আজ মঙ্গলবার, ১৬ Jul ২০১৯, ০১:৫৭ পূর্বাহ্ন

আবু সাইদ আহমেদের “অকবিতা-পোষ্টম্যান থামো” যেনো জীবনের সহজ পাঠ

আবু সাইদ আহমেদের “অকবিতা-পোষ্টম্যান থামো” যেনো জীবনের সহজ পাঠ

  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
    4
    Shares

“ঠিক কতটা পোড়ালে পোড়ে বল্কল,অরণ্য ভস্ম হয়-দাবানল জানে।“
পোষ্টম্যান জানে, খামের ভিতর দাউদাউ আগুন।“
অখবা
“আত্নদংশনে মরেনা সাপ, আগুনে পুড়েনা আগুন।
পোষ্টম্যান থামো খামের ভিতর অপার হাহাকার।“

মানুষের এই হাহাকার নিরন্তর। মানুষ কখনোই নিজের অবস্থানে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন না। অপার সুখের মাঝেও কোথাও যেনো একটা হাহাকার, যেনো কোথায় একটা দুঃখ বসবাস করে নিজের অজান্তে। কেহ জানে, আর কেহ খুঁজে পাওয়ার নিরন্তন চেষ্টায় শেষ করে তার ছোট্ট জীবন।
কাজেই সুখের ঠিকানা জানতে চাওয়া উচিত। দুঃখের কখনোই নয়। এতে কষ্ট বাড়ে, জমা হতে থাকে আরোও প্রশ্নাতীত হাহাকার।
“পোষ্টম্যান পোঁছে দিলে প্রেরকহীন খাম তুমি নির্ভয়ে খুলো। জানতে চেওনা কে পাঠায় খাম, তার নেই চাল চুলো।“

পান্ডুলিপি পৌছেছে আরো আগেই। পান্ডুলিপি নিয়ে আলোচনা করার বিলম্বে পোষ্টম্যান পৌঁছে গেছে বই মেলায়। এখন আর বলার সুযোগ নেই পোষ্টম্যান থামো।

আলোচনা করছি,পরিচিত মুখ, অনলাইন এক্টিভিস্ট আবু সাঈদ আহমেদের অকবিতা, পোষ্টম্যান থামো। আর আমি বলছি কঠিন জীবনের সহজ পাঠ।
পোষ্টম্যান থামো পান্ডুলিপিকে লেখক বলছেন অকবিতা। যা এখনো কবিতা হয়ে উঠেনি। কবিতাতো ঝলসানো রুটি। যা কিনা ক্ষুধার্থের কাছে পুর্ণিমার চাঁদের মতো। সে গুলো কবিতা হয়ে উঠার সুযোগ কোথায়? তার চেয়ে এইতো ভালো। কঠিন জীবনের সহজ পাঠ হয়ে বেঁচে থাকুক।

পোষ্টম্যান থামো প্রকাশিত হয়েছে ২০১৯ এর বইমেলায়, প্রকাশ করে স্বরচিহ্ন প্রকাশনী। পান্ডুলিপি থেকে জানা যায় বইটি পাঁচ ফর্মার। বিনিময় মুল্য ১৫০ টাকা। প্রিন্টেট বই আমার হাতে আসার সুযোগ হয়নি তবুও জেনে নিয়েছি বইটির প্রচ্ছদ পরিকল্পনা আবু সাঈদ আহমেদ নিজেই করেছেন।

আবু সাঈদ আহমেদ মুলত স্যাটায়ার লিখেন, এছাড়া অনুগল্প এবং পাশাপাশি রাজনৈতিক বিশ্লেষন নিয়ে ফেসবুকের পরিচিত মুখ। আমি আবু সাঈদ আহমেদকে লেখা দিয়েই ভালো করে চিনি।

