কবি জয়প্রকাশ সরকার এর ১০ টি কবিতা | Nobobarta

আজ বুধবার, ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, সকাল ১১:৫৯মি:

কবি জয়প্রকাশ সরকার এর ১০ টি কবিতা

কবি জয়প্রকাশ সরকার এর ১০ টি কবিতা

চুরি গেছে

শোন, পূর্বের একটি ঘটনা
বলি তোমায়-
শান্তিনগর খেলার মাঠে;
রানাঘাট, নদীয়ায়।

দিনটি ছিলো বোধহয়
সপ্তাহের শনিবার?
একাকী মাঠে আমি,
সঙ্গী ছিলো না আর।
পূর্বদিকে ছা দেবদারুর
লাইন সারি সারি,
সময় মনেতে ঘা দিয়ে যায়,
কখন যাবো বাড়ী?

প্রকৃতির রঙে মোড়ানো একটি
গাছ পশ্চিম দিকে,
দেখতে এগোচ্ছিলাম;
মনেতে কিঞ্চিৎ দ্বিধা রেখে।
গাছটিতে ঝুলছিল
জোড়া ফল,
ঘাই হরিণীর চাহনি যে ;
নির্বাক শতদল।

Rudra Amin Books

কি ভেবে যে এগোইনি যে?
নানান ভাবনা;
ফিরে গেলাম বাড়ীতে,
চিন্তার আনাগোনা।
ঘটনার আরো স্বাক্ষী আছে,
অনতি দূরত্বের যারা
বলবে সে স্মৃতি আজও,
ভুলবে না তারা।

পরের দিন গিয়ে দেখি,
গাছ হয়ে গেছে দাস!
গাছ-ফল হারায়েছি দুই’ই;
কষ্টে দীর্ঘ নিঃশ্বাস।
পরিবর্তন নাই খুব একটা,
এদিক ওদিক ঘুরি;
অমূল্যধন হারিয়েছে শুধু,
গাছটা গেছে চুরি।

অযুহাত

শত পাখা গজায় তার!
ডানা মেলে আকাশে ওড়ে;
আমি বিনিদ্র, কারণ খুঁজি
দীর্ঘ নির্ঘুম রাতে-
শত দিক চিন্তা করে।

কেন গজালো?
কিভাবে হলো?
কেনই বা হবে ?
যত্তসব আজব ভাবনা!

চৈত্রের তীব্র খরায়,
পরিস্কার নীল আকাশের নীচে,
ধরনী তপ্তবুক জুড়ানোর-
অপেক্ষায় বসে থাকে।
আকাশের ভয়াল কালো
আশাজাগানিয়া মেঘ
বৃষ্টিহীন চলে যায়,
বায়ুপ্রবাহের অযুহাতে।

পাহাড়ি ঢলে যখন ধরনীর
তৃষ্না জুড়াবার আশা,
হয় না পূরণ!
সোজা সাগরে চলে যায়,
স্রোতের অযুহাতে।

আম্রকুঞ্জের পাকা ফল ঝরে,
চারাগাছ তৈরী আর
জৈষ্ঠের গরমের অযুহাতে।

লিচু বাগানে মুকুল না ধরে
নিস্ফল বছর কাটায়,
পাতা গজানোর অযুহাতে।

পাকা পেয়ারাগুলো
অখাদ্য হয়ে যায়,
বৈরী আবহাওয়ার অযুহাতে।

বসন্ত শেষ না হতেই
কোকিল চলে যায়,
মিথ্যে ঋতুর অযুহাতে।

একটি অযুহাত ঢাকার চেষ্টায়
ডালপালা নিয়ে-
মিথ্যের বৃদ্ধি একরাশ।
তবুও যে,
না জড়ায় সংঘাতে।

শত অযুহাত সহ্য সাধারণ,
সুদাসলে কপটতা বৃদ্ধি!
অসম খেলার সহ্য সবই,
স্বাদের এই ধরনীতে।

শেষ বিন্দুজল

পরিপাটি যত সৌন্দর্য সকল
বাইরের আবরণ,
অপেক্ষার প্রহর গুনে
মৌন মন মরণ।
যেভাবে তুমি বুঝতে পারো
প্রকৃতির বর্নমালা,
সেই তুমিই যে বুঝো না মোটেই
হৃদয়ের অসহ্য খেলা।

শত সহস্র রজনী- দিবস
চলে গেল নিমিষে-
দেখতে তোমার উপস্হিতি,
মেঘ শতদল বরষে।
না দেখে তোমায় বৃক্ষ সকল
ঝরা পাতা উপহারে,
তাদের কতক প্রবল ঝড়ে
প্রকৃতির সংহারে,
আসো না তবুও তুমি !

