মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গ্রাম গুড়িয়ে সরকারি স্থাপনা - Nobobarta

আজ মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০২:৪৩ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম:
আটোয়ারীতে বঙ্গবন্ধু জাতীয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত লক্ষ্মীপুরে ব্যবসায়ীকে হত্যা মামলায় ২ আসামীকে আদালতে হাজির, জামিন না মঞ্জুর হামদর্দ এমডির বিরুদ্ধে যুদ্ধোপরাধের অভিযোগ তোলায় বিস্মিত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা আটোয়ারীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে এক ব্যক্তি সহ দুটি গরুর মৃত্যু দ্রুত জকসু গঠনতন্ত্র প্রণয়ন ও রাতে ক্যাম্পাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দাবি আবির্ভাব: এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন পরিষদের উদ্যোগে মাদার তেরেসার মৃত্যুবার্ষিকীতে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নেতাদের অভিষেক সম্পূর্ন বিচার নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ ইউপি সম্মাননা পুরস্কার পেলেন দন্ডপাল ইউপি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী সাইফুদ্দীন আহ্মদ কে কেউ মনে রাখেনি!
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গ্রাম গুড়িয়ে সরকারি স্থাপনা

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গ্রাম গুড়িয়ে সরকারি স্থাপনা

  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
    5
    Shares

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের পুরো গ্রাম গুড়িয়ে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পুলিশের ব্যারাক, সরকারি ভবন ও শরণার্থী পুনর্বাসন শিবির। বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব তথ্য।

মিয়ানমার সরকারের আমন্ত্রণে এক সফরে গিয়ে বিবিসি অন্তত চারটি স্থান খুঁজে পেয়েছে যেখানে সুরক্ষিত স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। অথচ স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এগুলো আগে ছিল রোহিঙ্গা মুসলিমদের বসতি। তবে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা গ্রামে এসব স্থাপনা তৈরির অভিযোগ নাকচ করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা।

২০১৭ সালে সামরিক অভিযানের জেরে সাত লাখের রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে পালিয়ে যায়।জাতিসংঘ এটাকে জাতিগত নিধন বলে উল্লেখ করেছে। তবে মিয়ানমার তাদের সেনাবাহিনীর ব্যাপক পরিসরের এই হত্যাযজ্ঞের কথা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। এখন দেশটি বলছে তারা কিছু শরণার্থী ফিরিয়ে নিতে রাজি আছে। কিন্তু গত মাসে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের দ্বিতীয় চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। মিয়ানমারের অনুমোদিত ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গার মধ্যে কেউই ফিরতে না চাইলে এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তারা অভিযোগ তোলেন, ২০১৭ সালে সংঘটিত নিপীড়নের জন্য কোনো জবাবদিহিতা নেই এবং নিজেদের চলাফেরায় স্বাধীনতা ও নাগরিকত্ব পাওয়া নিয়েও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

এই ব্যর্থতার জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করেছে মিয়ানমার। তারা বলছে, তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত ছিল। এই বিষয়টি প্রমাণ করতেই বিবিসিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের তাদের প্রস্তুতি পরিদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। সাংবাদিকদের ঘুরে দেখানোর জন্য সরকারি তত্ত্বাবধানে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশের তত্ত্বাবধান ছাড়া কোনো কিছুর ছবি তোলা বা ভিডিও করা, স্থানীয় কোনো মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কোনো অনুমতি ছিল না। এরপরও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে ইচ্ছাকৃতভাবে উচ্ছেদ করার সব চিহ্নই স্পষ্ট ধরা পড়ছিল সাংবাদিকদের চোখে। স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট জানায়, ২০১৭ সালে ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর মধ্যে কমপক্ষে ৪০ ভাগ গ্রাম পুরোপুরি গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

মিয়ানমারে ওই সরকারি সফরের বর্ণনা করে বিবিসির দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার প্রতিনিধি জোনাথন হেড বলেছেন, কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের লা পো কাউং ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বলা হয়, সেখানে ২৫ হাজার রোহিঙ্গা থাকতে পারবে। এখানে দুই মাস থাকার পর তারা ফিরে যেতে পারবে স্থায়ী আবাসে। তবে প্রায় এক বছর আগের তৈরির ক্যাম্পটির অবস্থা একেবারেই ভালো নয়। টয়লেটগুলোর একাংশ ভেঙে পড়েছে। ২০১৭ সালের সংঘাতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া হাউ রি তু লার এবং থার জায় কোন এই দুই গ্রামে এটি তৈরি করা হয়েছে। জনাথন বলেন, ‘আমি যখন শিবিরটির পরিচালক সো শোয়ে অং-কে জিজ্ঞাসা করলাম যে গ্রাম দুটো গুড়িয়ে দেয়া হল কেন, তখন কোনো গ্রাম গুড়িয়ে দেয়ার কথা অস্বীকার করলেন তিনি। কিন্তু যখন আমি দেখালাম যে স্যাটেলাইট চিত্রে এর প্রমাণ রয়েছে, তখন তিনি বললেন, তিনি কয়েক দিন আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।’

