করোনা ভাইরাসের কারণে চীনে কুঁচিয়া রফতানি বন্ধ হওয়ায় আর্থিক সংকটে বরিশালের অর্ধসহস্রাধিক পরিবার | Nobobarta
Rudra Amin Books

আজ বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০৪:১২ পূর্বাহ্ন

করোনা ভাইরাসের কারণে চীনে কুঁচিয়া রফতানি বন্ধ হওয়ায় আর্থিক সংকটে বরিশালের অর্ধসহস্রাধিক পরিবার
চীনে কুঁচিয়া রফতানি বন্ধ হওয়ায় আর্থিক সংকটে বরিশালের অর্ধসহস্রাধিক পরিবার

করোনা ভাইরাসের কারণে চীনে কুঁচিয়া রফতানি বন্ধ হওয়ায় আর্থিক সংকটে বরিশালের অর্ধসহস্রাধিক পরিবার

বরিশাল প্রতিনিধি :

সাম্প্রতিক সময়ে ঘাতক করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণের কারণে চীনের সাথে আমদানী-রফতানি বন্ধ হওয়ায় কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পরেছে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার কুঁচিয়া ব্যবসায়ীরা। কুঁচিয়া সংগ্রহ ও ব্যবসার সাথে জড়িত কমপক্ষে অর্ধসহস্রাধিক পরিবার ব্যাংক ঋণ ও দাদন পরিশোধ নিয়ে মহাবিপদে পরেছেন।

Rudra Amin Books

কুঁচিয়া ব্যবসায়ী অর্জুন মন্ডল, সুশীল মন্ডল, প্রদীপ বাড়ৈ, জয়দেব মন্ডল, জহর মন্ডল, ভীম মন্ডলসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীরা বলেন, আগৈলঝাড়া থেকে আগে প্রতিমাসে কমপক্ষে চার কোটি টাকার কুঁচিয়া রফতানি হতো চীনসহ বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে রফতানির তালিকায় শীর্ষে থাকা চীনেই রফতানি হতো ৯০ শতাংশ। বাকি ১০ শতাংশ রফতানি করা হতো হংকং, তাইওয়ানসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে। ফলে এই ব্যবসার সাথে জড়িত রেখে ভাগ্য পরিবর্তন করেছিল অনেকেই।

ব্যবসায়ীরা আরও জানান, চীনের নাগরিকদের দৈনন্দিক খাদ্য তালিকায় কুঁচিয়া অন্যতম একটি জনপ্রিয় পুষ্টিকর খাদ্য। কিন্তু দেশটিতে সম্প্রতি করোনা ভাইরাস মারাত্মক আকারে বিস্তারের কারণে চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি থেকে চীনের সাথে কুঁচিয়া রফতানি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিপাকে পরেছেন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কুঁচিয়া সংগ্রহকারী, ব্যবসায়ী ও রফতানি কাজে জড়িত আড়তদারসহ প্রায় অর্ধসহস্রাধিক পরিবার।

ব্যবসায়ীরা জানান, তারা আগে মাছ এবং কচ্ছপের ব্যবসা করতেন। আবার অনেকে ছিলো বেকার। ব্যবসার জন্য ঢাকা আসা-যাওয়ার সূত্র ধরে যোগাযোগ হয় উত্তরার টঙ্গীর কামারপাড়া ও নলভোগ এলাকার অর্কিড ট্রেডিং কর্পোরেশন, আঞ্জুম ইন্টারন্যাশনাল ও গাজী এন্টারপ্রাইজসহ অন্যান্য কুঁচিয়া রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের সাথে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তাদের সংগ্রহ করা কুঁচিয়া বিদেশে রফতানি করা হতো। রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় কুঁচিয়া ব্যবসার সম্প্রসারণের জন্য স্থানীয় কুঁচিয়া ব্যবসায়ীদের দাদনে টাকা দিতেন। ওইসকল প্রতিষ্ঠান থেকে আগৈলঝাড়ার কুঁচিয়া ব্যবসায়ীরা পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত দাদনে তাদের কাছে কুঁচিয়া বিক্রির শর্তে গ্রহণ করতেন। রফতানিকারকদের কাছে কুঁচিয়া বিক্রির মাধ্যমে দাদনের টাকা পরিশোধ করতেন ব্যবসায়ীরা। এভাবেই স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে কুঁচিয়ার বাজারের ক্রম:বিকাশ ঘটিয়ে কুঁচিয়া শিকারী, মজুদ ও ব্যবসার মাধ্যমে অর্ধসহস্রাধিক পরিবার স্বচ্ছলতায় জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে করোনা ভাইরাস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ায় চীনের সাথে অন্যান্য ব্যবসা বাণিজ্যের মতো কুঁচিয়া রফতানি পুরোপুরি বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পরেছেন দাদন নেয়া শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা। ফলে বেকার হয়ে পরেছেন কুঁচিয়া ধরা শ্রমজীবি লোকজন। কিছুদিন আগেও রফতানিযোগ্য কুঁচিয়া সংগ্রহ ও রফতানির জন্য যে আড়ৎগুলো ছিল কর্মচঞ্চল আজ সেখানে শুধু শূণ্যতা। জনশূণ্য হয়ে পরেছে কুঁচিয়ার আড়ৎগুলো। কাজ না থাকায় অলস সময়ের জন্য শ্রমিকদের বেতন হিসেবে আড়তদারদের গুণতে হচ্ছে মাসিক বেতন।

