বিশ্ব রাজনীতিতে তুরস্ক | Nobobarta

বিশ্ব রাজনীতিতে তুরস্ক

আফসানা রিজোয়ানা সুলতানা : ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী পশ্চিম এশিয়ার একটি দেশ তুরস্ক। তুরস্ক ভৌগোলিকভাবে এশিয়া এবং ইউরোপ দুই মহাদেশজুড়ে অবস্থিত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি এবং রাজনীতিতে এর গুরুত্ব ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। বর্তমান তুরস্ক অতীতে অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। ১২৯৯ সালের দিকে বর্তমান তুরস্কের আনাতলিয়ায় গড়ে ওঠে অটোমান সাম্রাজ্য। ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে সাম্রাজ্যের পরিধি। ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়া তিন মহাদেশের বিভিন্ন অংশকে নিজেদের শাসনে আনেন অটোমান সুলতানরা। বর্তমান গ্রিস, মিশর, ইসরাইল, জর্ডান, রোমানিয়া, আলজেরিয়া, হাঙ্গেরি, মেসোডনিয়া, লেবানন, সিরিয়াসহ বেশ কিছু আরব এবং আফ্রিকান অঞ্চল অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কেন্দ্রীয় শক্তির সঙ্গে মিলিতভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে অটোমানরা। যুদ্ধে কেন্দ্রীয় শক্তির পরাজয় হলে অটোমান সাম্রাজ্যের ইতি ঘটে। বর্তমান তুরস্ক মূলত অটোমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপ থেকে গড়ে ওঠা এক আধুনিক, ধর্মনিরেপেক্ষ রাষ্ট্র।

১৯২২ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে মিত্র শক্তির চাপের মুখে ১৯২৩ সালে ‘লুসান চুক্তি’ স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয় তুরস্ক। এই চুক্তির মাধ্যমে অনেক অন্যায় শর্ত চাপিয়ে দেয়া হয় তুরস্কের ওপর। লুসান চুক্তি তুরস্কের অর্থনীতিকে দুর্বল করে ফেলে। ইউরোপের রুগ্ন দেশের তকমা লেগে যায় তুরস্কের গায়ে। লুসান চুক্তি অনুসারে এত দিন নিজেদের ভূমিতে বা বাইরের কোনো দেশে প্রাকৃতিক সম্পদের কোনো অনুসন্ধান বা আহরণ করা নিষিদ্ধ ছিল তুরস্কের। এমনকি এজিয়ান সাগর এবং কৃষ্ণসাগরের সংযোগ প্রণালি বসফরাসের ওপর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো থেকেও কোনো টোল আদায় করতে পারত না তুরস্ক। ১৯২৩ সালে অবসান হতে যাচ্ছে লুসান চুক্তি। নানা শর্তের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পাবে তুরস্ক। গত ১০০ বছর বয়ে চলা শর্তের বেড়াজাল টপকে নতুন করে শুরু করার ইঙ্গিত তুরস্কের। বিগত কয়েক বছর থেকেই আঞ্চলিক ও বিশ্ব রাজনীতিতে তার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল।

শুরু থেকেই তুরস্ক তার পররাষ্ট্রনীতিতে ইউরোপ এবং আমেরিকাকে প্রাধান্য দিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালে দেশটি ন্যাটোতে অংশগ্রহণ করে। ন্যাটো গঠিত হয়েছিল মূলত আটলান্টিকের উত্তর দিকের রাষ্ট্রগুলোকে রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক খুব একটা উষ্ণ নয়। কিন্তু বেশ কিছু বছর ধরে তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু ইরানের সঙ্গেও তুরস্ক ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। অথচ মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের পরে যুক্তরাষ্ট্রের সব থেকে বড় মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে তুরস্ক বিবাদে জড়িয়ে আছে। আসলে তুরস্ক চাইছে আঞ্চলিক পরাশক্তি হতে। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বেকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুপ্ত বাসনাও রয়েছে তুরস্কের মনে। অটোমান সাম্রাজ্যের ৬০০ বছরের মধ্যে প্রায় ৪০০ বছর মক্কা এবং মদিনার নিয়ন্ত্রণ ছিল তুর্কিদের হাতে। বিশ্বজুড়ে বেশির ভাগ মুসলিম তখন অটোমান সুলতান সোলায়মানকে তাদের ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক পথ প্রদর্শক হিসেবে মনে করত। তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগানের নেয়া সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ অটোমান সাম্রাজ্যের সেই দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দেয়। আধুনিক তুরস্কের স্থপতি মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক পাশা দেশটিকে ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সেই লক্ষ্যে তিনি দেশটিতে আরবি চর্চা নিষিদ্ধ করেন, মাদ্রাসা বন্ধ করেন, আজান নিষিদ্ধ করেন। এমনকি প্রচলিত আরবি ভাষার পরিবর্তন ঘটিয়ে প্রচলন করেন ল্যাটিন ভাষার। কিন্তু বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোগান জাদুঘরে রূপান্তরিত মসজিদটি পুনরায় মসজিদে স্থানান্তর করে মুসলিম বিশ্বকে একটি নুতন ইঙ্গিত দেন। সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা ও কাশ্মীর ইস্যুতে এরদোগানের মতো উচ্চকিত হতে দেখা যায়নি মুসলিম বিশ্বের অন্য কোনো নেতাকে। কাশ্মীর ইস্যুতে মুসলিম বিশ্বের সংগঠন ওআইসি গঠনমূলক ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হলে মালয়শিয়ায় ৫০টিরও অধিক মুসলিম দেশকে নিয়ে সম্মেলন করে তুরস্ক। এই সম্মেলনকে ওআইসির বিকল্প হিসেবে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। তেমন হলে মুসলিম বিশ্বে সৌদির নেতৃত্ব হুমকির মুখে পড়বে।

