মুখোমুখি দেবর-ভাবি, কে হচ্ছে বিরোধীদলের নেতা - Nobobarta

আজ মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:৪৩ অপরাহ্ন

মুখোমুখি দেবর-ভাবি, কে হচ্ছে বিরোধীদলের নেতা

মুখোমুখি দেবর-ভাবি, কে হচ্ছে বিরোধীদলের নেতা

  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
    2
    Shares

সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা করতে জিএম কাদেরের চিঠি দেয়ার পরদিন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে পাল্টা চিঠি দিয়েছেন পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলের উপনেতা বেগম রওশন এরশাদ। স্পীকার বরাবর রওশনের দেয়া চিঠিটি পৌঁছে দেন রওশনপন্থী বলে পরিচিত ফখরুল ইমাম। এরফলে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধীদল জাতীয় পার্টিতে বিরোধীদলের নেতার পদকে ঘিরে আবারও মুখোমুখি অবস্থানে দেবর-ভাবি। দেবর-ভাবীর এ দ্বন্দ্ব আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। দলটিতে ভেতরে বিদ্রোহ এখন তুঙ্গে, দেখা দিয়েছে দল ভাঙ্গার শংকাও। বিশেষ করে মঙ্গলবার বিকেলে জিএম কাদেরকে বিরোধীদলের নেতা বানানোর জন্য সংসদের স্পীকার বরারব চিঠি দেয়ার পর নড়েচড়ে বসেছেন রওশন পন্থীরা।

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে বুধবার গুলশানে বাসভবনে এক জরুরী বৈঠকে বসেন রওশন এরশাদ। বৈঠকের পর জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক মন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু জিএম কাদেরের চিঠির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সাংবাদিকদের বলেছেন, জাতীয় পার্টির পার্লামেন্টারি কমিটির কোনো বৈঠক ছাড়া স্পিকারকে দেয়া জি এম কাদেরের চিঠিটির কোনো দাম নেই। বৃহস্পতিবার রওশন তার গুলশানের বাসভবনে বেলা ১১টায় জরুরী সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্পিকার শিরীন শারমিন বলেন, একটি চিঠি পেয়েছেন। তবে, সেখানে কী রয়েছে তা তিনি এখনও দেখেননি। পরে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। এদিকে রওশন পন্থীরা কোনঠাসা হয়ে পড়াতে উজ্জবিত জিএম কাদের পন্থীরা। বিশেষ করে মঙ্গলবার ও বুধবার দুই দফা অনেককে ফোন করেও কাছে পাননি রওশন এরশাদ। এ মুহুর্তে তার সঙ্গী হয়েছেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মজিবুল হক চুন্নু ও ফখরুল ইমাম।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুও চিঠি দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও বর্তমান সংসদ উপনেতা রওশন এরশাদ বুধবার স্পিকারকে একটি চিঠি দিয়েছেন। তবে এতে বিরোধীদলীয় নেতা করার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। তিনি বলেন, জিএম কাদেরের চিঠিটি যথাযথভাবে পাঠানো হয়নি এবং সংসদীয় দল বা পার্টির কোনও পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে ওই চিঠি পাঠানো হয়নি, সেটা জানিয়েই এই চিঠি দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় পার্টির পার্লামেন্টারি কমিটির কোনও বৈঠক ছাড়া স্পীকারকে দেওয়া জিএম কাদেরের চিঠির কোনও দাম নেই।

এর আগে মঙ্গলবার জিএম কাদের নিজেকে বিরোধীদলীয় নেতার স্বীকৃতি চেয়ে স্পিকারের কাছে চিঠি দেন। পার্টির প্রেসিডিয়ামের সভা ও সংসদীয় দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যরা জিএম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে মনোনয়নের প্রস্তাব করেছে বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পার্টির ১৫ জন এমপি স্বাক্ষরিত চিঠিটি স্পীকারের দফতরে পৌছেন দেন পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ। এসময় জাপার সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী, নাজমা আকতার, শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ, মেজর (অব.) রানা মোহাম্মদ সোহেল ও আদেলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। চিঠিতে তারা ছাড়াও আরো স্বাক্ষর করেছেন পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের, মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, অধ্যাপিকা মাসুদা রশিদ চৌধুরী, লে. জে. (অব.) মাসুদ উদ্দীন চৌধুরী, গোলাম কিবরিয়া টিপু, সালমা ইসলাম, নুরুল ইসলাম তালুকদার ও পনির উদ্দিন আহমেদ।

জিএম কাদেরের চিঠির খবর রওশন এরশাদের কাছে পৌঁছলে তিনি দলীয় এমপিদের মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিজ বাসায় আসতে বললেও হাজির হন মাত্র চারজন। এরপর বুধবার দুপুরেও নিজ অনুসারীদের নিয়ে বৈঠকে বসেন রওশন। আড়াই ঘণ্টার এই বৈঠকে ছিলেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়ামে তিন সদস্য ও সংসদ আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু ও ফখরুল ইমাম। জি এম কাদেরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত হলেও রওশনের বাড়িতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে যোগ দেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি শফিকুল ইসলাম সেন্টু ও ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম।

