শহীদ শেখ রাসেলের ৫৫ তম জন্মদিন আজ – Nobobarta

আজ বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ১২:১২ পূর্বাহ্ন

শহীদ শেখ রাসেলের ৫৫ তম জন্মদিন আজ

শহীদ শেখ রাসেলের ৫৫ তম জন্মদিন আজ

এত যে বিষাদ চারিধারে আজ! উত্তরের হাওয়া হাহাকার করছে কান্না হয়ে। অথচ আজকের দিনটি তো এমন হবার কথা ছিল না, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে আজ যে দেবশিশুর আগমন হয়েছিল তার জন্মোৎবের আলোক ছটা মেঘে মেঘে ভেসে বেড়াবার কথা ছিল। কথা ছিল তেতুলিয়া হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিয়ে যাওয়ার। কীভাবে করব আমরা আজকের দিনকে বরণ। জাতি হিসেবে আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ইতিহাসের কলংকজনক হত্যাকান্ডের নির্মম শিকার সেই দেবশিশুর হত্যাকারী আমরা নিজেরাই। ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর দিনটি চিরদিনের জন্য বিষাদ ভরা হয়ে রইল। আর কোন দিন প্রত্যুষে হাসবে না সূর্য। রাত জাগা পাখির ডানায় করে বিষাদ মাখা ভোর আসে প্রতি বছর। শহীদ শেখ রাসেলের আজ ৫৫তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৬৪ সালের এই দিনে ধানমন্ডির ঐতিহাসিক স্মৃতি-বিজড়িত বঙ্গবন্ধু ভবনে জন্ম তার।

সে ছিল বাঙালির এক রাজপুত্র। তার বাবা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মাতা বেগম ফজিলাতুনন্নেসা। বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ সন্তান ছিল শেখ রাসেল। তাই সে ছিল সবার আদরের ধন। সবাই তার আবদার পুরণ করার চেষ্টা করতো। ১০ বছরের ছোট্ট রাসেলের কোঁকড়া চুল, মায়া মায়া চেহারা। ডাগর দুটি চোখ। দু‘চোখ জুড়েই হরেক স্বপ্নেরা খেলা করতো সারাদিন। ফুল পাখি গাছ-পালা তার ছিল ভীষণ প্রিয়। হয়তো মনের অজান্তেই চুপি চুপি তাদের সঙ্গে কথা বলতো শিশু রাসেল। পাখিরা তাকে কি গান শোনাতো? জানতে বড়ো ইচ্ছে করে আজ। নতুন শিশুটির আগমনে বাড়িতে খুশির হাওয়া ছড়িয়ে যায়। বড় চার ভাই-বোনের পর রাসেলের জন্ম সবাইকে আনন্দে ভরিয়ে তোলে। শেখ রেহানার জন্মের সাত বছর পর রাসেলের জন্ম একটা ‘উৎসব’ হয়ে ওঠে। কে তাকে কোলে নেবে, কে তাকে আদর করে চোখে কাজল পরাবে, কে পাউডার মাখাবে- এসবের মধ্যে দিয়েই একটু একটু করে রাসেল বড় হতে থাকে।

এর মধ্যে আবার পিতা শেখ মুজিবও কারাবরণ করতে থাকেন। জেনারেল আইয়ুব খানের চন্ডনীতি ও দু:শাসনে সারা দেশ তখন বিক্ষোভ আন্দোলন গড়ে উঠেছে। আর শিশু রাসেল মায়ের কোলে চড়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় করাগারে যেত পিতাকে দেখতে। পিতার আদর স্নেহ ও ভালাবাসা এভাবেই তাকে পরিপুষ্ট করে তোলে। বাড়িতে ভাই-বোনদের হাতে সে ছিল পুতুল। তারা তাকে সেভাবেই আদর করতো, সাজাত, ছবি তুলতো, খাওয়াতো আর তার সাথে খেলা করতো। শিশু রাসেল ছিল সবার চোখের মনি এবং রূপকথার রাজপুত্তুর। এছাড়া ভাবীরাও ভীষন আদর করতো রাসেলকে। আর মা ছিল তার একমাত্র আশ্রয়। তার কাছেই যত আবদার, তার সাথেই যত অভিমান। মায়ের আঁচলের ছায়ায় রাসেল ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যেন পিতাকেও স্বপ্নে দেখতো। রাসেল- এ নামটি বাবার দেওয়া।

