মানব জীবনে রোজার প্রয়োজনীয়তা – Nobobarta

আজ মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ০৬:৪৪ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম:
মানব জীবনে রোজার প্রয়োজনীয়তা

মানব জীবনে রোজার প্রয়োজনীয়তা

ওয়ালি উল্লাহ সিরাজ : আমারা যে দেহটি দেখি, সেটি আসল মানুষ বা ইনসান নয়, আমাদের এই জড়দেহের ভেতরে রুহ বা আত্মা নামে একটি শক্তি আল্লাহপাক গচ্ছিত রেখেছেন, সেটাই হলো আসল মানুষ বা ইনসান। আমাদের এই জড়দেহ হচ্ছে তার আধার বা ধারণাপাত্র। দেহের সম্পর্ক হচ্ছে মাটি ও জড়জগতের সঙ্গে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, ‘আর নিশ্চয় আমি মানুষকে পচা কাদার খনখনে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছি’ (সুরা : আল হিজর, আয়াত : ৫৬)। পক্ষান্তরে রুহ বা আত্মার সম্পর্ক হচ্ছে ঊর্ধ্বজগতের সঙ্গে। রুহ সম্পর্কে ইহুদিরা নবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিল, যার উত্তরে আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘আর তারা আপনাকে রুহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। আপনি বলুন, রুহ হচ্ছে আমার রবের হুকুমবিশেষ। আর তোমাদের ইলমের খুব সামান্যই দান করা হয়েছে’ (সুরা : আল ইসরা, আয়াত : ৮৬)।

দেহ ও আত্মা উভয়েরই খাদ্যের প্রয়োজন আছে। তবে উভয়ের খাদ্য এক নয়। দেহের সম্পর্ক যেহেতু জড়বস্তুর সঙ্গে, সেহেতু অন্যান্য পশুর মতো মানবদেহেরও খাদ্যের উৎস হলো জড়বস্তু। এর দ্বারাই তার জড়দেহ বৃদ্ধি লাভ করে এবং পরিপুষ্ট হয়। কিন্তু মানুষের দেহসত্তা যতই পুরিপুষ্ট হয়, তার মধ্যে জৈবিক ও পাশবিক শক্তিগুলো ততই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে আর রুহ বা আত্মা ততই দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ঊর্ধ্বজগতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও ততই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যায়। রুহ বা আত্মা যদি তার নির্বারিত খাদ্য লাভ করে, তা হলে দেহের মতো রুহ বা আত্মাও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এখন প্রশ্ন হলো রুহ বা আত্মার খাদ্য কী? যেহেতু রুহ এসেছে আল্লাহর পক্ষ থেকে, আল্লাহর আদেশরূপে; সেহেতু এর খাদ্য হলো আল্লাহর ইবাদত। এ থেকেই বোঝা যায়, আমাদের ওপর যেসব ইবাদত ফরজ করা হয়েছে, আল্লাহর তাতে কোনো প্রয়োজন নেই। একটি হাদিসে কুদসিতে এসেছে, জিন ও ইনসান যদি নেকি দ্বারা দুনিয়া ভরে ফেলে, তাতে আমার রাজত্বের সামান্যও বৃদ্ধি হবে না। তদ্রুপ জিন ও ইনসান যদি নাফরমানি দ্বারা দুনিয়া ভরে ফেলে তা হলে আমার রাজত্বের সামান্যও ক্ষতি হবে না (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং : ২৪৯৫)।

আসলে আমাদের প্রয়োজনে আমাদের রুহ বা আত্মার খাদ্যরূপে আল্লাহপাক দয়া ও অনুগ্রহ করে আমাদের ওপর বিভিন্ন ইবাদত ফরজ করেছেন। দেহের খাদ্যে যেমন বৈচিত্র্যের প্রয়োজন, তেমনই রুহ বা আত্মার খাদ্যেরও বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা প্রয়োজন। সেই জন্যই একটিমাত্র ইবাদতের পরিবর্তে চার প্রকার ইবাদত আমাদের ওপর ফরজ করা হয়েছে। হজরত শাহ ওয়ালি উল্লাহ দেহলবি (রহ.) তার অমর গ্রন্থ হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহতে এ সম্পর্কে বলেছেন, রুহ বা আত্মার খাদ্য হিসেবে রোজার গুরুত্ব অনেক বেশি। দেহের খাদ্য জৈবিকতা ও পাশবিকতাকে শক্তিশালী করে, আর রোজা আমাদের তা থেকে বিরত রাখে, যেন আমাদের আত্মা নির্দিষ্ট একটা সময় জৈবিকতা ও পাশবিকতা থেকে মুক্ত হয়ে ঊর্ধ্বজগতের সঙ্গে তার সম্পর্কটি মজবুত করে নিতে পারে। বস্তুত রোজার মাধ্যমে রুহ বা আত্মা কতটা ঊর্ধ্বজাগতিক উন্নতি লাভ করে এবং মানুষ আল্লাহপাকের কতটা নৈকট্য অর্জন করে, তা একটি হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়- রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের থেকেও উত্তম (বোখারি, হাদিস নং : ১৮৯৪)। ইমাম গাজ্জালি (রহ.)

বলেছেন, আখলাকে ইলাহি তথা ঊর্ধ্বজাগতিক গুণাবলিতে মানুষকে গুণান্বিত করাই হচ্ছে রোজার উদ্দেশ্য। রোজা মানুষকে ফেরেশতাকুলের অনুকরণের মাধ্যমে যতদূর সম্ভব প্রবৃত্তিপরায়ণতা থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা দেয় এবং তার মধ্যে জৈবিকতা ও পাশবিকতার মোকাবিলা করার আত্মিক শক্তি সৃষ্টি করে। আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, রোজার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে তার পাশবিক ইচ্ছা ও জৈবিক অভ্যাস থেকে মুক্ত করা এবং এতে সুস্থতা ও স্বাভাবিকতা প্রতিষ্ঠিত করা। রোজার মাধ্যমেই মানুষ আত্মাশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জন করে।


Leave a Reply