হার্ড ইমিউনিটির আত্মঘাতী পথে আমরা? | Nobobarta

আজ মঙ্গলবার, ০২ Jun ২০২০, ০৫:১৮ পূর্বাহ্ন

হার্ড ইমিউনিটির আত্মঘাতী পথে আমরা?

হার্ড ইমিউনিটির আত্মঘাতী পথে আমরা?

Rudra Amin Books

ডা. জয়প্রকাশ সরকার : বাংলাদেশের করোনা সংক্রমণের বর্তমান ক্রান্তিলগ্নে ব্যক্তিপর্যায়ের সবাই যেমন কমবেশি বিভ্রান্ত তেমনি রাষ্ট্রের শীর্ষ স্থানীয়রা আরও বেশী দিকভ্রান্ত বলে মনে হয়। একদিকে যেমন বাসায় না থাকলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে, অন্যদিকে বাসায় থাকলেও দারিদ্র্যের জন্য এই ঝুঁকিগুলো কমবেশি থেকেই যাচ্ছে। পৃথিবী ব্যাপীই স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা খাত, শিল্প খাতসহ আর্থসামাজিক খাতগুলো বেহাল এবং বিপর্যস্ত। এসবের বিবেচনাতেই চলমান লকডাউন শিথিল কিংবা তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেই মনে হয়।

গত ১০ মে দেশব্যাপী দোকানপাট সহ মার্কেট সীমিত আকারে খুলে দেওয়া হয়েছে। ঢাকার মতো জনবহুল শহরে যে শারীরিক দূরত্ব মানা সম্ভব হবে না,এটা নীতি নির্ধারকেরা ভালো করেই জানার কথা! যার ফলশ্রুতিতে ঢাকাসহ সারা দেশের রাস্তাঘাট এবং মার্কেটগুলোতে আগের মতোই উপচে পড়া ভিড় পরিলক্ষিত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে স্বরূপে প্রত্যাবর্তন করছে। বাইরে প্রচুর জনসমাগম হচ্ছে যার সমান্তরালে ধারাবাহিকভাবে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।সংক্রমণ এবং মৃত্যু সামনের দিনগুলোতে যে শুধু বাড়তেই থাকবে—এটা শুধু আশঙ্কা নয় বরং অনেকটা নিশ্চিত। কারণ, লকডাউন শিথিল কিংবা তুলে নেওয়ার এই প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার রাষ্ট্রীয় মহলের যথেষ্ট ইঙ্গিত আপাত দৃশ্যমান মনে হচ্ছে। লকডাউনের সুবর্ণ সময়গুলো অলরেডি হারিয়ে গেছে।

একদিকে অর্থনীতি আর অন্যদিকে ভাইরাসটির দাপট সাথে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরের সমন্বয়হীনতা বাংলাদেশকে একটি অজানা ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু মুখে কথিত Herd immunity র দিকে হাঁটছে দেশ, বলেও শোনা যাচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে শেষ পর্যন্ত, বাংলাদেশ হার্ড ইমিউনিটির দিকেই যেতে পারে।

হার্ড ইমিউনিটি বলতে সাধারণভাবে বোঝায়, একটি অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী (প্রায় ৮৫%- ৯০%) যখন একটি সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়, সেই পরিস্থিতি।এটা দুই উপায়ে হতে পারে- প্রথমতঃ স্ব-ইচ্ছায় সংক্রমণ(সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়া বর্তমান ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) দ্বিতীয়তঃ টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে।যেহেতু করোনার কোন প্রতিষেধক এখনও আসে নাই সেক্ষেত্রে আমাদের প্রথম অপশনটাই বেছে নিতে হবে।

কোভিড -১৯ এতটাই ভয়াবহ জীবানু যার মর্টালিটি রেট প্রায় ১০- ১৫%(ইউরোপ,আমেরিকার দৃষ্টিতে)।যদি দেশ herd immunity র পথে হাটে এবং পুরো ইমিউনিটি ডেভেলপ করতে বছর দুয়েক লাগে তাহলে এই সময়ে দেশের ১০-১৫% মানুষের মৃত্যু হবে যা দেশের সকল সেক্টর এবং অর্থনীতির জন্য ভয়ানক।

