কবি মুহম্মদ নুরুল হুদার ৭১তম জন্মদিন | Nobobarta

আজ শুক্রবার, ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৯:০৪মি:

কবি মুহম্মদ নুরুল হুদার ৭১তম জন্মদিন

কবি মুহম্মদ নুরুল হুদার ৭১তম জন্মদিন

দেশের কবিকূলের কাছে ‘জাতিসত্ত্বার কবি’ নামেই পরিচিত চিরতরুণ এ কবি গতকাল ৭১ বছরে পা দিলেন। আমার কাছে “শর্তহীন শর্তে” এ যেন অনেকটা এ রকম “নীরবেই চলে যাবে বা গেলো দরিয়ানগরের কবি মুহম্মদ নুরুল হুদার ৭১তম জন্মদিন” দেশে এতো গুলো টেলিভিশন চ্যানেল অথচ ওনার ৭১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দেখলাম না ওনাকে নিয়ে তেমন কোন আয়োজন! যাই হোক আমার পক্ষ থেকে কবির জন্য রইলো অনেক অনেক শুভেচ্ছা, অভিনন্দন ও শুভ কামনা সহ সহস্র শ্রদ্ধা! দোয়া করি আল্লাহ্ তায়ালা যেন আপনাকে সুস্থ রাখেন যাতে আপনি দেশের জন্য আমাদের জন্য আরো অনেক অনেক মূল্যবান লেখনী লিখে যেতে পারেন।

কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা ১৯৪৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি দরিয়ানগর (কক্সবাজার) জেলার উত্তর পোকখালী গ্রামে হাজী মোহাম্মদ সেকান্দার ও আঞ্জুমান আরা বেগমের ঔরসে জন্ম গ্রহণ করেন। শুধু কক্সবাজারের গর্ব নয় কুমিল্লা বোর্ডে কক্সবাজার ঈদগাহ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকে (ম্যাট্রিক পরীক্ষা) তিনি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে মেধার পরিচয় রেখেছিলেন। তিনি ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র (ইংরেজিতে এম.এ)। ছাত্রজীবনে ‘অধোরেখ’ সংকলনটি সম্পাদনা করে সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

নজরুল ইনষ্টিটিউটের সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশে সমকালীন বাংলা কবিতার পথ চলা যাদের হাত ধরে, তাদের অন্যতম সাবেক বাংলা একাডেমীর পরিচালক কবি নূরুল হুদা জার্মান, জাপান, আমেরিকা, হাওয়াই, লন্ডন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, বেইজিং, শ্রীলংকা, তুরস্ক প্রভৃতি দেশে বিভিন্ন সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন এবং তুরস্ক প্রভৃতি দেশ থেকে সম্মাননাও গ্রহণ করেন। তিনি আর যে সব স্বীকৃতি ও সম্মাননা লাভ করেন তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮৮), যশোর সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), আলাওল পুরস্কার (১৯৮৩), কবি আহসান হাবীব কবিতা পুরস্কার (১৯৯৫), তুরস্কের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বিশেষ সম্মাননা লাভ (১৯৯৭), কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার, সুকান্ত পুরস্কার (২০০৪), কক্সবাজার মেয়র কর্তৃক নগর চাবি প্রদান (২০০৯) প্রভৃতি। তিনি বহু গ্রন্থ ও কাব্য রচয়িতা, বহু ভাষার ধ্রুপদি সাহিত্যের রূপান্তরসাধক এবং আপন ভাষা ও দেশমাতৃকার অসংকোচ সেবক।

তিনি বাংলাদেশের লেখকদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তাঁকে দেশ-বিদেশের নানাজন নানাভাবে সম্মাননা ও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। মুহম্মদ নূরুল হুদা শব্দ শিকারী কোথা থেকে না কোথা থেকে শব্দকে খুঁজে আনে। বাছবিচার করে না। ইলিয়ডে তার আনন্দ, শেক্সপীয়রে তার নেশা, বাল্মীকিতে সে অনুরাগী, হোমারে সে অভিভূত আর কোরানে সে আকণ্ঠ। আর আছে তার সাগর, আছে পাহাড়, আছে ঈদগাহ বিদ্যালয়।’

