৭ মার্চ কেন ‘স্বাধীনতা ঘোষণা দিবস’ নয়? | Nobobarta

তথ্য প্রেরক : রবিন তালুকদার, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি

৭ মার্চ কেন ‘স্বাধীনতা ঘোষণা দিবস’ নয়?

পড়ার সময়:24 মিনিট, 52 সেকেন্ড

অধ্যাপক ডাঃ কামরুল হাসান খান : সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, পর্যালোচনা হয়েছে, বিশ্লে­ষণ হয়েছে, এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছে কিন্তু এ ভাষণের পর তৎকালীন সময়ে বাঙালী জাতির ওপর কি প্রভাব পড়েছে বা মানুষ কিভাবে দ্রুত স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের দিকে এগিয়ে গেছে সেটি খুব আলোচনা হয়নি, যা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানো জরুরী।

১৯৭১-এর ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টি ঢাকার পূর্বাণীতে কর্মকৌশল নির্ণয় ও ৬ দফার আলোকে পাকিস্তানের খসড়া শাসনতন্ত্র প্রণয়নের বিষয়ে আলোচনায় মিলিত হয়। হঠাৎ ঐদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণের মাধ্যমে জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করলেন। তিনি বলেন, ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে পাকিস্তান পিপল্স পার্টিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল যোগ দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছে এবং বিদেশী শক্তি, বিশেষ করে ভারত রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তেজনাকর করতে সমূহ ইন্ধন যোগাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন।

ঢাকা ও সারাদেশে জনগণ ইয়াহিয়া খানের এ ঘোষণায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিক্ষুব্ধ মানুষ স্লোাগান দিতে দিতে রাস্তায় নেমে পড়ে। মিছিলের পর মিছিল যায় হোটেল পূর্বাণী অভিমুখে, যেখানে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দল বৈঠকরত ছিল। বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের সঙ্গে হোটেল পূর্বাণীতে মিলিত হন। অধিবেশন স্থগিত করাটাকে পাকিস্তানী শাসকচক্রের আরেকটি ষড়যন্ত্র বলে তিনি উল্লেখ করেন। দলমত নির্বিশেষে সর্বমহল থেকে প্রতিবাদ ধ্বনিত হতে থাকে ইয়াহিয়া কর্তৃক জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণায়।

পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার ঘোষণাটি বিদ্যুতস্পৃষ্টের ন্যায় মুহূর্তের মধ্যে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা গগনবিদারী স্লোগান দিতে দিতে রাস্তায় নেমে আসে। প্রত্যেকের হাতে বাঁশ ও কাঠের লাঠি ছিল। শুধু ছাত্র-ছাত্রীরাই নয়, সেক্রেটারিয়েটসহ সকল সরকারী, আধাসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মচারীরা নিজ নিজ অফিস-দফতর ছেড়ে রাজপথে নেমে আসে। খবরটি স্টেডিয়ামে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেট টেস্ট ম্যাচের খেলা বন্ধ হয়ে যায়। স্টেডিয়াম, বায়তুল মোকাররম, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, গুলিস্তান প্রভৃতি রাজধানীর প্রধান প্রধান জনবহুল কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে সভার পর সভা অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু ২ মার্চ ঢাকায় হরতাল, ৩ মার্চ সারাদেশে ও ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভার কর্মসূচী ঘোষণা করেন। জনতার প্রতিবাদ, বিক্ষোভ মিছিল প্রতিহত করার জন্যই সামরিক সরকার ২ মার্চ থেকে সান্ধ্য আইন জারি করে। কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতা কারফিউ অগ্রাহ্য করে শহরে প্রতিবাদ মিছিল বের করে। সামরিক জান্তা জনতার দিকে গুলি চালালে ৩ জন নিহত এবং কমপক্ষে ৬০ জন আহত হয়।

