সৈয়দ রনোর’র ছোট গল্প লিভ টুগেদার – Nobobarta

আজ শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৭:২০ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম:
আজ উদয় সমাজ কল্যান সংস্থা সিলেটের ১২তম ওয়াজ মাহফিল দলীয় কার্যালয় সম্প্রসারণের লক্ষে আগৈলঝাড়া রিপোর্টার্স ইউনিটির প্লট উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের কাছে হস্তান্তর যবিপ্রবিতে ইয়ুথ এন্ডিং হাঙ্গার বাংলাদেশের নতুন কমিটি গঠন আটোয়ারীতে পরিবার কল্যাণ সেবা ও প্রচার সপ্তাহ উপলক্ষে এ্যাডভোকেসি সভা অনুষ্ঠিত জবি রোভার দলের হেঁটে ১৫০ কিলোমিটার পরিভ্রমণের উদ্বোধন মারুফ-তানহার ‘দখল’ লক্ষ্মীপুরে রামগতি পৌরসভায় ৮ কোটি টাকার টেন্ডার জালিয়াতি চেষ্টার অভিযোগ নলছিটিতে যুবকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার সভাপতি সরফরাজ, সম্পাদক লিটন রাজাপুরে আ.লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন-২০১৯ অনুষ্ঠিত সহকারী পরিচালক সমিতির নির্বাচন আগামীকাল!!
সৈয়দ রনোর’র ছোট গল্প লিভ টুগেদার

সৈয়দ রনোর’র ছোট গল্প লিভ টুগেদার

মেঘের চোঁয়ালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তেরোর ঘরের নামতা পাঠ করছে অনিমেষ। তারুণ্য পার করে পূর্ণাঙ্গ যৌবনা হবার পরেও তেরোর ঘরের নামতা পাঠ করতে গেলেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায় তার । অংকে অনিমেষ বরাবরই কাঁচা। অবশ্য বাল্যকাল থেকেই অনিমেষের লেখাপড়ার চেয়ে ঝোক ছিলো মনোস্তাত্বিক বিষয়ের অজানা সবকিছু জানার কৌতুহলের প্রতি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে উঠেছে সব। পাশের বাড়ির শিমুল তুলোর গাছটিও কিন্তু এখন আকাশ ছুঁই ছুঁই। প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে চলার মানুষিকতাও কিন্তু আধুনিকতার ধারক বাহক। প্রকৃতি তার নিজস্ব গতিতেই যেমন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলে অনিমেষের বেলায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

সময়ের সাথে কিছুটা যুদ্ধ করে তরতর করে এগিয়ে গেছে অনিমেষ। স্কুল কলেজের আঙ্গিনা ছাড়িয়ে সে এখন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র। নানারকম ঘাত প্রতিঘাত তার নিত্য দিনের সাথী। প্রকৃতির বৈরী মনোভাব অন্য পাঁচজনকে তেমন একটা কাবু করতে না পারলেও অনিমেষের বেলায় ভিন্ন। খানিকটা চিড় ধরা মনোবল নিয়ে এখনো বেঁচে আছে। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই এখনো মনে মনে ভাবে এতো দুঃখ কষ্ট নিয়ে কি আর বেঁচে থাকা যায়? শুধু সান্তনায় বুক বাঁধে, কিছুই করার নেই, এটাই হয়তো তার নিয়তি কিংবা বিধির বিধান। পরিবার পরিজনের স্মৃতিঘেরা মায়া নিয়ে এখনো বেঁচে আছে, এখনো দুঃখ-বোধকে ছিন্নভিন্ন করে ঘুরে দাঁড়াবার রঙ্গীন স্বপ্ন আঁকে মনে। বিপত্তি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধে ভালো কোন সাবজেক্ট জোটেনি তার পোঁড়া কপালে। অজ্ঞাত্বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছে।
ক্লাসে মন বসে না । কারো সাথে তেমন একটা কথাও বলে না। সারাক্ষণ পরিবার পরিজনের অর্থকষ্ট নিয়ে ভাবে নিরবে নিভৃতে। অনিমেষের একাকিত্বের সাথী হবার জন্য তৃষ্ণা যুক্ত হতে চায়, ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে চায় অনিমেষকে তার অনেক পছন্দ। গড়ে তুলতে চায় বন্ধুত্ব। তৃষ্ণা সহপাঠি হিসেবে অন্য পাঁচজনের চেয়ে একটু ব্যতিক্রম। সহ-পাঠিদের সবাই যেখানে হাসি-ঠাট্টা, হৈ হুল্লোর নিয়ে মহাব্যস্ত। তখন অনিমেষ মনমরা হয়ে বসে থাকে একা। তৃষ্ণার নরম কমল মনে নিজের অজান্তেই অনিমেষের প্রতি সফ্টকর্ণার সৃষ্টি হয়। অবসর সময়ে দুজনের সুখ দুঃখের কথাও ভাগাভাগি হতে থাকে। চা-বিস্কুট খাবার ফাঁকে অনিমেষ একদিন বলে বসলো, শোন তৃষ্ণা যা হবার নয়, তা নিয়ে না ভাবাই ভালো। এতে দুঃখ-কষ্ট বাড়বে বৈ কমবে না।

