মেয়াদোত্তীর্ণ রাজমহল : বৈষয়িক বহুমাত্রিকতা | Nobobarta

আজ বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২০, ০৯:০৫ পূর্বাহ্ন

মেয়াদোত্তীর্ণ রাজমহল : বৈষয়িক বহুমাত্রিকতা

মেয়াদোত্তীর্ণ রাজমহল : বৈষয়িক বহুমাত্রিকতা

Rudra Amin Books

সালমান তারেক: কবিতা সাহিত্যের প্রাচীনতম শাখা। সাহিত্য চর্চা যারা করেন-তাঁরা কোন না কোন পর্যায়ে কবিতা চর্চায় ব্রতী হন, প্রশান্তি খোঁজেন। তাইতো দেখা যায় হুমায়ুন আহমেদ কিংবা আনিসুল হকের মত নিরেট গদ্যাকারও কবিতা চর্চায় মনোনিবেশ করেন। কবিতা চর্চা অনেকটা আরাধনার মত। মনকে প্রশান্তি দেয়, প্রফুল্ল করে-যদি তার স্বাদ নেওয়া যায়। সাধনা যেমন জীবন খরচ করা বিষয়-কবিতা চর্চাও তেমনই। জীবন খরচ না করলে কবিতার সৌন্দর্য-সৌকর্য কবির করায়ত্ব হয় না। বৈশ্বয়িক জীবনের রাজপথ ছেড়ে কবিকে হাঁটতে হয় আলপথ ধরে। সেই ত্যাগ করতে পারার ধৈর্য দেখানোর সাহস সবাই করে উঠতে পারেন না। যারা পারেন তাঁরা কবি। কবিতার রস আস্বাদন তাঁদেরকে স্বর্গলোকে পৌঁছার তৃপ্তি দেয়-কবিতা মাধুরি-মদিরা নিয়ে তাঁদের কাছে ধরা দেয়।

কবিতা পাঠও তেমনই সাধনার বিষয়। সবাই সেই সাধনা করার ধৈর্য দেখাতে পারেন না। তবে যারা পারেন তারা কবিতার রূপ-যৌবন প্রেমিক পুরুষের মত নান্দনিক চোখে দেখতে পারেন। কবিতার পাঠক শিল্পী। একজন শিল্পী যেমন সাধারণ বিষয়ের ভিতর অনন্য কিছু খোঁজার চোখ রাখেন-কবি আর কবিতার পাঠকও তেমনই কবিতায় সৌন্দর্য খোঁজার তৃতীয় চোখ রাখেন-মনন ধারণ করেন।

আকাশ মামুনের প্রথম কবিতার বই। তাঁর সমসাময়িকদের কবিতায় অনেক পথ হাঁটা হলেও আকাশ মামুন শুরু করেছেন ধিরে। তাঁর গন্তব্যও কি ধিরে চলার মত অনতিদূর কি না-তা দেখার জন্য সময়ের সাথে অপেক্ষা করতে হবে। তবে তাঁর কবিতা পড়লে মনে হবে তিনি হাঁটার জন্যই পথে নেমেছেন। সুউচ্চ পর্বতের চূড়ায় আরোহনের জন্য যেমন ছোট ছোট পাহাড় ডিঙ্গাতে হয়-আকাশ মামুনও তেমনই দম নিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাঁর কবিতায় সেই ছাপ দেখা যায়। কবিতায় তিনি গ্রামীণ আবহের সাথে যাপিত জীবনের উপমা অনন্য রূপে উপস্থাপন করেন। প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক-তিনি তবে জীবনানন্দ, জসীম উদ্দীন কিংবা আল মাহমুদ থেকে আলাদা কেন? কেন তাঁকে পাঠ জরুরি হয়ে পড়ে? আমার দৃষ্টিতে গ্রামীণ উপমা প্রয়োগে তিনি অগ্রজদের থেকে প্রকৃত পক্ষেই আলাদা। অগ্রজদের মত ধানক্ষেতের ব্যবহার করলেও-ধানক্ষেত থেকে শুরু করে স্বচ্ছল কৃষক হবার স্বপ্ন দেখান কবি। আবার সেই স্বচ্ছল কৃষককে বৈশ্বয়িক মানব জীবন আর ধানক্ষেতকে পৃথিবী কল্পনা কওে মানুষের নৈব্যত্তিক গন্তব্যকে সুচারু রূপে ইঙ্গিত করেন। যা পাঠ শেষেও পাঠকের নিউরনে কম্পন ধরে রাখে কিছুক্ষণ। এখানেই কবি সতন্ত্র-যাকে পাঠ করার আবেদন ধরে রাখেন। পরিযায়ী শীত প্রকৃতিতে খেজুর গাছের আড়ালে কিংবা উঠুনের মাচার সবুজ সজীব লাউ ঢগার আড়ালে কবি তাঁর প্রেয়সীকে নিপুন ভাবে কল্পনা করতে পারেন। যা স্পষ্ট হয়ে উঠে কবি যখন বলেন,

