উজিরপুরের ভুয়া চিকিৎসকের অপচিকিৎসার দাপট কমছেনা : প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নাম ভাঙিয়ে চলা রেজাউলের দাম্ভিকতায় অসহায় সিভিল সার্জন | Nobobarta
Rudra Amin Books

আজ বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০৩:৪৫ পূর্বাহ্ন

উজিরপুরের ভুয়া চিকিৎসকের অপচিকিৎসার দাপট কমছেনা : প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নাম ভাঙিয়ে চলা রেজাউলের দাম্ভিকতায় অসহায় সিভিল সার্জন
উজিরপুরের ভুয়া চিকিৎসকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নাম ভাঙিয়ে চলায় অপচিকিৎসার দাপট

উজিরপুরের ভুয়া চিকিৎসকের অপচিকিৎসার দাপট কমছেনা : প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নাম ভাঙিয়ে চলা রেজাউলের দাম্ভিকতায় অসহায় সিভিল সার্জন

বিশেষ প্রতিনিধি :

এইচএসসি ও এমবিবিএস পাসের জাল সনদপত্র দিয়ে বছরের পর বছর ধরে ভুয়া এমবিবিএস চিকিৎসক সেজে দরিদ্র, অসহায় রোগীদের সাথে প্রতারণার মাধ্যমে অপচিকিৎসা দিয়ে আসছেন রেজাউল করিম নামের এক প্রতারক ভন্ড চিকিৎসক। অপচিকিৎসার মাধ্যমে সে ইতোমধ্যে কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছে। এই প্রতারক ভুয়া রেজাউল করিম বরিশালের উজিরপুর উপজেলার পশ্চিম সাতলা গ্রামের মৃত আদম আলী সরদারের পুত্র।

Rudra Amin Books

ভুক্তভোগীরা জানান, কখনো সে এমবিবিএস চিকিৎসক, কখনো সে সাংবাদিক, আবার কখনো টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক, ঢাকা এবং বরিশাল শহর থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার মালিক-প্রকাশক হিসেবেও পরিচয় দিয়ে তার স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছেন।

ভুয়া এমবিবিএস ডাক্তার রেজাউল করিমের অপচিকিৎসার শিকার ভুক্তভোগী ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, উজিরপুর উপজেলার পশ্চিম সীমান্তবর্তী ও কোটালীপাড়া উপজেলার পূর্ব-দক্ষিণ সীমান্তের পশ্চিম সাতলা গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছে “মায়ের দোয়া ক্লিনিক এন্ড ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার’’। ওই সেন্টারে বসে বছরের পর বছর ধরে চলছে গ্রামগঞ্জের সহজ সরল রোগীদের অপচিকিৎসা। স্থানীয় কতিপয় দালালের মাধ্যমে সাধারণ রোগীদের ওই ক্লিনিকে এনে নানা কৌশলে অপচিকিৎসার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে মোটা অংকের টাকা। অনুমোদনবিহীন ওই ক্লিনিকে রেজাউল রোগীদের ভর্তি করে একেকজন রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে চিকিৎসা ব্যয় বাবদ ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছেন। এভাবেই প্রতারক রেজাউল ইতোমধ্যে কয়েক কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।

সূত্র মতে, ওই ক্লিনিকে রোগীদের ভর্তির পরে চিকিৎসা প্রদান বা জটিল অপারেশন করে ডায়েরী বা রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করে না রাখার ফলে তার কাজের কোন প্রমাণ থাকেনা। একই সাথে রোগীদেরকেও কোন প্রমাণপত্র দেয়া হয়না।

পিরোজপুরের নাজিরপুর, পদ্মডুবি, তরুর বাজার, স্বরূপকাঠী, ইলুহার, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া, টুঙ্গিপাড়া উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাম থেকে দালালের মাধ্যমে রোগী এনে ভর্তি করা হয় প্রতারক রেজাউলের অবৈধ ক্লিনিকে। তারপরেই শুরু হয় রোগীদেরকে তার অপচিকিৎসা দেয়ার কাজ। রেজাউল করিমের অপচিকিৎসার শিকার হয়ে বিভিন্ন সময় যাদের জীবনহানি ঘটেছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হলেও প্রভাবশালী রেজাউল সেসব মামলা থেকে অর্থের জোরে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছে।

সূত্রে আরও জানা গেছে, বানারীপাড়া উপজেলার ইলুহার গ্রামের দিনমজুর ফোরকান মিয়া তার ছয় বছরের অসুস্থ শিশুপুত্র হাসানকে গত ২৩ জুন রেজাউল করিমের মায়ের দোয়া কিনিকে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে ১৮ হাজার টাকার চুক্তিতে রেজাউল করিম হাসানকে চিকিৎসা করাতে রাজি হয় এবং তার ক্লিনিকে হাসানের পায়ুপথে ছুড়ি ও এসিড জাতীয় পদার্থ দিয়ে অপারেশনে করে। এতে অবুঝ শিশু হাসান চিরতরে তার পায়ুপথের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে এবং জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে যায়। এ অবস্থায় হাসানের দরিদ্র পিতা সহায় সম্বল হারিয়ে হাসানকে নিয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে হাসানের পেট কেটে বিকল্প উপায়ে পায়ুপথ তৈরী করা হয়। এ ঘটনার পর হাসানের পিতা ফোরকান মিয়া ভুয়া এমবিবিএস ডাক্তার রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে বরিশালের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্তের জন্য আদালত উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ পেয়ে উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শওকত আলী ও ডা. মো. মাকসুদুর রহমান তদন্ত করে আদালতে রিপোর্ট দাখিল করেন। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রেজাউল করিম “পিচব্লেন্ড ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি হাসপাতাল”থেকে এমবিবিএস (এস) ডিগ্রী অর্জন করেছেন বলে দাবি করেন। কিন্তু বাংলাদেশে মেডিকেল প্রাকটিসের লাইসেন্স প্রদানের একমাত্র আইনগত সংস্থা বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) প্রদত্ত কোন রেজিস্ট্রেশন বা সনদপত্র দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে “পিচব্লেন্ড ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি”নামক প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনেরও অনুমোদনকৃত নয়।

