মাহমুদ নোমান এর উপন্যাস "তামাশা" | Nobobarta
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी Italiano Italiano

ঢাকা   আজ বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২০, ৭:৩২ পূর্বাহ্ন

মাহমুদ নোমান এর উপন্যাস “তামাশা”
পর্ব – ১

মাহমুদ নোমান এর উপন্যাস “তামাশা”

মাহমুদ নোমান এর উপন্যাস "তামাশা"

Rudra Amin Books

সানজু হয়তো কাঁদছে…কান্নারচোটে চোখের সাথে সাথে নাক দিয়ে আসছে জল,এ বুঝি চোরাগর্ত দিয়ে নদীর জোয়ারের ঘোলা পানি আসছে। হৃদয়কান্নার এ এক মোজেজা। নাক টানছে,ছোটো ছোটো কান্নার ঢেউ তোলা ফুঁপানি সিয়ামের কানে শুধু নয়, বুকে বিঁধছে শূলময় তীরের মতো। এ কেমন প্রেম, এসবকি প্রেম..?
সিয়াম কলবলে এক যুবক ছিল। ইন্টার পরীক্ষাটা দিতে শহরে উঠল মেসে। কেননা ঘর ছিল তবুও যেন ঘর নয়। পড়ালেখার পরিবেশ নিজের সাথে বা পরিবারের সাথে বিভিন্ন পরিসরে বুঝিয়ে বা না বুঝিয়েও আনা যায়নি।
সিয়ামের বাবা প্রবাসী। তিনি নাকি সিয়ামের মাকে বিয়ে করার অনেক আগের থেকে বিদেশ গেলো,আর এখনো। এদেশে আসলে নাক ছিঁটকায়,মাস না ফিরতে আবার চলে যায়। কী এক নরপশু!
সিয়াম ছোটোকালে চিল্লায়ে কাঁদতো এয়ারপোর্টে, যখন তার বাবা বিদেশ চলে যেত। সিয়ামের কপালে জোরসে একটা চুমো দিয়ে ঢুকে যেত ঐ কাঁচের ঘরে। সিয়ামের মনে হতো সেটাই বুঝি পৃথিবীর একমাত্র স্বর্গ, নয়তো এতো আলোর ঝলমলানি কেন ওখানে!
বাবা প্রতিবারই মোছের কোণায় ডাকাতের মতো খানিক হেসে বলতো,ভালো থেকো,আসি…
মায়ের কালো বোরকা ও নেকাবের আড়াল থেকে চোখ দুটো হয়তো ভিজে, এসব পরোয়ানা জারি সিয়ামের মনে কখনো আলোড়ন তুলে না,বরঞ্চ খারাপ লাগতো কেন বাবা আসে…! আবার চলেও যায়,কেন সবার বাবা তো স্কুলে যায়,বাজার করে হাট থেকে আসে,থলের মধ্যে কতোকিছু থাকে। মনে হয় এটি পৃথিবীর সবচেয়ে স্বপ্নময় থলে। একদিন বাজার ফিরতি অন্য পাড়ার এক আংকেলের থলেটি ঝাপটে ধরেছিলো ছোট ছোট দুটি হাতে – আংকেল আসো,আংকেল আসো আমাদের ঘরে…
মায়ের বিস্ফোরিত চোখে লালময় মুখে বিভ্রান্তি ছড়াতে ছড়াতে যাচ্ছিল যখন,খুব ধমকে বলে উঠলো – এ বাবু,এমন অসভ্যতা করে না
কলারটা টেনে একটা ঠাস্ করে চড় দিল। পথচারী চেঁচিয়ে উঠলো – আহা,এমন করছেন কেন ভাবী…?
পথচারীটি কাছে এসে থলে থেকে একটি চাঁম কালো কলা বের করে হাতে দিল। মা বিরক্তির সাথে সেখান থেকে সিয়ামের হাতটি জেদের সাথে ধরে টানতে টানতে হাঁটা দিল।
একটু দূর হেঁটে এসে সিয়ামের হাতের কলাটি চিলের ছোঁ মারা মাংসের দলার মতো ফেলে দিল মা। চেঁচিয়ে নিজে নিজে বলতে লাগল – এতো খায়,তবুও রাক্ষুসের মতো করে। মর্,মরতে পারিস্ না…
সিয়ামের মাথায় কয়েকটা চটকানি দেয়,প্রতিবারে মাথা ঝুঁকে মাটিতে পড়বে এমন মনে হলেও পড়ে না। তবুও সেটা নিয়ে ভাবনা নেই, মায়ের সাথে কদম মিলিয়ে হাঁটে।
পথ চলতে রিমনের বাবা রিমনকে মোটরসাইকেল করে স্কুলে নিয়ে-আসা করে দেখে। কেমন যেন রিমনকে নায়কের ছেলে নায়ক ভাবতে শুরু করে। কী কপালটা না রিমনের!
মার্কেটের পূর্বে এসে মা নওয়াবের বাপের দোকানে ঢুকে। সিয়ামের কিছু শার্ট প্যান্ট কিনবে,অথচ মনটা বেঁকে আছে। অপমানবোধ হচ্ছে ছেলে কেমন করে অচেনা বেটার থলে টানে! দোকানের মালিক খুব পরিচত মানে এলাকারও এক লোক। তাঁর উঁচা পেটের প্রতিটা আঁতুড়িতে বুদ্ধি গিজগিজ করে আছে। এমনকি এক মন্ত্রী তার থেকে নাকি বুদ্ধি নিতে আসে। দোকানে ঢুকতে তিনি দাঁড়িয়ে মাকে সালাম দেয় – ভাবী,কেমন আছেন…?
মা একটু সৌজন্যবোধে নিজেকে শান্ত করে জবাব দেয় – ভালো,ভাই
হাঁফাতে হাঁফাতে কার্পু মাছের ঠোঁটের মতো করে জোরে নিশ্বাস ফেলে বলে – কিছু ভালো শার্ট প্যান্ট দেখানতো ছেলের জন্য…
মালিক মাথাটা এদিকওদিক করে সিয়ামকে খুঁজে নিয়ে বলে – এই আংকেল, কেমন আছো…?
সিয়ামের উত্তরের আগে মা বিরক্তি উগরে বলে – আর বলিয়েন না ভাই, বড় সমস্যায় আছি। লেখাপড়াতো নেই, ছাই… শুধু খাতাগুলো নষ্ট করে,দেখেনতো শার্ট প্যান্ট দেখে,কোনো লেখাপড়া করা ছেলের মতো লাগছে…? খাতাগুলোতে শুধু আঁকাআঁকি করে,এটার ওটার ছবি আঁকে…
সিয়াম মাথা নিচু করে থাকে। মালিক একটু হেসে উত্তর দেয় – ভাবী,এই তো প্রতিভা। ছেলের যেটাতে আগ্রহ তা করতে দেওয়া উচিত।
মায়ের এসবে কান নেই, শার্ট-প্যান্ট দেখে নিয়ে টাকা দিতে ব্যস্ত। সিয়ামের এই প্রথম অপমানবোধ হয়,মাথার মগজে টাং করে লাগে মায়ের জ্বালা যন্ত্রণার কথা। খাতায় ছবি আঁকাআঁকির কথা সিনেমার পর্দার মতো আলোর চিলিবিলি। প্রতিজ্ঞা করে নিজে নিজে – আর কখনো ছবি আঁকবে না,আর আঁকবে না কোনোকিছুই…
বাবার জন্য সিয়াম প্রতিবারে কাঁদে অথচ,সত্যি সত্যি কাঁদে যখন শোওয়ার বিছানায় বাবাকে পায় না। আবার কয়েকদিন পরে ভুলেও যায়।