বাবার প্রিয় ব্যক্তিত্ব বিখ্যাত লেখক-দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল। বাবা জানতেন তার এই ছোট্ট ছেলেটি ও একদিন আপন প্রতিভায় দীপ্ত হয়ে উঠবে। না, রাজনীতি নয়- সে হোক অন্য কিছু। লেখক, দার্শনিক কিংবা বড়ো বিজ্ঞানী অথবা বিশ্ব শান্তির নতুন কান্ডারি। বাবার জানাটা কি মিথ্যে ছিল? কি করে মিথ্যে হয়? এই বাবাই তো বলেছিলেন ‘এদেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’ তিনি সব জানতেন। জানতেন একদিন এদেশ মুক্ত হবে। স্বাধীন জাতি হিসেবে বাঙালি বিশ্ব দরবারে মহিমান্বিত হয়ে উঠবে। তাইতো হয়েছে। তাহলে তাঁর ছোট্ট ছেলেটি রাসেলের বেলায় তার ভবিষ্যৎ বাণী মিথ্যে হবে কেন? বাবা যেখানে গিয়েছেন সঙ্গে নিয়েছেন রাসেলকেও। জাপান, ভারত, যুগোশ্লাভিয়া- রাসেল ঘুরেছে বাবার সঙ্গে। রাসেল বাইরের পৃথিবী আগেই জেনে নিক, এটাই ছিল বাবার প্রত্যাশা।

রাসেল সে সময় পড়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে। মাঝে মাঝে রাসেল স্বপ্নমাখা দু‘চোখ মেলে তাকাতো নি:সীম আকাশের দিকে। দৃষ্টি যেন ছুটে যেত অসীম নি:সীমে। কল্পনার তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে দুরন্ত পঙ্খীরাজের পীঠে চেপে উড়ে যেত স্বপ্নপুরীর কোন দেশে। তার নিষ্পাপ হাসি, মিষ্টি কথা যে কারো হৃদয় কেড়ে নিত এক নিমিষে। শিশুরা যে স্বর্গের দূত, তার প্রমাণ মিলত রাসেলের নিস্কলঙ্ক অবয়ব দেখে। অক্টোবর মাস শেখ রাসেলের জন্ম মাস। আজ বেঁচে থাকলে শেখ রাসেল ৫৫ বছরের পূর্ণ মানুষ হতো। হয়তো বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো কিংবা তার মতোই হতো- যেমনটি তার বাবা প্রত্যাশা করেছিলেন। রাসেল বড় হলে কী হতো আমরা তা জানি না। ঘাতকের দল আমাদের তা জানতে দেয়নি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্মৃতিকথায় রয়েছে, জেলখানায় পরিবারের সবাই বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে গেছেন। রাসেল এক পর্যায়ে বলে উঠল, হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি? এমন প্রশ্নে সে সময়ের উপস্থিত সবাইকে হতবাক হতে হয়েছিল। আর আজও রাসেলের এমন প্রশ্নে আমরা হতচকিয়ে যাই এবং বেদনাহত হই। এমন ঘটনা আরও আছে। ২ বছরের শিশু রাসেল জেলখানায় গিয়ে একদিন বঙ্গবন্ধুকে বলল, ‘আব্বা বালি চল।’ কিন্তু তিনি যে কারাগারে বন্দী রাসেলের সেটা বোঝার বয়স হয়নি। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘কারাগারের রোজনামচা’য় লিখেছেন, ‘‘কি উত্তর ওকে আমি দিব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম, ও তো বোঝে না আমি কারাবন্দী। ওকে বললাম, ‘তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।’ ও কি বুঝতে চায়!…দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখনও বুঝতে শিখে নাই। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।’’ অন্য সব শিশুর মত রাসেল তার পিতার সান্নিধ্য চাইত। বঙ্গবন্ধুকে কাছে না পেয়ে বাসায় কান্নাকাটি করত। এজন্য ফজিলাতুন্নেছা মুজিব রাসেলকে একদিন বললেন, তাঁকে আব্বা বলে ডাকতে। অবুঝ রাসেল সেটাই করেছিল। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘‘ওর মার কোলে যেয়ে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে ডাকতে শুরু করল। ওর মাকে ‘আব্বা’ বলে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ব্যাপার কি ?’ ওর মা বলল, ‘বাড়িতে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কাঁদে তাই ওকে বলেছি আমাকে ‘আব্বা’ বলে ডাকতে। ‘রাসেল’ আব্বা আব্বা’ বলে ডাকতে লাগল। যেই আমি জবাব দেই সেই ওর মার গলা ধরে বলে, ‘তুমি আমার আব্বা।’’

