আজ মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯, ০৬:০৭ পূর্বাহ্ন

ড. কামাল কোন পক্ষের উকিল?

ড. কামাল কোন পক্ষের উকিল?

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  

প্রভাষ আমিন : ড. কামাল হোসেন আমার খুব প্রিয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে যেমন রাজনীতির কথা ভাবি, বলি, লিখি; ড. কামাল হোসেন জীবনভর তেমন রাজনীতির কথাই বলে এসেছেন। তার মেয়ের জামাতা ডেভিড বার্গম্যান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিপক্ষের লোক হলেও তিনি কখনো এই বিচারের বিপক্ষে বলেননি।

একাত্তরে নয় মাস রহস্যজনকভাবে পাকিস্তানে থাকলেও তিনি আজীবন মুত্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক। যদিও তার দলে ২৬ বছর ধরে তিনিই সভাপতি, তবুও তিনি সবসময় গণতন্ত্রের কথা বলেন। তার দলের সাধারণ সম্পাদক একসময় মাস্তান হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি সবসসয় মাস্তানির বিরুদ্ধে কথা বলেন। জামায়াতে ইসলামীর সাথে অভিন্ন প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিলেও তিনি সবসময় অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষের লোক।

১/১১ এর সামরিক সরকারের সমর্থক হলেও তিনি সবসময় মানবাধিকারের কথা বলেন। বিএনপির সাথে জোট বেঁধে নির্বাচনে অংশ নিলেও তিনি সবসময় নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে বলেন। তার দলের বিরুদ্ধে আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি করার অভিযোগ যেমন নেই, তেমনি নেই আন্দোলনের নামে পেট্রল সন্ত্রাসের অভিযোগও।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কথার সাথে কাজের মিল না থাকলেও তিনি মুখে যা বলেন, তা একদম মনের কথা, খালি ‘খামোশ’ অংশটুকু ছাড়া। সমস্যা হলো, বাংলাদেশে উচিত কথার ভাত নাই। তাই ড. কামালের ভালো ভালো কথা কেউ শোনে না। তাই তিনি কখনোই ভোট পান না।

১৯৭০ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন ড. কামাল। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে একটি স্বাধীন দেশের আইনমন্ত্রী হয়েছেন, প্রণয়ন করেছেন অসাধারণ একটি সংবিধান। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও করেছেন। ছিলেন আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামের সদস্য। আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গঠন করেছেন গণফোরাম। জীবনভর রাজনীতির সাথে জড়িয়ে থাকলেও তাঁকে কেউ কখনো ক্যারিয়ার পলিটিশিয়ান বলে না, তাঁর নামের আগে ‘প্রবীণ রাজনীতিবিদ’ লেখা হয় না। বরং তার পরিচয় হিসেবে ‘আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী’টাই বেশি মানানসই।

সারাজীবন রাজনীতি করেও রাজনীতিবিদ হতে না পারাটা তাকে পোড়ায় কিনা জানি না। অন্য অনেকের মত আমিও ড. কামালের যে কোনো উদ্যোগকে রাজনৈতিক বিবেচনায় না দেখে আইনগতভাবে দেখি। ভুল হতে পারে, কিন্তু এটা আসলে অভ্যাস। ড. কামাল যখন বিএনপির সাথে মিলে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে গেলেন; তখনও এটিকে আমার রাজনৈতিক পদক্ষেপ মনে হয়নি, মনে হয়েছে এটি তার আরেকটি মামলা। কেন মনে হয়েছে, তারও কারণ আছে। বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর মির্জা ফখরুল তাঁকে মুক্ত করতে মামলাটি নিয়ে ড. কামালের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু ড. কামাল দৃশ্যত মামলাটি নেননি। আমার ধারণা, আদালতে জয়ের সম্ভাবনা নেই জেনেই তিনি মামলাটি নেননি।

তবে আসলে তিনি বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার মামলাটি নিয়েছিলেন। তিনি বিএনপিকে বোঝাতে পেরেছিলেন, নির্বাচনে অংশ নিয়ে জিততে পারলেই কেবল বেগম জিয়ার মুক্তি সম্ভব, আদালতে কোনো সুযোগ নেই। আর ঐক্যফ্রন্টের জয়ের অপেক্ষায় ছিলেন কাদের সিদ্দিকী। ঐক্যফ্রন্ট জিতলেই কাদের সিদ্দিকী নিজে কারাগারের তালা ভেঙ্গে বেগম জিয়াকে মুক্ত করে আনতেন। কিন্তু বঙ্গবীরের সে আশা পূরণ হয়নি।

ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর দেশজুড়ে দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের অভূতপূর্ব সাড়া দেখে ড. কামাল ভেবেছিলেন, তাদের জয় বুঝি সময়ের ব্যাপারমাত্র। সারাজীবনে মিডিয়ার এতটা মনোযোগ কখনো পাননি তিনি। হঠাৎ পাওয়া এই মনোযোগে তাদের মাথা ঘুরে গিয়ে থাকবে। নইলে এত আলোচনা-আলোড়নের পরও ড. কামালের ঐক্যফ্রন্ট জেতার জন্য মরিয়া চেষ্টাটা কেন করলো না, সেটা রহস্যজনক। সে রহস্যে পরে আসছি। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ভালো হয়নি। আওয়ামী লীগ আগের রাতে ব্যালটবাক্স ভর্তি করে ফেলেছে, ঐক্যফ্রন্টের এজেন্ট ও ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে দেয়নি বা বের করে দিয়েছে; এসব অভিযোগের অনেকটাই সত্যি।

