সোমবার, ২২ অক্টোবর ২০১৮, ০২:০৩ অপরাহ্ন

English Version
আইসিইউ বেড নম্বর নাইন : হৃদয় ধর্মের বিমূর্তরূপ

আইসিইউ বেড নম্বর নাইন : হৃদয় ধর্মের বিমূর্তরূপ

আইসিইউ বেড নম্বর নাইন
আইসিইউ বেড নম্বর নাইন



  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অয়ন আহমেদ : গল্পকার মোক্তার হোসেনের ‘আইসিইউ বেড নম্বর নাইন’-এর গল্পগুলো বেশ একটু কর্পোরেট হয়ে ওঠার প্রতি আকাশমুখী রোদেলা। সরোনিপাট,ঝকঝকে,এখনকার পরিবেশের নাটুকে ধুয়ো।তবু আন্তরিক, সুর-অভ্যন্তরের ব্যঞ্জনা-স্বল্পতার অপরিসর যদিও।মানবিক দুশ্চিন্তার সমাধানসুলভ সহজ; কিন্তু, মানবীয় বেদনার ভাবনাক্রান্তি নয়। কোনো দূর বা অতিসুর নয়।সমস্যা আছে, সমস্যাঘনতা নেই। এই আপন আন্তরিক সুর গল্পগুলোর ভেতরের এমন একটি পরিবেশের মানুষ-ভাবনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, মানুষ হঠাৎ করেই যা দেখতে পায় বিশেষ কোনো মুহূর্তে বিশেষ পরিবেশের মধ্যে– এটি অতি অবশ্য গল্পের পটরেখার নিরিখে রচিত মুহূর্ত-বিশেষতা– যেখানে দৈনন্দিন ভাবনা-বোধের ব্যঞ্জিত নাকিসুর কেটে গিয়ে খুব স্পষ্ট ব্যথা ও যন্ত্রণা ফুটে উঠেছে।

এটি বেদনাতুর হলেও বেদনার পিঠের ভাবনার শ্লথপনাটে নেই।এহেন শ্লথপনাটে অবশ্য সমাজ-সমান্তরাল ও সমাজ-অন্বিষ্ট এবং অনেকাংশে আপন আর সঘনিষ্ঠ বরাবর-চরিত বলে।তাই একটি প্রশ্ন আসেই গল্পকার কি সমাজছাঁকুনী হয়ে আবেদনহীন এহেন সমাজনির্মাতা? নাকি নিজেরই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির বয়ান? গল্পকারের এ নবত্বখানি বোদ্ধারা কিভাবে নেবেন, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু, একজন দুরুস্ত পাঠক হিসেবে গল্পকারের এই চটপটেদুরন্ত যন্ত্রণা এবং তড়িৎসমাধানের নাটকিতি(কোনো কোনো ক্ষেত্রে), যেখানে জীবনকে শ্লথভূমিময়িতার বাইরে দাঁড় করিয়ে পুত্তলিকি টানার বিষয়টি ভালো লাগে একটুকু হলেও। সে অর্থে এগুলো তাই টানাপড়েনের গল্প নয়। মিঠেকড়া কড়চার স্বাদ পাওয়া যায়। অবশ্য ঘটে পোরার সাধ্যও থাকতে হবে পাঠকের।