০২.

সূর্যটার লালি একটু ফর্সা হতেই সিয়ামের মনটা কুঁকড়ে উঠে কিভাবে স্কুল মাঠে যাবে। মাঠের ঘাসগুলোও তার অনেক চেনা,ইচ্ছেমতো গড়াগড়ি দেয় যখন একটি বল আটকায়,ক্যাচ ধরে আর রান নিতে গিয়ে পিচের ধুলোমাখা হৃদয়ের পুরোটাতেই ক্রিকেট। রাতে ঘুমেও যাবে বলটি নিয়ে। দেয়ালে বলটি ছুঁড়ে মেরে মেরে শুয়ে শুয়ে বলটি ধরবে। বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়বে,হঠাৎ রাত একটু হতে ঠাস্ ঠাস্ এক গালে চড়, ঘুমের ঘোরে চোখ বন্ধতে গালটাতে ঢলতে ঢলতে আবার ঘুমিয়ে পরা। মা বিরক্তি নিয়ে চেঁচামেচি করে নিজে নিজে বলটি বুক থেকে কেড়ে নিয়ে চলে যায়।
খুব ভোরে আরবী পড়তে যাওয়ার আগে ফজরের নামাজ পড়ে নেওয়া বাধ্যতামূলক। নয়তো হুজুরের কাছে দশটি বেতের মার দুটি হাতের তালুতে। কান গরম হয়ে আসবে,চোখ থেকে অনবরত জল ঝরবে। সিয়ামের বড় দুই ভাই যখন মুখ ধুতে,ওজুতে ব্যস্ত,সিয়াম তখন বাসিমুখে বাম হাতটি ঘুরিয়ে চলে। যেন পেস বোলিংয়ে চাকিং না হয়। মুরব্বীদের কাছে শুনেছে,সকালে বাসিমুখে যেকোনো অসাধ্য কাজ করলে বশে আনা যায়।
রাস্তার খুঁটির বাতিগুলো তখনও পুকুরের জলে ঢেউ খেলছে,এসব ভালো করে না দেখে দৌড়ের উপর ওজু করে নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ে। নামাজ শেষে কুরআন পড়ার জন্য পাশের রুমে রেহেল বুকে চেপে গিয়ে নিজেরা পড়তে শুরু করে,নূরানি বাতাসে দুলে জানালার ঝটঝেট কাপড়টি।
আরবী পড়ার পর ঘরদোর ঝাড়ু দেওয়া,তৈলাক্ত বাসি -কালি ডেকসি ও বাসনকোসন গুলো ছাই দিয়ে ধানের খড়ে মেজে ঘষে ও চাল বাঁয়রে ধুয়ে চুলোর পাশে এনে দেওয়া সিয়ামের কাজ। মাঝেমাঝে হয়তো চুলোর জ্বাল দিতে হয়,যদিও মেজ ভাই অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কেননা মায়ের বলতে গেলে ৩৬৫ দিনই অসুখ। আর কোনো বোনও নেই। কারো বোন দেখলে কেমন যেন ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে। খাতির জমাতে চায় একবার যেন বোন ডাকা যায়। পাড়ার ময়না আপার কাছে সময়ে অসময়ে দৌড়ে যায়। কখনো হাতে পেয়ারা গাছ থেকে সদ্য পাড়া দুটো পেয়ারা,নয়তো একটা বার্মিজ বরই আচার। ময়না আপার পিছনে গিয়ে ডাক দেয় – আপা…
ময়না আপা কাজের মধ্য থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে উত্তর দেয়- সিয়াম আসলি ?
সিয়াম তড়িঘড়ি করে ময়না আপার কাছে গিয়ে হাতে গুঁজে দেয় বোনের জন্য আনা জিনিস – আপা ধরেন
ময়না আপা বরই আচার জিহ্বার টাক দিয়ে দিয়ে বিচিগুলো চুষে চুষে খায়। মাঝে মাঝে সিয়ামের একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকার এলোমেলো মাথার চুলে হাত বুলায়। আর মায়ের ডাক পড়লে পালায় সেখান থেকে।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অনলাইন নববার্তা-কে জানাতে ই-মেইল করুন- nobobarta@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