উদ্বিগ্ন আবাদি মাটি,
প্রখর বায়ুতে বালুঝড় দেখি,
দেহেতে লুটোপুটি।

তুমি আসো না বলে যে গ্রীষ্ম
উল্টাপাল্টা সাধে,
শত শত শত, সহস্র ভূমি
থাকে যে অনাবাদে।

তুমি আসোনি বলেই স্তব্ধ
সময়ের বারতা,
কাছাকাছি চাই স্রোতস্বিনী তুমি
শোন হে, প্রেয়সীলতা।

প্রেমিক জানে প্রেমগভীরে
জানে যে নিশ্চয়,
পদ্মপাতার শেষ বিন্দুজলেও
প্রাগাঢ় ভালবাসা হয়।

চৈতন্যে অচেতন

আর কতকাল?ব্যবসা চলবে? স্মৃতিযুদ্ধ নিয়ে?
সত্য-মিথ্যা খিচুড়ি রচন;কল্পনার চোখ দিয়ে।

তৈলমর্দন করতে করতে,কালি কলম চাঙ্গে;
ঘুম হয় না,চিৎকার করি;অকালনিদ্রা ভাঙ্গে।

শীতকালেতে ঘষে ঘষে দেহের ময়লা তুলি,
অতিঘষাতে চেতনার দোয়াত উল্টে কালো-কালি।

দেশের বয়স অর্ধশত,এই বুঝি হয়ে যায়?
তবুও তারা ধামাধরা আজও, চেতনা খুঁজে না পায়!

মৃত্যুবধি জন্মের দোষে যে ছেলেটি কাঁদে,
জানতো সে কি? কার বীর্জে গর্ভের আবাদে?
আমার
গর্ভধারিনীর
লজ্জা;
তোমার চেতনা হাসে!
দেশমাতৃকা প্রলুব্ধ আজ,অসংখ্য নাগপাশে।

জন্মদাত্রীর দেহখানি বিনে?মুক্তি কি করে আসে?
মাতৃভূমির গর্ভের আমি;বেজন্মা তাদের দোষে।

জন্মের দোষে ধিক্কার-নির্মম;মানবতার কথা,
অতি চেতনার ধোঁয়া তুলে শুধু স্বার্থের আকুলতা।

কেউ কামলা,কেউবা মনিব হতে পারে বহু কিছু,
সবার অবদান দেশের তরে,চেতনা না ছাড়ে পিছু!
করেছে যে জন অপরাধ সে বিচারে শুদ্ধ হয়,
জন্মের দোষে অপরাধী করা বাঞ্ছনীয় নয়।

অধিকার আছে আমার এ দেশ;
তোমায় ভালোবাসি,
হলে, হই না আমি?
অজানা বীর্জে জন্মানো এক বাংলাদেশী।

আশায় আশায়

দেহের সীমানা পাড়ি সহজেই ,
মনের সীমানা নয়!
যতবার আমি,
ছাড়ি এ দেশটা;
মনটা পড়ে’ই রয়।

নতুনের আশায় পুরাতন ফেলি
মনে তো ছাড়ে না!
আমি তোমার আশায়
পিতা মাতা ত্যাগী;
মনেতে লাগে ঘা।

কি করে চলি?অথৈ নদী
দুই পায়ে দুই নাও!
আমি সুখের আশায়
ভাইবোন ছাড়ি;
খোঁড়া হয় দুই’ পাও।

আশায় আশায় ছাড়াছাড়ি যত
পুরাতন- নতুন মিশে,
সাধ মিটে গেল
এই ভুবনে;
জীবনের নাই দিশে!

সবুজের খোঁজে

পতাকার সবুজ অংশ
কুঁড়ে কুঁড়ে খায়-
যত্তসব হায়েনার দল!
স্বপ্নে কেবলই;
লাল বেড়ে চলে
অর্ধ শতাব্দীর দেশে,
স্রোতহীন শতদল।

খুঁজে পাওয়া দুঃস্কর আজ
সবুজ রং’য়ের আভা;
যতই তোমরা বুলি কপচাও
করছো জাতির সেবা!