“রসবতী খেজুর গাছ স্তন উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে
কেবল গাছি-ই জানে তার কতটা উষ্ণতা প্রয়োজন।
আমিও গাছি হতে চাই-হে পৌষের খেজুর গাছ
অভিমান ভেঙে খোল তোমার আভরণ।” (উষ্ণতার ব্যাকরণ)
অথবা যখন বলেন,
“হে পৌষের লাউ-ঢগা, উঠুন ছেড়ে জড়াও আমার বুকে
তোমার গোলাপি আভায় আমাকেউ রাঙিয়ে দাও।” (দেনা-পাওনা)

প্রেম মানুষের জীবনের এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য-অলংকার। কবিও প্রেমিক হন। আর প্রেমিক মাত্রই সত্য স্বীকারে দ্ব্যর্থহীন। তাইতো কবি স্বীকার করে নিয়েছেন তাঁর দীনতার কথা। তবু প্রিয়ার প্রতি ভালোবাসায় তাঁর দৈন্যদশা নেই। প্রিয়ার স্তনবৃন্ত তার কাছে হাজরে আসওয়াদেও মত পবিত্র ও আরধ্য। তাইতো তিনি বলেন,

“বিত্তহীন বৈভবহীন শ্রমজীবী কৃষক আমি
তোমার বাদামি স্তনবৃন্ত আমার হাজওে আসওয়াদ”(ইবাদত)

একই রকম আবেগ মেশানো আকুতি নিয়ে বলেন,
“রাতের আলোটুকু বেচে আনব ভালোবাসা অকৃপণ
জলেস্বরী ধরবে এ হাত, রাখীবন্ধনে জড়াব।” (রাখীবন্ধন)
কিংবা প্রিয়ার ভালোবাসায় অবগাহিত হয়ে স্বগোতোক্তির মত বলে উঠেন,
“পতনোন্মুখ জীবন আমার
একদিন গতরের লাল ব্লাউজের নিশান উড়িয়ে
পতন ঠেকিয়েছিলে বলেই আজ আমি কবি।”

কবি শুধু প্রেমিক নন। আবার যিনি প্রেমিক তিনিই তো প্রতিবাদি। বৈশ্বয়িক জাপিত জীবনের প্রতি আগ্রহ না থাকলেও মানুষের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার দেখা যায়। দেখা যায় মিছিলে স্লোগানে দাবি আদায় করার আহ্বান জানানো এক বিপ্লবী কবিকে।

“আলোচনা আর নয়, লাথিমারি সে দুয়াওে সহস্রবার
বন্ধ যেই দুয়ার বাড়িয়েছে সব অযুত ব্যবধান,
সময়ক্ষেপণ-করা ধোয়াশার আলোচনা আর নয়
যা কিছু হবার হোক, মিছিলে স্লোগানেই হোক সমাধান।”

