আজ রবিবার, ১৮ অগাস্ট ২০১৯, ০৮:৫৪ পূর্বাহ্ন

শরিকী কুরবানী ও আক্বীকা প্রসঙ্গে শরয়ী বিধান

শরিকী কুরবানী ও আক্বীকা প্রসঙ্গে শরয়ী বিধান

  • 11
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
    11
    Shares

শরিকী কুরবানী দেওয়া এবং কুরবানির পশুতে আক্বিকার অংশ নির্ধারণ করা নিয়ে অনলাইন জগতে কনফিউশন ছড়িয়ে পড়েছে। এটি বড্ড দুঃখজনক। এটি ইসলামি শরিয়াহ সম্পর্কে নেহাত অপরিপক্ব জ্ঞানেরই বহিঃপ্রকাশ। তাই দ্বিধান্বিত উম্মাহকে সতর্ক করতে এ নিয়ে কিছু না লিখে পারলাম না। লেখাটি শুরু করার আগে সবাইকে পরামর্শ দিতে চাই যে, যেখানেই কোনো বিষয়ে নতুন কিছু দেখতে পাবেন, সেটি সম্পর্কে আপনি বিজ্ঞ ও গবেষক কোনো দায়িত্বশীল আলেম থেকে দালিলিক ভাবে সমাধান জেনে নেবেন।

বর্তমানে মুসলিম উম্মাহ অনেক সঙ্কটের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। শত্রুর জালে বন্ধী । নানা রকম মতানৈক্য সৃষ্টি করে উম্মাহকে ব্যস্ত রাখার মধ্য দিয়ে ইসলামের শত্রুরা ফায়েদা হাছিল করছে। সিংহের জাতি মুসলিমজাতির উপর শোষণের ছড়ি ঘুরাচ্ছে। বেখবর এ জাতি নিজ আত্মপরিচয়টুকু পর্যন্ত ভুলে বসেছে। জ্ঞানহীনতা আজ এ উম্মাহর উপর প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। অনেকেই বিভ্রান্ত, কোনটা সঠিক পথ এই নিয়ে। এই সঙ্কটগুলো মোকাবিলার জন্য কুরআন-সুন্নাহ কঠিনভাবে আঁকড়ে ধরা প্রয়োজন, সালফে সলিহীনের মানহাজে প্রত্যাবর্তন প্রয়োজন। উম্মাহর ঐক্য প্রয়োজন।

জিলহজ্ব মাস আসলেই দেখা যায়, কিছু ভাই অনলাইনে বা ফেইসবুক পেইজে প্রচারণা চালান এই বলে যে,‘ভাগে কুরবানী দেওয়া যাবে না; ভাগে কুরবানীর কোন দলিল নেই। কুরবানির পশুতে আক্বিকা দেয়া নাজায়েজ।’ ভাগে কুরবানী সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাপারে ওনারা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন যে, সেই হাদিস নাকি শুধুমাত্র সফরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু তাদের এ ব্যাখ্যার সমর্থনে সুস্পষ্ট শব্দে ভিন্ন কোনো রেওয়ায়েত নেই। ভাগে কুরবানীর বিষয়টি যে স্রেফ সফরের সাথে খাস – এরকম কোনো ইংগিতও উক্ত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। বরং ভাগে কুরবানী সম্পর্কে সুস্পষ্ট হাদিস আছে। ফলে হাদিস বিদ্যমান থাকতে হাদিসের বিরুদ্ধে যায় এমন যে কোনো ব্যাখ্যাই গুরুত্বহীন হবে। এতদ্ব্যতীত দ্বীন হচ্ছে সহজলভ্য জিনিস। সহিহ বুখারির ১ম খন্ডের ১০ নং পৃষ্ঠায় আবু সাঈদ খুদরী (রা) হতে বর্ণিত রাসূল (সা) বলেছেন – ان الدين يسر অর্থাৎ নিশ্চয় দ্বীন হচ্ছে সহজ।

আল্লাহ তায়ালা তিনি বান্দার উপর এমন কিছু ন্যস্ত করেন না, যা তার পক্ষে পালন করা কষ্টকর হতে পারে। ভাগে কুরবানি নাজায়েজ হলে তখন অবস্থাটি কেমন দাঁড়াবে তা সুবিবেচক পাঠকের সুস্থ জ্ঞানের উপরই ছেড়ে দিলাম। মাসআলার বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিম্নরূপঃ