নাস্তা খেয়েছে বা না খেয়ে সকালের কাজগুলো সেরে ত্বরিত ডাল ছেঁড়া বইগুলো নিয়ে দৌড় মাঠের দিকে।
খেলার কোন সময়ে স্কুল ড্রেসের হয়তো বোতামের ঘর ছিঁড়লো নয়তো কাদা মাখামাখি, এভাবে ময়লা কাপড় নিয়ে স্কুলে ঢুকে পড়ে। হয়তো এসবের খেয়ালও থাকে না,উদ্ভ্রান্তের মতো দেখায়। স্কুলের জাকিয়া ম্যাডামের কানের জুরপি উল্টো ঢলে দেওয়া খুব বিরক্তিকর – আর এভাবে ময়লা কাপড়ে স্কুলে আসবি…? তোর মা-বাপ নেই…?
– এ্যঁ,ম্যাডাম। আর হবে না
ম্যাডাম পুনরায় ছেড়ে দিয়ে আবার ধরে। এবার সিয়ামের সত্যি সত্যি শ্যামলা মুখটি লাল হয়ে উঠে। নাক চেং মাছের ফুলকোর মতো ফুলছে। এক ঝটকায় ম্যাডামের হাতটি ঝেড়ে ফেলে। ম্যাডাম হতবিহ্বল। সিয়ামের চোখ দুটো পাগলা বিরিশের মতো হয়ে উঠলো,এসব দেখে ম্যাডাম ভড়কেই গেলো। এ মুহূর্তে ছুটির ঘন্টা বাজতে ক্লাস ছেড়ে যায় ম্যডাম।
স্কুল ছুটির পর সিয়ামের মাথা পাগলামি বেশিক্ষণ থাকে না,কেননা আজ বাংলাদেশের খেলা দেখাচ্ছে টিভিতে। অথচ ঘরে টিভি নেই, বাবা বিদেশ থাকলেও। ছোটোকাল থেকে শুনে আসছে,প্রথম প্রথম মায়ের বিয়ের পর বাবা নাকি শখ করে টিভি এনেছিল অথচ মা নাকি লাঠি দিয়ে টিভিটা চুরমার করে দিল! সে থেকে কারো সাহস নেই টিভি নিয়ে কথা বলবার,কিন্তু খেলা দেখালে সিয়ামের থর আর সয় না। সে পালিয়ে চুরি করে টিভি দেখতে যায় পাশের এক বাড়িতে,তাও জানলা দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। চার ছক্কা মারলে বা বাংলাদেশের কেউ উইকেট পেলে সে হাসতে বা হৈ চৈ করতে পারবে না এ শর্তে। আর ঘরের মধ্যে মালিকের ছেলেমেয়েরা যা আছে তাদের কটকটে হৈ হল্লোড়।