প্রথমত কবিতা বরাবরই দুর্বোধ্য বিষয়। অন্তত আমার কাছে। যে কবিতা জীবনের কথা বলেনা, যে কবিতা জীবনের শ্লোগান হয়ে উঠেনা, যে কবিতা প্রেমিকাকে অন্ধকার গলি ধরে পালানোর পরিবর্তে আলো জ্বালানোর মন্ত্র শেখায়না সেই কবিতা অন্তত আমার কাছে কবিতা মনে হয়না। আবার ছন্দোবদ্ধ ছড়াকে শ্রুতি মধুর করে তোলাকে কবিতা বলেও মনে হয়না। সার্বিক বিবেচনায় আবু সাঈদ আহমেদ গদ্য কবিতা বা কবিতার বাকবদল নিয়ে পরীক্ষণ চালিয়েছেন বলে প্রতিয়মান হয়। বিশেষ করে তার সিক্যুয়াল কবিতা গুলো থেকে। মুক্ত ছন্দ, ছন্দোবন্ধ ছন্দ উভয় ক্ষেত্রেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন কবি।

জীবনের পরিমিতি বোধের ভেতর কষ্ট গুলো মানুষের সহজাত। বোধের ভেতর যা জমে থাকে দিনের পর দিন। খুব কম জীবনই আছে যা মীমাংসিত হয়ে তবেই যবনিকা ঘটায়।
যেন,
“প্রতিটি দেয়ালেরই কিছু গোপন ইতিহাস থাকে
এডোনিসের মৃগয়ার মত মর্মান্তিক কষ্টকর।“

আশ্চর্য! মনুষ্যবিহীন দেয়ালের অস্থিত্ব কোথায়। যেখানে কষ্ট গুলো জমা রাখে। যার জীবন আছে সেইতো জমা করে রাখে তার কষ্ট নিরন্তর। কিন্তু তারপর। মানুষ হারিয়ে যায় অথচ দেয়াল হারায় না। দাঁড়িয়ে থাকে যুগের পর যুগ। তাইতো দেয়াল কবিতায় শেষ লাইনে লিখেছেন “মানুষ পালাতে পারে দেয়াল পারেনা…।“ আসলে মানুষকে পালাতে হয়। জয়ী হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় লোকান্তরিত হতে হয়।

দ্বিতীয়ত কিছু কিছু কবিতা নিয়ে আলোচনা চলেনা। আলোচনা চলতে পারে সামগ্রিক পান্ডুলিপি নিয়ে। নিরীক্ষণের বেলায় তা চলেনা। কেননা কবি নিজে অকবিতা বলেছেন। এবং নিরীক্ষণ চালিয়েছে। কবিতার রুপ বদলাতে চেয়েছেন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েই।

অপরদিকে অকবিতা পান্ডুলিপি পোষ্টম্যান থামো নিয়ে আলোচনা দীর্ঘায়িত হয়না কেননা বেশীর ভাগই কবিতাই জীবনের সরল ব্যাখ্যা। যেখানে আলাদা করে ব্যাখ্যার প্রয়োজন পরেনা। আমরা আমাদের অতীত ভুলে যাই। ভুলে বীজের অংকুরোদগম, এরপর বানে বাতাসে জলে জঙ্গলে বেড়ে উঠে প্রাণ।

কবি বলেছেন,
“মানুষের ইতিহাস মুলত সার্বিক পতনের আগে সর্বোচ্চ বেগে উঠার পাঠ।
মাতৃ জঠরে বেড়ে উঠার যে শুরু মৃত্যুর আগে আর থামেনা।”
(বনসাই)
তারই ধারাবাহিকতা পাওয়া যায় ক্যাকটাস মুকুট মাথায় পরি কবিতায়
“তুমি তো জানো ছোট্ট একটা বীজ দিনে দিনে কিভাবে মহীরুপ হয়ে উঠে।“

