কবির পরিবার কলকাতায় অবস্থান করার কারণে তার পূর্ব পুরুষের ভিটাটি বেদখল হয়ে যায়। দীর্ঘ ৫৯ বছর বেদখল থাকার পরে ২০০৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কবির বাড়ি দখল মুক্ত হয়। ১৯২৬ সালের ১৫ আগষ্ট কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য কালীঘাটের মহিমা হালদার স্ট্রিটে মামা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।

সুকান্ত ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অকৃতকার্য হন। এ সময় ছাত্র-আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। তাঁর জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে কলকাতার এক বাড়িতে এবং সেটি এখনো অক্ষত আছে। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সুকান্তের নিজের ভাইয়ের ছেলে। ১৯৪৪ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন।

আট-নয় বছর বয়স থেকেই সুকান্ত লিখতে শুরু করেন। স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়ে’ একটি ছোট্ট হাসির গল্প লিখে আত্মপ্রকাশ করেন। তার দিনকতক পরে বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিখা’ কাগজে প্রথম ছাপার মুখ দেখে তাঁর লেখা বিবেকান্দের জীবনী। মাত্র এগার বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ নামে একটি গীতি নাট্য রচনা করেন। এটি পরে তাঁর ‘হরতাল’ বইতে সংকলিত হয়। বলে রাখা ভালো, পাঠশালাতে পড়বার কালেই ‘ধ্রুব’ নাটিকার নাম ভূমিকাতে অভিনয় করেছিলেন সুকান্ত। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাল্য বন্ধু লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে আরেকটি হাতে লেখা কাগজ ‘সপ্তমিকা’ সম্পাদনা করেন। অরুণাচল তাঁর আমৃত্যু বন্ধু ছিলেন।

মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান করে নেন। সুকান্তকে বলা হয় গণমানুষের কবি। অসহায়-নিপীড়িত সর্বহারা মানুষের সুখ, দুঃখ তার কবিতার প্রধান বিষয়। অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ধনী মহাজন অত্যাচারী প্রভুদের বিরুদ্ধে নজরুলের মতো সুকান্তও ছিলেন সক্রিয়। যাবতীয় শোষণ-বঞ্চনার বিপক্ষে সুকান্তের ছিল দৃঢ় অবস্থান। তিনি তার কবিতার নিপুণ কর্মে দূর করতে চেয়েছেন শ্রেণী বৈষম্য। মানবতার জয়ের জন্য তিনি লড়াকু ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অসুস্থতা অর্থাভাব তাকে কখনো দমিয়ে দেয়নি। মানুষের কল্যাণের জন্য সুকান্ত নিরন্তর নিবেদিত থেকেছেন। তিনি মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছেন। তার অগ্নিদীপ্ত সৃষ্টি প্রণোদনা দিয়ে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে প্রয়াসী ছিলেন। মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কাব্যধারার প্রচলিত প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিতে পেরেছিলেন। সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতার (১৯৪৫) ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন। মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান করে নেন।তার কবিতায় অনাচার ও বৈষ্যমের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ পাঠকদের সংকচিত করে তোলে। গণমানুষের প্রতি গভীর মমতায় প্রকাশ ঘটেছে তাঁর কবিতায়। তাঁর রচনাবলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো: ছাড়পত্র (১৯৪৭), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২), গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫) প্রভৃতি।