তৃষ্ণার মনের জমিনে বয়ে গেলো দমকা হাওয়া। চায়ের কাপটি হাত থেকে ধপাস করে পড়ে গেলো। মাথা নিচু করে বুড়ো আঙ্গুলের নখ দিয়ে ছিড়ছে একের পর এক ঘাসের ডগা।
অনিমেষ এ রকম একটি উওর দিতে পারে তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলো না তৃষ্ণা। চোখের জলে ক্যাম্পাসের উতপ্ত মাটি ভেজার আগেই তরতর করে চলে গেল মহিলা হোস্টেলে।

অনিমেষ শুধু তাকিয়ে থাকলো গন্তব্যের দিকে। এ রকম পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয় সম্পর্কে মোটেই ধারনা নেই তার। এতো ভেবে চিন্তেও কথাগুলো বলেনি সে। করণীয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে পকেটের মোবাইল ফোন বেজে উঠলো। মোবাইল ফোন একের পর এক বাজছে, সে দিকে খেয়াল নেই তার, দরদর করে ঘেমে যাচ্ছে। চিন্তার রাহুঘ্রাস থেকে কিছুটা নিস্কৃতি পাবার পর পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করলো । ফোন রিসিভ করতেই বাবার দরাজ কন্ঠ। এতবার ফোন দিচ্ছি ধরছিস না কেন? কী হয়েছে তোর? কোন সমস্যা? বাবা নাছোরবান্দা, কিছুই শুনতে নারাজ। বাকরুদ্ধ কন্ঠে এপ্রান্ত হতে অনিমেষ ক্ষীণ কন্ঠে উওর দিলো, না বাবা আমার কোন সমস্যা নেই। মা কেমন আছে? সমস্যা নেই বললেই তো হবে না, কিছু না কিছু একটা হয়েছে। বিদেশ বিভুইতে সন্তানের কিছু হলে বাবা-মায়ের মনে জানান দেয় আগে”। যাক বাবা যেখানেই থাকিস যে ভাবেই থাকিস ভালো থাকিস। তোর মার ব্লাডপ্রেসার আর ডায়েবেটিস বেড়েছে। শরীরের অবস্থা আগের চেয়ে আরো বেশি খারাপ। তোর দুঃচিন্তা বাড়িয়ে লাভ নেই। আমাদের জীবন তো শেষ, এখন তোদের জীবন গঠনের পালা। আমাদের নিয়ে না ভেবে লেখাপড়ায় মনোযোগি হও বাবা, বলে ফোন কেটে দিলেন সমর বাবু।

অনিমেষকে একেবারেই বিমর্ষ লাগছে। ধুলিঝড়ে প্রকৃতি যেমন অন্ধকারে নিমজ্জ্বিত হয় ঠিক তদরূপ মুখের আকৃতি ও প্রকৃতি একেবারেই ধুলা-বালির প্রলেপ।
বেশ কয়েকদিন ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত অনিমেষ। নিজের মনের সাথে চলে দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ, বোঝা-পরা। কোনো সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে পারে না সে। আষাঢ়ের বৃষ্টির মতো ঝড় বরিশান ঝড়ে পড়ে অশ্রু আবার চৈত্র খড়তাপের মতো নিজের মনের জমিনকে করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক।

