ঘিওরের ইউএনও আইরিন আক্তারের করোনা জয়ের গল্প | Nobobarta

আজ বৃহস্পতিবার, ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১লা অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৩:৫২মি:

ঘিওরের ইউএনও আইরিন আক্তারের করোনা জয়ের গল্প

ঘিওরের ইউএনও আইরিন আক্তারের করোনা জয়ের গল্প

করোনা থেকে বাঁচতে ভাইরাসটির যুদ্ধ করে যাচ্ছে পুরো বিশ্ব। করোনা আক্রান্ত নতুন রোগীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি তারা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। তাই করোনায় একটু স্বস্তিতে থাকতে মানুষ আশার কথা শুনতে চায়। বলবো, ঘিওর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আইরিন আক্তার ও তার আড়াই বছরের শিশু কন্যা করোনা থেকে বেঁচে ফেরার গল্প।

গত (২২ মে বৃহস্পতিবার) কয়েকদিন ধরে ঠাণ্ডা জ্বর অনুভব করলে নিজ উদ্যোগে মা-মেয়ে দুজনেই করোনা টেস্ট করান। এরপর গত ২৪মে তার শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। করোনা যুদ্ধে জয়ী হতে আক্রান্ত দিনগুলো কেমন ছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,

আমার সাথে সাথে আমার আড়াই বছরের শিশুটি যেদিন (কোভিড-১৯) এ আক্রান্ত হয়েছিলো, সেদিন কিছুটা হলেও শংকিত ছিলাম। মা মেয়ের কোভিড-১৯ এর পজিটিভ ফলাফল দেখে জেলা প্রশাসক, মানিকগঞ্জ স্যারকে প্রথম ফোন করি। স্যার, সাহস দিলেন, শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিলেন, আইসোলেশনে থাকতে বললেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিলেন।ফোন রেখে শুধু ভাবছিলাম, এইটুকু শিশুকে ঘরের মধ্যে ১৪ দিন কিভাবে আটকে রাখবো! মানিকগঞ্জ-১ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য মহোদয়কে তার পরের ফোনটা করি এবং কোভিড-১৯ টেস্ট করানোর অনুরোধ করি।

কারণ পজিটিভ রেজাল্ট আসার কিছুক্ষণ আগেও মাননীয় সংসদ সদস্য মহোদয়ের সাথে একটি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করি। আগামী ১৪ দিন ত্রাণ বিতরণ, সরকারি বিভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়ন, দাপ্তরিক কার্যক্রম, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তদারকি বাসায় বসে কিভাবে করবো, এরকম অদ্ভুত চিন্তা একটার পর একটা মাথায় আসতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যে এখবর উপজেলার গন্ডি পেরিয়ে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, বাংলাদেশ এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস এসোসিয়েশনের অনেক সিনিয়র স্যারগণ, পরিচিত পরিমন্ডলের অনেকেই ফোন করেন কিন্তু ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক যার অধিকাংশ ফোনই রিসিভ করিনি।

আমার শ্বাশুড়ি মা প্রতিবেশীর কাছ থেকে জানতে পারেন তার ছেলের বউ করোনায় আক্রান্ত। আমার মা নিউজ দেখে জানতে পারে। দুজনই এখবর জেনে খুব ভেঙ্গে পড়েন। নিজে যতটা না করোনা পজিটিভ হয়ে বিচলিত হয়েছি, তার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন আর দুশ্চিন্তায় ছিলেন আমার পরিবারের সদস্যরা। স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করে আমার আর আমার বাচ্চার বিচ্ছিন্ন পৃথিবীতে আমার স্বামী স্বেচ্ছায় আমাদের সঙ্গী হলেন। “বাঁচলে একসাথে বাঁচবো, মরলে একসাথে মরবো” তার এই কথাটিতে আমি তাকে আরেকবার নতুন করে চিনি।

Rudra Amin Books

এই কয়টি দিনে সে যেভাবে আমাদের সেবাশুশ্রূষা করেছে, তা আমার কাছে একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিলো। আমাদের অনেক শ্রদ্ধাভাজন সিনিয়র স্যার সামাজিক দুরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাকে আমাদের (করোনা পজিটিভ) পাশে থাকার পরামর্শ দেন। কিন্তু আমার বাচ্চাকে সামাজিক দুরত্ব, আইসোলেশন বুঝানোর কোন উপায় আমাদের জানা ছিলোনা। সে বাবা মা দুজনকে একসাথে পেয়ে একা একা আইসোলেশনে থাকার কষ্টটা একটুও বুঝতে পারেনি, বরং সে বেশ হাসিখুশিই ছিলো, দুষ্টুমি আগের চেয়ে আরো বেড়ে গেছে। ওর জীবনে এতো দীর্ঘসময় বাবামাকে নিবিড়ভাবে পাওয়ার সুযোগ খুব কমই এসেছে।