Rudra Amin Books

ষাটের দশকে ইংরেজী সাহিত্যের অনার্সে ছাত্র থাকাকালীন সময়ে কবি হিসাবে মুহম্মদ নূরুল হুদার অগ্রযাত্রা শুরু হয়। ষাটের দশকে (১৯৬৭) উর্মি মালা সাহিত্য সংসদ থেকে কক্সবাজারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য সংকলন “কলতান” প্রকাশ হয় তাঁরই সম্পাদনায়। কবি হিসাবে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শোণিতে সমুদ্রপাত’ স্বাধীনতার এক বছর পরই প্রকাশিত হয়। ষাটের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় তিনি মানুষ। সময়ের স্বাক্ষর তাঁর রচনায় ষ্পষ্ট ও প্রকাশ্যভাবে ধরা পড়েছে। এ সময়ের কবিতার কেন্দ্রীয় সুরই বিক্ষুদ্ধ গণ-আন্দোলন, রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতার। সেদিক বিবেচনায় মুহম্মদ নূরুল হুদা তাঁর সহজীবী কবিদের সঙ্গে একই পাটাতনে দাঁড়িয়ে ওই দশকের দ্বিতীয় প্রজন্মের কবি হিসাবে স্বীকৃতি আদায় করতে সক্ষম হয়। গ্রাম বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঠিক রূপায়ন তাঁর কবিতার প্রধান সুর। প্রকৃতি, নারী ও প্রেম বিষয়ক কবিতা রচনায় তিনি অত্যন্ত সাবলীল। ছন্দ সচেতন এই কবির রচনাকর্মে অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং স্বরবৃত্তের ছন্দের সমানুপাতিক মিশ্রণ লক্ষণীয়। তাঁর বিভিন্ন কবিতার বিষয় ও ভাবনা বাস্তব জীবন থেকে আহৃত। সাহিত্য তাঁর আশার প্রদীপ ও সংগ্রামশীলতার প্রতীক এবং মানবতাবাদের পতাকা। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা এ পর্যন্ত ৪৫ টির অধিক কাব্যগ্রন্থ রচনা করে বাংলা কাব্য সাহিত্যে একটি অবস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। যদিও তিনি গতানুগতিক কবিতা লেখেন। আমরা আশা করি মাইকেল মধূসুদন, কাজী নজরুল ইসলামের মতো কাব্য জগতে একটি নতুন প্রবাহ সৃষ্টি করে। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এক নতুন আইকন হিসাবে মুহম্মদ নূরুল হুদার নাম ব্যবহৃত হয়।

মুহম্মদ নূরুল হুদা একজন একনিষ্ট যৌবন শক্তি সম্পন্ন পন্ডিত কবি, কথা সাহিত্যিক এবং নিষ্ঠাবান গবেষক। তার গবেষনাক্ষেত্র বৈচিত্র্যপূর্ণ। এই নিবন্ধে সামগ্রিক দিক বিবেচনা না করে একমাত্র নজরুল বিষয়ক তাঁর রচনা সমুহের প্রতিই আলোকপাতে প্রয়াসী হচ্ছি। বিদ্রোহী কবি নজরুল বাংলাসাহিত্যে একজন ‘অদ্বয় কুটাভাস’। সাহিত্যে তাঁর আগমন, পদচারনা এবং বিদায় এক নাটকীয় বৈশিষ্ট্যে দেদীপ্যমান। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নজরুল এক বিশেষ স্থান দখল অধিকারী । তাঁর কবিতার চারণিক বৈশিষ্ট্য, বিষয় –বৈচিত্র্যের আভিজাত্য শব্দ ও প্রতীকী ব্যবহারে তাঁর পরিসিত জ্ঞান এবং কবিত্ব প্রতিভার অপুর্ব প্রকাশ মানতা বা আমাদের নাড়া দেয়। আমরা অভিভূত হই- একজন স্বল্প শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে গভীর পান্ডিত্য, স্বয়দ্ভ কবি – প্রতিভা কত সক্রিয়ভাবে উজ্জীবিত ছিল- তা দেখে। মুহম্মদ নূরুল হুদার নজরুল বিষয়ক অনেক কবিতা রয়েছে। যে কবিতাগুলোর মধ্য দিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের চেতনাকে স্বরূপে উন্মোচন করা যায়। কবি হুদার কবিতায় কাজী নজরুলের দিলখোলা সহজ সারল্য,আনন্দমুখী জীবন, উচ্ছ্বাসমুখীকর্মকোলাহল, ভালোবাসামুখী অন্তর, প্রতিভার প্রদীপ্ত উজ্জ্বলতা তাকে অসাধারণ করে তুলেছেন- ‘কত জন্ম, কত পূণ্য কত রক্তবলে বেড়েছিস চক্রবৃদ্ধি হারে তোরই বংশের ধারা আজ জনে জনে শত্র“ জনতা, তোকেই রাখবে তারা চোখে, বল, তুই পালাবি কোথায়? ‘নজরুল সুন্দর’কবিতায় নজরুল সাহিত্য যে এদেশ থেকে বৃটিশ তাড়াতে বিদ্রোহ ধ্বনিত প্রতিধ্বনি হয়েছিল সে যুগের মুক্তি প্রয়াসে। নজরুলের শৃঙ্খলিত সাহিত্যের গান গাইতে গাইতে সত্যি সত্যি আমরা যুদ্ধে গিয়েছিলাম এবং স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনেছিলাম।