ক্লান্ত শরীর নিয়ে ক্যাম্পাসে এসে একদিন হাজির হয়। উসকো খুসকো চুল, খোচা খোচা দাড়ি, গোফও গজিয়ে উঠেছে বেশ। তৃষ্ণা অনিমেষকে দেখেই অবাক এবং নির্বাক। ক্লাসে স্যারের বক্তব্যের ফাঁক গলিয়ে আঁড় চোখে তাকিয়ে থাকে অনিমেষের দিকে।

ক্যাম্পাসের পরিবেশ আজ অন্যদিনের চেয়ে একেবারেই আলাদা। কোলাহল নেই, চারদিকে শুধুই শুনশান নীরবতা। তৃষ্ণা আপন গতিতে হাটতে থাকে। অনিমেষ পিছু পিছু হাটে। অনিমেষ অপলোক দৃষ্টিতে তৃষ্ণার হাটার গতিবেগ ফলো করে। পেছন দিক থেকে বুঝতে চেষ্টা করে তৃষ্ণার সু-ঢেল রূপ-যৌবনের ইতিবৃত্ত। দু’জনে কৃষ্ণচূড়ার গাছের নিকট গিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায়।

দু’জনের আগমনে কৃষ্ণচূড়ার ডালে ছুটোছুটি শুরু করে দোয়েল পাখি। দোয়েল পাখির নাচন দেখে মুগ্ধ অনিমেষ পলকহীনভাবে মগডালের দিকে তাকিয়ে থাকে । তৃষ্ণা খানিকটা তিক্তবিরক্ত হয়। রাগত কন্ঠে বলে, তুমি কিছু বলবে অনিমেষ? অনিমেষ কোন বাক্যবিনিময় না করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে- আমি রাজি। প্রথমে বেশ বিরক্ত হয় তৃষ্ণা। রাজি মানে কী? অন্যদিকে ঘুরে অনিমেষ বলে আমি রাজী। কিসে রাজি? কেন রাজি? এতক্ষণে অনিমেষ ঘুড়ে দাঁড়ায়। তৃষ্ণার মুখোমুখি হয়ে বলে, তোমার সকল প্রস্তাবে আমি রাজি। তৃষ্ণা আরো বিরক্ত হতে থাকে। আমি তোমাকে কি প্রস্তাব দিয়েছি যে তুমি রাজি হবে? তুমি কি প্রস্তাব করেছো তার ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই । আমি বলতে চাচ্ছি তোমার চাওয়া-পাওয়া,আকাঙ্খা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা,পছন্দ-অপছন্দ সবকিছুর সাথে আমি আছি এবং থাকতে চাই । তৃষ্ণা এবার খানিকটা বদলে যায় । উচ্চস্বরে হো হো করে হেসে উঠে। জেনে রেখো অনিমেষ, ভাঙ্গা কলস যেমন জোড়া লাগে না তদ্রুপ ভাঙ্গা মনও জোড়ালাগার নয়। তবু তোমার প্রস্তাবটা আমি ভেবে দেখবো বলে হনহন করে হেটে যায় তৃষ্ণা। তৃষ্ণার গমন পথের দিকে বিস্ফারিত নেত্রে তাকিয়ে থাকে অনিমেষ । ভাবনার স্রোতে প্রতিধ্বনিত হয়, মানুষ এমন হয় কি করে? সূর্যটা যেমন আলোকরশ্মি ফেলে পৃথিবীর প্রতিটি ইঞ্চি ইঞ্চি ধূলি-কণা দেখছে তদ্রুপ অনিমেষ তার চোখের আলোক রশ্মি দিয়ে তৃষ্ণার চলন-বলন এমনকি অন্তরআত্মা দেখার চেষ্টা করছে। নিজের অজান্তেই মুখ ফসকে বিড় বিড় করে বলতে থাকে সুন্দর, অপূর্ব সুন্দর বিধাতা তোমার সৃষ্টি।

ক্যাম্পাসে এবার তৃষ্ণার অনুপস্থিতির পালা। অনিমেষ সমস্ত ক্যাম্পাস তন্নতন্ন করে খোঁজে, না কোথাও নেই সে। মোবাইলে মিনিটে মিনিটে ফোন দেয় কিন্তু নাম্বার বন্ধ দেখায়। নানা ব্যস্ততায় দিন গেলেও রাত আসে অগ্নিডালা সাঁজিয়ে।

