মাশরফির নির্বাচন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম – Nobobarta

আজ মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ০৬:৫৭ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম:
মাশরফির নির্বাচন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

মাশরফির নির্বাচন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

Azhar Mahmud

আজহার মাহমুদ : ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্তজা। অনেক ওজনদার একটি নাম। না, এটা শুধু আমার কথা নয়, এটা পুরো বাংলাদেশের কথা। সবসময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অন্যতম ইস্যু হয়ে থাকেন এই মানুষটি। কখনো দলকে জিতিয়ে, কখনো ভালো বল করে, কখনো উইকেট নিয়ে, কখনো অবিশ্বাস্য ক্যাচ ধরে, কখনো চোখ ধাধানো ব্যটিং কিংবা বড় বড় ছয় মেরে। ফেসবুকে ঢুকলেই চোখে পড়ে মাশরাফিকে নিয়ে হাজার হাজার লেখালিখি। লিখাগুলো কোনো বিখ্যাত লেখকরা লিখেননা, লিখেন বাংলাদেশেরই সাধারণ মানুষ। কারণ মাশরাফিকে অসাধারণ থেকে সাধারণ মানুষরাই বেশী ভালোবাসে। একথায় বলাযায় সকলেই ভালোবাসে।

এ নিয়ে আমার কোনো দ্বিমত নাই। মাশরাফি সম্পর্কে আমার তেমন বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন আছে বলেও মনে হয় না। কারণ মাশরাফি কি, কেমন সেটা সকলে জানে বলেই তার প্রতি মানুষের ভালোবাসার পাল্লা ভারী। তবে তার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশে সৃষ্টি হলো এক নতুন ইস্যু। নড়াইল-২ আসন থেকে প্রার্থী হতে আওয়ামী লীগের ফরম নিয়েছেন নড়াইল এক্সেপ্রেস খ্যত মাশরাফি। এই আসনটিতে মহাজোট সরকারের গত নির্বাচনে সংসদ সদস্য ছিলেন ওয়ার্কাস পার্টির শেখ হাফিজুর রহমান। যাইহোক মূল কথায় ফিরে আসি। মনোনয়ন নেওয়ার আগ পর্যন্ত যে মাশরাফিকে মানুষের কাছে দেখেছিলাম, মনোনয়ন নেওয়ার পর সেই মানুষটিকে যেনো সেভাবে আর দেখা যাচ্ছে না।

আমি আমার জীবনে যা কখনো আশা করিনি ঠিক সেরকমই কিছু দেখেছি। যে মাশরাফিকে নিয়ে হরহামেশা মানুষ আবেগী আর ভালোবাসায় মোড়ানো স্ট্যাটাস দিতো তারাই আজ সেই মানুষটিকে নিয়ে বাজে বাজে স্ট্যাটাস দিচ্ছে। যে মানুষটিকে নিয়ে ফেসবুকে লম্বা লম্বা গল্প বানিয়ে পোষ্ট কওে সাধারণ মানুষের ভেতর ভালোবাসা বাড়িয়ে দিতো তারাই আজ মাশরাফিকে ইঙ্গিত করে অপরাধী বলছে। না, এটা কোনো গল্প কিংবা সিনেমার কাহীনি না। এটাই এখন বাস্তব। আর এখন এটাই হচ্ছে। কিন্তু কেন? রাজনীতি করাতো কোনো অপরাধ নয়। এটা কেউ বলতে পারবেন না। কারণ একটা দেশ পরিচালনা করেন এই রাজনীতিবীদরা। অনেকেই বলে বাংলাদেশের এই পচা রাজনীতিতে মাশরাফি কেনো যোগ দিয়েছে? তার মানে তাদের কথা পচা রাজনীতি আরো পচে যাক, তবুও রাজনীতিতে ভালো মানুষ না আসুক। রাজনীতি প্রতিটি ধর্মে আছে। ইসলামেও বলা আছে রাজনীতির কথা। আমি মনে করি যারা রাজনীতি করতে না করে তারা ধর্ম সম্পর্কেও অজ্ঞ।