এই কবিতা গুলোতে বেশ চমতকার টুইষ্ট পাওয়া যায় কবিতার শেষ দিকে এসে। যেমন এই কবিতার শেষ লাইনে আছে,” তুমি কি জানো আমার ভীষন অসুখ। একবার ছুঁয়ে দাও যিশুর মত—বড় সাধ সুস্থ হয়ে উঠি, খুব বেশী লোভ তোমার ক্যাকটাস মুকুট মাথায় পরি।“

মৃত্যু এক অমোঘ নিয়ম, নিশ্চিত নিয়তি। এরপরও মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, স্বশরীরে, প্রাণে,কর্মে চেতনায়। পরিশেষে কার পরাজয় ঘটলো, তা নির্ভর করে কালের উপর। কবিতা এভাবে কালোর্তীর্ণ হয় আবার কখনো হারিয়ে যায়।
এমন নিরীক্ষাধর্মী হৃদি সিরিজের ধারাবাহিক কবিতাগুলো জীবনের গল্প বলবে, জীবনের গল্প স্মরন করিয়ে দিবে, স্মরন করিয়ে দিবে মানব জীবনের হারিয়ে যাওয়া মুল্যবান শৈশব, কৈশোর আর প্রেমিক বেলার ভুলতে না পারা যন্ত্রণার স্মৃতি গুলো।
“প্রিয় হৃদি
তোমার কাছে গচ্ছিত থাক একটা সকাল,
কুয়াশাময় হেমন্তকাল।
গচ্ছিদ থাক চায়ের কাপে উঠা ধোঁয়া”
অথবা
“প্রিয় হৃদি
ফিরিয়ে দিও একটা সকাল, একটা দিনে সারাদিন মান ইচ্ছে হলে।“

যাপিত জীবনের এই আহবান গুলো উপেক্ষা করা কঠিন। পুরন হবেনা জেনেও, ভুলে যায়নি জেনেও আবারও খুব থেকে মনে করিয়ে দেয়া। হৃদিকে
“প্রিয় হৃদি,
তুমি না চিনেছো জীবন, না চিনেছো পৃথিবী। আজ তাই অকপটে তোমাকে জানাই, বেঁচে থাকার জন্য হৃদযন্ত্র যতটা গুরুত্বপুর্ণ, হৃদয় ততটা নয়।“

হয়তোবা এটাই সত্যি। বেঁচে থকার কবিতার চাইতে, চাঁদ সদৃশ রুটিটাই বেশী প্রয়োজন। সুতরাং “প্রিয় হৃদি। তুমি জানো ব্যকরণই শেষ কথা নয়।“ “পৃথিবী বলেছে কথা বহুদিন, ব্যাকরণহীন ভাষায়।“ তাতে সমস্যা কি হয়েছে?

কোথায় কি থেমে আছে কিছু? স্বর্গ মর্ত্য পাতালে কি কোন বিগ্রহ দেয়া দিয়েছে? কখনোই নয়। আসলে মনের ভাব প্রকাশে ভাষার প্রয়োজন হয়, ভাব কিংবা প্রেম প্রকাশের কোন ব্যাকরণ লাগেনা। হৃদয়বোধ্য ভাষাই যথেষ্ট। এর জন্য বিজ্ঞান শেখার প্রয়োজন আছে কি?কবি বলেছেন “বিজ্ঞান মাত্রই ভালো নয়।“ কাজেই খুব ভালো করে পড়তে হবে হৃদি সিরিজের অকবিতাগুলো।

এছাড়া এমনি আরো কিছু সাবলীল স্মৃতি জাগানিয়া অকবিতা আছে। যে গুলো অনায়াসে আপনাকে নিয়ে যাবে আপনার শৈশব, কলতলা, বাড়ীর পকুরঘাট, কাঁঠাল চাঁপার গন্ধের বুকে। যেখানে কেবল সময়ই অতীত হয়েছে। জীবন নয়।