তিনি বলেন, ‘এরপর কিয়েন চং নামে আরেকটি পুনর্বাসন শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয় আমাদের। সেখানে জাপান ও ভারত সরকারের সহায়তায় বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য। তবে এই পুনর্বাসন শিবিরটি তৈরির জন্য মিয়ার জিন নামে একটি রোহিঙ্গা গ্রাম বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এই গ্রামটি ছিলো নতুন করে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষা পুলিশ বাহিনীর জন্য বানানো একটি ব্যারাকের পাশে।’ ২০১৭ সালে নিরাপত্তা বাহিনীর এই অংশটির বিরুদ্ধে ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিল রোহিঙ্গারা। ক্যামেরার পেছনে মিয়ার জিন গ্রামটি গুড়িয়ে দেয়ার কথা স্বীকার করেন কর্মকর্তারা । মংডু শহরের বাইরেই অবস্থিত মিও থু গাই নামে একটি গ্রামে একসময় আট হাজার রোহিঙ্গার বাস ছিল।

জনাথন বলেন, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে, আরেকটি সরকারি গাড়ি বহরে করে ভ্রমণের সময় ওই গ্রামটির ছবি তুলেছিলাম আমি। ওই গ্রামের অনেক বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, কিন্তু বড় দালানগুলো অক্ষত ছিল। আর যে গাছগুলো রোহিঙ্গা গ্রাম বেষ্টন করেছিলো সেগুলোও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এখন মিও থু গাই গ্রামটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বড় বড় সরকারি স্থাপনা আর পুলিশ কমপ্লেক্স ছাড়া কিছুই চোখে পড়েনি। এমনকি সেই গাছগুলোও নেই।

তিনি বলেন, আমাদেরকে ইন দিন নামে আরেকটি গ্রামেও নিয়ে যাওয়া হয়। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ১০ জন বন্দী মুসলিম পুরুষকে হত্যাকাণ্ডের জন্য আলোচিত ওই গ্রামটি। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অল্প যে কয়টি নির্যাতনের ঘটনা স্বীকার করে এটি তার একটি। ইন দিন গ্রামের তিন-চতুর্থাংশ বাসিন্দাই ছিলো মুসলিম, বাকিরা রাখাইন বৌদ্ধ। এখন মুসলিমদের কোনো চিহ্ন নেই। রাখাইনরা চুপচাপ ও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু যেখানে রোহিঙ্গারা থাকতো সেখানে গিয়ে দেখা গেল, কোনো গাছপালা নেই। তার পরিবর্তে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া আর বিশাল সীমান্ত রক্ষী পুলিশের ব্যারাক। রাখাইনের বৌদ্ধ বাসিন্দারা বলছেন, প্রতিবেশী হিসেবে মুসলিমদের আর কখনোই মেনে নেবে না তারা।

সাংবাদিক জোনাথন হেড জানান, ফেরার পথে তিনি ইয়াঙ্গুনে গ্রাম থেকে বিতাড়িত এক রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান। অনুমতি ছাড়া বিদেশিরা সেখানে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দেখা করতে পারে না। ওই রোহিঙ্গা তরুণ সাত বছর ধরে একটি শরণার্থীশিবিরে রয়েছেন। ২০১২ সালের সহিংসতায় সিত্তে গ্রাম থেকে বিতাড়িত এক লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে তিনিও একজন। তিনি জানান, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারেন না। অনুমতি ছাড়া ক্যাম্পের বাইরে যেতে পারেন না। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরে আসার ঝুঁকি না নিতে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

বিবিসির তাদের পাওয়া তথ্যের ব্যাপারে জানতে মিয়ানমারের সরকারের মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তিনি সাড়া দেননি। মিয়ানমারের মন্ত্রীরা রোহিঙ্গাদের বাঙালি বলে দাবি করে। তাঁদের দাবি, ৭০ বছর ধরে অবৈধ অভিবাসনের স্রোতে তারা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ঢুকেছে। তবে এ বক্তব্যের পক্ষে খুব কমই প্রমাণ দেখাতে পেরেছেন তাঁরা। মিয়ানমারজুড়ে এমন মনোভাব রয়েছে যে রোহিঙ্গারা তাদের নয়। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়া এবং অবাধে চলাচলের অধিকার দেওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমার সরকার। এর পরিবর্তে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড দিতে চায় সরকার। তাদের ভাষায়, এটা নাগরিকত্ব পাওয়ার পথের ধাপ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে বেশির ভাগ রোহিঙ্গা এই কার্ড গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের মতে, এই কার্ড নিলে তাদের বাঙালি হিসেব শনাক্ত করা হবে।

লাইক দিন এবং শেয়ার করুন


Leave a Reply