আজ শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৩:২১ পূর্বাহ্ন

৩০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৬ই রবিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী
National Election
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও একটি ২৮ ইঞ্চি সাদাকালো টেলিভিশন

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও একটি ২৮ ইঞ্চি সাদাকালো টেলিভিশন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বর্তমান সময়ে টেলিভিশন একটি প্রয়োজনীয় আইটেম। আকার ও রং ভেদে প্রায় প্রতিটি সচ্ছল পরিবারে এই দরকারি জিনিসটি বিদ্যমান, কিন্তু ১৯৭৯-১৯৮০ সনে এই মাধ্যমটি ছিল সাধারণের নাগালের বাহিরে। তখনও রঙিন টেলিভিশন বাংলাদেশে আসেনি। তৎকালীন সরকার প্রধান তাঁর কর্মসূচি মানুষের মধ্যে প্রচারের কৌশল হিসাবে সম্ভবত ১৯৮০ সনের দিকে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ঐ সরকার কর্তৃক সৃষ্ট গ্রামসরকার প্রধানদের একটি করে ২৮ ইঞ্চি সাদাকালো টেলিভিশন দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সেই মোতাবেক আমার বাবা শহীদ বাচ্চু মিয়া, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হিসাবে এবং চাচা মরহুম পিয়ারু মিয়া গ্রামসরকার প্রধান হিসাবে দুটো টেলিভিশন বরাদ্ধ পান। যেহেতু আমার বাবা নাসিরনগর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তাই তাঁর বরাদ্ধপ্রাপ্ত টেলিভিশনটি  তিনি না নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন।

তখনও গ্রামে বিদ্যুৎ আসেনি, প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার দূর থেকে ব্যাটারি চার্জ করে এনে এক্কেবারে কিছু নির্ধারিত অনুষ্ঠান ছাড়া টেলিভিশন চালানো ছিল প্রায় অসম্ভব। চাচার বরাদ্ধপ্রাপ্ত টেলিভিশনটি তিনি এভাবে চালানো শুরু করেন। আমাদের এবং চাচার বাড়ীর মধ্যকার দূরত্ব ছিল মাত্র একটি দেয়ালের, ফলে টেলিভিশনের শব্দ আমাদের বাড়ী থেকে শোনা যেত। এর ফলে বাবার উপর আওয়ামী সমর্থক ও পরিবারের পক্ষ থেকে টেলিভিশন কেনার একটা অনুরুধ তথা চাপ আসতে থাকে। এদিকে বাবা অনেক ধার্মিক ছিলেন, তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত পড়তেন এবং উনি টেলিভিশন কিনবেন না বলে মনস্তির করলেন। আমি তখন ৭-৮ বছর বয়সের হব। যেহেতু মাত্র ২-৩ বছর বয়সে আমার আম্মা মারা যান তাই বাবা আমার কোন আবদার কখনো না করেননি। বড়ভাই ও আপারা এই সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাননি। আমার আবদারে বাবা একই সাইজের অর্থাৎ ২৮ ইঞ্চি একটি সাদাকালো টেলিভিশন কিনলেন।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি, ঐ সময় খুবই জনপ্রিয় অনুষ্ঠান যেমন “যদি কিছু মনে না করেন”, “মাসিক সিনেমা”, জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক, ফুটবল খেলা, সংবাদ ইত্যাদি ছাড়া টেলিভিশন দেখা হত না। গ্রামের মানুষজন দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে দুই বাড়িতে অনুষ্ঠানাদি উপভোগ করা ছিল গ্রামীন বিনোদন।

বাবা সংবাদ দেখতেন এবং বিশেষকরে আগস্ট মাসের ১৫ তারিখের সারাদিনের সংবাদ উনি মিছ করতেন না। তাঁর অনুগত সমর্থকদের নিয়ে ঐদিন টেলিভিশন সেটের সামনে প্রতিটি সংবাদের সময় বসে থাকতেন শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণটি শোনার জন্যে। তখন সংবাদে ২০-২৫ সেকেন্ডের বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের অংশবিশেষ “এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম” এই অংশটুকুই টেলিভিশনে বাজানো/দেখানো হত। এইটুকুই শোনে আমার বাবা এবং তার সমর্থকদের মধ্যে যে আবেগ, উচ্ছ্বাস, ভালবাসা ও প্রেরণা, আমি দেখেছি তা ধারন করেই আজ অবদি এই সংগঠনটির সাথে আছি।

