মানবতার কল্যানে বিডিএস'র এক দশক | Nobobarta

মানবতার কল্যানে বিডিএস’র এক দশক

আবিদ হাসান জুয়েল, গফরগাঁও প্রতিনিধি : লেখাপড়া শেষ করে সবেমাত্র একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের আমিনুল ইসলাম খাঁন। এক ঘটনার পর তাঁকে পেয়ে বসে ব্যতিক্রমী এক নেশায়। মানুষের জীবন বাঁচাতে রক্ত জোগাড় করে দেওয়। যেই কথা, সেই কাজ। একদিন এক আড্ডায় এলাকার ভাই বন্ধুদের সাথে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। এতে তাঁদেরও বেশ সাড়া মেলে।

সেদিনের সেই আড্ডাতেই ‘ব্লাড ডোনেশন সোসাইটি-২০১০'(বিডিএস) নাম স্থির করে কাজে লেগে পড়ে তাঁরা। গত এক দশকে পনেরো হাজারের বেশি রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছে ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁওয়ের অনলাইন ভিত্তিক এই সেচ্ছাসেবী সংগঠন। নয় বছর আগে যাত্রা শুরু করা স্বেচ্ছাসেবী এ সংগঠনটির দশ হাজার সদস্য নিয়মিত রক্তদান করে আসছে। তাঁরা শুধু নিজেরাই নিয়মিত রক্ত দেন না, অন্যদেরও রক্তদানে উৎসাহিত করেন। প্রয়োজনের সময় নানাভাবে চেষ্টা করে রক্তের ব্যবস্থা করে দেন। এভাবে মানুষের জীবন বাঁচাতে রাতদিন কাজ করে যাচ্ছেন এই রক্তযোদ্ধারা। রক্তদানের পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮০টির বেশি বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ক্যাম্পেইন করে বিশ হাজারের বেশি মানুষদেরকে তাদের রক্তের গ্রুপ জানাতে সক্ষম হয়েছে বিডিএস।

আমিনুল ইসলাম খাঁন জানালেন শুরুর গল্প। ২০১০সালের মার্চ মাস। ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবার চিকিৎসা চলছে ময়মনসিংহের সেইফওয়ে ক্লিনিকে। কেমোথেরাপির জন্য রক্তের প্রয়োজন। রক্ত সংগ্রহের জন্য শহরের এপার থেকে ওপারে চষে বেড়াতে লাগলেন। কাছের দূরের ৩০/৩৫ জন আত্মীয়স্বজনদের ব্লাডগ্রুপ চেক করে ৫ ব্যাগ ম্যানেজ হলো। আরো রক্তের প্রয়োজন। পরিচিত একজনের মাধ্যমে জানতে পেরে প্রচণ্ড ঝড়তুফান উপেক্ষা করে ফুলপুর উপজেলা থেকে রক্ত দিতে চলে আসলেন একজন। সে বিষয়টি ভীষণ মনে ধরেছিল তাঁর। কয়েকদিন পর স্থানীয় বারইহাটি চরে বসে আতিকুল ইসলাম,ইলিয়াস বেপারি, রুহুল আমীন, এড.বকুল মিয়া, রুশো, হাবিবুল্লাহ, আল আমীন, আল ফারুক, তানভীর আহমেদসহ আরো কয়েকজন ভাই বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন বিডিএস। প্রথমে নিজেরা নিজেদের নিকটাত্মীয় ও দূর আত্মীয়দের মধ্যে রক্ত আদান প্রদানে সীমাবদ্ধ থাকলেও ২০১৩ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আলম হাসানের মাধ্যমে অনলাইনে গ্রুপটির আত্বপ্রকাশ ঘটে এবং বৃহৎ পরিসরে Blood Donesation-2010 (BDS) গ্রুপের কার্যক্রম শুরু হয়। ধীরে ধীরে সংগঠনটির কার্যক্রমের পরিধি বাড়তে থাকে।

বিডিএস’র অনলাইন গ্রুপে রক্তদান ও রক্তদানে উদ্বুদ্ধকরণ সম্পর্কিত পোস্ট, অফলাইনে স্বেচ্ছায় রক্তদানের প্রচারপত্র বিলি, সচেতনতামূলক নানা প্রচার-প্রচারণা নিয়মিত চলতে থাকে। বিডিএস’র নিয়মিত এসব কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার তরুণ তরুণী ও নানা শ্রেণী- পেশার লোকজন গ্রুপের কার্যক্রমে নিয়মিত অংশ নিচ্ছে। বর্তমানে গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ৩৭ হাজারের বেশি। আমিনুল ইসলাম খাঁন আরো জানান,প্রথমদিকে তাঁর বেতনের একটা অংশ দিয়ে বিডিএস গ্রুপের নিয়মিত মেম্বারদের উৎসাহদানে তিনি গ্রুপের লগো সম্বলিত টিশার্ট ও বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতেন তিনি।