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে চুড়ে খান খান হতে থাকে অনিমেষের দীর্ঘশ্বাসে। সে দহন আর কেউ না জানুক, জানে শয্যা সাথী বালিশ। বেশ কিছুদিন পর হঠাৎ ধুমকেতুর মতো তৃষ্ণা এসে ক্লাসে হাজির। ক্লাশ শেষে অনিমেষকে কিছু না বলেই সবার সামনে খপ করে হাত চেপে ধরে টেনে ক্লাশরুম থেকে বাইরে নিয়ে আসে। অনিমেষ কিং কর্তব্যবিমূঢ়। তৃষ্ণার অগ্নিমুর্তি দেখে মনে মনে ভর্কে যায়। ক্যাম্পাসের বাইরে এসে তৃষ্ণা একটি রিক্সা ডেকে উঠে বসে। সোজা আজিমপুর গিয়ে রিক্সা থামে। রিক্সা ভাড়া চুকিয়ে দিয়ে অনিমেষকে তৃষ্ণা বলে-আমি যা যা করবো তোমার কাজ হলো আমাকে অনুসরন করা। এখন বলো পকেটে টাকা আছে কতো? ভয়ে ভয়ে অনিমেষ উত্তর দেয়, হাজার পাঁচেক হতে পারে। সমস্য নেই চলো।

  • কোথায়?
    কোন প্রশ্ন করা চলবে না, সামনে এগোও। রস্তার দুই পাশের্^ খেয়াল করবে টু-লেট আছে কি না? হ্যাঁ সূচক মাথা দুলিয়ে দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। ঢাকা শহরে সব মিলিয়ে ভাড়ার বাসা মনের মতো পাওয়া একটু কঠিন বটে। কিন্তু এদের বেলায় ঘটলো উল্টো ঘটনা। রাস্তার বাম পাশে আড়া-আড়িভাবে দাড়িয়ে থাকা, মীর মঞ্জিলের তৃতীয় তলার দুই রুমের ফ্ল্যাট বাসা ভাড়ার সাইনবোর্ড ঝুলছে। বাড়িটির নামকরণ মীর মঞ্জিল হওয়ার ব্যাপারে যৌক্তিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন থাকলেও বাড়িওয়ালীর সাথে ওরা দু’জন স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে বাসা ভাড়া নিয়ে পাঁচ হাজার টাকা এ্যাডভান্সও দিয়ে পাকা করে ফেললো। মাসের ০১ তারিখে নতুন বাসায় উঠবে, বহু ধরণের প্রস্তুতির প্রয়োজন। কিছুই বুঝে ওঠার আগেই তৃষ্ণা তড়িৎ গতিতে একার সিদ্ধান্তেই বাসা ভাড়া নেয়াটা কতটুকু যৌক্তিক এ নিয়ে ভাবছে অনিমেষ।

ভাবনার গতি রিক্সার চলমান চাকার সাথে ঘুরতে ঘুরতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে এসে থেমে যায়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দু’জন পা মেলে একে অপরের পাশাপাশি বসে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এখন কিছুটা নির্জন। বিকেল ৪টা, এখনো জন মনুষের তেমন একটা সমাগম ঘটেনি। পুরাতন একটি গাছের ডালপালা শেকড় বাকরকে ঘিরে দু’জন মনের গহীণে লুকিয়ে থাকা আলোচনা করছে। ইশারা ঈঙ্গিতে কিছু কথা হলো। এরপর কিছুটা উচ্চস্বরে তৃষ্ণা অনিমেষের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলো- শোনো অনিমেষ, আমি এখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবো। অনিমেষ মাথা চুলকিয়ে কিছুটা অন্য মনস্ক। হ্যাচকা টানে তৃষ্ণা অনিমেষকে মুখোমুখি এনে বসালো। গুরুত্বপূর্ণ কথার সময় অন্য মনস্ক থাকতে নেই। আমরা দু’জন লিভ টুগেদার করবো। এতে বহুবিদ লাভ রয়েছে। মনে রাখবে এতে বহুবিদ লাভ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষে আমরা কেউ কাউকে বিয়ে করবো না, এটা আমার প্রথম এবং প্রধান শর্ত। দু’জন একত্রিত থাকায় একে অপরের সাথে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগির পাশাপাশি লেখা পড়ার বিষয়টি শেয়ার করতে পারবো। তুমি বাজার করবে, আমি রান্না করবো, এতে সময়ের অপচয় হবে না এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবারও খাওয়া যাবে। মানুষের যে যৌবিক চাহিদা সেটা দুশ্চিন্তাহীনভাবে উভয়ের ইচ্ছায় পুরণও হতে পারে। খরচের বিষয়ে দু’জন দুটি ডাইরী মেইনটেইন করবো, মাস শেষে হিসেবান্তে খরচ ফিফটি ফিফটি।