বাংলাদেশে ২১ বছর বয়সে অনেক কবি প্রতিষ্ঠা পাওয়া তো দূরের কথা কবিতা লেখাই শুরু করেন নি। ইংরেজ কবি পার্সি বিশি শেলি (১৭৯২-১৮২২) ৩০ বছর এবং জন কিটস (১৭৯৫-১৮২১) ২৬ বছর বেঁচে ছিলেন। এদিক দিয়েও সুকান্তই বিশ্বসাহিত্যের একমাত্র কবি যিনি সবচেয়ে অল্প সময়ে কবি জীবন অতিবাহিত করেছেন। এই অতি অল্প সময়ে তিনি বাংলা সাহিত্যকে দিয়ে গেছেন এক অসাধারণ রত্মভান্ডার; যার মধ্যে আমরা পাই দেশপ্রেম, সমাজের সাধারণ মানুষের দুঃখ-দূর্দশার চিত্র ও প্রতিবাদী চেতনা। সুকান্ত জন্মে ছিলেন এক দারিদ্রপীড়িত পরিবারে। দারিদ্রের কশাঘাতে সুকান্তের পরিবার সদা বিপর্যস্ত ছিল। শুধু সুকান্তের পরিবার নয়, গোটা বিশ্ব তখন বিপর্যস্ত। যুদ্ধ বিধ্বস্ত পুরো পৃথিবীময় জ্বলছিল তখন এক অশান্তির আগুন। পরাধীন ভারতেও ছড়িয়ে পড়েছিল সে দাবানল। যুদ্ধ-দুর্ভিক্ষ বিধ্বস্ত এ পৃথিবী তথা ভারতবর্ষের রূপ ক্ষত-বিক্ষত করেছে তার হৃদয়। তাই তো ব্যথিত চিত্তে তিনি বলেছেন–

অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি।
জন্মেই দেখি ক্ষুদ্ধ স্বদেশ ভূমি।
অবাক পৃথিবী! আমরা যে পরাধীন।
অবাক, কী দ্রুত জমে ক্রোধ দিন দিন।
(অনুভব : ১৯৪০)

সুকান্ত জন্ম থেকেই জ্বলেছেন; বলা যায় জীবনভর জ্বলেছেন। আর এ জ্বলা থেকেই তিনি প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন। তার বুকের ভিতরে লুকায়িত বেদনাবেগ প্রতিবাদীর হাতিয়ার হয়ে রূপ নিয়েছে কবিতায়। যে শিশুটি সবেমত্র জন্ম গ্রহণ করেছে পৃথিবীতে তার মধ্যেও তিনি লক্ষ্য করেছেন প্রতিবাদী চেতনা-

যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো আজ রাত্রে
তার মুখে খবর পেলুম :
সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,
নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার
জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে…
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
(ছাড়পত্র)

ভূমিষ্ঠের পর যে শিশুটির জন্য কবি’র দরদ, তাকে কি সত্যিকারের বাসযোগ্য পৃথিবীতে স্থান দিতে পেরেছেন? না, এ দারিদ্রপীড়িত শিশুরা চিরদিনই অবহেলিত- অপাঙক্তেয়। যারা পথে-ঘাটে ঘুরে বেড়ায়, ফুটপাতে প্লাটফরমে রাত কাটায়Ñতারা কীভাবে খাদ্য খায় কীভাবে শীতের কাপড় যোগার করেÑ এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই কারো। এ সব শিশুর জন্য সূর্যের প্রতি সুকান্তের আহবান ও প্রত্যাশা-

হে সূর্য!
তুমি আমাদের উত্তাপ দিও
শুনেছি তুমি এক জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড,
তোমার কাছে উত্তাপ পেয়ে পেয়ে
একদিন হয়ত আমরা প্রত্যেকেই এক একটা অগ্নিপিণ্ডে পরিণত হবো।
তারপর সেই উত্তাপে যখন পুড়বে আমাদের জড়তা
তখন হয়ত গরম কাপড়ে ঢেকে দিতে পারব
রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।
(প্রার্থী)

সুকান্ত দুঃখী-দরিদ্র সাধারণ মানুষকে নিয়ে লিখেছেন অধিকাংশ কবিতা। এসব কবিতার মধ্যে কিছু কবিতা আছে যা রূপকধর্মী। এগুলোতে অন্য বস্তুর রূপক-প্রতীকে কবি দরিদ্র-নিঃস্ব মানুষের বেদনার কথা ব্যক্ত করেছেন। এসব কবিতার মধ্যে সিঁড়ি, একটি মোরগের কাহিনী, কলম, সিগারেট, দেশলাই কাঠি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব কবিতার রূপকের আড়ালেও দেখা যায় প্রতিবাদী চেতনা-

আমরা বার বার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়
তা তো তোমরা জানই।
কিন্তু তোমরা তো জান না :
কবে আমরা জ্বলে উঠব
সবাই শেষবারের মতো।
(দেশলাই কাঠি)

