আজ বুধবার, ২৬ Jun ২০১৯, ০৮:১০ অপরাহ্ন

আমাদের শ্রবণ শক্তি কেড়ে নিচ্ছে ‘শব্দ-সন্ত্রাস’

আমাদের শ্রবণ শক্তি কেড়ে নিচ্ছে ‘শব্দ-সন্ত্রাস’

আমাদের শ্রবণ শক্তি কেড়ে নিচ্ছে ‘শব্দ-সন্ত্রাস’

  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
    4
    Shares

আজহার মাহমুদ : শব্দ দূষণ। খুব সহজেই আমরা এ দূষণের সাথে মানিয়ে চলি। কিন্তু এই শব্দ দূষণ বর্তমানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একে ‘শব্দ-সন্ত্রাস’ নামে অভিহিত করা যায়। এটা আমার কথা নয়, পরিবেশবাদীরাই একথা বলছেন। আবাসিক, অনাবাসিক এলাকা, অফিসপাড়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি হাসপাতালের আশপাশেও শব্দ দূষণের তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। শব্দ দূষণের মাত্রা এখন সবস্থানেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যা জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।

পরিবেশ অধিদফতরের হিসেব মোতাবেক যে কোনো শহরে শব্দের মাত্রা দিনে সর্বোচ্চ ৪৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৩৫ ডেসিবেল পর্যন্ত সহনীয়। অপরদিকে শয়নকক্ষের জন্য আলাদা পরিমাপ রয়েছে। সেটি ২৫ ডেসিবেলের উপরে অনুমোদিত নয়। অফিস আদালতের ক্ষেত্রে ৩৫-৪০ এবং হাসপাতালের জন্য অনুমোদিত শব্দের পরিমাপ ধরা হয়েছে ২০-২৫ ডেসিবেল। অথচ এ সবের ধারেকাছেও নেই নগরীগুলোর শব্দের মাত্রা। বরং বহুগুণ শব্দের তান্ডবে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।

মানুষের শ্রবণযোগ্য শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল হলেও বর্তমানে আমরা অনায়াসে ৬০-৭০ ডেসিবেল শব্দের মাত্রা সহ্য করে যাচ্ছি। অথচ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মতে, ৭৫ ডেসিবেল কিংবা তার বেশি মাত্রার শব্দ দূষণ হলে মানুষ ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ৮০ ডেসিবেলের অতিরিক্ত মাত্রার শব্দ মানুষের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। তথাপিও আমাদের তা শ্রবণ করতে হচ্ছে। যা দেশের সবস্থানেই এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাস্তার পাশে কিংবা অলিতে-গলিতে সাউন্ড বক্সের আওয়াজ মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। নিয়ম লঙ্ঘন করে যত্রতত্র গাড়ির হর্ন বাজানো হচ্ছে। টাইলস বসানো, ইট ভাঙার মেশিন কিংবা বড় বড় দালান নির্মাণের ক্ষেত্রে পাইলিং মেশিনের উচ্চমাত্রার আওয়াজ মানুষকে নাজেহাল করে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। এটা শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম হচ্ছে তা কিন্তু নয়। দেশের সর্বত্রই একই অবস্থা। রাস্তা-ঘাটে বেরুলেই যত্রতত্র শোনা যায় মাইকিং, ভটভটি বা নছিমন গাড়ির অস্বস্তিকর আওয়াজ, বিয়ে কিংবা গায়ে-হলুদে উচ্চঃস্বরে গান-বাজনা, সবমিলেয়ে ভয়ংকর এক অবস্থা। এসব আওয়াজ অনবরত শ্রবণের ফলে মানুষ তার শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলছেন ধীরে ধীরে।