ঝড়ের গতিতে কথাগুলো বলে তৃষ্ণা সরাসরি অনিমেষের দিকে তাকায়। যে তাকানোতে কোন ভনিতা নেই, নেই কোন রহস্য। অনিমেষ শুধু হ্যাঁ সূচক মাথা দুলিয়ে একটি ঝড়া পাতা উলট পালট করে দেখতে থাকে। এক পর্যায়ে মৃদু কণ্ঠে বলে- বাসায় তো পনের দিনের মধ্যে উঠতে হবে, অনেক অনেক ফার্নিচারের প্রয়োজন, এ বিষয়ে আমরা কী করতে পারি? তৃষ্ণা আবার বলতে শুরু করে- আমরা উভয়ে ফার্নিচারের একটি তালিকা তৈরী করে সম্ভাব্য বাজেট নির্ধারণ পূর্বক দু’জন সমহারে টাকা দিয়ে কিনে ফেলবো। অনিমেষ নিচুস্বরে দু’হাত কচলাতে কচলাতে বললো- আমি একটি কথা বলতে চাই।
– বলো।
– আগে বলো তুমি রাগ করবে না।
– ঠিক আছে বলো।
– আচ্ছা আমরা লিভ টুগেদার না করে কন্ট্রাক ম্যারেজ করতে পারি না?
– না। খোঁজ খবর নিয়ে দেখতে পারো, তলে তলে অনেকেই এসব করছে। আমরা করলে দোষ কোথায়? খাইলে জাত যায় না, কইলে জাত যায়? আমি এরকম জাতের নিকুচি করি। অনিমেষ সাহস করে তৃষ্ণার মুখের উপর কোন কথা বলতে পারলো না। ধীরে ধীরে দু’জন দাড়িয়ে দু’দিকে পা বাড়ালো।

০১ তারিখে যথারীতি নতুন ফার্নিচার আসবাবপত্র নিয়ে দু’জন বাসায় উঠে পরলো। মাঝখানে অনেক সলা পরামর্শ ওরা করে নিয়েছে। ধীরে ধীরে লিভ টুগেদারের বিষয়টি ওদের দু’জনের কাছেই যৌক্তিকতার মাত্রা অতিক্রম করে প্রেমময়, মায়াময় এবং সৌহাদ্যপূর্ণসহ অবস্থানে রুপান্তরিত হলো। নানারকম হাসি-ঠাট্টা, হৈ হুল্লোর এবং খুনসুটির মধ্যে দিয়ে অতিক্রম হতে থাকলো মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।

হঠাৎ দু’জনের জীবনে নেমে এলো জমকালো অন্ধকারের অকল্পনীয় এক নতুন অধ্যায়। তৃষ্ণা বাসা ছেড়ে দিয়েছে অত্যন্ত গোপনে, এ ব্যাপারে অনিমেষকে কিছুই জানায়নি। ৩০ তারিখ ভোরে অনিমেষ বাজারের ব্যাগ হাতে বের হবে তখন তৃষ্ণা বললো- নানাবিধ সমস্যার কারণে বাসা ছেড়ে দিতে হয়েছে, আজ বাসা খালি করে দিতে হবে। ধপাস করে অনিমেষ মাথায় হাত দিয়ে খাটের কিনারায় বসে পড়লো।

  • কই আমাকে তো এ ব্যাপারে কিছুই বললে না? এখন এতো এতো ফার্নিচার নিয়ে কোথায় উঠবো। আমার বিষয়ের চেয়ে তোমার বিষয়টি বেশি করে ভাবছি।
  • আমাকে নিয়ে না ভাবলেও চলবে অনিমেষ। তুমি তোমাকে নিয়ে এবং তোমার মাল সামানা নিয়ে ভাবো।
  • আমাকে আগে জানালে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হতো। এতো এতো মাল সামানা নিয়ে আমি এখন কোথায় রাখবো।
  • মুখে মুখে তর্ক করো না। কোন সিনক্রিয়েটও করার চেষ্টা করো না। পান্থ পথে কিংবা পুরানা পল্টনে পুরাতন মাল প্রয়োজনে সেখানে নিয়ে কেজি দরে বিক্রি করে দিও।

