আমি ধর্মে বিশ্বাস করি না : তসলিমা নাসরিন | Nobobarta

আজ মঙ্গলবার, ০২ Jun ২০২০, ০৪:৪৮ পূর্বাহ্ন

আমি ধর্মে বিশ্বাস করি না : তসলিমা নাসরিন

আমি ধর্মে বিশ্বাস করি না : তসলিমা নাসরিন

Rudra Amin Books

*আমার দাদা সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করত, কবিতা লিখত। দেখে দেখে আমিও ১৩ বছর বয়স থেকে কবিতা লিখতে শুরু করি। আরেকটু বড় হয়ে আমিও সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করি। এইভাবেই বিজ্ঞানের ছাত্রী শিল্প সাহিত্যের মধ্যে সময় এবং সুযোগ পেলেই ডুবে যেতাম। বইপোকা বলে সুনাম বা দু’র্নাম ছিল ছোটবেলা থেকেই। মেডিক্যাল কলেজে একসময় পড়ার চাপ এত বেশি বেড়ে গিয়েছিল যে আমাকে সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশনা স্থগিত রাখতে হয়েছিল। ডাক্তার হওয়ার পর, হাসপাতালের চাকরির ব্যস্ততার মধ্যেও লিখতে থাকলাম কবিতা প্রবন্ধ, গল্প উপন্যাস। সেগুলো বই হয়ে বেরোতে লাগলো।

*নিয়মিত কলাম ছাপা হতে লাগলো জাতীয় সাপ্তাহিকগুলোয়। লেখাগুলো প্রচন্ড জনপ্রিয় ছিল, বইও ছিল বেস্ট সেলার লিস্টে, কিন্তু নারীর সমানাধিকারের পক্ষে আমার লেখাগুলো বাংলাদেশের নারীবি’দ্বেষী সমাজের কর্তারা অবশ্য ভালো চোখে দেখলেন না। সব ধর্মই নারীর সমানাধিকারের বিরুদ্ধে-এ কথা লিখেছি বলে সব ধর্মের ঘোর বিশ্বাসীরা আমার ওপর ভীষণ ক্ষু’ব্ধ হয়ে উঠলো। ইসলামের সমালোচনা করেছি বলে মুসলিম মৌলবাদীরা সারা দেশে আমার ফাঁ’সি চেয়ে বড় বড় মিছিল মিটিং শুরু করলো। মোল্লা মুফতিরা আমার মাথার দাম ঘোষণা করতে শুরু করলো। রাজনৈতিক দলগুলো আমার পাশে না দাঁড়িয়ে দাঁড়ালো নারীবি’দ্বেষী মোল্লা মৌলভীদের পাশে।

*সমাজের মানবাধিকার সংগঠনগুলো, এমনকি নারীবাদী দলগুলোও চুপ হয়ে রইলো। এমন সময় সরকার আমার বিরুদ্ধে ব্লাস’ফেমির মামলা করলেন। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলো। জীবন বাঁচাতে আমাকে দু মাস লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল। দেশের আনাচে কানাচে পুলিশ আমাকে খুঁজছে, মোল্লারা আমাকে খুুঁজছে মে’রে ফেলার জন্য। সে সব ভ’য়াবহ দিনগুলোর কথা ভাবলে এখনও শিউরে উঠি। শেষ অবধি ১৯৯৪ সালের ৮ আগস্ট বাংলাদেশ সরকার আমাকে বের করে দেয় দেশ থেকে।

*সেই থেকে পড়ে আছি দেশের বাইরে। আজ ২৫ বছর পার হলো। জীবন এভাবেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই বিদেশ বিভুঁইয়ে একদিন মরে পড়ে থাকবো। যখন দেশ থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল আমাকে, আমি কল্পনাও করতে পারিনি ওই যাওয়াই আমার শেষ যাওয়া। আমি কল্পনাও করতে পারিনি, দেশের কোনও সরকারই আমাকে আর কোনও দিনই দেশে ফিরতে দেবে না। ধীরে ধীরে আমার কাছের মানুষগুলো এক এক করে ম’রে যাবে, আমার মা, আমার বাবা, আমার নানি, প্রিয় খালারা, প্রিয় মামারা, আমার দাদারা, আমার শিক্ষকেরা, যাদের ভালবাসতাম, শ্রদ্ধা করতাম। আমি কল্পনাও করতে পারিনি আমি কারো কাছে একটিবারের জন্যও যেতে পারবো না। কাউকে শেষবারের মতো দেখতে পাবো না।

*নির্বাসিত জীবনে কত কিছু ঘটেছে। পশ্চিম ইউরোপ আমাকে নিয়ে এক যুগ উৎসব করেছে। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিয়েছে, নাগরিকত্ব দিয়েছে, মান মর্যাদা দিয়েছে। যেখানেই গিয়েছি, আমাকে দেখার জন্য, আমার কথা শোনার জন্য উপচে পড়েছে মানুষ। বিভিন্ন দেশের প্রকাশকেরা আমার বই বিভিন্ন ভাষায় ছাপিয়েছেন। এত নাম এত খ্যাতি,- কিন্তু সব ছেড়ে আমি দেশে ফিরতে চেয়েছি। দেশের দরজা বন্ধ বলে এক সময় ভারতের পশ্চিমবংগে বাস করতে শুরু করেছি। কিন্তু রাজনীতি আমাকে বাধ্য করেছে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, ভারত ত্যাগ করতে।

