বন্ধ ক্যাম্পাসেও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন – Nobobarta

আজ বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ১২:৫৭ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম:
কাউখালীতে ৪০ যাত্রীসহ খেয়া ট্রলার ডুবি, পিএসসি পরীক্ষার্থী নিখোঁজ পাকিস্তান থেকে এলো ৮২ টন পেঁয়াজ রহমতপুর ইউনিয়নে ওয়ার্ড আ’লীগের সম্মেলন, সভাপতি সুলতান, সম্পাদক স্বপন তারেক রহমানের জন্মদিনে জাবি ছাত্রদলের দোয়া ও মিলাদ আগৈলঝাড়ায় পেঁয়াজ, চাউল ও লবণ নিয়ে গুজব, ইউএনও বিপুল চন্দ্র দাসের অভিযান অব্যাহত কাউখালীতে নৌকা ডুবিতে নিখোঁজ পিইসি পরীক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার কবি সুফিয়া কামালের নামানুসারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ইতিহাসবিদ সিরাজ উদ্দীনের জাবির হল খুলে দেওয়াসহ ৭দফা দাবি শিক্ষার্থীদের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে শুরু হল বুড়ি তিস্তা খনন নলছিটিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভবন নির্মাণের অভিযোগ
বন্ধ ক্যাম্পাসেও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন
পুলিশ পাহারায় বাসভবনে উপাচার্য

বন্ধ ক্যাম্পাসেও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন

জোবায়ের কামাল, জাবি : দুর্নীতির অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। গত মঙ্গলবার ছাত্রলীগের হামলার পর শিক্ষার্থীরা বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠলে পরিস্থিতি ঠা-া করতে ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নির্দেশ দেয়া হয় সন্ধ্যার মধ্যে আবাসিক হল ত্যাগের।

কিন্তু প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখান করে দিনভর আন্দোলন চালিয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠা সংগঠন ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গতকাল কয়েক দফা হল ত্যাগের সময় বাড়ালেও ক্ষুদ্ধ আন্দোলনকারীরা ক্যাম্পাস ত্যাগ করবে না বলে ঘোষণা করেন। দিনভর উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের সামনে সংহতি সমাবেশ করেছেন তারা। সমাবেশ শেষে বিকাল সাড়ে চারটার দিকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি উপাচার্যের বাসভবনের দিকে গিয়ে ফের ঘেরাও করেছেন উপাচার্যের বাসভবন। এদিকে, উপাচার্যের বাসভবনের সামনে প্রায় দেড় শতাধিক পুলিশ মোতায়েন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক উপ-পরিদর্শক জানান, যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে দেড় শতাধিক এবং বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পাশ্ববর্তী এলাকায় আরো দেড় শতাধিক পুলিশ রিজার্ভে রাখা হয়েছে।

সকাল ৯টা থেকেই বিক্ষুদ্ধ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ও মানবিকী অনুষদ ভবন সংলগ্ন মুরাদ চত্বরের সামনে জড়ো হতে শুরু করে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসে কর্মচারিরা প্রবেশ করতে চাইলে তাদের সরিয়ে দেয়। ফলে স্বাভাবিক হয় নি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম। সকাল সাড়ে দশটায় দুই শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয় মুরাদ চত্বর থেকে। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার-টারজান পয়েন্ট-ছাত্রীদের সবকটি হল-চৌরঙ্গী-পরিবহন চত্বর ঘুরে পুনরায় শহীদ মিনার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে এসে অবস্থান নেয়। সেখানে উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সংহতি সমাবেশ পালন করে তারা।

সংহতি সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, উপাচার্য ছাত্রলীগের হামলাকে গণঅভ্যুত্থান বলেছে। কিন্তু প্রকৃত গণঅভ্যুত্থান ঠেকাতে হল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উপাচার্য হল খালি করে সরকারকে বুঝাতে চেয়েছেন অদ্ভুত সমস্যার সমাধানে এটা করা হয়েছে। কিন্তু এর সমাধান হল খালি করা নয় বরং উপাচার্যের গদি ছাড়া। আশা করি উপাচার্যের বিষয়ে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্তে আসবেন। সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে শিক্ষার্থীদের পেটানোয় তার নৈতিকতার পূর্ণ অবক্ষয় হয়েছে। ফলে উপাচার্য তার পদে থাকার নৈতিক অবস্থান হারিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক ব্যবসায়ী ও পুলিশের ভূমিকা নিয়েছে। আর দেশের বিশ^বিদ্যালয় গুলোতে ভিসি নিয়োগ আইয়ুব খানের অধ্যাদেশ অনুযায়ী চলছে। যার ফলে ভিসি নিয়োগ সরকারের কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। কিন্তু ভিসি নিয়োগের প্রক্রিয়া এমন হওয়ার কথা ছিলো না। বেশ কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে ভিসি নিয়োগ হওয়ার কথা। প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় এবং কোন কোন শিক্ষক শিক্ষকতার চেয়ে ব্যবসায়ী, পুলিশ, কেউবা আমলা হতে পছন্দ করার ফলে এমন দুর্নীতিবাজরা ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় গুলো প্রশ্নালয়ে পরিণত না হয়ে দুর্নীতিগারে পরিণত হয়েছে। গতকালকে উপাচার্য যে গণঅভ্যুত্থানের কথা বলেছে তা মূলত গণপশুত্বের অভ্যুত্থান। উপাচার্যের অভ্যুত্থানের সংজ্ঞা দেখে তার জ্ঞানের দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পেয়েছে। আমরা গোপালগঞ্জ, পাবনা ও বুয়েটের পরে জাহাঙ্গীরনগরে দেখলাম ক্ষমতাসীনরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কিভাবে পশুত্বালয়ে পরিণত করেছে। আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব এদের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন করে সর্বজনের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই পশুত্ব, স্বৈরাচারী আচরন চিরতরে বিদায় করা।