  • অনিমেষের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লেও আর কথা বাড়ায় না সে। সোজা মাথা নিচু করে বাসা হতে বেড়িয়ে যায় ঠ্যালাগাড়ি, ভ্যান গাড়ির সন্ধানে। তার শরীরের মধ্যে সার্বক্ষণিক ভ‚মিকম্প চলছে। এটা কী করলো তৃষ্ণা? যাকে এতো বিশ্বাস করলাম সে কিনা আমাকে ঠেলে রাস্তায় ফেলে দিলো। বাড়িওয়ালাকে বলে বাসা ছেড়ে দিয়েছে এ কথাটি আমাকে আগে বললে কী সমস্য ছিলো? তৃষ্ণার সাথে একটানা বছর খানেকের উপর স্বামী-ন্ত্রী হিসেবে বসবাস করেও তাকে কিছুই বুঝতে পারলাম না। এমন কোন ঘটনাওতো ঘটেনি যে ও আমাকে নিয়ে এভাবে খেলতে পারে? নারীর মন বোঝা বড়ই কঠিন। আকাশের রং বুঝা যায় কিন্তু নারীর মন বোঝা বড় কঠিন। আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে রাস্তা পার হচ্ছে অনিমেষ। পিছন দিক থেকে একটি প্রাইভেটকার এসে অনিমেষের শরীরে আছড়ে পরলো। পুরোপুরি অজ্ঞান, ফিনকি দিয়ে বেরুচ্ছে রক্ত।

  • অপর দিকে তৃষ্ণা অনিমেষের সাথে কোন যোগাযোগ করতে না পেরে তিক্ত বিরক্ত হয়ে বাসা বদলকারীদের ফোন করলো, ক্ষণিকেই ওরা এসে হাজির। বাসার সমস্ত মালামাল নিয়ে বকশি বাজারের একটি বাসায় গিয়ে উঠলো। আলীসান বাড়ি। বাড়িওয়ালা থাকে দেশের বাইরে।