সে কথাটিরই উল্লেখ পাওয়া যায় মুহম্মদ নুরুল হুদার নজরুল বিষয়ক অনেক কবিতায়- ‘তোমার অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে বাঙালি অকুতোভয় মুক্তিযুদ্ধে আনলো ছিনিয়ে জয় বাংলার জয় সবুজ স্বদেশ সোনালী বৃত্তে আনলো সূর্যক্ষণ স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা, আত্মার রূপায়ন তুমি দেখেছিলে প্রতীক প্রতিমা এ জাতিস্বত্তার। (অগ্নিছোঁয়ায় উঠলো জেগে/সুর সমুদ্র) এবং আরো পাওয়া যায়- “স্বপ্নদ্রষ্টা তুমি তাই সর্বমানবিক স্বাধীন স্বত্তার স্বপ্নদ্রষ্টা তুমি তাই তোমার স্বদেশভূমি সার্বভৌম বাংলার তোমার স্বপ্নাভূক ধরে দুর্গম কান্তগিরি পার হয়ে বাস্তব স্বদেশ জনে জনে মুক্তিযোদ্ধা, জমেছে জনতা, সমতটে, হরিকেলে, রাঢ়ে, বঙ্গে এলেন শ্যামাঙ্গ এক জাতি পিতা বাঙালির জাতির, কণ্ঠে তাঁর বজ্রের উদ্দাম; ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” বাংলাদেশে জন্মনিলো স্বপ্নবাস্তবের উপত্যকায় বাঙালির জাতিরই এক তুমিই জাতীয় কবি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার? (নজরুল সুন্দর/পদ্মাপারের ঢেউসোয়ার) এ জাতি কোনদিন নজরুলকে ভুলতে চায় না। তাঁরই কাছে জাতি চির শ্রদ্ধাবনত- বাংলার আবালবণিতা, মুক্তি জাগানিয়া’ (নজরুল সুন্দর/পদ্মাপারের ঢেউসোয়ার) কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলমাকে নিয়ে “নজরুল বাড়ি’’, ‘অগ্নিছোঁয়ায় উঠলো জেগে’, ‘কথা ছিল প্রমীলার পাশে’, নজরুলের জন্য কয়েক পঙক্তি-২০০৫’ সহ কয়েকটি কবিতা লেখেছেন, যা নজরুলকে নতুন ভাবে চেনা জানার কৌতুহল জাগায়।