যুদ্ধাপরাধ কলঙ্ক যখন
একটু মুছতে যাই,
মুক্তিযোদ্ধা গেজেট প্রথা
বগলে চাপাই;
ছেলেপুলে আর নাতিপুতিতে
দেশটা হয় বিলীন;
সবুজের অংশ আবার কমে
লালে সাবলিন।

রক্ত,শুধু রক্তই দেখি
সব লালচে হয়ে যায়;
স্বপ্নে শুধু রক্তই মেলে
মুজিবের পতাকায়।

লুটেপুটে খাবার তরে
অস্ত্র ধরি নাই,
মনিব যেথায় জীবন দিলো;
কামলা সবই পাই!

নিত্য আমি সারারাত্রি
সকাল দুপুর সাঝে,
সময় চলে, ঘুম ধরে না
আশা সবুজের মাঝে।
অংশটুকু ম্লান হয়ে যায়
রক্ত লালের বোঝা;
তবুও চেষ্টা,ছাড়ি নাই আজও-
চিরন্তণ সবুজ খোঁজা।

নাছোড়বান্দা স্বপ্ন

দুই পাড়ে অসংখ্য কদলির চাষ,
স্বচ্ছ সবুজ জলের রং,
ছোট বড় হেলানো মোচার সমাহার
অন্তে তার, মৃদু বাতাসে ঢং।
ঝাউগাছ গুলো সবুজতা বাড়ায়-
পূর্বে দূর্বাঘাস জন্মেছে অনেক;
জলে কিছুটা লোনার আভাস,
আজও আবেগে হারাই-
স্মৃতির কতেক।

দু’পাশে ঘন বসতি, অধিকাংশ-
বাংলাদেশ
থেকে
আসা
রিফিউজি,
উদাস বৃদ্ধরা; তবু,
কেটে যায় বারোমাস!
মৃদু বাতাসে, মাটিতে স্বস্তি
নিতম্ব স্পর্শে সবল দূর্বাঘাস।

নীরবে বসে আছো পশ্চিম তটে;
উদাসী মনে চিন্তার আভাস;
অনেক গরম পড়ছে এখন
বোধহয় ভাদ্রমাস!

বানের জলে টইটুম্বুর নদীখানা;
জেলেরা ভেসাল পেতেছে-
কষ্ট বহুৎ,খুব কায়দা করে;
জোটাতে দু’ মুঠো খানাপিনা।
শান্ত নদীর মৃদু স্রোতে
ভাসছে কচুরিপানা,
আয়ত্তে আনতে জেলেদের
নিশিব্যাপী ঘুম হয় না।
আশা বাঁধে উটকো ঝামেলায়
হাওয়াই স্হাপনা- না যেন নড়ে!
স্বপ্ন বুকে-জালেতে যেন
বড় মাছখানা পড়ে।

নতুন ব্রীজ নদীর উপরে,
একাকী নৌকোতে বসে;
বৈঠা চালাই দিকশূন্য,
উল্টো হিসাব কষে।
ডাকাত?না যোদ্ধা রানা?
কি লাভ ভেবে?
সৌন্দর্যে অপরূপা!
অযথা নামের আনাগোনা!

এই নদীর’ই টলটলে জলে
একটি বৃহৎ মাছ নজরে,
হয়তো বা চেনা!
আজব মৎস্য যে,
নাই সাথে একটিও পোনা।
এ রকম মৎস্য দেখিনি আগে;
বড়ই ব্যস্ত সে, নয়ন দর্শনে তার;
ভ্রমণ পিপাসা জাগে।

এবারই প্রথম দেখা তোমার
অপরূপার সাথে ;
সত্য মনে স্বপ্ন দেখি,
দিনের প্রভাতে!
সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরে যাও,
প্রার্থনায় প্রতি রাতে,
চন্দ্রালোকে পিছু পিছু;
এক,ছায়া তোমার সাথে।
মনটা ফেরাই তখন আমি,
ছোট বাজারের খোজে;
দৃষ্টি রাখি, মুগ্ধ হই,
তোমার পদব্রজে।

তুমি বুঝতে পারো না,
বুঝবেই কি করে?

