বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ৭৮তম জন্মবার্ষিকী আজ – Nobobarta

আজ বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ০৭:০৮ অপরাহ্ন

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ৭৮তম জন্মবার্ষিকী আজ

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ৭৮তম জন্মবার্ষিকী আজ

আজ ২৯ অক্টোবর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের জন্মদিন। ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার ১০৯ আগা সাদেক রোডের পৈতৃক বাড়ি ‘মোবারক লজ’-এ জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ৯ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে মতিউর ষষ্ঠ। তার বাবা মৌলভী আবদুস সামাদ, মা সৈয়দা মোবারকুন্নেসা খাতুন। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পাস করার পর সারগোদায় পাকিস্তান বিমানবাহিনী পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। তিনি ডিস্টিংকশন সহ ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

১৯৬১ সালে তিনি বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালের জুন মাসে রিসালপুর পিএএফ কলেজ থেকে কমিশন লাভ করেন এবং জেনারেল ডিউটি পাইলট হিসেবে নিযুক্ত হন। এরপর করাচির মৌরিপুরে জেট কনভার্সন কোর্স সমাপ্ত করে পেশোয়ারে গিয়ে জেটপাইলট হন। ১৯৬৫-তে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ফ্লাইং অফিসার অবস্থায় কর্মরত ছিলেন। এরপর মিগ কনভার্সন কোর্সের জন্য পুনরায় সারগোদায় যান। সেখানে ১৯৬৭ সালের ২১ জুলাই তারিখে একটি মিগ-১৯ বিমান চালানোর সময় আকাশে সেটা হঠাৎ বিকল হয়ে গেলে দক্ষতার সাথে প্যারাসুটযোগে মাটিতে অবতরণ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ইরানের রানী ফারাহ দিবার সম্মানে পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত বিমান মহড়ায় তিনি ছিলেন একমাত্র বাঙালি পাইলট। রিসালপুরে দু’বছর ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর হিসেবে কাজ করার পর ১৯৭০-এ বদলি হয়ে আসেন জেট ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর হয়ে।

চাকরিজীবনে তিনি এফ-৮৬ জঙ্গি বিমানের পাইলট হিসেবে ১৯নং ফাইটার স্কোয়াড্রন ও ২৫নং স্কোয়াড্রনে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিমানবাহিনী একাডেমি, রিসালপুরে ও ২নং স্কোয়াড্রনে। এ ছাড়া তিনি কিছুকাল আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা সদর দপ্তর, ইসলামাবাদেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৬৭ সালে এক পাঞ্জাবি পাইলটের সাথে প্রশিক্ষণকালীন আকাশযুদ্ধে লিপ্ত হলে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার বিমানটি বিধ্বস্ত হয় এবং তিনি বেইল আউট করেন। এ ঘটনায় তাদের উভয়কেই কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি করা হয়। বিচারে পাঞ্জাবী পাইলটের শাস্তি না হলেও তাকে এক বছরের জন্য গ্রাউন্ডেড করা হয়।

১৯৬৮ সালের ১৯ এপ্রিল তিনি মিলি খানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৬৯ সালের ২৩ এপ্রিল তাদের প্রথম কন্যাসন্তান মাহিন ও ১৯৭০ সালের ১৪ ডিসেম্বর দ্বিতীয় কন্যাসন্তান তুহিনের জন্ম হয়। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে বার্ষিক ছুটিতে তিনি সপরিবারে ঢাকায় আসেন। এ সময় তিনি প্রত্যক্ষভাবে স্বাধিকার আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১ মার্চ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা করেননি। ২৫ মার্চ গ্রামের বাড়ি নরসিংদী গমন করেন এবং সেখানকার স্বাধীনতাকামী জনতার প্রশিক্ষণের বন্দোবস্ত করেন। ৪ এপ্রিল পাকিস্তান বিমানবাহিনী নরসিংদীর ওপর বিমান হামলা চালালে তিনি ভৈরব হয়ে নানার বাড়ি গোকুল নগরে গমন করেন। পাকিস্তান থেকে বিমান ছিনতাইয়ের মানসে ৯ মে ১৯৭১, তিনি সপরিবারে কর্মস্থলে ফিরে যান। কর্তৃপক্ষের কাছে দেরিতে যোগ দেওয়ার কারণ দর্শানোর পর তাকে ফ্লাইং সেফটি অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

মাশরুর বিমানঘাঁটির ৬৪ নটিক্যাল মাইল দূরে যেখানে মতিউরের বিমানটা বিধ্বস্ত হয়, সেখান থেকে আর মাত্র তিন মিনিটের পথ দূরেই ছিল ভারত সীমান্ত। ভারতীয়রা পাকিস্তানিদের কথোপকথন ইন্টারসেপ্ট করে ততক্ষণে মতিউরের কথা জেনে গিয়েছিল এবং কিছু ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভারতের আকাশে ঢোকার পর মতিউরের বিমানকে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান থেকে বাঁচাতে আকাশে টহলও দিচ্ছিল। অনেকের মতে, মতিউর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মিনহাজকে প্রাণে মারতে চাননি। কারণ, পেছনের নিচু সিটে বসে সীমাবদ্ধ দৃষ্টিসীমা নিয়ে বিমানটাকে নিরাপদে নিকটস্থ ভারতীয় বিমানঘাঁটি পর্যন্ত নিয়ে যেতে মিনহাজের সহায়তা তার দরকার ছিল। আর এ কারণে জ্ঞান ফেরার পর পেছন থেকে একটা পিস্তল ঠেকিয়ে তিনি মিনহাজকে বিমান চালাতে বাধ্য করতে চেষ্টা করেছিলেন। মতিউর রহমান তার অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, স্বাধীনতার জন্য বাঙালিরা কতটা ব্যাকুল আর উদগ্রীব ছিলেন।

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের দাফন হয়েছিল পাকিস্তানের করাচির মাশরুর বেসের চতুর্থ শ্রেণীর কবরস্থানে। কবরের সামনে লেখা ছিল, ‘ইধার শো রাহা হ্যায় এক গাদ্দার’। প্রায় ৩৫ বছর ওখানে ছিলেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। ২০০৬ সালের ২৩ জুন মতিউর রহমানের দেহাবশেষ পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তাকে পূর্ণ মর্যাদায় ২৫ জুন শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে পুনরায় দাফন করা হয়।

পুনশ্চ
এই একই ঘটনায় বাংলাদেশ মতিউর রহমানকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে আর পাকিস্তান মিনহাজকে নিশান-ই-হায়দার উপাধিতে ভূষিত করে। একই ঘটনায় উভয় দেশের দুজনের সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক পদক প্রাপ্তির দৃষ্টান্ত সত্যি বিরল।


Leave a Reply