আবার এই হার্ড ইমিউনিটি অর্জনও খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, আত্মঘাতী, জটিল এবং সময় সাপেক্ষ হতে পারে। এর জন্য কয়েক বছরও সময় লাগতে পারে।বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি চরম আত্মঘাতী হতে পারে। দীর্ঘদিন লকডাউনে থাকা জনগোষ্ঠী, অপুষ্টি এবং অন্যান্য রোগের কারণেও লকডাউন পরবর্তী সময়ে করোনা সংক্রমণ ও অন্যান্য সংক্রমণে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যাবে।

তখন আক্রান্তদের টেস্ট এবং চিকিৎসায় হাসপাতাল গুলোর বিদ্যমান অপর্যাপ্ত সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে। আরও ভয়ঙ্কর বিষয়, কোভিড-১৯ ভাইরাসটি হার্ড ইমিউনিটির জন্য কীভাবে কাজ করবে, কত সময় নেবে, পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কতটুকু, আরও অনেক বিষয় এখন অবধি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

উদাহরণস্বরূপ, আমরা লকডাউনকে ব্যাতিরেকে হার্ড ইমিউনিটি কিংবা জনগণকে স্বেচ্ছায় করোনা প্রতিরোধে সংক্রমিত হওয়ার পদ্ধতি অবলম্বন করার আগে সুইডেনের কথা ভেবে বাস্তব শিক্ষা নিতে পারি।বর্তমানে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে এই দেশটিকে।তাদের কতক বিশেষজ্ঞের পরামর্শে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রাজধানী স্টকহোম হার্ড ইমিউনিটিতে পৌঁছাবে এরকম বললেও তার প্রতিফলন নাই বরং উল্টো হচ্ছে। লাশের মিছিল বাড়ছে,সংক্রমণের অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়ার হার এবং টেস্টের সংখ্যা একেবারেই কম। সুতরাং মোট আক্রান্তের সঠিক সংখ্যাটা অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে। পাশাপাশি বিধ্বস্ত স্বাস্থ্য খাতসহ অন্য অনেক বিষয় বাংলাদেশের জন্য হার্ড ইমিউনিটিকে ভয়ঙ্কর করে তুলবে। সত্যি বলতে কোভিড-১৯–এর টিকা ছাড়া বাংলাদেশের জন্য সার্বিক করোনা প্রতিরোধ দুঃসাধ্য।

অনেক বিশেষজ্ঞরা বললেও আমার নিজস্ব ধারণামতে, হার্ড ইমিউনিটি বাংলাদেশের জন্য চরম অভিশাপ বয়ে আনবে যা আমাদের দেশকে ইউরোপ আমেরিকার চেয়েও অনেক বড় লাশের মিছিলের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দেশব্যাপী এখনো ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত রোগীর বড় সংখ্যা এই ধারণাকে বুঝতে আরও সুবিধা করে দিবে।

বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে লকডাউনের মাধ্যমেই সংক্রমণ প্রতিরোধের বিকল্প নাই। অ্যান্টিবডি টেস্টও শুরু করা যেতে পারে। অপেক্ষা করলে ভাইরাসটিও দূর্বল হয়ে যেতে পারে। অ্যান্টিবডি টেস্টের মাধ্যমে জনগণের কোন অংশ সংক্রমিত এবং কোন অংশ ইতিমধ্যে ইমিউনিটি লাভ করেছে, তা নির্ণয় করা যাবে।পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ এবং শিশুদের আরও কয়েক মাস অবশ্যই ঘরে থাকতে হবে। স্বাস্থ্যবিধিগুলোকে জীবনের অংশ মনে করে চর্চায় রাখতে হবে।

ডা. জয়প্রকাশ সরকার : কবি,লেখক ও চিকিৎসক।


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.






Nobobarta © 2020 । About Contact Privacy-PolicyAdsFamily
Developed By Nobobarta