আপনি বিএনপি, জাতিয়পার্টি, ঐক্যপ্রন্ট, জামায়েত করেন বলে কি মাশরাফি খারাপ? এই জন্যই কি মাশরাফির প্রতি আপনার ভালোবাসা শেষ? তাহলে বলবো, মাশরাফির প্রতি আপনার ভালোবাসা কখনোই ছিলো না। স্বার্থের জন্য ভালোবাসতেন মাশরাফিকে। মাশরাফির জন্য মাশরাফিকে ভালোবাসেন নাই। যদি বাসতেন তাহলে আপনার বিপক্ষ দল হোক আর যেই দল-ই হোক ব্যক্তি মাশরাফিকে আপনার ভালোবাসতেই হবে। আপনি বলতে পারেন আলাদা একটি দল নিয়ে রাজনীতিতে আসতে পারতো। কিন্তু আপনার মতামতটা আপনার কাছে, আর মাশরাফিরটা সে ভালো বুঝে। মাশরাফি যখন মাঠে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করে তখন কি আপনি মাঠে গিয়ে মাশরাফিকে শিখিয়ে দিয়ে আসেন? নাকি আপনি মাঠে গিয়ে মাশরাফিকে বলে দেন কখন কাকে বল দিতে হবে। কাকে কি বলতে হবে, কখন কি করতে হবে সেটা মাশরাফি জানে এবং বুঝে বলেই মাশরাফির প্রতি মানুষের ভালোবাসা এতো। কিন্তু আজ রাজনীতির বেলায় এসে তার সাথেও অনেকে রাজনীতি করছি। যাইহোক, রাজনীতি করা যেতে পারে তবে মাশরাফিকে কষ্ট দেওয়া যেতে পারে না। যে মানুষটা অনেকবার পায়ের অপারেশন করেও সেই পা নিয়ে আমাদের জন্য ২২ গজে ফিরে এসেছেন সেই মানুষটাকে কীভাবে এতো সহজে অবিশ্বাস করতে পারি আমরা?

আমাদের বুঝতে হবে এবারও তিনি কোনো ভালো কাজের উদ্দেশ্যে রাজনীতিতে এসছেন এবং আওয়ামীলিগে যোগ দিয়েছেন। আমি বলছি না এই কারণে আওয়ামীলিগকে ভালোবাসতে হবে, কিন্তু মাশরাফিকে এবং তার কাজকে ভালোবাসতে তো ক্ষতি নেই। এই মানুষটার পাশে ছিলাম বলেইতো ক্রিকেটে আমরা অনেকজয় পেয়েছি। এখনও তাকে উৎসাহ দিয়ে দেশের উন্নয়ণে পাশে থাকুন। এটাই যতেষ্ট। আর নেহয়েত তাকে ভালোবাসতে না পারেন কিন্তু কুমন্ত্যব্য করবেন না। অনেকে বলে খেলার মাটে মাশরাফি দেশের জার্সি পড়ে নামবে, সে এই মূহুর্তে রাজনীতিতে কেনো এলো। কিন্তু আমরা জানিনা যে এই মানুষটি ক্যারিয়ারের শেষাংশে চলে এসেছেন। ইতোমধ্যে টেস্ট ক্রিকেট ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে অবসরে গেছেন। বাকি ওয়ানডে, এবং আগামী জুনে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপের মাধ্যমেই তিনি তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষ করবেন। এরপর তিনি কি করবেন, তখন কি তার জন্য আরেকবার সংসদ নির্বাচন করতে পারবেন কেউ?