বৈঠক শেষে চুন্নু সাংবাদিকদের বলেন, জি এম কাদের পার্লামেন্টারি কমিটির কোনো বৈঠক না করেই লুকিয়ে এই চিঠি দিয়ে থাকলে আমি ও আমরা সে বিষয়ে কিছু জানি না। আমি তো এক নগণ্য এমপি। আমাকে তো কোনো নোটিস বা ফোন দেওয়া হয়নি। যে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে শুনছি, সেটি প্রপার না। ব্যারিষ্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, আগামী বৃহস্পতিবার বেলা ১২টায় রওশন এরশাদ তার নিজ বাসভবনে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন। এতে দলের রাজনীতি নিয়ে রওশন এরশাদ নিজেই সাংবাদিকদের ব্রিফ করবেন। এরশাদের মৃত্যুর পর এই প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আসছেন তার স্ত্রী রওশন এরশাদ। তিনি দলের কো চেয়ারম্যানের পাশাপাশি সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতার দায়িত্বেও রয়েছেন। বৈঠকে উপস্থিত এক নেতা জানান, পার্টি সংসদীয় কোনো সভা ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত কেউ নিতে পারে না। ম্যাডাম (রওশন) আগামী ৮ তারিখে সংসদে আমাদের সংসদীয় দলের সভা ডেকেছেন। সেখানেই আমরা বিরোধীদলের নেতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবো।

এদিকে নতুন করে জাপায় নেতৃত্ব নিয়ে পারিবারিক বিভেদে অস্থিরতায় ভুগছে পার্টির তৃণমূল নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর থেকেই পার্টিতে দেবর-ভাবির দ্বন্ধ অনেকটাই স্পষ্ট। এরমধ্যে একাধিকবার রওশন ও জিএম কাদের রওশনের গুলশানের বাসভবনে একান্তে কথা বলেন। কিন্তু দুইদিন না যেতেই না ইস্যুতে আবার তাদের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি হতে থাকে। জিএম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হলে এর বিরোধীতা করেন রওশন। আসন্ন সংসদ অধিবেশনেই বিরোধীদলের নেতা নির্বাচিত হবার কথা। এর আগেই পার্টির অধিকাংশ এমপিরা জিএম কাদেরকে বিরোধীদলের নেতা নির্বাচিত করার জন্য স্পীকারকে চিঠি দিলে চরম নাখোশ হোন রওশন এরশাদসহ তার পন্থীরা। যদিও নাটকীয়ভাবে পার্টিতে রওশনপন্থীদের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। তারপরও যেকোনো কিছুর বিনিময়ে জিএম কাদেরকে বিরোধীদলের নেতা মানতে নারাজ রওশন।

সার্বিক বিষয়ে পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা মনোনয়ন প্রশ্নে জোর করে কিছু করা হয়নি। জাতীয় পাটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চিঠি দেওয়া হয়েছে। পার্লামেন্টারী পার্টির বৈঠক না করায় বিতর্ক উঠেছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এরশাদ সাহেব যখন বেঁচে ছিলেন তিনিও কিন্তু এভাবে বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছিলেন, আমাকে বিরোধীদলীয় উপনেতা করেছিলেন। পরে আমাকে সরিয়ে রওশন এরশাদকে উপনেতা করা হয়, তখনও কিন্তু পার্লামেন্টারী পার্টির কোনো মিটিং করা হয়নি। কাদের বলেন, আমরা ফোনে সংসদ সদস্যদের জিজ্ঞেস করেছি। তারা সম্মতি দিয়েছে। লিখিত দিতে বলা হলে ১৫ জন সম্মতিপত্র দিয়েছে। ২৫ জনের মধ্যে ১৫ জন সম্মতি দিলে আর কিছু লাগে না। তাই অন্যদেরকে বলা হয়নি। এখন আরও অনেকে দিতে চাচ্ছে। প্রয়োজন নেই বলে নেওয়া হচ্ছে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্য কেউ পার্লামেন্টারী পার্টির সভা ডাকতে পারে না। ডাকতে হলে আমিই ডাকবো।

প্রসঙ্গত, সাবেক রাষ্ট্রপতি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গত ১৪ জানুয়ারি মারা গেছেন। এর আগে তিনি তার অবর্তমানে পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে ছোট ভাই জিএম কাদের দায়িত্ব পালন করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন-তার কোন সুরাহা তিনি করে যাননি। জিএম কাদেরের চেয়ারম্যান হওয়ার বিষয়টি এরশাদ আগে জানিয়ে গেলেও রওশনপন্থীরা সেটা মেনে নিতে রাজি হননি। ফলে এরশাদের মৃত্যুর পরপরই দলটির চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা মনোনয়ন নিয়ে জিএম কাদের ও রওশনপন্থীদের মধ্যে রশি টানাটানি শুরু হয়। দেওয়া হয় বিবৃতি, পাল্টা বিবৃতি। অবশ্য জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে মেনে নিতে রওশনপন্থীরা কিছুটা নমনীয় হলেও বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে মেনে নিতে রাজি নন। তাদের মতে, বিরোধী দলের নেতার পূর্ব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রওশন এরশাদই হবেন বিরোধীদলীয় নেতা।

লাইক দিন এবং শেয়ার করুন


Leave a Reply