০৩.
সিয়ামরা হঠাৎ করে নয়া ভিটেয় এসে গেলো বলবো না,সিয়ামের এই বয়সে এসব খেয়াল করার কি সুযোগ আছে ? নয়া ভিটেয় দুই রুমের সেমি পাকা ঘর,অমরণী দিয়ে রাস্তার দিকে ঘেরা,বড় একটি পুকুর। সিয়ামের কষ্ট অন্য এক সূক্ষ্ম জায়গাতে অর্থ্যাৎ ময়না আপাকে হারানোর। অথচ ময়না আপাকে হারিয়েছে সে কবে। একদিন দুপুরবেলা ভাত খেয়ে যখন একটু বিছানায় গড়গড়া খাচ্ছে সবাই, তখন হেমন্তের পরে গা -টানা দিন। একটি ঢিল মেরেছিল ময়না আপাদের বরই গাছে। হতে পারে এটাও করতে চায়নি,হয়তো করে ফেলেছে ময়না আপাকে একটু দেখবে বলে,সকাল থেকে কথা হয়নি। ময়না আপার মা বের হয়ে সে কি গালিগালাজ – ঐ খানকির পুত,তোর বাপের গাছ নাকি…? যখন তখন ঢিল মারিস…? মানুষকে ঘুমাতেও দিবি না,কী কুকুরের বাচ্চা কুকুর!
ময়না আপা মায়ের পিছে এসে দাঁড়িয়েছে অথচ কিছু বলেনি। এতে সিয়ামের অপমান দ্বিগুণ হলো। আরো মাথার মধ্যে এটুকু ঢুকলো যে,যখন তখন ও তাহলে ঢিল মারে বরই গাছে…! তাহলে সব গ্লানি নিজের কাঁধে তুলে নিলো ?
সিয়াম মাথা নিচু করে সেখান থেকে খেলার মাঠে চলে গেল। অথচ খেলায় মন নেই, মাঠের এককোণায় বসে আছে। সেদিন থেকে আর ময়না আপার চোখের দিকেও তাকায়নি। অথচ মনের মধ্যে চোরাটানে বারবার কান্নার মৃদু গুঞ্জন; একদিন বিকেল পেরুতে পাড়ার একেবারে রাস্তার মাথায় বিয়ের গেট বানানো হলো। পাঁচ তলা বিয়ের গেট। ময়না আপাদের উঠোন পর্যন্ত সারি সারি মরিচা বাতির ঝিলিকমিলিক সন্ধ্যা হতেই শুরু হয়ে গেল। রাতে আশিক বানায়া,ধুম মাচালে হিন্দি গানের তালে তালে পাড়ার যুবক যুবতী উঠোনের ধূলা উড়াধুড়া করলো। প্লাস্টিকের কয়েকটি চেয়ার বিপন্ন ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লো সকাল সকাল যখন আজান দেওয়া হচ্ছে মসজিদে। হঠাৎ গান বাজনা,কোমর দোলানো বন্ধ হয়ে গেলো দোলানো থেকে। ভোরের আলো ফুটতেই পানার ডোবায় জবাইকৃত গরুর নাড়িভুড়ি নিয়ে কাকদের কা কা। কী অসীম জেদে লাকরি পুড়ছে আন্ডি ডেকসিগুলোর নিচে। আগুনের কী লকলকে জিহ্বা!দুপুর গড়াতে সিয়ামের মা অনেক বুঝালো – কাল রাতে মেহেদি অনুষ্ঠানে গেলি না,ঠিক আছে। আয়,এখন বিয়ের ভাতটুকু খেয়ে আয়।
– না,আমি যাবো না
– কেন! খুব তো খাতির ছিলো
– না,আমি যাবো না বলছি
– ঘরে ভাত রান্না হয়নি,খাবি কোথায়…?
সিয়াম হঠাৎ জেদ করে সেখান থেকে দৌড়ের মতো বিলের দিকে ছুটে গেলো। মরিচ খেতির আলে বসে ইচ্ছেমতোন কাঁদল। অযথা বাম হাতে ঢিল ছুঁড়োছুঁড়ি করলো অজানা উদ্দেশ্যে খুব জেদে।