  • তৃষ্ণা এখন আগের চেয়ে সুখী। জৌলুস জীবনযাপন, চাকচিক্য যৌবনের বাহার। মানুষের চাওয়া-পাওয়ার শেষ নেই। তবু আপাত দৃষ্টিতে বাড়তি প্রণদনা জুটেছে তৃষ্ণার কপালে।
  • অপর দিকে মাস খানেকের ব্যবধানে সুস্থ্য হয়ে উঠেছে অনিমেষ। মাথায় আঘাত, ভাগ্যিস প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিল। মৃত্যুর সাথে পাঁঞ্জা লড়ে এ যাত্রায় জীবনে বেঁচে গেলেও বাম হাত আর বাম পা টা আংশিক অবস। খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটে। অনার্স ফাইনাল পরীক্ষাটাও তার কপালে জোটেনি। বাবা-মা জোড় করে নিয়ে গেছে গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরে। মাঝে মাঝে মন খারাপের গল্প লিখে, কবিতাও লেখে কম বেশি। সারাক্ষণ ঘরের এক কোনে বসে থাকে। মা-বাবার একমাত্র আদরের সন্তান। বাবার নিকট বায়না ধরতেই বাবা আর্ট করার রং তুলি বোর্ড সবকিছু কিনে দিয়েছে। প্রথম প্রথম মা অবশ্য বাঁধা দিয়ে বলেছিলো।
  • ব্রেনের আঘাত, এখনো ফুল রেস্টে থাকাই ভালো। কিন্তু অনিমেষের বাবা কোন কথাই শোনেনি। সন্তানের প্রশান্তিই তার চাওয়া পাওয়া। দিন, মাস, বছর পেরুতেই অনিমেষ আগের চেয়ে অনেকগুন সুস্থ্য। একা হাটা চলা করতে পারে। শুধু বাম হাতে ব্যবহৃত একটি ক্যাচ তার নিত্য সাথী। অমর একুশে গ্রন্থমেলা আগত প্রায়। এর মধ্যে বই প্রকাশ করার মতো কবিতাও লিখেছে অনিমেষ। বাবার নিকট বায়না ধরে, বাবা আমি একটি কবিতার বই প্রকাশ করতে চাই। অনেক কষ্ট বুকে চেপে বাবা রাজি হন। চাচাতো ভাই অরবিন্দুকে নিয়ে রওয়া হয় ঢাকার উদ্দেশ্যে। বাংলা বাজারের বিউটি বোডিং এ এসে উঠে, অনিমেষ আর অরবিন্দু। নাম করা একটি পাবলিকেন্স থেকে অনেক চেষ্টার পর একটি বইও প্রকাশিত হয়। বই এর নাম দেয় “কন্ট্রাক ম্যারেজ” বই মেলার সময় রমনাপার্কে রং তুলির আঁচড়ে ছবি আর্ট করে। ছেলে মেয়েদের উপচে পরা ভিড়। কেউ এসে হাতে, মুখে, কপালে আল্পনা অঙ্কন করায়। চারটি প্লাষ্টিকের চেয়ার কিনেছে। একটিতে অনিমেষ বসে কাজ করে, অন্যটিতে অরবিন্দু, বাকি দু’টির একটিতে যে পরবর্তী সিরিয়ালে থাকবে তাকে সিরিয়াল করে অরবিন্দু বসিয়ে রাখে। বাকি চেয়ারটিতে বসিয়ে বিভিন্ন রকম আল্পনা আঁকে মনের মাধুরী মিশিয়ে। এভাবেই বই মেলায় ব্যস্ত সময় পার করতে থাকে আরবিন্দু। বাম হাতে ভর রাখার ক্যাচটি তার কোন কাজেই বাঁধা হিসেবে এখন আর মনে হয় না। শুক্র-শনিবার অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়। কোন দিকে মনোযোগি হবার কোন সুযোগ নেই। মাথায় শুধু হরেক রকমের আল্পনা ঘুরপাক খেতে থাকে। এতে কিছু উপার্জনও হয়।