পবিত্র সহিহ হাদিসের আলোকে ভাগে কুরবানি এবং কুরবানির সাথে আক্বিকা : কোরবানি একটি ইবাদত এবং তা ইসলামের অন্যতম শিআ’র ও নিদর্শন। ইসলামী আদর্শের ইবাদত অংশটিও অতি মহিমান্বিত এবং বিশিষ্টতাপূর্ণ। এর প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘তাওহিদ’ ও ‘সুন্নাহ’। ইসলামের ইবাদত ও উপাসনা একমাত্র আল্লাহর জন্যই, তিনি ছাড়া আর কেউ ইবাদতের উপযুক্ত নয়। তেমনি ইবাদতের নিয়ম-নীতিও সুন্নাহ কর্তৃক নির্ধারিত। সুন্নাহ পরিপন্থী কোনো ‘ইবাদত’ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কোরবানির প্রসঙ্গটি কোরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় এসেছে।

সুরাতুল বাকারা : ১৯৬; সুরাতুল মায়েদা : ২, ৯৫; সুরাতুল আনআম : ১৬২; সুরাতুল ফাহত : ২৫; সুরাতুল হজ : ২৭-৩৭ ও সুরাতুল কাউসারে কোরবানির বিধান আছে। সুরাতুল আন’আম ও সুরাতুল কাউসারে সাধারণ কোরবানি আর অন্যান্য সুরায় হজের কোরবানির কথা উল্লেখ হয়েছে।

শরিকে কুরবানি : কোরবানির নিয়মনীতি সংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ আছে হাদিস শরীফে। সামর্থ্যবান ব্যক্তির পক্ষে একা কোরবানি করা বিভিন্ন কারণে উত্তম। তবে শরিকে কোরবানির বিধান উম্মতকে দিয়েছে অবকাশ ও প্রশস্ততা। এই প্রশস্ততা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ এ স্পষ্টভাবে আছে।

বিখ্যাত সাহাবী জাবির ইবনে আবদুুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘আমরা হজের ইহরাম বেঁধে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে বের হলাম। তিনি আমাদের আদেশ করলেন যেন প্রতিটি উট ও গরু সাতজন করে শরিক হয়ে কোরবানি করি।’
— সহীহ মুসলিম শরীফ ১/৪২৪।

অন্য বর্ণনায় আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (একটি) গরু সাতজনের পক্ষ থেকে এবং (একটি) উট সাতজনের পক্ষ হতে (কোরবানি করা যায়)।
—সুনানে আবু দাউদ ২/৩৮৮।

ফকিহগণের ফতোওয়া : ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ) ও ইমাম শাফিঈ (রহ) এ বিষয়ে মাসআলা দিয়েছেন যেঃ সাতজনের পক্ষ হতে একটি গরু অথবা একটি উট কুরবানী করা জায়েজ রয়েছে। [ সূত্রঃ যাদুল মা’আদ, ইমাম ইবনিল কাইয়িম আল-জাওঝী হাম্বলী (রহ); তাহকিকঃ শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব হাম্বলী (রহ); পৃষ্ঠা ১২১ ]

মুয়াফফাকুদ দ্বীন ইমাম ইবনুল কুদামা মাকদিসী (রহ) তাঁর ‘উমদাতুল ফিকহ’ কিতাবেও অনুরূপ মাসআলা উল্লেখ করেছেনঃ সাতজনের পক্ষ হতে একটি গরু অথবা একটি উট কুরবানী করা জায়েজ রয়েছে। হাতিম আল হাজ এ কিতাবের শারহে সহীহ মুসলিমের উপরে বর্ণিত হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। [ সূত্রঃ উমদাতুল ফিকহ, ব্যাখ্যামূলকগ্রন্থ : হাতিম আল হাজ; ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৮]

আমরা দেখছি যে পূর্বযুগের আলিমগণ ভাগে কুরবানী সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাপারে এটাই বুঝেছেন যে,শুধু সফর নয়, বরং সর্বাবস্থায় ৭ জন মিলে একটি গরু বা উট কুরবানী দিতে পারেন। এ সংক্রান্ত মাসআলায় তাঁরা মোটেও সফরের কথা উল্লেখ করেননি।

তবে শরিক নির্বাচনে সতর্কতা কাম্য। আল্লাহর কাছে কোরবানি কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো হালাল উপার্জন দ্বারা কোরবানি করা। হাদিস শরীফে আছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ পবিত্র আর তিনি শুধু পবিত্র বস্তুই গ্রহণ করে থাকেন।’
—(সহীহ মুসলিম, হাদিস : ১০১৫)