প্রধান উদ্যোক্তা আমিনুল ইসলাম খাঁন ও বিডিএস গ্রুপের এডমিন মোঃনাঈম,হাসিব রহমান,শিমু বিনতে আজিজ, নুসরাত মরিয়ম, রফিক শেখ, শিহাব, রুমান, ইমতিয়াজ, রুবেল সরকার, ইমরান আফ্রিদি, ইমরান সাব্বির, মাসুম-বিন মুজিবসহ অন্যরা সার্বক্ষণিক সক্রিয় থেকে অনলাইনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। “মানবতার টানে ভয় নেই রক্তদানে” এই স্লোগান কে সামনে রেখে জরুরি মূহুর্তে সংগঠনটির সদস্যরা প্রতি মাসে গড়ে প্রায় দুইশো’র বেশি ব্যাগ রক্ত বিনামূল্যে তারা প্রদান করে আসছে। বিডিএস’র স্বেচ্ছাসেবীরা প্রতিদিন বিভিন্ন জেলায় স্বেচ্ছায় রক্তদান, বিভিন্ন স্কুল, কলেজে ফ্রী ব্লাড গ্রুপ নির্ণয় সহ সাধারণ মানুষকে রক্তদান বিষয়ে সচেতন করে করছেন। পাশাপাশি গ্রামের মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক প্রচারণা, প্রসূতি ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ নানা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।দিনে দিনে তাঁরা হয়ে উঠেছেন এতদ অঞ্চলসহ সমগ্র দেশের মানুষের দুঃসময়ের ভরসার জায়গা।

পরবর্তীতে বিডিএস’র এ স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনলাইন ভিত্তিক আরো বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। বিডিএস’র প্রধান এডমিন মোঃনাঈম বলেন, মানবতার কল্যানে এ সংগঠনের প্রতিটি সদস্য কাজ করে থাকেন। আমরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও রক্তদান করি। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা সমাজের মানুষের সেবা করে যাচ্ছি। বর্তমানে এই বিডিএস এ নানা শ্রেনী-পেশার মানুষ স্বেচ্ছায় কাজ করছেন। রক্তদানের পাশাপাশি গ্রুপের সদস্যরা সামাজের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য দেশের প্রতিটি পরিবারেই একজন রক্তদাতা তৈরি করা। রক্তের অভাবে আর যেনো একটি প্রাণও না হারায়। স্বেচ্ছাসেবী নুসরাত মরিয়ম বলেন, আমরা রক্তের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও ফ্রী মেডিকেল ক্যাম্পেইনও করে থাকি এবং সেসব কার্যক্রম এই গ্রুপের সদস্যদের নিজস্ব অর্থে করা হয়। বিডিএস’র বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও ফ্রী মেডিকেল ক্যাম্পে গাজীপুর সিটি মেডিকেল কলেজের প্রভাষক ও ডা: তানসিব জামান (এমবিবিএস স্বাস্থ্য) অংশ নেন।

সুবিধাভোগীদের কথা : গফরগাঁওয়ের ১৫ নং টাঙ্গাব ইউপি চেয়ারম্যান মোফাজ্জল হোসেন সাগর বলেন, আমার এক নিকটাত্মীয়ের এ পজিটিভ রক্তের প্রয়োজন। কোথাও খোঁজে পাওয়া যাওয়া যাচ্ছিলো না। এক মারফত জানতে পারি আমার এলাকারই কয়েকজন মিলে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তুলেছেন। ওদের সাথে যোগাযোগ করলে ওরাই রক্ত জোগার করে দিয়েছেন। সেই থেকে এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিডিএস’র সাথে আমি ওতপ্রোতভাবেই জড়িত। এই সংগঠনের নিয়মিত সদস্য হিসেবে আমিও রক্তদান করি এবং ওদের যে-কোন কার্যক্রমে অংশ নিই।

Rudra Amin Books

ঠাকুরগাঁওয়ের কামরুল ইসলাম বলেন, আমার ছেলের হঠাৎই ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ে। চিকিৎসার জন্য ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকার একটি হাসপাতালে নিয়ে আসি। ডাক্তার বলেছে, রক্ত লাগবে। আমার এক পরিচিত ভাই জরুরী রক্তের আবেদনমূলক একটি পোস্ট দিলেন বিডিএস গ্রুপে। ওই গ্রুপের এডমিনরা দ্রুত সময়ের মধ্যেই ডোনারসহ হাসপাতালে এসে উপস্থিত হন।

গাজীপুর সদর ভুমি অফিসের দলিল লেখক ফারুক মৃধা বলেন, আমার স্ত্রীর টিউমার অপারেশনের জন্য ও নেগেটিভ রক্তের প্রয়োজন। বিরল গ্রুপের এই রক্তের জন্য আমি তখন দিশেহারা। বিডিএস’র স্বেচ্ছাসেবীরা কয়েক ঘন্টার মধ্যেই রক্ত জোগার করে দেন। গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগের অফিস সহকারী মোখলেছুর রহমান বলেন, রক্তশুণ্যতায় ভোগা নিকটাত্মীয়ের এবি পজিটিভ রক্তের প্রয়োজন হলে বিডিএস’র স্বেচ্ছাসেবীরা বেশ কয়েক ব্যাগ রক্ত ম্যানেজ করে দেন। আরেক আত্মীয়ের সিজারের সময়ও রক্ত জোগাড়ে পাশে পেয়েছি বিডিএস পরিবারকে।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ এ বি এম সিদ্দিক বলেন, করোনাকালের শুরুর দিকে আমি ফেইসবুক লাইভে এসে নিয়মিত চিকিৎসা সংক্রান্ত আলোচনা করতাম। এ লাইভের সূত্র ধরে বিডিএস’র এডমিনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। আমার এক গরীব রোগীর রক্তের প্রয়োজন হলে বিডিএস’র স্বেচ্ছাসেবীরা তা ম্যানেজ করে দেয়। এরপর থেকেই এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। বিডিএস’র মানব সেবা ও বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক নিঃস্বার্থ এ কর্মকাণ্ডকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

959 Shares
Share959
Tweet
Share
Pin