যাক, এ বিষয় নিয়ে “মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতায় নজরুল বন্দনা” নামে একটি আলাদা রচনা লিখার আশা আছে বিধায় নজরুল বিষয়ক কবিতায় এখানেই ইতি টানছি। কবিতার মতো গদ্যেও মুহম্মদ নূরুল হুদা বহুপ্রজ সফল এক লেখক। ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমী থেকে “শর্তহীন শর্তে” নামক প্রবন্ধ গ্রন্থের মধ্যদিয়ে প্রাবন্ধিক মুহম্মদ নূরুল হুদার অগ্র যাত্রা শুরু। ‘শর্তহীন শর্তে’ থেকে শুরু করে একে একে Methodology: Valuation of Identified Traditional Cultural Expressions of Bangladesh পর্যন্ত মোট ২১টি প্রবন্ধ গ্রন্থের নির্মাতা তিনি (অবশ্যি সম্পাদনা গ্রন্থ ছাড়া)। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে লেখালেখি করার পাশাপাশি নজরুল বিষয়ক দু’চারটি মৌলিক প্রবন্ধ গ্রন্থও প্রকাশ করেন তিনি। মুহম্মদ নূরুল হুদা তার রচিত নজরুল বিষয়ক মৌলিক ৪টি গ্রন্থে বিভিন্ন অনুসন্ধিৎসায় নিজস্ব গবেষনার ফসল উদঘাটন করেছেন। এ গ্রন্থগুলেকে যথার্থ গবেষনাকর্ম হিসেবে কেউ কেউ স্বীকার না করতে চাইলে ও তাঁর গভীর অনুসন্ধিৎসু ও নিষ্ঠার স্বাক্ষর যে রেখেছে তা স্বীকার রেখেছে তা স্বীকার করতে দোষের কী? ১৯৯৬ ইং সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত নজরুল ইনষ্টিটিউট, ঢাকার নির্বাহী পরিচালক থাকাকালীন সময়ে নজরুল বিষয়ক মৌলিক এবং সম্পাদনা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

তাঁর মৌলিক গ্রন্থের মধ্যে-(১) শিশু সাহিত্য-(ক) ছোটদের নজরুল জীবনী (২০০১)। (২) গবেষনা গ্রন্থ- ক. নানন্দিক নজরুল (২০০১), খ. Nuzrul aesthetics and other Aspects (2001) গ . Atatruk’s Influence (2001)| এ ছাড়া বিভিন্ন পত্র পত্রিকা, সাময়িকী ও মাসিক পত্রকায় তাঁর নজরুল বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে প্রায় শতাধিক এই প্রবন্ধ গুলোতে নজুরুলকে জানার, বুঝার এবং চিনের নিরলস প্রচেষ্টা দেখার মত। বিভিন্ন দৃষ্টি কোন মূল্যায়ন প্রয়াসী হওয়াতেই বিষয় বৈচিত্রে সুস্পষ্ট চাপ তাঁর রচিত গ্রন্থ ও প্রবন্ধে ফুটেছে। তাঁর প্রথম মৌলিক গ্রন্থ ‘নান্দনিক নজরুল’ ২০০১ সালের একুশে বইমেলায় আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থ নজরুল সাহিত্য আলোচনার একটি উল্লেখ যোগ্য গ্রন্থ। এতে নজরুল জীবনীর একটি সুদীর্ঘ অধ্যায় ছাড়াও বিভিন্ন অধ্যায়ে নজরুলের কবিতা, শিশু সাহিত্য, গদ্য সাহিত্য এবং নজরুলের কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ ইত্যাদি সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। ‘ছোটদের নজরুল জীবনী’ বইটি সত্যিকার অর্থে ছোটদের জন্য লিখিত। নজরুল মানসে শিশু- চরিত্র বৈশিষ্ঠ্য ও ছোটদের নজরুল জীবনী ধারাবাহিক বর্ণনা দিতে প্রয়াসী হয়েছে। এতে একদিকে একটা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ যেমন রয়েছে, অপর দিকে কবি চিত্তে শিশুর ভাবও ফুটে উটেছে। নজরুল ইসলামকে বহির্বিশ্বে পরিচিত করার লক্ষ্যে- ড. গোপাল হালদার, মীযানুর রহমান, উইলিয়াম রাড়িচে, কবির চৌধূরী, প্রবোধ চন্দ্র সেন, আমির হোসেন চৌধূরী, সিরাজুল ইসলাম চৌধূরী, আবু রূশ্দ, বাসুদা চক্রবর্তী, করুণা গোস্বামী, প্রীতিকুমার মৈত্র, তারিনী প্রসাদ ঘোষ, জাহাঙ্গীর তারেক, এস. কৃষ্ণমুর্তি, লাবিবা হাসান পাইখাই ইউয়ান, সুব্র“ত কুমার দাস, অধ্যাপক ডাব্লিউ. এফ লংলি, সাজেদ কামাল, সাইয়েদ মুজিবুল হক, আব্দুল হাকিম সহ কয়েকজন নজরুল চর্চার যে ধারা প্রবাহিত করে যাচ্ছেন, মুহম্মদ নূরুল হুদাও তার অংশীদার।

