বিতর্ক সংগঠন ও আমার ভাবনা – Nobobarta

আজ সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০১:৫০ পূর্বাহ্ন

বিতর্ক সংগঠন ও আমার ভাবনা

বিতর্ক সংগঠন ও আমার ভাবনা

বিতর্ক বর্তমান যুগের শিক্ষিত সমাজে একটি অতিপরিচিত বিষয়। এখন স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গÐি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিতর্ক চর্চা হয়। একজন মানুষ বিতর্ক চর্চার মাধ্যমে তার চিন্তা চেতনার জগতে পরিবর্তন সাধন করতে পারেন। কারণ একমাত্র বিতর্কের মাধ্যমেই প্রদত্ত কোন বিষয় বা প্রস্তাবনাকে সুশৃঙ্খল সুবিন্যাস্ত এবং শাণিত যুক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সঠিক বা সত্য বলে প্রমাণ করতে হয় এবং পাশাপাশি এর বিপরীত দিকটিকেও তথ্যবহুল আলোচনার মাধ্যমে অসত্য ও দুর্বল হিসেবে দাঁড় করাতে হয়।

একজন বিতার্কিকের বিতর্ক চর্চার মাধ্যমে চিন্তার মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যুক্তির শাণিত ধারায় পতিপক্ষকে ঘায়েল করার যে প্রক্রিয়ার মধ্যে একজন বিতার্কিক তার শুদ্ধ উচ্চারণ বাচনভঙ্গি তত্ত¡ ও তথ্য বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য থেকে একটি যুক্তিসঙ্গত উপায় বা সমাধানের পথ খুঁজে। বিতর্ক চর্চার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাচেতনা ও সৃজনশীলতাকে বিকশিত করতে পারে। একজন বিতার্কিক সমাজে একজন যোগ্য যুক্তিবাদী ব্যক্তি হিসেবে তার মেধা ও মননের পরিচয় বহন করতে পারে। সচেতনতা বৃদ্ধি তথ্যের অনুসন্ধান উপস্থাপনা ও তত্তে¡র বেড়াজালে প্রতিপক্ষ দলকে দমিয়ে রেখে নিজের দলের যুক্তিগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করার যে প্রয়াস দর্শকদের আনন্দিত করে। তেমনি বিচারকদের বিচার বিশ্লেষণ থেকে একটি যৌক্তিক সমাধানের পথও খুঁজে পাওয়া যায়। উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক ড. হাসান আজিজুল হক বলেছিলেন ‘কথার ছুঁড়ি দ্বারা একে অপরকে বধ করা হয়। বিতর্কে রক্তারক্তি হয়না কিন্তু তলোয়াড় চালানো যায়। বিতর্ক মঞ্চে একজন বিতার্কিকর গুরুত্বপুর্ণ কাজটি আমাকেও ভাবিয়ে তোলে।’ বিচারক স্পীকার সভাপতি পক্ষ, বিপক্ষ দল ও দর্শকদের আকৃষ্ট করার যে মাধ্যম অর্থ্যাৎ যুক্তির অস্ত্রের ঝনঝনানিতে নিজের তথ্যবহুল গোছালো বক্তব্যে বিতর্ক মঞ্চকে প্রাণবন্ত করে তোলা যায়। একইভাবে পক্ষ বা বিপক্ষ দলের যুক্তিগুলোকে নিজস্বভাবে গঠনমূলক বিশ্লেষণধর্মী উপস্থাপনার মাধ্যমে একজন বিতার্কিকের নিজস্ব মতকে ফুটিয়ে তোলার যে আকাঙ্খা সত্যিকার অর্থেই এটি চিন্তা চেতনা ও চর্চার প্রতিফলন যা বিতর্কে থেকে শেখা যায়। একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে কথা বলার জড়তা বাচনভঙ্গি একটি বিষয়ের উপর গুছিয়ে উপস্থাপন করার জন্য বিতর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যা চর্চার মাধ্যমে আয়ত্ব করতে হয়।