উত্তরে না ছাড়া আর কিছুই আসবে না। তাই আগে চিন্তা করবেন, তারপর মন্তব্য করবেন, এটাই শ্রেয়। আর মাশরাফি ক্রিকেট খেলা অবস্থায় রাজনীতিতে আসছেন, নির্বাচন করছেন। এটা নজিরবিহীন এমনও নয়, এমন নজির আগেই স্থাপন করেছেন শ্রীলঙ্কার সনাথ জয়াসুরিয়া। সনাথ জয়াসুরিয়া ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাহেন্দ্র রাজাপাকসের ইউনাইটেড পিপল ফ্রিডম অ্যালায়েন্সে যোগ দেন এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এমপি হয়ে যাওয়ার পরও খেলা চালিয়ে যান জয়াসুরিয়া। ২৮ জুন ২০১১ সালে দেশের হয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন তিনি। এবং এরও এক বছর পর শ্রীলঙ্কার ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। ২০১২ সালে জয়াসুরিয়া খুলনা রয়েল বেঙ্গলসের (কেআরবি) হয়ে বিপিএলও খেলে যান। জয়াসুরিয়া যেমন ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শেষের দিকে রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছিলেন, মাশরাফিও সেই একই পথে। এখানে জয়াসুরিয়ার সঙ্গে মাশরাফির একটা বড় মিল। কিন্তু দেশের মানুষের মন্তব্যটা শুধু ভিন্ন।

আর ক্রিকেটারদের রাজনীতি? সেটাও এই উপমহাদেশের নতুন কিছু নয়। ভারতের সেই মনসুর আলী খান পাতৌদি, নবজ্যোত সিং সিধু, বিনোদ কাম্বলি, মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক নাইমুর রহমান দুর্জয়, শ্রীলঙ্কার সনাথ জয়াসুরিয়াসহ অনেকেই এসেছেন রাজনীতিতে। কেউ কেউ সফল হয়েছেন, আবার কেউবা ব্যর্থ হয়েছেন। তবে ক্রিকেটার রাজনীতিবিদ হিসেবে সবচেয়ে সফল হওয়া নাম পাকিস্তানের ইমরান খান। মাশরাফি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন শাস্ত্রে ভর্তি হলেও লেখাপড়া শেষ করতে পারেননি তিনি ক্রিকেটের কারণে। ১৭ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ২০০১ সালের নভেম্বরে। টেস্ট ক্রিকেট দিয়ে শুরু এবং আগামী বছরের জুনের ওয়ানডে দিয়ে ক্রিকেট ক্যারিয়ার সমাপ্তির আলোচনা রয়েছে। ক্রিকেটের কারণে লেখাপড়া শেষ করতে না পারলেও তিনি সবসময় মানুষের সংস্পর্শে ছিলেন। নিজের শহর নড়াইলে গড়েছেন তিনি ‘নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন’।

এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। গতবছরের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) রংপুর রাইডার্সকে শিরোপা জিতিয়ে তিনি দলের মালিকের কাছ থেকে অ্যাম্বুলেন্স চান। পেয়েছেনও বটে। আর পাবেনই বা না কেনো। এটা যে মানুষের কল্যাণের জন্য। এলাকার মানুষের প্রতি তার এমন ভালোবাসা, মমতা, আর অঙ্গিকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগের অন্যতম দৃষ্টান্ত। নেতৃত্ব গুণ ও ব্যক্তিমানুষ হিসেবে তুমুল জনপ্রিয় মাশরাফি দেশের ৩০০ আসনের মাত্র একটি আসনের একজন মনোনয়নপ্রত্যাশী হয়েও আলোচনায়। আলোচনায় থাকাটা খারাপনয়, তবে বদআলোচনা অবশ্যই খারাপ। কারণ মানুষটা যে মাশরাফি। এখন পর্যন্ত বলা যায় খেলোয়াড়ী জীবনে সফল এক ব্যক্তি¡ মাশরাফি। তিনি শুধু বাংলাদেশের সফল একজন অধিনায়কই নন বাংলাদেশের পক্ষে ওয়ানডে ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী। এমন এক অধিনায়ক ও ব্যক্তিত্ব অবসরের দুয়ারে এক পা দিয়ে যখন গণমানুষের সেবার নিমিত্তে রাজনীতিতে নাম লেখান তখন একে স্বাগত না জানানোর যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছি না। তবে একদিন এই ভুল সকলেই বুঝতে পারবে। আর তখন বলবে—

ভুল করে তোমায় করেছি অসম্মান
আর নিজেকে করেছি পাপিষ্ট,
ক্ষমা চাওয়ার ভাষা নেই আজ
অনুশোচনার নেই অবশিষ্ট।


Leave a Reply