ইংরেজী ভাষায় নজরুল বিষয়ক তাঁর গ্রন্থদ্বয় Nazrul Aesthetics and other Aspects (2001) এবং Atatruk’s Influence (2001)| এ গ্রন্থদ্বয়ে নজরুলের কাব্য, গদ্য সাহিত্যের বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। নজরুল সাহিত্য বিবেচনায় অন্যান্য লেখকের ইংরেজী বইয়ের মতো এই বইও নজরুলকে বহির্বিশ্বে পরিচিত করতে উল্লেখ্য যোগ্য সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। ষাট বছরের অধিককাল ধরে নজরুল সাহিত্যের আলোচনা সমালোচনায় মৎ সংগৃহীত এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে, ২৫০ জনের অধিক লেখকের ৫৫০টি নজরুল বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশের যে ধারা প্রবাহিত হয়েছে এবং হচ্ছে, স্বল্প হলেও মুহম্মদ নূরুল হুদা তারই অংশীদার। পেশাদার নজরুল গবেষক না হয়েও আমলা হিসেবে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা নজরুল বিষয়ক যেসব গ্রন্থ একক সম্পাদনা করেছেন- ‘Nazrul: An Evalution. (2001, N.T), oetry of Kazi Nazrul Islam in English Translation’ 1997)নজরুলের হারানো গানের খাতা (১৯৯৭), নজরুল ও বঙ্গবন্ধু (১৯৯৭), জন্মশত বর্ষে নজরুলকে নিবেদিত কবিতা (১৯৯৯), নজরুলের মক্তব সাহিত্য (২০০১), নজরুলের লাঙল (২০০১) ইত্যাদি। নজরুল বিষয়ক গবেষক রফিকুল ইসলাম, আবুল কালাম আজাদ, সুধীন দাশ, রশিদুন্নবী সহ কয়েক জনের সাথে অন্যতম সম্পাদক হিসাবে নজরুলের উপন্যাস সমগ্র (১৯৯৭), নজরুলের কাব্যনুবাদ (১৯৯৭), নজরুলের নির্বাচিত নাটক (১৯৯৭) নজরুলের ছোটগল্প (২০০১) রেকর্ড ভিত্তিক নজরুলের সঙ্গীতের নির্বাচিত বাণী সংকলন (১৯৯৭)।

এ সম্পাদনা গ্রন্থগুলোতে দেশী-বিদেশী বিভিন্নজনের নজরুল বিবেচনা সংকলিত হয়েছে। যা ভাবি নজরুল গবেষককে নজরুল গবেষণা কাজে সহযোগিতা করবে। মুহম্মদ নূরুল হুদা তাঁর স্বকীয় দৃষ্টিপাতেই নজরুলকে অবলোকন ও মূল্যায়ন করেছেন। কোন বহির্দেশী প্রেরণা বা তাড়নায় নয়, সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনাই তার কণ্ঠে উচ্চারিত। তারই আরেক নতুন প্রকাশ তার নজরুল সাহিত্য বিবেচনা। নজরুল ও কাব্য বিবেচনা তার গদ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুহম্মদ নূরুল হুদার বিবেচনা তাঁর আত্মবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত। ‘নজরুল সাহিত্য সাধনার মূলে প্রেরণা দান করেছে সমাজ বিপ্লবের এষণা’। নজরুলের পুর্বসূরী রবীন্দ্রনাথ সহ কয়েকজন বলেন- জাগো দেশ, জাগো জাতি। আর নজরুল বললেন- জাগো নিপীড়ত, জাগো কৃষক, শ্রমিক, জাগো নারী। এখানেই তাঁর স্বাতন্ত্র ষ্পষ্ট এবং এখানেই তিনি কালোত্তর।