সেদিন সন্ধ্যা হওয়ার পর ঢলেঢলে ঘরে ঢুকতে,ময়না আপার বিয়ের গাড়িটা রাস্তা পেরিয়ে গেল। পাড়াময় শান্ত, হঠাৎ হৈ চৈ এর পরে এমন পরিবেশ প্রশান্তি আনলেও সিয়ামের মনে এসবের ছিঁটেফোঁটাও নেই। কেবল এক বিষন্নতার ঘোর হৃদয়ে ঘুরপাক খায়। গতকালের আনন্দময় মরিচা বাতিগুলো যেন আজ বেদনার্ত।
নয়া ভিটের গন্ধটা অন্যরকম। একটু রাঙা মাটি স্নিগ্ধরুচির বিলের ফুরফুরে বাতাসে মনকে পবিত্র করে তুলে অথচ মনটা কেমন দুলে থাকে,দুলতেই থাকে। হয়তো এটা পুরনো স্থান ফেলে আসার নীরব কান্না; ছোট ছোট লাগানো গাছগুলো অথচ কলাগাছ তেড়ে উঠলো। আর অনেকটাতে কলার তোড় আসলো,কলা ধরলো। কয়েকটি পাকা কলায় শালিকে ঠুকরাচ্ছে। বিভিন্ন পাখির কিচিরমিচির, মৃদু কলহ বড়ই ভালো লাগে। পুকুরে,বিলে যত্রতত্র একটু পানি থাকলেই চিংড়ি মাছের অফুরান্ত ভাণ্ডার। একটু পানি ঘোলা করলেই চিংড়ি মাছের শূম ভাসিয়ে দেয় যখন জীর্ণ হৃদয়টাও কলবলে হয়ে উঠে। আর বকের মতো হাত দিয়ে একটা একটা ধরা,বড় গলদা চিংড়িতে ডুলা ভরাচ্ছে সিয়ামের চাচা। লুই জালের হাতা চিবা দিয়ে আটকিয়ে গামলা দিয়ে পানি সেচছে। সিয়াম লাফিয়ে লাফিয়ে ফড়িংয়ের মতো গলদা চিংড়ি ধরছে আর একটু ছোট হলে ফেলে দিচ্ছে যেন এসব মাছও না। হঠাৎ একটা নীলচে,গোঁয়ারা জমা বড় টেংওয়ালা গলদা চিংড়ি সিয়ামের বাম হাতে কামড়ে ধরেছে। সিয়াম ‘ও বাবা ও বাবা’ করে চিল্লাচ্ছে আর তার চাচা সেদিক চেয়েও আসেনি। একটু বিচলিত হওয়ার কোনো ভাবও দেখায়নি! ওনি পাড়ে ওঠে বারবার লুঙ্গি উল্টিয়ে প্রস্রাব করতে ব্যস্ত। মনে হচ্ছে ওনি চাপিয়ে চাপিয়ে,হুঁতহাত করে প্রস্রাব করছে বা করতে চাচ্ছে, চোখেমুখে বিষন্নতার খুব ছাপ। সিয়াম জীবনে চাচাকে এমন করুণ, অসহায় মুখে দেখে নি আর। চিংড়িমাছটি কোনোমতে ছাড়িয়ে দৌড়ে চাচার কাছে গেল – বাবা,কি হলো…? ও বাবা,কি হলো ?
চাচার কোনো সাড়াশব্দ নেই। যেন কতক্ষণ পরে ওনি মারা যাবে,এমনভাবে কোমর বাঁকিয়ে সিয়ামকে উত্তর না দিয়ে বারবার প্রস্রাব করতে বসছে আর দাঁড়াচ্ছে – শালা,বেরুচ্ছে না
– কি…? বাবা!
– ও আমি শেষ
অধৈর্য হয়ে গেল চাচা,নিশ্চিত পরাজয় মেনে নিল যেন। নিজে নিজে পরখ করছে হয়তো কোনো জিনিসকে। কাঁদতে চেয়েও কান্না আসছে না,কী অদ্ভূদ অসহায়! হঠাৎ বিড়িটা মুখ থেকে নিয়ে যুদ্ধ জয়ের স্মিত হাসি,প্রশান্তির হাসি। সিয়াম অজানা খুশির কথা জানতে চায়- চাচা,ও চাচা কি…?
– শালার জোঁক
সিয়ামেরও এতোক্ষণ পর শান্তি নেমে এল। নিশ্বাস ফেলল। যাক বাঁচা হলো বিপদ থেকে, তবে সিয়াম জানে না কিভাবে জোঁকটি বেরুলো! এটাও হয়তো বিস্ময়!