এ ধরনের বিরতিহীন শব্দ দূষণের ফলে মানুষ উচ্চরক্তচাপ, শিরঃপীড়া, মানসিক অসুস্থতা, স্নায়ুবিক বৈকল্য, আত্মহত্যার প্রবণতা, আক্রমণাত্মক মনোভাবের উদ্রেক, হৃদরোগসহ নানা জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনবরত শব্দ দূষণের ফলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় রোগীদের ক্ষতি করে। তাদের নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটায়। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। মহল্লায় বা কোন এলাকায় উচ্চ ভলিয়মে সিডি বাজালে, মাইকিং হলে এলাকার লোকদের স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে যারা অসুস্থ বা পরীক্ষার পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন তাদের শব্দ দূষণে বেশি ক্ষতি হয়। আমাদের আশেপাশে অনেকেই রয়েছেন, যারা দূরে কোথাও গাড়ি করে গেলে মাথা ঘুরায় এবং বমি করে। এবং অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এটাকে আমরা সহজ ভাবেই নিই। আমাদের ধারণা যারা দূর্বল তারা গাড়িতে চড়লে এমন করে। কিন্তু আসলে তা নয়। মূল কথা হচ্ছে এদের মাস্তষ্ক শব্দ সহ্য করতে পারে না। আর তাই গাড়ির শব্দ শুনার কারণে এমনটা হয়। দীর্ঘক্ষণ গাড়ির শব্দ শুনতে শুনতে অনেকের মস্তিষ্কে এ সমস্য হয়। যার ফলে বমি, মাথা ব্যথা, মাথা ঘুরানো ইত্যাদি সৃষ্টি হয়।

অপরদিকে শব্দ দূষণের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় শিশুরা। শিশু-কিশোরদের মেধার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটতে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে শব্দ দূষণের তান্ডবে। বেশিরভাগ শিশু সম্প্রতি কানে কম শোনা রোগে ভুগছে বলে শিশু বিশেষজ্ঞ ও ডাক্তাররা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। শব্দ দূষণের ফলে কানের নানারকম ব্যাধির কথা এখন শোনা যায়। কানের পর্দা ফেটে যায় অসহনীয় শব্দ হলে। বয়স্কদের মধ্যে গ্যাস্ট্রিক, আলসার এবং ডায়াবেটিক রোগ হওয়ার অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে শব্দ দূষণ একটি বড় কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। উচ্চ শব্দ হলে হার্টের বিট বেড়ে যায়। ফলে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। শুধু মানুষই নয় জীব বৈচিত্রের ক্ষেত্রেও শব্দ দূষণ মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শব্দ দূষণে এত খারাপ দিক থাকা সত্ত্বেও এর প্রতিকারের জন্য অদ্যাবধি ব্যাপক কোন কর্মসূচি সরকারিভাবে গ্রহণ করা হয়নি। অবাধে এ দূষণের মাত্র বেড়ে যাওয়া দেখে মনে হচ্ছে দেশে এ বিষয়টা দেখার কেউ নেই।

শব্দ দূষণের ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যথেষ্ট সোচ্চার। সংস্থাটি এ ব্যাপারে সর্তকবাণী প্রেরণ করছেন বিশ্বের সমগ্র দেশে। শব্দ দূষণের ক্ষতির দিক চিহ্নিত করতে ইউনিসেফ এবং বিশ্বব্যাংক একাধিকবার গবেষণায় জড়িত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০টি জটিল রোগের অন্যতম কারণ পরিবেশ দূষণ। তার মধ্যে শব্দ দূষণ অন্যতম। জরিপে দেখা গেছে, শব্দ দূষণের শিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাও। সেখানে ইতোমধ্যে ১১ শতাংশ লোক তাদের শ্রবণশক্তি হারিয়েও ফেলেছেন। দুর্ভাগ্যজনক সত্যটি হচ্ছে, আমাদের দেশে এ ধরনের পরিসংখ্যান না থাকাতে তার সঠিক হিসাব জানা যায়নি আজ অবধি। তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনোক্রমেই আমাদের দেশে শব্দ দূষণে আক্রান্তের সংখ্যা কম নয়।

কিন্তু এভাবে আর কতদিন? এই অবস্থা থেকে অবশ্যই আমাদের পরিত্রাণ পেতে হবে। দেশবাসীকে একটি স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ দিতে হলে অবশ্যই শব্দ দূষণ রোধ করার বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে এবং এই আইনের বিধান লংঘনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আরেকটি আইন জারি করতে হবে। তাই শব্দ দূষণ থেকে দেশের মানুষকে বাচাঁতে এখনই পদক্ষপ নিতে হবে। গণমাধ্যমেও এর কুফল এবং সমস্যাগুলো তুলে ধরতে হবে। তাতে শব্দ দূষণের মাত্রা অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।

লাইক দিন এবং শেয়ার করুন




Leave a Reply



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com