বিতর্ককে পাঠ্যপুস্তকের অর্ন্তভুক্ত করা এখন সময়ের দাবী। সমাজকে পরিবর্তন করতে হলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের জন্য বিতর্ক সম্পর্কে বা বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা আমাদের নিজস্ব জ্ঞান ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে। পাশাপাশি একজন যোগ্য যুক্তিবাদী এবং চিন্তার উপলব্ধি জ্ঞানকে বিকশিত করে। আমরা জানি বিতর্ক করতে হলে একজন বিতার্কিককে অনেক অধ্যয়ন করতে হয়। ঠিক তেমনি এই অধ্যয়ন বিতর্ক মঞ্চে আমাদের তথ্য বিশ্লেষণে দলকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়। বিতর্কের মঞ্চে পক্ষ, বিপক্ষ, সরকারী, বেসরকারী বা বিরোধীদলগুলোর সদস্যদের সম্মানের সাথে সম্বোধন করে উভয় দলের অবস্থান এবং নিয়মকানুন মেনে সুন্দর একটি প্রতিযোগিতা উপহার দেয়। দিনশেষে বিতর্কের জয় হয়। যারা বিতর্ককে তর্ক হিসেবে আর বিতর্ক হিসেবে দেখে তাদের অবস্থান ভিন্ন। তাই আমরা কোন বিষয়ের উপর না যেনে কোন তর্কে জড়াবো না।

এখন আসি বিতর্কে বিশেষ বিষয়ে তর্ক আমরাও করি কিন্তু সেটা নির্দিষ্ট ও বিশেষভাবে। যেখানে না বুঝে কথা ছুড়াছুড়ি থাকবে না। নির্দিষ্ট নিয়ম নীতির মাধ্যমে বিশেষ উপায়ে সেখানে থাকবে তথ্য ও তত্তে¡র গঠনমূলক সমালোচনা। এর মাধ্যমে একজন মানুষকে যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে সমাজে নিজেকে ভিন্ন মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত করবে। বাংলাদেশের বিতর্ক জগতের কিংবদন্তী বলা হয়ে থাকে বিরুপাক্ষ পালকে। তিনি বলেছেন ‘বিতার্কিকরা কখনও বেকার থাকে না। একজন বিতার্কিক যেমন বক্তা তেমনি একজন সংগঠক এবং নিজের প্রয়োজনে দুয়ার খুঁজে বের কের। যুক্তিবাদীরা হতাশ হবে না।’ সহশিক্ষা কার্যক্রমের অন্যতম মাধ্যম বিতর্ক। বিতর্ক চর্চার মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রতিভাকে বিকশিত করে হয়ে উঠুক যুক্তিবাদী। আর তাদের মাধ্যমেই সাধিত হবে জাতির কল্যাণ।

বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজে বিভিন্ন ধরনের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দেখতে পাই। এসব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো বিভিন্নভাবে মানুষের জন্য কাজ করে থাকে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, বিতর্ক সংগঠন বিভিন্ন শিক্ষামূলক ক্লাব, বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করে তা সুষ্ঠুভাবে সমাধানের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির সাংগঠনিক দক্ষতা বৃদ্ধির পথ তৈরি করে দেয়। একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি দেশ ও জাতির জন্য কাজ করে। এসব সংগঠনের মাধ্যমে সমাজে নারী নির্যাতন,যৌতুক, ইভটিজিং দুর্নীতি সেগুলো সমাজকে কলুষিত করছে তার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছে। যেমনটা দেখেছি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন তাদের গানের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। এছাড়া অর্থ সংগ্রহ করেছিল। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলে। সংগঠন করা মানুষ কখনোই সহজে বখে যায় না, মাদকাসক্ত হয় না। কারণ তারা একা থাকে না। তাদের আশেপাশে অনেকেই থাকে ফলে হতাশা তাদের গ্রাস করতে পারে না। তারা তাদের ভেতরের প্রতিভাকে বিকশিত করে এবং যোগ্য সৎপরায়ন মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। সাংগঠনিক দক্ষতা পরবর্তী জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোন আয়োজনকে সামনে রেখে এসব সংগঠনগুলো মিলনমেলায় পরিণত হয়। ফলে প্রাক্তন ও বর্তমান সদস্যদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। সবশেষে বলতে চাই ভবিষ্যৎ তরুণ প্রজন্মের সুদক্ষ নেতৃত্বে আগামীর বিশ্বকে পরিচালিত হবে। একইসঙ্গে সকল বিতার্কিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের সংগঠনগুলোর জন্য অফুরান শুভকামনা রইলো।

 

লেখক শিক্ষার্থী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবেক সভাপতি গ্রুপ অব লিবারেল ডিবেটারস্ বাংলাদেশ (গোল্ড বাংলাদেশ) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


Leave a Reply