যেদিন আমার করোনা পজিটিভ রেজাল্ট আসলো, সেদিন রাতেই আমার সকল স্টাফদের শিবালয় উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোভিড-১৯ টেস্টের জন্য স্যাম্পল দেয়া হয়।এর পরদিন আমার এক স্টাফ অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে অফিসে আসেনি; আমার বাসায় যে মেয়েটি আমার বাচ্চাকে দেখাশুনা করতো, তাকে তার শ্বশুর বাড়ির লোক আটকে রেখেছিলো; আরেকজন যিনি রান্না করে আমাদের এই দুঃসময়ে সকল বাঁধা উপেক্ষা করে আমাদের পাশে ছিলেন, তার বর তাকে একদিন আচ্ছা করে বকা দিচ্ছিল যা দোতলা থেকে আমি স্বচক্ষে দেখতে পাই। ত্রাণের জন্য সকাল থেকে বাংলোর গেইটে ভীড় করা সেই জনগোষ্ঠীকে আর দেখা গেলো না। উপজেলা পরিষদের কোন পরিবারকেও বাইরে দেখা গেলো না।

চারদিকে সুনসান নীরবতা। যেখানে জীবনমরণের প্রশ্ন আসে, সেখানে মানুষের এই আচরণগত পরিবর্তনটা বেশ স্বাভাবিক হিসেবেই ধরে নিলাম। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া যারা করোনা ভয়ে ভীতু ছিল, তাদের প্রত্যেকের কোভিড-১৯ এর ফলাফল নেগেটিভ। জেলা প্রশাসন, আইনশৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা উপহার পেলাম। জেলা প্রশাসনের “তোমার সুস্থতা ও শুভ কামনায় সর্বদা পাশে আছি” স্টিকার দেখে সত্যি খুব মন ভালো হয়ে গিয়েছিলো। ঘিওর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের UHFPO Shwomen Chowdhury, মানিকগঞ্জ এর Dr. Rajib Shahriar এবং পিজি হাসপাতালের ডা. মেহেদী প্রথম দিন থেকেই পথ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন হেলথ টিপস দিয়ে এসেছেন এবং সবসময় খোঁজখবর রেখেছেন।

ছোটবেলা থেকেই এজমা থাকায় এটিকে কখনো পাত্তা দেইনি, কিন্তু করোনার সময়ে এসে এজমা যে খুব ছোটখাটো অসুখ নয় তা আমায় খুব ভালোভাবে বুঝিয়েছে। আইসোলেশনের বারোতম দিনে দ্বিতীয় বারের মতো স্যাম্পল দিলাম, চৌদ্দতম দিনে রেজাল্ট নেগেটিভ আসলো। মুক্ত পৃথিবীতে পদার্পণের লক্ষ্যে গাড়ি নিয়ে উপজেলার সার্বিক পরিস্থিতি দেখতে বের হলাম। রাত তখন ৮টা। সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। আমার আজকের থাকা না থাকায় এই পৃথিবীর কিচ্ছু যায় আসেনা।

করোনা আক্রান্ত সংখ্যা থেকে পরিণত সংখ্যায় রুপান্তরিত না হয়ে সংখ্যার বাইরে আসার সক্ষমতায় আজ সত্যিই নিজেকে খুব মুক্ত মনে হচ্ছে। বাইপাস সড়কের নতুন ব্রীজ থেকে আকাশের পানে তাকাতেই অনেক বাতিযুক্ত ঘুড়ি চোখে পড়লো, রাতের আকাশে এক একটি ঘুড়িকে তখন এক একটি তারা মনে হচ্ছিল। জীবনবোধের জায়গা থেকে আমরা প্রত্যেকেই এক একটি ঘুড়ি যেখানে ঘুড়িতে টান পড়লে নাটাইয়ের কারিগরকে সব থেকে বেশি মনে পড়ে, যার ইচ্ছায় আমরা পৃথিবীতে বিচরণ করে বেড়াচ্ছি। অশেষ কৃতজ্ঞতা মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি যার অশেষ কৃপায় এযাত্রায় আমরা বেঁচে ফিরেছি।

বাংলাদেশ এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস এসোসিয়েশনের সম্মানিত সভাপতি ও মহাসচিব স্যার, মানিকগঞ্জ জেলার জেলা প্রশাসক স্যারসহ জেলা প্রশাসনের সকল সদস্যবৃন্দ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক Mosharrof Hossain স্যার, সায়লা ফারজানা স্যার, ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক Ferdous Khan স্যার, S.m. Khurshid Ul Alam স্যার, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনাব আমিনুল ইসলাম খান স্যার, Shafiqul Islam Manik স্যার, ভাবীবৃন্দ, আমার সকল ব্যাচমেট, সকল সহকর্মী, ঘিওর থানার অফিসার ইনচার্জ, Dr. Rajib Shahriar, UHFPO, ডা. মেহেদী, ইউনিভার্সিটির শিক্ষকবৃন্দ, বন্ধুগণ, সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিগণ, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ, আমার সকল শুভাকাঙ্ক্ষী এবং কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা এই সংকটময় সময়ে আমার মনোবল বৃদ্ধিতে সাহস দেয়ার জন্য।

বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই মানিকগঞ্জ – ১ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব এ, এম, নাঈমুর রহমান দুর্জয় মহোদয় এবং ঘিওর উপজেলা পরিষদের উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়কে। সর্বোপরি, ঘিওরের সাধারণ মানুষের প্রতি আমার বিশেষ কৃতজ্ঞতা। করোনায় আক্রান্ত না হলে হয়তো আমার প্রতি আপনাদের এতোটা আস্থা আর ভালোবাসার এভাবে বহিঃপ্রকাশ ঘটতো না।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

সংরক্ষণাগার

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
Nobobarta © 2020 । About Contact Privacy-PolicyAdsFamily
Developed By Nobobarta