১৯৭৫এর পর বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রকাশ্যে বাজানো অনেকেই সাহস করতেন না। ১৯৮০ সনে আমার বড়ভাই এম, এ, রউফ (পরবর্তীতে বাবা ১৯৮৪ সনে নিহত হওয়ার পর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ও উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক ছিলেন) একটি ভিডিও রেকর্ডার ভাড়া করে এনে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণটি আমাদের বাড়ীতে প্রায় সকল সমর্থকদের দেখানোর ব্যবস্থা করেন। আমি তখন দেখেছি এবং উপলব্দী করেছি- ভাষণটির প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর আগ্রহ ও ভালবাসা। তাৎক্ষনিক সংবাদটি স্থানীয় মাধ্যম হয়ে তৎকালীন বিএনপি সরকারের দৃষ্টিগোচরে আসে এবং বাবাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। এই ঘটনার পর একদিন সরকারের সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে একটি দল আমাদের বাড়ীটি ঘীরে ফেলে এবং বাবাকে খুঁজতে থাকে। ভাগ্যিস বাবা সেদিন বাড়ীতে ছিলেন না। তাঁরা বাবাকে না পেয়ে আমার বড়ভাইকে (ভাই তখন উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র) ধরে নিয়ে যান এবং বাবাকে তাড়াতাড়ি থানায় দেখা করতে বলেন। এই ঘটনায় বাবা বেশ কষ্ট পেয়েছিলেন এবং থানায় ধরা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ছেলের মুক্তির জন্যে কিন্ত তাঁর সমর্থকেরা সেদিন তাঁকে থানায় যেতে বারন করেন। ভাইকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় বাহিনীর ঐ দলটি সঙ্গে করে নিয়ে যান আমাদের প্রিয় টেলিভিশনটিকে। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে প্রায় সপ্তাহ খানেক পর আমার ভাই ছাড়া পেয়েছিলেন সত্য কিন্ত আমাদের প্রিয় টেলিভিশনটি ছাড়া পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় একটি বছর। অবশেষে ১৯৮১ সনের জুলাই মাসে আমরা ফেরত পেয়েছিলাম আমাদের প্রিয় টেলিভিশনটিকে। এই একবছর আমরা বঞ্চিত হয়েছি বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটি শোনা/দেখা থেকে। এই বঞ্চনা সাময়িক কিন্ত ভাষণটির প্রতি আমাদের গভীর আগ্রহ ও ভালবাসা ছিল সারাজীবনের। প্রায় ২১ বছর বিভিন্ন সরকার এই ভাষণটিকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছে কিন্ত পারেনি। ভাষণটি শুধুমাত্র সিডি বা ক্যাসেটের ফিতাতেই বন্ধী ছিল না এই ভাষণটি ছিল মানুষের হৃদয়ে এবং ভালবাসার জায়গায়। একটি টেলিভিশন, ভিডিও রেকর্ডারকে নিয়ে তালাবদ্ধ করা যায়, ক্যাসেটের ফিতাকে ছিঁড়ে ফেলা যায়, মাইক্রোফোন ও মাইক ভেঙ্গে ফেলা যায় কিন্ত মানুষের হৃদয়ে স্থানপ্রাপ্ত কোনকিছু সহজে মুছে ফেলা যায়না। তাইতো এই ভাষণটি আজ বাজে মানুষের হৃদয়ে এবং হৃদয় থেকে বেরিয়ে বাংলার আনাচে কানাচে এবং ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে। এই ভাষণটিই আজ স্বীকৃতি পেয়েছে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেইজে। ধন্যবাদ ইউনেস্কোকে, তাঁদের এ স্বীকৃতি আমাদের আরও উৎসাহ ও প্রেরণা যোগাবে। সালাম ও কৃতজ্ঞতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আপনাকে। আপনি ও আপনার ঐতিহাসিক ভাষণটি বাঙ্গালী জাতির প্রেরণা ও স্বাধীনতার মূল ভিত্তি। এ দেশে ৭৫’পরবর্তী শাসকেরা চেষ্টা করেছে এ প্রেরণা, আবেগ, উৎসাহ ও ভালবাসার জায়গাগুলো চিরতরে মুছে ফেলতে কিন্ত পারেনি এবং আর পারবে না কোনদিন। ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট আপনাকে আমাদের মধ্য থেকে নিয়ে গেছে সত্যি কিন্ত আপনার আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিয়ে যেতে পারেনি এবং পারবেও না।

তাইতো এই শোকের মাসে আপনি ও আপনার সাথে যারা সেদিন শহীদ হয়েছিলেন তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং নিন্দা ও ধিক্কার জানাই ঐসব কুলাঙ্গারদের যারা একটি সত্য ও সঠিক ইতিহাসকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতে ছেয়েছিল।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ আলমগীর কবীর

সাবেক প্রভোস্ট,

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

লাইক দিন

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Nobobarta on Twitter

© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com