*এই যে আমাকে তাড়ানো হয় দেশ থেকে, রাজ্য থেকে, শহর থেকে, পাড়া থেকে, ঘর থেকে- ২৫ বছরে আজও পায়ের তলায় মাটি নেই- তারপরও কিন্তু আমি দমে যাইনি, হতাশায় ভেঙে পড়িনি। যতবারই আমাকে লাথি মা’রা হয়েছে, ততবারই উঠে দাঁড়িয়েছি। মুক্তচিন্তার জন্য, মানবাধিকারের জন্য আমার সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছি। শত দুঃসময়েও আমি এক চুল বিচ্যুত হইনি আমার আদর্শ থেকে। আমাকে একটা ‘ইসলাম বিরোধী’ ট্যাগ দিয়ে ধুরন্ধর রাজনীতিকরা রাজনীতি করেছেন আমাকে নিয়ে। আমি যে মানবতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছি, সে কথা বলতে অনেকের আপত্তি। মানবাধিকারের পক্ষে লেখা আমার পাঁচটি বই বাংলাদেশ সরকার নি’ষিদ্ধ করেছে। বই নিষি’দ্ধের বিরুদ্ধে, বাক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে একটি লোকও মুখ খোলে না দেশটিতে। দেশটি ক্রমে ক্রমে ইসলামী মৌলবাদী দেশ হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের সরকারও নি’ষিদ্ধ করেছিল একটি বই। নিষে’ধাজ্ঞার দুবছর পর সেটিকে অবশ্য হাইকোর্ট মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, নিষে’ধাজ্ঞা কেন জারি করেছিল সরকার? কাউকে কি মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে দেওয়া হবে না?

*আমি ইউরোপের নাগরিক হয়েও, আমেরিকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েও ভারতকে বেছে নিয়েছি বাস করার জন্য। আমি ধর্মে বিশ্বাস করি না, তাই ধর্মের কারণে হওয়া ভারত ভাগেও আমার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। ভারতকে নিজের দেশ ভাবতে আমার কোনও অসুবিধে হয় না। আমি তো ভারতেরই অনেকগুলো ভাষার একটি ভাষায় লিখি, কথা বলি। যেখানেই বাস করি, নারীর সমানাধিকারের জন্য জীবনের শেষদিন পর্যন্ত লিখে যাবো, গণতন্ত্রের পক্ষে, বাক স্বাধীনতার পক্ষে, বৈষম্যহীন সুস্থ সুন্দর সমাজ গড়ার জন্য লিখে যাবো, মানবতার জন্য লিখে যাবো, নির্যা’তনের বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, অন্যা’য় অত্যা’চারের বিরুদ্ধে সরব হবো। এতে আমার মাথায় চাপাতির কো’প পড়বে তো, পড়ুক।

*২৫ বছর নির্বাসনে আছি। কী দোষ করেছিলাম আমি? মানবতার পক্ষে লেখালেখি করেছি এটিই আমার দোষ। শুধু কি তাই! এখনও ফতোয়া দেওয়া হয়, এখনও হুম’কি আসে, এখনও পায়ের তলার মাটি সরে যায়! আর কত অনিশ্চয়তা, আর কত দু’র্ভোগ পোহাতে হবে আমাকে? আসলে বেশ বুঝি, পৃথিবীর কোনও দেশই আমার দেশ নয়। আমার ভাষাটিই আমার দেশ, যে ভাষায় আমি কথা বলি, লিখি। আমার কাছ থেকে আমার যা কিছু ছিল, ধন-দৌলত সব কেড়ে নেওয়া হলো, ভাষাটি আশা করছি কেউ চাইলেও কেড়ে নিতে পারবে না।

*২৫ বছর দীর্ঘ সময়। নির্বাসনই শুধু নয়, বই নি’ষিদ্ধই শুধু নয়, নিজেও নি’ষিদ্ধ হয়েছি ভারতের বিভিন্ন শহরে আর রাজ্যে, শারীরিক হাম’লা হয়েছে আমার ওপর, মানসিক তো অহর্নিশি হচ্ছেই। আমাকে গৃহবন্দি করা হয়েছে, আমাকে বয়কট করা হয়েছে, কালো তালিকা-ভুক্ত করা হয়েছে। আমার মাথার দাম একবার নয়, বহুবার ঘোষণা করা হয়েছে। আমার লেখা ছাপানো বন্ধ করেছে মিডিয়ার বড় একটি অংশ, সাংঘাতিকভাবে সেন্সরের শিকার হয়েছি, পলিটিক্যাল মার্ডারের শি’কার হতে হতে বেঁচে গিয়েছি।

*সোজা কথা, সুতোর ওপর বিপজ্জনক হাঁটা হাঁটছি। তারপরও এই ভারতেই থাকবো বলে পণ করেছি। কারণ ভারত অন্তত বলতে পারবে, বাক স্বাধীনতার মর্যাদা উপমহাদেশের একটি দেশ হলেও দেয়। ভারত ভিন্ন মতকে ফাঁ’সি দেয় না, জেলেও পোরে না, বরং নিরাপত্তা দেয়। সত্যিকার গণতন্ত্র তো একেই বলে।

লেখক: নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.






Nobobarta © 2020 । About Contact Privacy-PolicyAdsFamily
Developed By Nobobarta