প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় আবারও বাংলাদেশের অবনতি – Nobobarta

আজ মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ০৬:৪১ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম:
প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় আবারও বাংলাদেশের অবনতি
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম

প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় আবারও বাংলাদেশের অবনতি

এ আর সুমন : টানা তৃৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। এরই মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের পথে আজকের বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ছড়াছড়ি। তবে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত করতে নানামুখী উদ্যোগের কথা বলা হলেও সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক সংস্থা বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) তথ্য বলছে, চলতি বছর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশ আরও দুই ধাপ পিছিয়েছে। বিশ্বের ১৪১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১০৫তম। ১০০ স্কোরের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ৫২.১। গত বছর ১৪০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল ১০৩তম এবং তার আগের বছর ছিল ১০২তম। তার মানে ক্রমাগতভাবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমেছে।

ডব্লিউইএফের তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডা, কেনিয়া, এশিয়ার স্থলবেষ্টিত দেশ মঙ্গোলিয়া, এমনকি হন্ডুরাস, গুয়েতেমালার মতো দেশেও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ বাংলাদেশের চেয়ে উন্নত। যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে এবার এক নম্বরে জায়গা করে নিয়েছে গত বছর দুই নম্বরে থাকা সিঙ্গাপুর। দুইয়ে নেমে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) গ্লোবাল কমপিটিটিভনেস রিপোর্ট বা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদন-২০১৯। যেখানে এসব চিত্র ফুটে উঠেছে। দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাবসহ বেশকিছু বিষয়ে বাংলাদেশের এই অবনতি হয়েছে বলে উল্লেখিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। উল্লেখ্য, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ১৯৭৯ সাল থেকে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশকেও এ প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তখন থেকেই সিপিডি বাংলাদেশে সংস্থাটির সঙ্গে অংশীদার হিসেবে কাজ করে আসছে।

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকের স্কোর নির্ধারণে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, পণ্য বাজার, আর্থিক ব্যবস্থা, বাজারের আকার, ব্যবসায়িক গতিশীলতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা- এই ১২টি মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়েছে। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরেন। পাশাপাশি বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশের ওপর একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছে সিপিডি। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ চ্যাপ্টারে বলা হয়েছে, আগের বছরের তুলনায় এ বছর সুশাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে। প্রতিবেদন তৈরিতে যেসব ব্যবসায়ীর মতামত নেওয়া হয়েছে তাদের ৭৮ শতাংশ বলেছেন, সরকারি কাজ পেতে ঘুষ দিতে হয়। একইভাবে আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে ঘুষ দিতে হয় বলে ৭৬ শতাংশ ব্যবসায়ী মত দিয়েছেন। অংশগ্রহণকারী ৭৪ শতাংশ ব্যবসায়ী বলেছেন, কর পরিশোধে ঘুষ দিতে হয়। ৭৭ শতাংশ ব্যবসায়ীর মত হচ্ছে- রাজনীতিবিদদের নৈতিক অবস্থানে অবক্ষয় হয়েছে। দুর্নীতি বৃদ্ধির ফলে ব্যবসার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে নতুন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েছেন বেশি। এছাড়া দুর্নীতির কারণে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমেছে। ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সরকারি তহবিলের যথাযথ ব্যবহার না হওয়া একটি সাধারণ প্রবণতা। বিচার ব্যবস্থা প্রভাবমুক্ত নয় বলে মনে করেন ৬৬ ভাগ উত্তরদাতা।

ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকার বাজেটে যে সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে তা সব খাত সমানভাবে পাচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার অভাব ও অনিয়মের কারণে এমন পক্ষপাতমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সরকার নতুন যেসব নীতি গ্রহণ করছে তার প্রশংসা করেছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সেসব ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের মতামতের প্রতিফলন হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অবকাঠামোতে উন্নয়ন হলেও রেল যোগাযোগ এখনো আগের অবস্থায় রয়ে গেছে। সড়ক, নৌ ও আকাশপথের যোগাযোগ আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প (ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট) সময়মতো শেষ না হওয়ায় এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। সময়মতো এবং মানসম্মতভাবে প্রকল্প শেষ না হওয়ায় নতুন প্রকল্পের সুফল পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্কোর গত বছরের মতো এ বছরও ৫২.১ রয়েছে। যদিও ১২টি মানদণ্ডের মধ্যে ১০টিতেই বাংলাদেশ আগের বছরের তুলনায় খারাপ করেছে। শুধু ‘বাজার’ মানদণ্ডে বাংলাদেশ ৫০টি দেশের মধ্যে রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বলছে, সূচকের মানদণ্ডগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য, দক্ষতায় বাংলাদেশের উন্নতি হলেও প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে স্কোর কমেছে। অবকাঠামো, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, শ্রমবাজার, আর্থিক ব্যবস্থা, বাজারের আকার, বাজারের গতিশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতায় এবার স্কোর হয়েছে গতবারের সমান। বাংলাদেশের শ্রমবাজার, নতুন তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষতা ও ব্যবসার গতিশীলতার বিষয়ে সতর্ক হওয়া দরকার বলে মনে করে সিপিডি। সংস্থাটি বলেছে, এসব বিষয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। বিশেষ করে মানব সম্পদের ক্ষেত্রে। বর্তমানে যে মানব সম্পদ রয়েছে এবং আগামীতে যে মানব সম্পদ শ্রমবাজারে যোগ হবে, তাদের সময়োপযোগী দক্ষ করে তুলতে না পারলে এসব মানুষ দেশের বোঝা হয়ে যাবে। এজন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে সিপিডি। সংস্থাটি বলেছে, জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা তথা মানব সম্পদ উন্নয়নে ব্যয় করতে হবে।