দীর্ঘদিন মার্কসবাদ ও তৎকালীন রাজনীতি বিষয়ে অল্পবিস্তর জ্ঞানগম্যি স্বত্ত্বেও নিজেকে একনিষ্ঠ পার্টি সদস্য হিসেবে হাজির করেন। তার একান্ত বন্ধু কমরেড মুজাফ্ফর আহমদের সান্নিধ্যে তাঁর কবি জীবন পার্টি জীবনে পরিণত হয়নি। মার্কসীয় সামাজিক মমতা নজরুল মোটামুটি গ্রহণ করেছেন, কিন্তু মাকর্সীয় তত্ত্বের ছকে ফেলে কবিতা রচনা করেন নি তিনি। জগৎ ও জীবনের সকল ক্ষেত্রে নজরুল পদ্ধতির শিকল ভাঙতে চেয়েছেন। নজরুল ইনিষ্টিটিউট এর নির্বাহী পরিচালক থাকাকালে দেশী-বিদেশী নজরুল বিষয়ক বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। নজরুল সাহিত্যে অবদানের স্বরুপ নজরুল জন্মশত বার্ষিকী সম্মাননা (১৯৯৯, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ), নজরুল জন্মশত বর্ষ উদযাপন সম্মাননা (১৯৯৯, যশোর),নজরুল ফাউন্ডেশন সম্মাননা (২০০০, কলকাতা), নজরুল জন্মশত বার্ষিকী গুণীজন সম্বর্ধনা (বাংলাদেশ আইনজীবী সংসদ, ২০০১), নজরুল সম্মাননা (২০০৯) অর্জন করেন। জনৈক ইংরেজ সমালোচক ভাষায় কবি হচ্ছেন At the most conscious point of his age (ড: মো. হারুন-অর-রশিদ, শিল্পিত নজরুল: অন্বেষিত অপচয়, ফেব্র“য়ারী ২০০৪ ঢাকা, পৃ: ৭১) জাগ্রত বিবেক ও যুগ চৈতন্যের উজ্জল প্রতিভার স্বাক্ষর বেখে কালের তাগিদ, কার প্রয়োজন ও কালের বিবেক কবি নজরুলের কাব্য- গদ্যে গাঢ়বদ্দ বাণীরূপ যে লাভ করেছে মুহম্মদ নুরুল হুদা তাঁর কাব্য- গদ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। যা নজরুল কাব্য-গদ্য সাহিত্য বিবেচনায় অন্যান্য বিবেচকদের থেকে আলাদা। এখানে তিনি স্বাতন্ত্র। তাঁর কবিতায় বাঙ্গালী জাতির পুরান ইতিহাস-ঐতিহ্য অন্বেষনের সূত্রে জাতির ব্যক্তিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বিপন্ন দশা, নিমকহারামী, স্বার্থপরতা ইত্যাদির বিরুদ্ধে কথা বলতে লেখনী ধারণ করতে পিছপা হননি- ‘রাজপথে ত্রিকাল দর্শক সে অন্ধ পুরোহিত যার রক্তে রাজপথ নদী বনে যায়’- এই শাতিতিক মন্ত্রতুল্য উচ্চাকাংখায় তিনি ‘প্রতীক মানুষ’।

সমকাল জ্ঞান, ইতিহাস জ্ঞান ও জাতিসত্তার সমবায়ে কাব্য ভূগোলপ্রদীপ্ত কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা তাঁর কবিতায় স্বাধীনতাকে তুলে এনে স্বাধীনতার কাব্য ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছেন বলে মনে হয়। তাঁর স্বাধীনতা বিষয়ক কবিতায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশ, কবি শামসুর রাহমান, কবি আল মাহমুদ, কবি ওমর আলী, কবি শহীদ কাদরী, হাসান হাফিজুর রহমান, সিকান্দার আবু জাফরের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। স্বাধীনতার পর বাংলা কাব্য সাহিত্য যে নতুন বাঁক নেয়, এ ক্ষেত্রে কবি মুহম্মদ নুরুল হুদার ভূমিকা অগ্রগন্য। বাঙ্গালী জাতিসত্তার শেখড় সন্ধানে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা তাঁর কাব্যে, উপন্যাসে প্রতিফলিত।

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগস্: ,

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

সংরক্ষণাগার

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
Nobobarta © 2020 । About Contact Privacy-PolicyAdsFamily
Design & Developed BY Nobobarta.com