আবার দেশপ্রেমিক কবিকে দেখা যায় ভালো ও জনদরদী নেতার প্রতীক্ষায় দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে। ব্যর্থ হয়ে একসময় নিজেই খেই হারিয়ে ফেলেন। নিজেকেই অস্বীকার করেন কবি। বলেন দেয়াল জুড়ে তাঁর নিখোঁজ সংবাদের কথা। গারোদের নিয়ে মহাকাব্যিক কবিতা কবির অনন্য সংযোজন-যা ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। গারো সম্প্রদায়ের উপর রফিক আজাদসহ কেউ কেউ লিখেছেন। তবে আকাশ মামুনের সংযুক্তি একেবারেই ভিন্ন আঙ্গিকে-নতুন। অন্য কেউ এভাবে লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। যে ভাবে পাহাড় দখল হয়ে যাচ্ছে আর তাদের পাহাড়ের উপর অধিকার সংকুচিত হচ্ছে তাতে গারো সম্প্রদায়ের মত কবিও সংকিত। সংকিত তাদের উপর সাংষ্কৃতিক ও ধর্মীয় আগ্রাসন দেখেও।

কবিও রক্ত মাংসের মানুষ। বৈশ্বয়িক ভাবনা, পাপ-পঙ্কিলতা কবিকেও হাতছানি দেয়। সেই স্বীকারোক্তি কবিকে মহান করে। তবে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে বেঁচে ফিরতে চান। মানুষের কাতারে সামিল হতে চান-হতে চান মানবিক। তাইতো চন্দন কাঠকেও যেমন পবিত্র জ্ঞান করেন-মুয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনির প্রতীক্ষাও করেন। জীবনের কঠিন বাস্তবতা পাঠ কবিকে ঋদ্ধ করেছে-সেই নিগুঢ় পাঠ কবি সাবলিল ভাবে উপস্থাপন করেন।

“সময় বড় নিষ্ঠুর, শেষরাতে জলসা ফুরিয়ে গেলে-সব ভুলে
ফুড়–ত কওে উড়ে গিয়ে হাত দেয় সতীনের শ্রোণী-সন্ধিতে।” (সময়)

তবুও চোখে চোখ রেখে-পরষ্পরকে পড়তে পারার মিথ্যে গৌরবে
খিড়কি-আঁটা দক্ষিণ-দুয়ারি ঘওে পাশাপাশি ঘুমাই প্রতিদিন।” (হাওয়া ঘর)

কবি হবেন মানুষের ভরসার জায়গা। আশা জাগানিয়া ফিনিক্স পাখি। কিন্তু কবি যদি হতাশ হন-সাধারণ মানুষকেও সেই হতাশা স্পর্শ করে। তাইতো কবি যখন বলেন, “এখন আর কিছুতেই কিছু এসে যায় না” কিংবা “কিছুদিন আগে দেয়াল জুড়ে দেখেছি তার নিখোঁজ সংবাদ।” তখন পাঠকে ধাক্কা খেতে হয়। শব্দ প্রয়োগেও আরও একটু সাবধান হওয়া আবশ্যক। কারণ যখন বলেন আঁটকুড়ে বাইদ কিন্তু বর্ণনায় বাইকে দেখান শস্যদাত্রী রূপে-তখন পাঠক ভেবাচেকায় পড়ে যান। বেশ কিছু জায়গায় বানানের হেরফের ও অক্ষর পড়ে যাওয়াও দৃষ্টি কটু লাগে। নামে কী এসে যায়? কানা ছেলের নাম পদ্ম লোচন কিংবা কালো ছেলের নাম সুন্দর আলী নয়তো লাল চান হতে পারে। তবুও সাহিত্যে নামের একটা আলাদা দ্যোতনা আছে। বইটি পাঠ শেষে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগা অসমীচীন নয়-কেন বইটির নাম মেয়াদোত্তীর্ণ রাজমহল হলো! যদিও রাজনৈতিক অনেক ইঙ্গিত বইটিতে পাওয়া যায়-তবুও তা যথেষ্ট নয় বোধ করি। মেয়াদোত্তীর্ণ রাজমহলের কোন উল্লেখ কোন কবিতায় নেই কিংবা শিরোনামে কোন কবিতা নেই। নেই তাতে কি হয়েছে! তাতে করে বইটি পড়ার আবেদন কোন অংশেই কমে না।

কবি: আকাশ মামুন
প্রকাশক: অগ্রদূত এন্ড কোং
প্রচ্ছদ: দেওয়ান আতিকুর রহমান
মুদ্রিত মূল্য: ২০০ টাকা
পৃষ্ঠা: ৬৪


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.






Nobobarta © 2020 । About Contact Privacy-PolicyAdsFamily
Developed By Nobobarta