বাংলাদেশের কেন দুই ধাপ অবনমন হলো, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘এ বছর ১২টি সূচকের মধ্যে দশটিতেই পতন হয়েছে। শুধু পণ্য বাজার ও স্বাস্থ্য এই দুটি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নতি হয়েছে। যে দশটিতে অবনমন হয়েছে, তার মধ্যে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, শ্রমবাজার, প্রযুক্তি অভিযোজন এবং অবকাঠামো রয়েছে।’ দুই ধাপ পেছানোর পেছনে আরও যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৪১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১২৩তম। দুর্নীতির ঘটনায় ১২৫তম। জনসংখ্যার তুলনায় অনিরাপদ পানি গ্রহণের সূচকে ১৪১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৬তম। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, ভূমি ব্যবস্থাপনার গুণগত মান, আর্থিক খাতের অবস্থানেও অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এখন জনসংখ্যার বোনাস কাল ভোগ করছে। যেখানে প্রায় ৬৯ শতাংশ জনগোষ্ঠীর বয়স ১৫ থেকে ৫৯ বছরের মধ্যে। এরা সবাই কর্মক্ষম। কিন্তু এই অদক্ষ জনশক্তি একদিন বাংলাদেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে চতুর্থ শিল্প বিপবের কারণে।’ সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘দেশ ক্রমাগত উন্নতি করলেও অনেক ক্ষেত্রে সংস্কার জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বাড়ানো ও মানবসম্পদের উন্নয়ন করা দরকার। যদিও এরই মধ্যে কিছু সংস্কার উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে তা অপ্রতুল।’

আর্থিক পরিস্থিতির সার্বিক বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আর্থিক খাত তার দুর্বল কাঠামোর সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। এ খাতের সব সূচকই নেতিবাচক। যেসব ব্যবসায়ীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে তার ৫৫ ভাগ ব্যাংক ব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। এসএমই খাতের অর্থায়নে সুযোগ কমেছে। এছাড়া এ খাতে সুদের হারও বেড়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল অডিট ও রিপোর্টিং এখন দুর্বল। বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগেও নানা ধরনের বাধা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন ধরনের কিছু ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে- জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বেকারত্ব বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় দুর্বলতা, মনুষ্য সৃষ্ট পরিবেশদূষণ বৃদ্ধি ইত্যাদি। গত এক বছরে আর্থিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, সামাজিক অস্থিরতা, অবৈধ ব্যবসা এবং সম্পদ বৃদ্ধিও নতুন ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। যদিও প্রতিবেদনে কিছু ঝুঁকি প্রশমিত হয়েছে বলে উলেখ করে বলা হয়েছে, এ সময়ে সাইবার ঝুঁকি কমেছে বাংলাদেশে।

সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে, অভ্যন্তরীণ বাজার কতিপয় ব্যবসায়ীর হাতে আটকে যায়নি। এখানে ছোট ব্যবসায়ীর সুযোগ থাকতে হবে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে।’ বিশ্বে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার দিক দিয়ে এবারের সূচকের শীর্ষে উঠে এসেছে সিঙ্গাপুর। এরপরই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, হংকং, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, জাপান, জার্মানি, সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও ডেনমার্ক। এই দশটি দেশই গতবারের সূচকে শীর্ষ দশে ছিল, এবার শুধু অবস্থানের হেরফের হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, জাপান ও যুক্তরাজ্যের অবস্থার অবনতি হয়েছে। সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার চেয়ে এগিয়ে ভারত। তবে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার উন্নতি হয়েছে। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই লক্ষ্যণীয় বিষয় বলে উল্লেখ করেছে সিপিডি।

— সাম্প্রতিক দেশকাল


Leave a Reply