গল্পগুলোর কাঠামোপর্যাস ছোটগল্পের পরিণীত পর্যায়ের মেনে নিলেও; যে ভাবতূর্যতায় অনুভূতি ও উপলব্ধির ডেলিরিয়াম থাকা দরকার তেমন পর্যায়ের গীতিঘনতা দেখা যায় না।হা, নাটকীয় মোড় আছে বেশ জা’গায় জা’গায়– সেটি ছোটগল্পের শর্তটি যেন পুরোবার।বোধ করি, গীতিপর্যাস এ ধরনের গল্পে বেশি দরকার নাটকিত মুহূর্তের পুনঃ পুনঃ নির্মাণের চেয়ে। প্রতিটি গল্পই সান্ধ্যচৈতন্যময়ী যদিও, তবু ব্যাকগ্রাউন্ডের সময়টি ভরাট সূর্যালোক পেয়েছে। তবে এ সান্ধ্যচেতনাটি old age অর্থে নয় termination অর্থে– যেখানে একটি ভুল, জীবনের কোনো খণ্ডাংশে কৃত, যেটি শেষ বেলাতে এসে নিয়তির প্রতি নিয়তময় হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, ‘ক্যাপ্টেন মারুফ’ গল্পটির পরিণতি — হয়তো সমাধানের পথটি অবিকল্পিত নয়, তবু কী সমাধান হতে পারে! আর শোধরানোর রাফটি তো থাকেই। গল্পকার প্রতিটি গল্পের নিয়তিপিষ্ট চরিত্রগুলোকে এমন এক সায়াহ্নে রশ্মিকৃত করেননি যে ফলাগুলো ইতোমধ্যে অপসৃয়মান রয়েছে সন্ধ্যাকালে; বরং সম্পন্নমান সন্ধ্যাকাশে। অর্থাৎ নাতিদীর্ঘ আশাটি অন্তত থেকে যায়। ‘ক্যাপ্টেন মারুফ’ গল্পের মারুফ ও ফারিয়ার জীবনের যে ক্ষণে তারা উপস্থিত, সেখান থেকে দুটি বিকল্প জুটি হয়তো সৃষ্টি করা যায়, অসম্ভব নয় যদিও– এ সমাধানটি তখন তাদের পূর্বজীবনের কৃত ভুলের চেয়েও যেন জীবনের প্রতি হাস্যকর হয়ে বাজে।

প্রথম গল্পটিতে যে ক্রাইসিসের সৃষ্টি ও তা থেকে উত্তরণে যে কমেডিয় যবনিকা — মনে করা যেতে পারে, বাহ, বেশ তো! কিন্তু, ভেবে দেখলে জীবনের প্রতি, এহেন যবনিকা আরোপ একটি নিদারুণ অ্যাবসার্ড করা বৈকি। কেননা, জীবনে এমনি সইসই লাগসই কিছুটি ঘটে না।ফলে এমনি রোমান্টিক যবনিকার অসম্ভবতা ভীতি ও কারুণ্যের উভয়বলের জন্ম দেয়।

মোক্তার হোসেনের গল্পের বইটি প্রকাশ করেছে বেহুলা বাঙলা প্রকাশন, 2018 এর বই মেলায় । গল্প গ্রন্থটিতে ৪টি হৃদয়ধর্মী গল্প স্থান পেয়েছে ।’আইসিইউ বেড নম্বর নাইন’– নামটির কারণেই কি গল্পকার একধরনের ভলিশনাল ট্রাবল ক্রিয়েট করবেন সবসময়ই? তেমন কিছু চোখে পড়েনি। সেটি করতে গেলে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করতে হতো গল্পে স্বভাবতই মানসিক টানাপড়েন থাকতে হতো বলে। গল্পে তাই বাস্তবিক দৈহিক উৎকারুণ্য ফুটে উঠেছে লেখকের অভিপ্রায়সুলভ। যেন একটি সমস্যা পাঠককে নিতেই হবে যে কোনো সময়ে। তাতে তাড়াহুড়ো পাঠকের কিছু নেই।অর্থাৎ পাঠকগতি সৃষ্টি হয়ে উঠেনি, যে অর্থে পাঠক তাগিদ বোধ করে থাকেন। সর্বোপরি, ‘আইসিইউ বেড নম্বর নাইন’ আমাদের কিছুটা আশাহত করেছে গল্পগুলোর বুনোটে জরুরি সময়ের গতিব্যঞ্জনার চেয়ে অতিসময়ের রঙপনা দেখানোয়।তবু একটা মেসেজ আমরা পেয়েছি যেটি নৈয়ায়িকি, এবং মানবিক ধর্মের আশায় উজ্জীবনের উৎকীর্তি-স্বরূপ। ধন্যবাদ তাই লেখককে।

লাইক দিন

Please Share This Post in Your Social Media




Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com