বাংলাসাহিত্যে গণমুখী কবিতা রচনায় সুকান্তের দান অবিস্মরণীয়। অবশ্য বাংলাসাহিত্যে গণমুখী চেতনা চলে আসছে সেই প্রাচীনকাল অর্থাৎ চর্যাপদ থেকে। চর্যাপদের ধারাবাহিক পথ ধরে মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের কবিরাও গণমুখী কবিতা লিখেছেন। তবে তুলনামূলক ভাবে আধুনিক যুগের কবিরাই সবচেয়ে বেশি গণমখী কবিতা লিখেছেন। সুকান্তের কবিতাও এরই ধারাবাহিকতার ফসল। তবে তিনি এসব কবিতা লেখায় বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছেন মার্কসীয় দর্শন ও লেনিনের আদশের্র কারণে। তার কবিতায়ও এর প্রমাণ মেলে-

লেনিন ভেঙেছে রুশ জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ,
অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন প্রথম প্রতিবাদ।…
লেনিন ভূমিষ্ঠ রক্তে, ক্লীবতার কাছে নেই ঋণ,
বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন।
(লেনিন)

সুকান্তের গণমুখী কবিতার প্রতিবাদী চেতনার মধ্যে দেশপ্রেম লুকায়িত আছে কিংবা বলা যায় দেশপ্রেমমূলক কবিতার মধ্যে রয়েছে তার এ গণমুখী চেতনা। মূলত তার দেশপ্রেম ও গণমুখিতা ওৎপ্রোত ভাবে জড়িত। তার ‘‘দুর্মর’’ কবিতার কিয়দংশ লক্ষ্য করা যাক-

সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয় :
জ্বলে-পুড়ে মরে ছাড়খার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।

সুকান্তের এসব কবিতা সামন্তবাদকে তীব্র ভাবে আঘাত করেছে এবং তাদের ভিতকে প্রবল ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। যখন অনেক কবি প্রকৃতির প্রেমে মগ্ন, চাঁদকে তুলনা করছেন প্রেয়সীর মুখের সাথে তখন একমাত্র সুকান্তই বাস্তবজীবনের মুখোমুখি হয়ে বলতে পারেন-

ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় :
পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসারো রুটি।
(হে মহাজীবন)

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় যখন কবিতায় এ নতুন স্রোতের (গণমুখী চেতনা) জোয়ার প্রবাহিত করেছেন ব্যাপক ভাবে। এমনি সময় কবি সুভাষের কাছে পৌঁছে যায় কিশোর কবি সুকান্তের একটি কবিতার খাতা। সুকান্তের কবিতা পড়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় মুগ্ধ হলেন এবং বাংলাসাহিত্যে এক শক্তিমান কবির আগমন লক্ষ্য করলেন। সুকান্তের কবিতা সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহিত্যিক বদরুদ্দীন উমর বলেছেন, ‘‘যে যুগে সুকান্তের আবির্ভাব সে যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শ্রেণিসংগ্রামের অপেক্ষাকৃত তীব্রতা এক উচ্চতর পর্যায়ে তার উত্তরণ।’’

পরিশেষে তুরস্কের বিপ্লবী কবি নাজিম হিকমতের বক্তব্য উপস্থাপন করে বলা যায়, ‘‘সেই শিল্প খাঁটি শিল্প, যার দর্পণে জীবন প্রতিফলিত। তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে যা কিছু সংঘাত, সংগ্রাম আর প্রেরণা; জয় ও পরাজয় আর জীবনের ভালোবাসা। খুঁজে পাওয়া যাবে একটি মানুষের সবকটি দিক। সেই হচ্ছে খাঁটি শিল্প, যা জীবন সম্পর্কে মানুষকে মিথ্যা ধারণা দেয় না।’’ সুকান্তের কবিতার মধ্যেও আমরা এ বক্তব্যের যথার্থতা খুঁজে পাই।

লাইক দিন এবং শেয়ার করুন




Leave a Reply

কে এই যুবক? টিস্যু দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বিকৃত ছবি পরিস্কার করছে



Nobobarta on Twitter

© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com