[বিঃদ্রঃ মাহমুদ নোমান এর উপন্যাস “তামাশা” প্রকাশিত হবে প্রতি বৃহস্প্রতিবার সন্ধ্যে ছয়টা। নববার্তা.কম এর পাঠকদের অনুরোধ করছি উপন্যাসটি পড়ুন এবং মন্তব্য করুন]


Leave a Reply

নববার্তা ফেসবুক পেজে আলোচিত সংবাদ

১৪ দলের নতুন মুখপাত্র প্রত্যাশা ড.মহীউদ্দীন খান আলমগীর১৪ দলের নতুন মুখপাত্র প্রত্যাশা ড.মহীউদ্দীন খান আলমগীর3K Total Shares
রেড জোনের আওতায় মানিকগঞ্জ জেলারেড জোনের আওতায় মানিকগঞ্জ জেলা2K Total Shares
ঘিওর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আইরিন আক্তারসহ  করোনায় আক্রান্ত ১০ঘিওর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আইরিন আক্তারসহ করোনায় আক্রান্ত ১০2K Total Shares
ঘিওর উপজেলাবাসীকে ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানালেন অধ্যক্ষ হাবিবঘিওর উপজেলাবাসীকে ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানালেন অধ্যক্ষ হাবিব2K Total Shares
ঘিওরের ইউএনও আইরিন আক্তারের করোনা জয়ের গল্পঘিওরের ইউএনও আইরিন আক্তারের করোনা জয়ের গল্প1K Total Shares
মানিকগঞ্জে বিএনপির অসহায় নেতাকর্মীদের মাঝে তারেক রহমানের ঈদ উপহার তুলে দিলেন – এস এ জিন্নাহ কবিরমানিকগঞ্জে বিএনপির অসহায় নেতাকর্মীদের মাঝে তারেক রহমানের ঈদ উপহার তুলে দিলেন – এস এ জিন্নাহ কবির1K Total Shares
ব্রীজ ভেঙে ভোগান্তিতে হিজুলিয়া গ্রামবাসীব্রীজ ভেঙে ভোগান্তিতে হিজুলিয়া গ্রামবাসী1K Total Shares
মানিকগঞ্জে পৌর বিএনপির নেতাদের হাতে ঈদ উপহার শাড়ি লুঙ্গি তুলে দিলেন এ্যাডঃ জামিল ও এস এ জিন্নাহমানিকগঞ্জে পৌর বিএনপির নেতাদের হাতে ঈদ উপহার শাড়ি লুঙ্গি তুলে দিলেন এ্যাডঃ জামিল ও এস এ জিন্নাহ1K Total Shares





Nobobarta © 2020 । About Contact Privacy-PolicyAdsFamily
Developed By Nobobarta