তেমনি কোরবানির উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি। হাদিস শরীফে বলা হয়েছে, ‘সকল আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।…’।
—সহীহ বুখারী, হাদীস : ১।

যেহেতু সব শরিকের পক্ষ থেকে একটি পশু যবেহ করা হচ্ছে তাই সবার নিয়ত ও উপার্জন শুদ্ধ হওয়া জরুরি। ইসলামী ফিকহ বিশারদরা বলেছেন, কোনো শরিকের পুরা বা অধিকাংশ উপার্জন হারাম হলে কিংবা কেউ শুধু গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে শরিক হলে কারো কোরবানি সহীহ হবে না।
(রেফারেন্স : ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া ৩/৩৪৯, ৪০০; আলমগিরি ৫/৩৪২; আহসানুল ফাতাওয়া ৭/৫০৩)

কুরবানির সাথে আক্বিকা : অনেকে কোরবানির সঙ্গে আকিকাও দিতে চান। তবে বিজ্ঞ ফুকাহায়ে কেরাম বিষয়টিকে উৎসাহিত করেননি। কোরবানি ও আকিকা আলাদাভাবেই করা উচিত। তবে কেউ একত্রে করলে কোরবানি ও আকিকা দুটোই আদায় হবে। কারণ আকিকাও এক ধরনের কোরবানি। হাদীস শরীফে আকিকাকেও বলা হয়েছে ‘নুসুক’, যার অর্থ কোরবানি। (রেফারেন্স : আল-মুসান্নাফ, আবদুর রাযযাক : ৭৯৬১; আলমুসনাদ, ইমাম আহমদ : ৬৭১৩, ৬৭২২; আসসুনান, আবু দাউদ (আকিকা অধ্যায়) : ২৮৪২; আসসুনান, নাসাই : ৭/১৬২, ১৬৩)।

আকিকাতেও পশু জবাইয়ের উদ্দেশ্য আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি। তাছাড়া মৌলিকভাবে এক হওয়ার কারণে আকিকার অনেক বিধান নেয়া হয়েছে কোরবানির হাদিস থেকে। সুতরাং উট ও গরু দ্বারা একাধিক ব্যক্তির কোরবানি আদায় হওয়ার হাদিসগুলোর অন্তর্নিহিত যুক্তি ও ব্যাপকতা কোরবানি ও আকিকা একত্রে আদায়ের অবকাশকেও ধারণ করে।

তাছাড়া বিভিন্ন জনের বিভিন্ন ‘প্রকারের’ কোরবানি যে এক পশু দ্বারা আদায় হতে পারে তা স্পষ্টভাবেই বলেছেন বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম আতা ইবনে আবি রাবাহ (রহ)। তিনি বলেছেন, ‘উট ও গরু সাতজনের পক্ষ হতে কোরবানি হতে পারে। আর এতে শরিক হতে পারে কোরবানিকারী, তামাত্তু হজকারী এবং হজের ইহরাম গ্রহণের পর হজ আদায়ে অপারগ ব্যক্তি। (রেফারেন্স : সুনানে সায়ীদ ইবনে মানসুর-আল কিরা লি-কাসিদি উম্মিল কুরা পৃ. ৫৭৩)

সুতরাং কোরবানির সঙ্গে আকিকার অংশ দেয়াই যাবে না— এমন সিদ্ধান্তের জন্য সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী প্রমাণ লাগবে, যা আমাদের জানা মতে পাওয়া যায় না। শরিকে কোরবানির ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গোস্ত বণ্টন। আলাদা আলাদা পরিবারের কয়েক ব্যক্তি শরিকে কোরবানি করলে প্রত্যেকের অংশ মেপে বণ্টন করতে হবে। শুধু অনুমান করে ভাগ করা যাবে না। (রেফারেন্স : আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৭; কাজিখান ৩/৩৫১) আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে কোরবানি করার এবং কোরবানির পূর্ণ কল্যাণ অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমীন।

(সংগ্রহে: মাওলানা মখলিছুর রহমান, তথ্য, আহলে হক্ব মিডিয়া)

লাইক দিন এবং শেয়ার করুন


Leave a Reply

Nobobarta.com
Design & Developed BY Nobobarta.com