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির সামনের রাস্তায় দুরন্ত রাসেলকে তিন চাকার একটি সাইকেলে প্রায়ই দেখা যেত। সে প্রায় সাইকেল চালাত সড়কজুড়ে। বিখ্যাত সাংবাদিক এ বি এম মুসা স্মৃতিকথায় রাসেল সম্পর্কে লিখেছেন, ‘কদিন বিকেল পাঁচটার দিকে শাঁ করে ৩১ নম্বরের অপ্রশস্ত রাস্তা থেকে ৩২ নম্বরে ঢুকেই আমার সামনে একেবারে পপাতধরণিতল। গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল সদ্য শৈশবোত্তীর্ণ ছেলেটি।…অতঃপর সাইকেলে উঠে লেকপাড়ে উধাও হলো শৈশবের শেষ প্রান্তের ছোট্ট ছেলেটি। …বিকেলে লেকের পূর্বপাড়ে এমনি করে চক্কর মারত। মধ্যবর্তী ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পূর্বপ্রান্তের সাদা একটি দালান পর্যন্ত সাইকেলারোহীর দৌড়ানোর সীমানা। …এদিকে ৩২ নম্বরের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন স্নেহময়ী মা, তীক্ষè দৃষ্টি রাখতেন দুষ্টু ছেলেটির সাইকেল-পরিক্রমা যেন সীমাবদ্ধ থাকে।’

সে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ছাড়াই সাইকেলে করে স্কুলে যেত। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন রাষ্ট্রপতির ছেলে সাইকেলে করে বিনা প্রটোকলে স্কুলে যেত কিনা সন্দেহ। এ যেন রাষ্ট্রপতি পুত্র নয় পাড়ার আর দশজন সাধারণ ছেলের মত। ছোট ছেলেটি যেন বাবা মা আর বড় ভাইবোনদের অনুসরণ করছে। বঙ্গবন্ধু কারাগারের বাইরে থাকলে সন্তানদের সময় দিতেন। কাজের শেষে বাড়ি ফিরে সবার আগে রাসেলের খোঁজ নিতেন। রাসেল ঘুমিয়ে থাকলে ঘুমের মধ্যে তিনি তাকে আদর করতেন। জেগে থাকলে রাসেল বাবার সঙ্গ ছাড়তে চাইত না। কোলে উঠত, গল্প শুনতে চাইত। মাঝে মাঝে বঙ্গবন্ধুর চশমাও চোখে দিত রাসেল।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ঐতিহাসিক বাড়িটা কি আজো কাঁদে রাসেলের শোকে? ভাবতেই দু’চোখ ভিজে যায় জলে। ১৫ আগস্টের কালো রাতের হত্যাযজ্ঞ দেখে আতঙ্কিত রাসেল বলেছিল, ‘আমি মায়ের কাছে যাব’। কিন্তু তার আকুতিতে খুনীদের মন কাঁপেনি। উপরন্তু তাদেরই একজন মায়ের কাছে চল্ বলে দোতলায় নিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করে। টেনে হিচড়ে উপড়ে নেয়ার সময় রাসেল ভয় পেয়ে বলেছিল, আমাকে হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দিন। তার কান্নায় পাথর হয়ত গলে যায়। কিন্তু ঘাতকদের মন গলে না। যেন সীমারের প্রেতাত্মা। আইয়ুব টিক্কার বংশধর। এটি শুধুমাত্র একটি হত্যাকান্ড নয়। একটি শৈশব লুণ্ঠন করা। একটি সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটানো। শুধু রাসেল নয় যেন বাংলার সব শিশুর শৈশব হরণ করা হল। একটি হত্যাকান্ডের সাথে পরিচিত করানো হল বাংলার শিশুদের। যারা হত্যা শব্দটা জানতই না তারা জানল শিশু হত্যা করা যায়। যে শিশুটি ভাবত ছোট মানেই সবাই আদর করবে তারা বুঝল তাদের জানাটা কত ভুল। নির্দ্বিধায় একজন শিশুর বুকে একটি বুলেট তাক করা যায়। ‘এ কোন মৃত্যু’, কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন।”

রাসেল আমাদের কাছে একটি নিষ্পাপ শিশুই রয়ে গেছে এবং থাকবে চিরদিন। শেখ রাসেল আজ বাংলাদেশের শিশু-কিশোর-তরুণদের কাছে ভালবাসার নাম। অবহেলিত, পশ্চাৎপদ, অধিকার বঞ্চিত শিশুদের আলোকিত জীবন গড়ার প্রতীক হয়ে গ্রাম-গঞ্জ-শহর তথা বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জনপদ-লোকালয়ে শেখ রাসেল আজ এক মানবিক স্বত্তায় পরিণত হয়েছেন। মানবিক চেতনা সম্পন্ন মানুষরা শেখ রাসেলের বিয়োগ বেদনাকে হৃদয়ে ধারণ করে বাংলার প্রতিটি শিশু-কিশোর তরুণের মুখে হাসি ফোটাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই দেশবাসী এখন শেখ রাসেলসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকল সদস্যদের হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে সোচ্চার। আমরা শেখ রাসেলকে আজও ভুলিনি, ভুলবো না কোনদিন। ইতিহাসের মহাশিশু হয়েই শেখ রাসেল বেঁচে থাকবেন আপামর গ্রাম-বাংলার সবার হৃদয়ে। তার জন্মদিনে আমাদের হৃদয়ের অর্ন্তস্থল থেকে জানাই গভীর ভালোবাসা।


Leave a Reply