কচুরিপানা সরে গেল যে,
করে দিল দেখার স্হান;
সে যে-
কালিগঙ্গা
থেকে
চূর্নীতে
ঘুরে,
কাছে পেতে তোমায়;
জলেতে অবস্হান।

আমি একবার হারাই
মাছের মাঝে,
দাঁড়িয়ে পূর্ব বাজারে;
আবার হারাই-
তোমার মাঝে;
হারাই চিরতরে।

আজকের দিনগুলি

মরাপাতা ঝরে যাওয়ার অসীম চঞ্চলতা,
বাপ-দাদার ভিটের পূর্বপাশের কাঠবাগানে-
মেহগনি আর ইউক্যালিপটাসের নিদারুণ চাহনি,
পাশে শত বছরের স্বাক্ষী কালী মন্দির।

গ্রামের কোমল কিশোরদের মাঠের অভাবে
বৃক্ষতলে খেলা করা-গোল্লাছুট কিংবা ডাংগুলি।
খেলা হয় না তাদের আজ বিস্তীর্ন মাঠের খেলাগুলি।

বাড়ীর পশ্চিমে যে ভিটের অবস্হান,
সেখানেও যে ব্যবসায়ী বৃক্ষ,
হয় না খেলার অধিষ্ঠান।
বিঘার পর বিঘা মাটি ভরাটকরন;
আবাদি ভূমির বিনাশ,
মিল-কারখানা স্হাপনের কল্পনা;
আজ বিকশিত শিশু-কিশোরদের অধিক বঞ্চনা।

সময় চলে যায়; নতুন বছর আসে,
তীব্র সুগন্ধি বিস্তার করে বৈশাখী বাতাসে-
প্রকৃতির রজনীগন্ধা আর হাস্নাহেনারা।
গাঁটছড়া দামালেরা বেরোয়
আধুনিকতার ছায়াতলে।

তবু ধরে রাখতে মন চায়
বাপ-দাদার পুরোনো সংস্কৃতি ;
দৌড়- ঝাপের পুকুরে আজ বড়ই নিঃস্তব্ধতা,
নেশায় প্রকৃতি প্রমত্তা সাধে,
পরিমানে খুব অল্পই-থাকে যে অনাবাদে।

স্বার্থপর

আমি সমুদ্রের কাছে যাই-
হৃদয় যেন তার মত বিশাল হয়;
পরক্ষণে সমু্দ্রকেই নিজের মনে হয়।

যাই খরস্রোতা নদীর কাছে,
যেন প্রবাহ চিন্তা বিরাজে সব সময়;
পরক্ষণে নদীকেই নিজের মনে হয়।

সুউচ্চ পর্বতে শীতল হাওয়ায় প্রাণ-
জুড়ানোর স্বপ্ন যেই সময়;
পরক্ষণে উহাকেই নিজের মনে হয়।

ভয়ঙ্কর বালুঝড় দর্শন আশায়,
অপেক্ষার প্রহর গুণি;পরক্ষণে-
মরুভূমিকেই নিজের মনে হয়।

তুমি বলো;এ হলো-মৃত নদীর
নিস্প্রান বালুময় চর;
হালকা বায়ু প্রবাহিত হলে
চোখে – নাকে লেপটে যায়
বালু অতিশয়। তবুও;কেন যে?
মনে হয় না-এতটুকু পর?
আমি বড়ই স্বার্থপর!

অগ্নিনামা

কেন পোড়াতে চাইলে তাকে?
কেন পোড়ালে?
জগৎজন্মের
অগ্নিতে
জন্ম
যার-
তাকে কেন পোড়ালে?

অগ্নিতে নিদ্রা যার,
দাউদাউ নিঃশ্বাস ছাড়ে;
দেহ যার-
গলিত
লাভার
তাপে,
তাকে পোড়াবে কি করে?

কেন আগুন জ্বালালে?
পোড়াবার তরে?
আগুনে কি
আর
আগুন
পোড়ে?
তাকে কেন পোড়ালে?

অগ্নিতে অগ্নি
পুড়ল না ছাই!
দাবানল
বনে
জ্বালালে;
তবুও আগুন ধরালে?

ফেসবুক থেকে মতামত দিন


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

সংরক্ষণাগার

Nobobarta © 2020 । About Contact Privacy-PolicyAdsFamily
Developed By Nobobarta