মুসলিম বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়ার যে বাসনা তুরস্কের রয়েছে, সেটি কারও অজানা নয়। তুরস্কের সামরিক বাহিনী বেশ উন্নত এবং শক্তিশালী। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যেটি দ্বিতীয় বৃহত্তম। সিরিয়া, লিবিয়ায় তুরস্কের সামরিক বাহিনী সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে। ‘হর্ন অফ আফ্রিকা’ খ্যাত সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুতে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। লিবিয়ার প্রতিবেশী দেশ নাইজারের সঙ্গেও সামরিক চুক্তি রয়েছে তুরস্কের। করোনা সংক্রমণের সময়টিতে তুরস্ক আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশেকে সাহায্য সহযোগিতা করেছে। এটা স্পষ্ট যে, তুরস্ক তার আশপাশের এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে।

Rudra Amin Books

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও তুরস্কের অগ্রযাত্রা বিদ্যমান। তুরস্ক তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। অতি সম্প্রতি তুরস্ক কৃষ্ণ সাগরে ৩২০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস মজুতের সন্ধান পেয়েছে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট ২০২৩ সাল নাগাদ এই গ্যাস সরবারহ করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। এর ফলে তুরস্ক তাদের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আর আমদানি করতে হবে না। এতে করে তুরস্কের অর্থনীতি অনেকটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। যদিও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে তুরস্ক চিরশত্রু গ্রিসের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে। তুরস্কের আঞ্চলিক শত্রু মিশর ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের প্রভাবকে কমানোর জন্য গ্রিসের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি মিশর এবং গ্রিসের মধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি চুক্তিপত্রও স্বাক্ষরিত হয়েছে। মিশর-গ্রিস এই চুক্তিটিকে ২০১৯ সালে লিবিয়া-তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির পাল্টা চুক্তি হিসেবে দেখছে। তুরস্ক-গ্রিস ইস্যুতে ইউরোপিয়ান দেশগুলোর জোট ইইউ গ্রিসকে সমর্থন করার ইঙ্গিত দিয়েছে। পশ্চিমা মিত্রদের বিরোধিতার আশঙ্কা থেকেই হয়তো তুরস্কের প্রেসিডেন্ট বিগত দিনগুলোতে ইরান, রাশিয়া, পাকিস্তান, চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন। সচেতনভাবেই সৌদি-মিশর-আমিরাত-বাহরাইনের বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলেছেন তুরস্ক-ইরান-কাতার জোট।

মুসলিম বিশ্বের রাজনীতি কিংবা আঞ্চলিক রাজনীতি— উভয়টিতেই তুরস্ক তার একটি শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে। এখন শুধু সামনে এগোনোর পালা। লুসান চুক্তির অবসান নিঃসন্দেহে তুরস্কের আগামীর পথচলাকে আরও মসৃণ করবে। এই মুহূর্তে তুরস্কের মসনদে রয়েছেন এরদোগানের মতো একজন দূরদর্শী এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তার গৃহীত অনেক পদক্ষেপ ইসরাইল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অস্বস্তিতে ফেললেও দেশগুলোর মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে তার আঁচ লেগেছে খুবই কম। করোনা সংকটে দুটি দেশেই চিকিৎসাসামগ্রী পাঠিয়েছে তুরস্ক। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও বেশ শক্ত হাতে সামলাচ্ছেন তিনি। অনেকে রাজনৈতিক বিশ্লষক তাকে নতুন সুলতান হিসেবে অভিহিত করেছেন। এখন এই নতুন সুলতান তুরস্ককে কত দূর নিয়ে যান, সেটা সময়ই বলে দেবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। নববার্তা.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য নববার্তা কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।
ফেসবুক থেকে মতামত দিন

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

0 Shares
Share
Tweet
Share
Pin