কিন্তু ঐক্যফ্রন্টকে আমার একবারও জয়ের ব্যাপারে সিরিয়াস মনে হয়নি। ‘জামায়াতকে ধানের শীষ দেয়া হবে জানলে ঐক্যফ্রন্টের দায়িত্ব নিতাম না’ নির্বাচনের দুদিন আগে এ কথা বলে ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেছিলেন ড. কামালই। ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের অবিশ্বাস্য পরাজয়ে ড. কামালের আসলে ডাবল পরাজয় হয়েছিল। তিনি রাজনৈতিকভাবেও হেরেছিলেন, আবার বেগম জিয়াকে মুক্ত করার মামলায়ও হেরেছিলেন।

তবে ড. কামাল কি আসলেই হেরেছিলেন? এই প্রশ্নটি আমার মনে এসেছে আরেকটি প্রশ্নের কারণে। ড. কামাল আসলে কোন মামলার উকিল ছিলেন? এবারের নির্বাচনটি ড. কামালের জন্য একটি এসাইনমেন্ট ছিল। সেটা বেগম জিয়াকে মুক্ত করার এসাইনমেন্ট নাকি বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার এসাইনমেন্ট; সেটা নিয়েই আমার সংশয়। কোনটা তার আসল এসাইনমেন্ট? বেগম জিয়াকে মুক্ত করার মামলায় হারলেও বিএনপিকে নিয়ে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার এসাইনমেন্ট কিন্তু দারুণ সফল। এই প্রশ্নটি আমার মনে আসারও যুক্তি আছে। ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর থেকে ড. কামাল যা যা করেছেন, তার সবই আওয়ামী লীগের পক্ষে গেছে।

২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের জন্য একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দরকার ছিল। বিএনপিকে নির্বাচনে এনে সে শর্ত পূরণ করেছেন ড. কামাল। শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বিএনপিকে নিয়ে সংলাপে অংশ নিয়ে নির্বাচনের পরিবেশে ইতিবাচকতা ছড়িয়ে দিয়েছেন। অনেকদিন ধরেই শেখ হাসিনা বলছেন, বাংলাদেশে সরকারি দল এবং বিরোধী দল দুটিই হবে স্বাধীনতার পক্ষে। নির্বাচনের আগে ঐক্যফ্রন্ট স্বাধীনতার পক্ষেই তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে।

ড. কামালের ভাবমূর্তিকে পুঁজি করে জয়ের আশায় বিএনপি নেতাদের ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশের বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা, জয়বাংলা স্লোগান শুনতে হয়েছে। নির্বাচনে অংশ নিলেও ঐক্যফ্রন্টকে জয়ের ব্যাপারে সিরিয়াস মনে হয়নি, সেটা তো আগেই বলেছি। নির্বাচনের দিন সকালে ভোট দিয়েও ড. কামাল নির্বাচনের প্রশংসা করেছেন। দুপুরের মধ্যে ঐক্যফ্রন্টের অনেক নেতা স্থানীয়ভাবে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও ড. কামালের পরামর্শে শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে ছিল। যখন তারা নির্বাচন বাতিলের দাবি তুললো, ততক্ষণে খেলা শেষ। জিতে গেছে আওয়ামী লীগ।

ড. কামালও কি জিতে গেলেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক, তাই বিএনপি আশা করেছিল, নির্বাচনে হারলেও তারা আদালতে জিতে যাবে। কিন্তু নির্বাচনের একমাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, ড. কামাল এখনও তাদের আদালতে নিতে পারেননি, জেতা তো অনেক পরে। ড. কামালের পরামর্শে নির্বাচন নিয়ে বিএনপি কার্যকর কোনো কর্মসূচিও দেয়নি। একমাস পর মানববন্ধন আর গণশুনানীর মত নরম কর্মসূচি দিয়েছে। সব দেখেশুনে আমার সংশয় আরো প্রবল হয়েছে, ড. কামাল আসলে নির্বাচনে কোন পক্ষের উকিল ছিলেন? তার আসল এসাইনমেন্ট কোনটা ছিল- বেগম জিয়ার মুক্তি নাকি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন?

২৬ বছর আগে আওয়ামী লীগ ছাড়লেও আদর্শিকভাবে তিনি এখনও আওয়ামী লীগের কাছাকাছি। এখনও তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেন। বিএনপি জিতলে নিশ্চয়ই এর উল্টোটা করতো। তিনি কেন সেটা চাইবেন? ঝানু উকিলরা সবসময় তার মক্কেলের পক্ষে দাঁড়ান না। বরং উল্টো পক্ষে গিয়ে মামলা দুর্বল করে দেন। আসল মক্কেলকে জিতিয়ে দেন। ড. কামাল যদি সত্যি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মামলা নিয়ে মাঠে নেমে থাকেন, তাহলে মানতেই হবে সত্যিকার অর্থেই তিনি একজন ঝানু উকিল।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

লাইক দিন এবং শেয়ার করুন




Leave a Reply

জনসম্মুখে পুরুষ নির্যাতন, ভিডিও ভাইরাল

Nobobarta on Twitter

© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com