শিক্ষক সমিতির সদ্য পদত্যাগ করা সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক সোহেল রানা সংহতি জানিয়ে বলেন, গতকালের ঘটনায় আমরা দেখেছি কিভাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করা হয়েছে। আমি ক্ষমাপ্রার্থী যে শিক্ষক সমিতির পদে থেকেও কিছু করতে পারিনি। সামান্য একটি প্রতিবাদ লিপিও দিতে পারিনি। তাই সেই দায় নিয়ে পদত্যাগ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা সংকট চলছে। এই সংকট সমাধানে সরকারকে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। কলা ও মানবীকি অনুষদের ডীন অধ্যাপক মোজাম্মেল হক সংহতি জানিয়ে বলেন,আমি আজ এখানে এসেছি সংহতি জানাতে। আমিও আপনাদের সাথে আছি। গতকালকের ঘটনায় আমি ব্যথিত ও মর্মাহত। সিন্ডিকেটে গতকাল হল ভ্যাকেন্ডের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তার তীব্র বিরোধিতা করছি।

সংহতি সমাবেশ শেষে আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত ভিসির বাসভবন অবরোধ করে রাখেন। এসময় সেখানে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উপস্থিত ছিলো। উপাচার্যের বাসভবনের সামনে কর্মসূচি সম্পর্কে আন্দোলনের মুখপাত্র দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, আগামীকাল (আজ) সকাল ১০টায় মুরাদ চত্বরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের মধ্য দিয়ে নতুন করে আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করবো। উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে আমাদের যে আন্দোলন তা পূরণ হওয়া না পর্যন্ত আমরা থামবো না। ক্যাম্পাসে অবস্থানের বিষয়ে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সভাপতি নজির আমিন চৌধুরী জয় বলেন, আমরা চেষ্টা করবো নিজ নিজ হলে অবস্থান করার। তবে প্রশাসন যদি থাকতে না দেয় তবে আমরা রাতের মতো ক্যাম্পাস ত্যাগ করবো এবং পরিদন আবার ক্যাম্পাসে এসে আন্দোলনে যোগ দিবো।

এদিকে সকাল থেকে দুই দফা আবাসিক হল ত্যাগের জন্য সময় বাড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রভোস্ট কমিটি। অতঃপর দুপুর ২টায় কমিটির এক জরুরী বেঠক শেষে অধ্যাপক বশির আহমেদ শেষ বারের মতো বেলা সাড়ে ৩টার মধ্যে হল ত্যাগের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, বিকাল সাড়ে তিনটার মধ্যে সব হল খালি করা হবে। এই সময়ের মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং ছাত্রলীগ নেতাদেরও হল ত্যাগ করতে হবে। এই সময়ের পরে প্রত্যেকটি হল সংলগ্ন খাবারের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এই সময়ের মধ্যে হল ত্যাগ না করলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

জানা যায়, বেঁধে দেয়া এই সময়ের মধ্যে হল ত্যাগ না করলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুলিশের সাহায্য নিয়ে জোরপূর্বক শিক্ষার্থীদেরকে হল ছাড়তে বাধ্য করবে। এমন ঘোষণার পর সাধারণ শিক্ষার্থীসহ ছাত্রলীগের অনেক নেতা-কর্মী হল ত্যাগ করেছে। এদিকে জোরপূর্বক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের খাবার দোকানগুলো। ফলে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে। ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় ক্রমেই কমছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৩ অক্টোবর একনেকে জাবির অধিকতর উন্নয়নের জন্য ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ করা হয়। প্রকল্পের শুরু থেকেই অপরিকল্পিত উন্নয়ন পরিকল্পনা, সহ¯্রাধিক গাছ কাটা এবং শাখা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে টেন্ডার ছিনতাইসহ ২ কোটি টাকা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়ে এই বিশাল প্রকল্প। এরপর থেকেই উপাচার্যকে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে তার অপসারণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠা সংগঠন ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’। তিন মাসের লাগাতার আন্দোলনের পর গত সোমবার, ৪ নভেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে সংগঠনটির ব্যানারে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে। পরদিন ৫ নভেম্বর, মঙ্গলবার শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে ৮ শিক্ষকসহ অন্তত ৩৫জন আহত হয়। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠলে সেদিনই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।


Leave a Reply