“কাঁঠাল চাপা ফুলের ঘ্রাণটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। পুরো ছাদ জুড়ে শুধুই কাঁঠাল চাঁপা ফুলের ঘ্রাণ।অথচ দশ পরেনো কিলোমিটারের মধ্যে একটিও কাঁঠাল চাঁপার গাছ নেই। “

পান্ডুলিপি বেশ কিছু ভিন্ন ধাচের ছড়া কবিতা আছে। ছন্দের তালে পড়তে বেশ ভালো লাগবে। এখানেও একটা নিরীক্ষণ আছে।
যেমন,

“বাড়ছে বয়স চর্যাপদের গীতে
বনস্পতির ছায়ায় শুকোই ঘাম,
বোতাম ছেড়া শার্ট
ভীষন আনস্মার্ট
হয়নি শেখা বাধতে জুতোর ফিতে,
পারফিউমের দেইনি কোনো দাম।“(ভালবাসার ভাগ)

অথবা পাবেন
“টেনো না টেনো তুমি বিভাজন রেখা
সোনামুখি সুই
সুতো হয়ে ছুঁই
প্রণয় কুড়োই
প্রণয়ের জ্যামিতিটা হয়নিকো শেখা”
(প্রণয়ের ঋন)
অথবা
“কফিন চোখেও শরত আকাশ নীল
কাশের বনেতে গোপন দহন শাদা,
মেঘের দুয়ারে বিরহ ঢেলেছে চিল
পাখার আজাদি পালকে পালকে বাধা।
(সমর্পন)

কবিতা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন গৌন। আমি এখানে শুনছি জীবনের গান। কবিতার গান। ব্যাকরণহীন ভাব গুলো কবিতা হয়ে উঠার নিরন্তর চেষ্টা। কেননা,” যেহেতু, ভালবাসা সার্বজনীন গ্রন্থ”।
আমার অন্যতম দুটি ভাললাগা বিমুর্ত অকবিতা “কান্না যদি আসে””জলজীবন”। এছাড়াও ভাললেগেছে “সে বড়ো বিস্মৃতি প্রবণ” আর “যৌথ প্লাবনে”
কবি জানে,” ডাকনাম হতে প্রিয় কোনো নাম নেই,
প্রণয় হতে বড়ো কোনো স্বাধীনতা নেই”।
অথবা
ভালবাসবো
“একুরিয়ামের মাছ শুনেনা নদীর কল্লোল
প্রিয়তম মুখ ভাঙ্গে ভাঙ্গুক নির্বোধ।

আমরা চলে এসেছি পান্ডুলিপি শেষ পর্যায়ে। চোখ বন্ধ করুন, আলতো করে বিরতি নিন। এই অলস চোখ খুলে পড়তে থাকনু স্পর্শ বিষয়ক কয়েক ছত্র। মাঝে মাঝে চোখ নির্মিলন পুর্বক অনুভব করতে থাকুক। আর আমরা শেষ করতে থাকি আমাদের আলোচনা। কবি এরপরও নিরিক্ষা চালাবেন কিনা। কবিতা বানাবেন কিনা। এই প্রশ্নের উত্তর দিবেন কবি নিজে। আমি অন্তত এই দায় নিতে পারিনা। শেষ করছি আমার লেখা একটা কবিতার দুটি চরণ দিয়ে।

“কবিতা ভাঙ্গার দায় আমার উপর চাপিওনা।
আমি কোনো কালেই নবী হবার আস্পর্ধা দেখাইনি।“
প্রশ্ন হতে পারে নবীর সাথে কবির কি সম্পর্ক। নবীগন যৌবনে মেষ চড়াতেন পরিনত কালে মেষের চাইতেও বিচিত্র মানুস চড়াবেন বলে। আমি কোনকালেই কারো সাথেই সম্পর্ক রাখিনি। তবে আমি কবিতার সাথে সম্পর্ক রাখতে চাই। অনুভবে, উপভোগে।

লাইক দিন এবং শেয়ার করুন




Leave a Reply



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com