আগামী এক মাসের মধ্যে চীনে রফতানি কার্যক্রম পুনরায় শুরু না হলে ব্যবসায়ীদের মজুদ করা কুঁচিয়া সম্পূর্ণ মারা যাওয়ার আশঙ্কা করছেন আড়তদাররা। রফতানি বন্ধ থাকায় কুঁচিয়া সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে কুঁচিয়া কিনতে চাচ্ছেন না আড়তদাররা। যে কারণে বেশীরভাগ গরীব জেলে এখন কুঁচিয়া ধরা বন্ধ করে দিয়েছে। অর্থিক অনটনের মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে ওইসকল পরিবারের লোকজন। নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত কুঁচিয়ার মৌসুম থাকলেও জানুয়ারি ও ফেব্রয়ারী দুইমাস কুঁচিয়ার প্রাপ্তির ভরা মৌসুম। কিন্তু ভরা মৌসুমের শুরুতেই করোনা ভাইরাসের কারণে কুঁচিয়া ব্যবসায় পুরোপুরি ধ্বস নামায় মহাবিপাকে পরেছেন কুঁচিয়া ধরা শ্রমিক, ব্যবসায়ী, আড়তদারসহ সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা। কুঁচিয়া সংগ্রহকারী রাজিহার গ্রামের সুশীল রায় জানান, আগে আড়তদারদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে প্রতিদিন পুকুর, ডোবা-নালা, খাল-বিল থেকে কুঁচিয়া ধরে আটশ’ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতেন। বর্তমানে রফতানি বন্ধ হওয়ায় কোন আড়তদারই কুঁচিয়া কিনতে চাইছে না। তাই তাদের সংসার চালানো এখন খুবই কঠিন হয়ে পরেছে।

উপজেলা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা রোজিনা আকতার জানান, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের জন্য চীন কুঁচিয়া আমদানী বন্ধ করে দিয়েছে। যে কারণে এলাকার কুঁচিয়া ব্যবসায় ধ্বস নেমেছে। আমাদের অধিদপ্তরের আওতাধীন কুঁচিয়া চাষের একটি পাইলট প্রকল্প প্রাকৃতিক দূর্যাগসহ অন্যান্য কারণে বাতিল হয়ে গেছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার চৌধুরী রওশন ইসলাম বলেন, উপজেলার বহু মৎস্যচাষী কুঁচিয়া চাষ করার পাশপাশি মজা পুকুর, ডোবা-নালা, খাল থেকে কুঁচিয়া সংগ্রহ করে আড়তে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। যে কারণে এখানে কুঁচিয়া চাষের একটি পাইলট প্রকল্প চালু করেছিল সরকারের মৎস্য অধিদপ্তর। সিডরের কারণে ওই মাস্টার প্রকল্প বাতিল হয়ে যায়। তারপরেও কুঁচিয়া সংগ্রহ, রক্ষণাবেক্ষণ ও বিক্রির সাথে জড়িত থেকে অসংখ্য মানুষ কর্মজীবনের মাধ্যমে আর্থিক স্বচ্ছলতায় দিনযাপন করতেন। সম্প্রতি চীনে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পরায় কুঁচিয়া রফতানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে কারও কিছু করার নেই। তারপরেও আমরা আশা করছি এটি একটি সাময়িক সমস্যা। আমরা আশা করছি অচিরেই এ সমস্যাটি দূর হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, মজুদকৃত কুঁচিয়া আমাদের দেশীয় বাজারে বিক্রি করা সম্ভব হলে একটু হলেও লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবে জেলে ও আড়তদাররা।


Leave a Reply



Nobobarta © 2020। about Contact PolicyAdvertisingOur Family DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com