Rudra Amin Books

আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলার সঙ্গে হরতাল পালন এবং লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতির মতো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ শাসনতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের উদ্দেশে জাতীয় পরিষদের সকল পার্লামেন্টারি গ্রুপের ১২ জন নির্বাচিত নেতাকে ১০ মার্চ ঢাকায় মিলিত হওয়ার জন্য ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানান।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৩ মার্চ রাতেই প্রেসিডেন্টের ঘোষিত আমন্ত্রণ এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যেÑ ‘রাস্তায় রাস্তায় যখন শহীদের রক্ত পুরোপুরি শুকায় নাই, যখন কতিপয় লাশ সৎকারের অপেক্ষায় পড়িয়া রহিয়াছে এবং হাসপাতালে যখন শত শত লোক মৃত্যুর সহিত লড়াই করিতেছে, তখন এই আমন্ত্রণ একটি নিষ্ঠুর তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। যেসব লোকের হীন চক্রান্ত অসহায় ও নিরস্ত্র কৃষক-শ্রমিক এবং ছাত্রদের মৃত্যুর জন্য দায়ী তাহাদের সহিত একত্রে বসতে বলা আরও পরিহাসজনক। বন্দুকের নলের মুখে এরূপ সম্মেলনের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এসব অবস্থায় এরূপ আমন্ত্রণ গ্রহণ করার কোন প্রশ্নই ওঠে না। অতএব আমি এরূপ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলাম।’

৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগ আয়োজিত বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু অসহযোগের ঘোষণা দেন এবং বলেন, ‘জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই এখন কেবল বৈধ কর্তৃত্বের অধিকারী। তিনি আরও বলেন যে, ‘৭ মার্চ-এর বক্তৃতাই হয়তো তাঁর শেষ বক্তৃতা।’ বস্তত ৫ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারী-বেসরকারী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই তখন একমাত্র কার্যকরী নির্দেশ। বঙ্গবন্ধু তাঁর বাসভবনে ৭ মার্চ সকালে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদের বৈঠক ডাকেন। বঙ্গবন্ধু কি ভাষণ দিবেন তা নিয়ে আলোচনা হয়। গোটা বাঙালী জাতি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছেন। একটি ভাষণ শোনার জন্য একটি জাতির এত উৎসাহ, উৎকণ্ঠা আর আগ্রহ ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের মূল ভাষণটি ২৩ মিনিটের হলেও ১৮-১৯ মিনিটে রেকর্ড করা হয়েছিল। এ ভাষণের জন্য অনেক জ্ঞানী-গুণী নেতা, কেউ চিরকুট দিয়েছেন, কেউ বলে গেছেন- নেতা এটা করতে হবে, বলতে হবে। এ ভাষণে সব থেকে বড় অবদান বঙ্গমাতার। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘অনেকে অনেক কিছু বলে, লিখে দিয়েছে, একমাত্র তুমিই জান কি বলতে হবে। তোমার মনে ঠিক যে কথাগুলো আসবে, তুমি তাই বলবে।’ বঙ্গবন্ধু কথা শুনে হাসলেন, তারপর মাঠের দিকে রওয়ানা করলেন। তাঁর দীর্ঘ ৩০ বছরের রাজনীতির আলোকে নিজের চিন্তা থেকে তিনি ৭ মার্চের ভাষণ প্রদান করেন।

বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ নিয়ে অনেক বিশ্বনেতা, অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সে সময়ই অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। ১৯৭১-এর সে সময়ই বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির ভাষ্য ছিলো ‘৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব আসলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি বাঙালীদের যুদ্ধের নির্দেশনাও দিয়ে যান। ঐ দিনই আসলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।’

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ পেরিয়ে আর একটি নতুন দিনের অভ্যুদয় ঘটল, ৮ মার্চ ১৯৭১ সোমবার। দেশ পরিচালনার ভার সামগ্রিক বিবেচনায় এখন বঙ্গবন্ধুর হাতে। কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ কোথাও নেই। এদিনে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ সংবাদপত্রে এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষিত কর্মসূচীর একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচী ঘোষণার ফলে প্রতীয়মান হয় যে, বঙ্গবন্ধু পূর্ববাংলায় এক সমান্তরাল সরকার পরিচালনা করেন।

৮ মার্চ থেকেই রেডিও, টেলিভিশন, দেশের সমুদয় প্রশাসন ও জীবন যাত্রা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চলতে থাকে। এদিন কেবল সেনানিবাস ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানের পতাকা দেখা যায়নি। সর্বত্রই ছিল সবুজ জমিনে লাল সূর্য মাঝে সোনালী রঙের ভূ-মানচিত্র আঁকা বাংলাদেশের পতাকা। ঢাকা শহর থেকে সর্বত্র গ্রামে-গঞ্জে, মহল্লায় নানাভাবে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ শুরু হয় কাঠের রাইফেল অথবা লাঠিসোটা নিয়ে। এদিন থেকে কার্যত দেশ স্বাধীন রূপ নেয়।