ভুক্তভোগীদের মধ্যে সাতলা গ্রামের বেনজির বালী অভিযোগ করে বলেন, তার বাবা আ. লতিফ বালীকে রেজাউল ডাক্তার নামের এক দানব অপচিকিৎসা দিয়ে তাকে প্রায় মেরেই করে ফেলেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ঢাকায় ল্যাব এইড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় তার বাবা জীবন ফিরে পেয়েছে। তাছাড়া নয়াকান্দি গ্রামের মতলেব হাওলাদার, ফরাজী বাড়ির শাহজাহান সরদার, রাজাপুরের নুরু হাওলাদারসহ অনেক রোগীরাই মানুষ হত্যাকরী ভুয়া এমবিবিএস ডাক্তার রেজাউল করিমের অপচিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেছেন। এসব মৃত্যুবরণকারী রোগীদের পরিবারের লোকজন অসচ্ছ্বল হবার কারণে ভুয়া চিকিৎসক রেজাউলের বিরুদ্ধে কোন আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি।

তথ্যমতে, ভুয়া ডাক্তার রেজাউল করিম ২০০৩ সালে আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা দাখিল মাদ্রাসা থেকে জিপিএ-৩ পয়েন্ট পেয়ে দাখিল পাশ করে। দাখিল পাশ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ তার শিক্ষা জীবন। এরপরে সে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৭ সালে এইচএসসি পাসের একটি জাল সনদপত্র তৈরি করে। রেজাউল করিম উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এইচএসসি পাসের যে সনদপত্রটি বিভিন্ন দপ্তরে দাখিল করেছে তাতে দেখা যায় তার স্টুডেন্ট আইডি নম্বর ০৪-০-১১-১৬৫-০২৩। অন্যদিকে বাংলাদেশে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৭ সালে এই ০৪-০-১১-১৬৫-০২৩ একই স্টুডেন্ট আইডি নম্বরে মানিকগঞ্জের মতিলাল ডিগ্রী কলেজ থেকে জিপিএ ১.৮৫ পেয়ে বৈধভাবে এইচএসসি পাশ করেছেন মোহাম্মদ মোশারেফ হোসাইন নামের এক ব্যক্তি। তার পিতার নাম এমডি মনির উদ্দিন এবং মাতার নাম শাহেরা বেগম। উল্লেখিত সনদপত্রে কোথাও রেজাউল করিমের মায়ের নাম লেখা নেই। এছাড়া তার এমবিবিএস সনদপত্রসহ অন্যান্য সনদপত্রে “চার্টার অব অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল অব ইন্ডো এ্যালোপ্যাথি এন্ড কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিন”৯৭/৬বি, হাজরা রোড, কোলকাতা-২৬ ঠিকানা থেকে এসব সনদপত্র সে সংগ্রহ করেছে। কিন্তু ভারতের পশ্চিমবঙ্গে উল্লেখিত ঠিকানায় একাধিকবার তল্লাশি করেও এ নামের সনদপত্র প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি।

অপরদিকে গোপালগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় সুপারের দায়িত্বে থাকা রেজাউলের বড়ভাই মাওলানা রুহুল আমিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নাম ভাঙিয়ে ও প্রভাব খাটিয়ে রেজাউলের এসব অপকর্মের মদদ দিচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। যেকোন ধরণের সংস্থাই রেজাউলের অবৈধ কিনিকে গেলে সে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেই এমন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে বলে দম্ভ প্রদর্শন করে থাকে।

উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. একেএম শামসুদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, রেজাউলের বিরুদ্ধে অসহায় সাধারণ মানুষকে অপচিকিৎসা দেয়ার একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে গেলেই তার বড়ভাই মাওলানা রুহুল আমিন রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে থাকে। তবে র‌্যাব-৮, ডিবি ও দুর্নীতি দমন কমিশন চাইলেই তদন্ত সাপেক্ষে রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন ।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত রেজাউল করিমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, দেশে এমন কোন সংস্থা নেই যে রেজাউল ডাক্তারের কিছু করবে। রেজাউল ডাক্তার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অনুমতি নিয়েই এখানে কিনিক তৈরি করে ডাক্তারী করছে। যে কারণে আমার বিরুদ্ধে পত্র-পত্রিকায় টানা একমাস সংবাদ লিখেও কোন লাভ হবেনা।

বিষয়টি নিয়ে বরিশালের সিভিল সার্জন মো. মনোয়ার হোসাইনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গত একবছরে পশ্চিম সাতলা গ্রামের মায়ের দোয়া কিনিকের মালিক রেজাউল করিমের নামে একাধিক অভিযোগ পেয়ে দু’বার আমি নিজে সেখানে তদন্তে গিয়েছি। তার সকল সনদপত্র পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তা ভুয়া বলেই প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করলেই বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যে কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে বার বার পিছিয়ে যেতে বাধ্য হতে হচ্ছে। তবে সে কোনমতেই এমবিবিএস তো দূরের কথা,কোন হাতুড়ে ডাক্তার হবারও যোগ্য নয় বলেও সির্ভিল সার্জন মন্তব্য করেন।


Leave a Reply



Nobobarta © 2020। about Contact PolicyAdvertisingOur Family DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com