৩১ দুর্গম দ্বীপে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ফ্রি ইন্টারনেট সুবিধা

এমদাদুল হক তুহিন, ঢাকা: দেশের দুর্গম ও উপকূলীয় এলাকার ৩১টি দ্বীপ এখন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ব্যান্ডউইথের আওতায়। ১১২টি ভি-স্যাটের মাধ্যমে সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে ব্যান্ডউইথ। ফলে মোবাইল ইন্টারনেট ও অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ ছাড়ায় সেখানকার মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন। ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে ফ্রি ইন্টারনেট ব্যবহার করছে সেখানকার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষ। এছাড়া এসব এলাকা টেলি মেডিসিন ও টেলি এডুকেশনেরও আওতায় আনা হবে বলেও জানিয়েছে বাংলাদেশ কমিউনেকশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএসসিএল)।

এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রথম ধাপে ৩১ দ্বীপকে নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। আরও ৪০টি দ্বীপ বা চর যেখানে পৌঁছাতে পারছি না, সেখানেও ইন্টারনেট সেবা দেওয়া হবে। দুর্গম এলাকাগুলোকে নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে প্রথম ধাপের কাজ শেষ পর্যায়ে, দ্বিতীয় ধাপের কাজও শুরু হচ্ছে।’

বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএসসিএল)-এর চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘টেলিভিশন চ্যানেগুলো ছাড়াও ইতোমধ্যে আমরা প্রায় ৩১টি দ্বীপে যেখানে কোনো ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল যায়নি বা যেখানে কোনো টেলিফোন সেবা বা ব্যান্ডউইথ ওখানে পৌঁছায়নি সেখানে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ১১২টি ভি-স্যাটে বসিয়ে ব্যান্ডউইথ সাপ্লাই করছি। ওই সমস্ত এলাকায় টেলিমেডিসিন ও টেলি এডুকেশন সেবা প্রদান করার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।’

স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দ্বীপ এলাকায় নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক হামেদ হাসান মুহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দুর্গম এলাকার ৩১টি দ্বীপকে ইন্টারনেটের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। সেখানে ডাউনলোড স্পিড ১০ এমবিপিএস ও আপলোড স্পিড দুই এমবিপিএস। দ্বীপগুলোর বাসিন্দারা তাদের নিজস্ব ডিভাইসে ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে ফ্রি ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন। এখন পর্যন্ত টাকা-পয়সা নেওয়া হচ্ছে না, আগামী দুই বছরও টাকা নেওয়া হবে না।’

Rudra Amin Books

বিসিএসসিএল জানিয়েছে, পটুয়াখালীর চর কাজল, চর বিশ্বাস, বাহের চর, চর বোরহান ও চন্দ্রদ্বীপসহ এলাকার সাতটি দ্বীপ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেটের আওতা এসেছে। এছাড়া চাঁদপুরে আটটি, পিরোজপুর, বরিশাল নোয়াখালীর একটি করে এবং ভোলার ১১টি দ্বীপে এ ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপে মোবাইল ইন্টারনেট সুবিধা থাকলেও জরুরি যোগাযোগের জন্য সেখানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালু করা হয়েছে। এসব এলাকার সরকারি-বেসরকারিসহ ১১২টি প্রতিষ্ঠানে এখন ফ্রি ইন্টারনেট ব্যবহার করা যাচ্ছে। এলাকাগুলোর বাসিন্দারাও এখন ফ্রি ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছে। আর ২০১৯ সালের মার্চে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অনলাইন নববার্তা-কে জানাতে ই-মেইল করুন- nobobarta@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

প্রসঙ্গত, ভি-স্যাট (ভেরি স্মল অ্যাপারেচার টার্মিনাল) হচ্ছে খুব ছোট আকারের সংযোগযন্ত্র যা দ্বিমুখী ভূ-উপগ্রহকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এর থালা আকৃতির অ্যান্টেনার ব্যাস তিন মিটারের কম হয়, যেখানে অন্যান্য ধরনের উপগ্রহ কেন্দ্রের ব্যাস হয় প্রায় ১০ মিটারের মতো। আর এই ভি-স্যাটের মাধ্যমে উপকূলীয় ৩১ দ্বীপকে ব্যান্ডউইথের আওতায় আনা হয়েছে।

২০১৮ সালের ১২ মে বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ২টা ১৪ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে দেশের প্রথম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’র সফল উৎক্ষেপণ হয়। নিজ কক্ষপথ ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রিতে পৌঁছানোর পর এর ইন অরবিট টেস্টসহ (আইওটি) নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হয়। পাওয়া যায় সফল সংকেত। উৎক্ষেপণের ছয় মাসের মাথায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর মালিকানা ও দেখভালের দায়িত্ব বুঝে নেয় বাংলাদেশ। এরপর থেকে বাংলাদেশ কমিউনেকশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএসসিএল)-এর অধীনে স্যাটেলাইটটির সম্পূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ চাম্পিয়নশিপ সরাসরি সম্প্রচারের ক্ষেত্রে সফলতা দেখায় দেশের প্রথম এই স্যাটেলাইট। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর মাধ্যমে বিটিভিতে খেলা দেখানো হয়। মাত্র এক বছরের মধ্যেই স্যাটেলাইটটির বাণিজ্যিক কার্যক্রমও শুরু হয়। দেশের সবকটি টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিও এখন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রচার কার্যক্রম চালাচ্ছে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ক্যাবল ছাড়া টিভি দেখার ডিটিএইচ সেবাও চালু হয়েছে। এখন পর্যন্ত বেশ জনপ্রিয় এইসেবা। এদিকে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ উৎক্ষেপণের লক্ষ্যে এগিয়ে চলছে কার্যক্রমও। এরইমধ্যে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য পরামর্শকও নিয়োগ করা হয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী ২০২৩ সালের মধ্যে এর কার্যক্রম চালু হওয়ার ঘোষণা রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২-এর উৎক্ষেপণের লক্ষ্যে কাজ করছে বিসিএসসিএলও।

বিসিএসসিএল-এর তথ্যমতে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। এরমধ্যে ২৬টি কেইউ ব্যান্ডের। বাকি ২৪টি ইনসেটসি ব্রান্ডের। বর্তমানে বিদ্যমান স্যাটেলাইটগুলো সি ব্যান্ডের। তবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটির ইনসেট সি। অন্যান্য স্যাটেলাইটগুলোর সঙ্গে দেশের স্যাটেলাইটের পার্থক্য এটাই। বিসিএসসিএল জানিয়েছে, এরইমধ্যে ডিরেক্ট টু হোম’ (ডিটিএইচ) সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান আকাশ ছয়টি ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দিয়েছে। এখন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সবচেয়ে বড় গ্রাহক তারাই। বাইরের কয়েকটি দেশ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ট্রান্সপন্ডার ভাড়া নিতে আগ্রহ দেখালেও এখন পর্যন্ত কোনো সুখবর মেলেনি।

 

সূত্র: সারাবাংলা

আপনার মতামত লিখুন :