অপর এক ঘটনায় পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বিএ সিদ্দিকী নবনিযুক্ত গবর্নর লেঃ জেনারেল টিক্কা খানকে শপথ গ্রহণ করাতে অস্বীকৃতি জানান। এদিকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবকরা জনগণের জানমাল রক্ষায় তৎপর হয় যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। ঐ সময়ে যাতে কোনভাবে কোন ধরনের হঠকারী বা উচ্ছৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় সেদিকে বঙ্গবন্ধু কঠোর নজর রেখেছেন।

প্রশাসন যাতে সুষ্ঠুভাবে চলে সেজন্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ৩৫টি বিধি জারি করেন শাসনকার্য পরিচালনার জন্য ১৫ মার্চ থেকে কার্যকর এসব নির্দেশাবলী জারির মধ্য দিয়ে পূর্বে ঘোষিত সকল নির্দেশ, আদেশ ও ব্যাখ্যাসমূহ বাতিল বলে বিবেচিত হয়। এদিকে সামরিক শাসন, নির্যাতন-অত্যাচার, অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন তাঁর ‘হেলাল-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব, দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামছুদ্দীন ও ঢাকা বিশ্বাবদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী পাকিস্তান খেতাব বর্জন করেন। বিস্ফোরণোন্মুখ বাংলাদেশে ১৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও বঙ্গবন্ধুর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল টানটান এবং উত্তেজনাপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে হেয়ার রোডে অবস্থিত প্রেসিডেন্ট ভবনে আলোচনার জন্য যান।

অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৩২ নম্বর বাসভবনে সকল স্তরের মানুষের ঢল নামতো। মনে হতো যেন সকল পথ ৩২ নম্বরের সঙ্গে মিশে গেছে। ইতোমধ্যে ১৯ মার্চ ঢাকার জয়দেবপুরে ঘটে যায় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহ। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী জয়দেবপুরে নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালালে বেশ কয়েকজন হতাহত হন। জয়দেবপুরে অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ব্যাটালিয়নের বাঙালী সৈনিক ও অফিসারগণ মেজর শফিউল্লার নেতৃত্বে অস্ত্রসমর্পণে অস্বীকৃতি জানায়।

২২ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আলোচনার অজুহাতে ২৫ মার্চ আহূত জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করেন। বাংলাদেশের কোথাও ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস উপলক্ষে পাকিস্তানের পতাকা উড়েনি। জনসাধারণ সেদিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতি ঘরের শীর্ষে কালো পতাকার পাশাপাশি স্বাধীন বাংলার মানচিত্র আঁকা নতুন পতাকাটিও উড়ায়। সরকারী, বেসরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বিদেশী দূতাবাস, স্কুল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, কোর্ট কাচারী, হাইকোর্ট, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, যানবাহন, বাসগৃহ সর্বত্রই উত্তোলন করা হয় এ পতাকা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বাসভবনেও স্বাধীন বাংলার পতাকা পত পত করে উড়ছিল। ঐদিন পল্টন ময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে পেছনে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসী। গানটি বাজানো হয়। স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। জয় বাংলা বাহিনী পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করেন।

২৫ মার্চ ১২.৩০ মিনিট অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হওয়ার আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তা ওয়ারলেসযোগে চট্টগ্রামে জহুর আহমেদ চৌধুরীকে প্রেরণ করেন। ইপিআর-এর ওয়ারলেস যোগে ঐ বার্তা বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি থানায় এবং ইপিআর পোস্টে পৌঁছে যায় এবং তা সর্বত্র সাইক্লোস্টাইল করে বিতরণ করা হয়। বিদেশের পত্র-পত্রিকায় ও বেতার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা, পাকিস্তান থেকে পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ও মুক্তিযুদ্ধের খবর প্রচারিত হয়।