২১ শে ফেব্রুয়ারি, তিল ধারনের ঠাই নেই সমস্ত বই মেলার আঙ্গিনায়। এক জনের পর আর একজনের আল্পনা আঁকতে আঁকতে দর দর করে ঘাম চুইয়ে পড়ছে শরীর দিয়ে। ওদিকে দাড়িয়ে থাকা লাইনের বহরও বেড়েই চলছে। বোরকা পরিহীত একজন নারী অনেক সময় লাইনে দাড়িয়ে থেকে বিরক্ত হয়ে অরবিন্দুর নিকট সিরিয়ালটা আগে দেবার জন্য বিরক্তিকর অনুরোধ করছে। অরবিন্দুও মহা ব্যস্ত। লাইন সামলাবে, না টাকা নিবে, না সিরিয়ালের টোকেন দিবে। অরবিন্দু সারাশরীর এবং মুখমন্ডল আবৃত নারীর সিরিয়ালের টোকেন দেখে বললো- আপনি আর পাঁচ জনের পরে আসুন। বৈকালিক আলোক ছটায় গড়াগড়ি খাচ্ছে আকাশ। আর পৃথিবী ও লুকিয়ে পড়তে চাচ্ছে অন্ধকার গহ্বরে। আগের সিরিয়ালওয়ালারা তার জেদ এবং অনুনয়, বিনয়, আকুতি দেখে বললো- ঠিক আছে তাকেই আগে দিয়ে দেন, আমাদের কোন আপত্তি নেই। অরবিন্দু তবুও কেন যেনো রাজি হচ্ছে না। অনিমেষ একুশ দিনের কাজের ফাঁকে কোন কথা বলেনি। ইতোমধ্যে বইমেলার অঙ্কনলিল্পী হিসেবে সুনাম এবং সুখ্যাতি কুড়াতে সক্ষম হয়েছে। এই প্রথম কাজের ফাঁকে মুখ ফসকে বললো, “ঠিক আছে অরবিন্দু, সবাই যখন বলছে ম্যাডামকে দিয়ে দাও।” হাতের কাজ শেষ, বোরকা পরিহিত নারী এসে অনিমেষের মুখোমুখি বসলেন। অরবিন্দু জিজ্ঞোস করলো, “আপনি কী করাতে চান?” মেয়েটি ব্যাগ হাতে “কন্ট্রাক ম্যারেজ” কাব্যগ্রন্থটি বের করে এক টুকরো কাগজ এগিয়ে দিয়ে ডান হাতে পরিহিত হাত মোজা খুলে ফেললো। চিরকুটে লেখা অনুযায়ী অনিমেষ ডান হাতের তালুতে বইয়ের প্রচ্ছদ অঙ্কন করে লিখলো, “কন্ট্রাক ম্যারেজ” অনিমেষ। অনিমেষ ভেতরে ভেতরে খুব আনন্দিত হচ্ছে। তার লেখা কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ এবং নাম এক পর্দানশীন মেয়ের হাতে এঁকে দেয়ার চেয়ে আর কী বা স্বার্থকতা থাকতে পারে। ডান হাতের অঙ্কন শেষে বাম হাতের হাত মোজা খুলে দিয়ে আর একটি কাগজ তুলে দিলো। দ্বিধাহীন চিত্তে কাগজ খÐের লেখাটি অনিমেষ লিখলো। কাউকে কষ্টের অনলে পুড়ালে নিজেরও পুড়তে হয়- লেখক- অনিমেষ। এটি পড়ে আরো অবাক হলো, এতো অনিমেষের লেখা একটি কবিতার চরণ। লেখা শেষে অনিমেষ আবেগে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। অন্তরআত্মায় শিহরণ অনুভব হলেও সে শিল্পী হিসেবে পেশাদারিত্বের কাজ করে চলছে। মনে মনে ভাবছে এটাই আমার জীবনের পরম প্রাপ্তি। দুই হাতের লেখা শেষ হবার পর মেয়েটি মুখের বোরকা খুলে ফেলে বললো- আমার মুখে যতো ক্ষত চিহ্ন আছে, সব আমার প্রাপ্য ছিলো। আমি আমার অপকর্মের প্রাপ্ততা কড়ায় গোন্ডায় বুঝে পেয়েছি। হে মহান শিল্পী আপনি এবার আমার মুখের ক্ষতচিহ্নগুলো আপনার পবিত্র রং তুলির আচড়ে নিশ্চিহ্ন করে দিন। অবাক নির্বাক এবং হতভম্ভ অনিমেষের চোখ দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে জল। মেয়েটিও এতোক্ষণে ডুকরে কেঁদে উঠলো। ওদের কাণ্ড দেখে চারপাশে উচ্ছাসিত জনতার ভিড়। মুখের সব ক্ষতচিহ্নের উপর আল্পনা এঁকে দিলো কাঁপা কাঁপা হাতে। এরপর নারী মূর্তিটি উঠে দাঁড়ালো। ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকলো সামনের দিকে। পরের সিরিয়ালের একটি সুন্দরী বালিকা এসে বসলো অনিমেষের সামনে। অনিমেষ ক্রাচে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলো। বোরকা পরিহিত রমনী দৌড়ে এসে হাত ধরে ফেললো। উপস্থিত সবাই অবাক। অনিমেষ ক্ষিণ কণ্ঠে বললো- তৃষ্ণা। তোমার এ অবস্থা আমার ভাবনার জগতকে অতিক্রম করেছে। এতোক্ষণে বাকরুদ্ধ কণ্ঠে তৃষ্ণা বললো- আমার ন্যায্য হিস্যা আমি বুঝে পেয়েছি, এতে আমার কেবল মাত্র অনুশোচনার আগুনে জ¦লে পুড়ে ছাঁই হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই। আমার দুঃখ শুধু তোমার মতো একজন মানুষের জীবন আমি নষ্ট করে দিয়েছি। অনিমেষ বললো- আমরা কি অতীতকে ভুলে যেতে পারি না?

  • না। অতীতকে ইচ্ছে করলেই ভোলা যায় না। অতীত আনন্দের, অতীত বেদনার, অতীত হাসি কাঁন্নার নিত্য সাথী। ততক্ষণে রাগে অভিমানে পশ্চিম দিগন্তের লাল টুকটুকে সূর্যটা অন্ধকারের গ্রীবায় হাবুডুবু খেয়ে নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিলো।


Leave a Reply