২৫ মার্চের রাত থেকেই ঢাকায় রাজারবাগে পুলিশ লাইন, পিলখানার ইপিআর ঘাঁটিসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ, বাঙালী জাতির মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। একটি ভাষণ কীভাবে একটি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে শেখায় এ হচ্ছে বিশ্বের বিরল সেই ইতিহাস। গত ৩০ অক্টোবর ২০১৭ ইউনেস্কো ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে বিশ্বে প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের আন্তর্জাতিক রেজিস্ট্রার স্মৃতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে মেমোরী অব ওয়ার্ল্ড রেজিস্ট্রারে সব মহাদেশ থেকে ৪২৭টি প্রামাণ্য দলিল ও সংগ্রহ তালিকাভুক্ত হয়েছে। এরমধ্যে শুধুমাত্র ভাষণ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এর আগেও বিশ্বের সেরা ভাষণের তালিকায় ৭ মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০১৪ সালে যুক্তরাজ্য থেকে জ্যাকব এফ ফিল্ড সংকলিত ‘উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস- দ্য স্পিচেস দ্যাট ইন্সপায়ার্ড হিস্টোরী’ বইটি প্রকাশিত হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১ থেকে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সেরা ভাষণ নিয়ে ২২৩ পৃষ্ঠার এ বইয়ে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। ২০১ পৃষ্ঠায় ‘দ্য স্ট্রাগল দিস টাইম ইজ দ্য স্ট্রাগল ফর ইন্ডিপেন্ডেন্স’ শিরোনামে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ।

একাত্তর আমাদের সকল চেতনা, প্রেরণা এবং গৌরবের উৎস আর একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চ আমাদের জ্বলে ওঠার সময় যেখানে ফিরে যেতে হবে বার বার। সশস্ত্র যুদ্ধের পাশাপাশি শুরু হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স¤প্রচার। মুক্তিকামী মানুষ গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো স¤প্রচার শোনার জন্য। সবচাইতে আকর্ষণীয় ছিল বজ্রকণ্ঠ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। এ ভাষণ শোনার পর মুক্তিযোদ্ধারা রণক্ষেত্রে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে ফেটে পড়তো এবং উজ্জীবিত হতো নতুন করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে।

সত্যিকার অর্থে ১৯৭১-এর ৭ মার্চ থেকে ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি মানে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পর্যন্ত একটিই কমান্ড ছিল আর তা ছিল ৭ মার্চের ভাষণ। এ ভাষণের জন্যই মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাঙালী জাতি টের পায়নি বঙ্গবন্ধুর শারীরিক অনুপস্থিতি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণই একমাত্র ভাষণ যার মধ্য দিয়ে গোটা বাঙালী জাতি সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, সন্দেহ-অবিশ্বাস ঝেড়ে স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণই হচ্ছে বিশ্বসেরা ভাষণ। এর আগে মানুষের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল কারণ সংসদ অধিবেশন বসার প্রস্তুতি চলছে- প্রথমে ৩ মার্চ পরে ২৫ মার্চ, অন্যদিকে আবার নানা ধরনের সমঝোতা বৈঠক চলছে।

বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ মার্চের ভাষণে বাঙালী জাতির বঞ্চনার কথা বলেছেন, রাজনৈতিক ইতিহাসের কথা বলেছেন, বাঙালীর মুক্তির সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধেও প্রস্তুতি কথা বলেছেন, সর্বোপরি স্বাধীনতার কথা বলেছেন। বস্তুত এটিই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। ‘তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’

‘মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দিব। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের প্রতিটি শব্দই গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থবহ। তারপরেও উল্লি­খিত বাক্যগুলো সুস্পষ্টভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা করা হয়েছে।

৭ মার্চের ভাষণে কি নেই যে এটাকে স্বাধীনতার ঘোষণা বলা যাবে না। সকল বিজ্ঞ বিশ্লেষকরাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেছেন ৭ মার্চের ভাষণই হচ্ছে স্বাধীনতার ঘোষণা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ৭ মার্চ এবং ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক গুরুত্ব। বাঙালী জাতি যেন যুগ যুগ ধরে এ ভাষণের জন্য অপেক্ষা করেছে- তাদের মুক্তির জন্য, স্বাধীনতার জন্য। ইতোমধ্যে স্বাধীনতাকে ঘিরে অনেক সরকারী-বেসরকারী দিবস পালিত হয়। কিন্তু ৭ মার্চ সেভাবে কোন দিবস হিসেবে পালিত হয় না। ইতিহাসের প্রয়োজনে, নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস প্রবাহিত করার জন্য ৭ মার্চকে সরকারীভাবে জাতীয় দিবস হিসেবে পালন করা উচিত। সবাই বলেছেন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চেও ভাষণই স্বাধীনতার ঘোষণা। তবে ৭ মার্চ কেন ‘স্বাধীনতা ঘোষণা দিবস’ নয়? সংশ্লিষ্ট সকল মহল বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখবেন এটিই প্রত্যাশা।

লেখক অধ্যাপক ডাঃ কামরুল হাসান খান
সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

(প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। নববার্তা-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য নববার্তা কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।)

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

36 Shares
Share36
Tweet
Share
Pin