পাস নয়, শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে – Nobobarta

আজ রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৬:৩৭ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম:
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে লাশ উদ্ধার সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন নিয়ম জারি ভালুকায় বন বিভাগের জমি হতে কাটা শতাধিক কাঠ জব্দ রংপুরে দুুই সন্তানসহ অন্ত:সত্বা স্ত্রীকে হত্যা, স্বামী গ্রেফতার ইন্টারনেট থেকে মিথিলা ও ফাহমির ছবি সরাতে হাইকোর্টের নির্দেশ হলে দর্শক ফেরাতে সিনেমাকে ডিজিটালাইজড করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী ভালুকা পাক হানাদার মুক্ত করতে স্বজন হারিয়েছি : এমপি কাজিম উদ্দিন আহাম্মেদ ধনু কোটালিপাড়ায় ৫০০ প্রতিবন্ধীর মাঝে কম্বল বিতরণ হয়রানী ও অফিস স্থানান্তর না করার দাবীতে লক্ষ্মীপুরে পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহদের মানববন্ধন রুম্পা হত্যা মামলায় রিমান্ডে ‘বয়ফ্রেন্ড’ সৈকত
পাস নয়, শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে

পাস নয়, শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে

কবীর চৌধুরী তন্ময় : সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি… দিনের শুরুতেই মানুষ একটা ব্রত, পণ-প্রতিজ্ঞা বা চিন্তা-ভাবনা করে যেথ সেবামূলক কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত রাখবে- এই ধরনের শিক্ষা পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই পেয়ে থাকে। কারণ, একমাত্র প্রাণী মানুষ, যাকে প্রতিনিয়ত শিখেই সভ্যতার দিকে এগিয়ে যেতে হয়।

অন্যদিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বললে, মানুষ প্রথমে জন্তু, পরে মানুষ- এ কথাটি খুব শক্ত হলেও তার সত্যতা এড়ানোর সুযোগ নেই। আর এই মানুষকে সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে হলে তাকে পেরোতে হয় নানা ধরনের কঠিন বাধা-বিপত্তি। প্রতিটি মানুষের জীবনধারণ করা বা বেঁচে থাকাই হচ্ছে ‘প্রথম শর্ত’ ও ‘বড় বাধা’। খুব বেশি দুর্ভাগ্যের শিকার না হলে আমাদের প্রতিটি শিশুই বেঁচে থাকার মতো পারিবারিক সেবা-যত্ন পেয়ে আসছে। আর এই শিশুর প্রতি মমত্ববোধ একটি সহজাত ও প্রকৃতির অপার মহিমাও বটে। তবুও শিশুকে বেড়ে ওঠার জন্য, তার মানসিক বিকাশ সাধনের জন্য ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেটার পূর্ব শর্তই হচ্ছে শিক্ষা। প্রতিটি মানুষ তার প্রথম শিক্ষা লাভ করে মা ও তার পরবিারের কাছ থেকে। তারপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দিকে এগিয়ে যেতে হয়।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের অধিকাংশ পরিবার পরিজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের দিকে রীতিমতো বাধ্য করে খুব ছোটকাল থেকেই। শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটার আগেই বাবা-মা সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখে, বড় হয়ে কে কী হবে বা তাকে কোন পেশায় জীবনযাপন করাবে। আর সেদিকেই চেষ্টা করে। সেটা শিশুর জন্য চ্যালেঞ্জ হলেও তাকে সেদিকে পরিচালিত করতে বাধ্য করে। আমরা ভুলে যাই, হাত-পা নাড়ানো শিশুটি ধীরে ধীরে তার আপন ভুবনে খেলাধুলা করবে। আর প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের প্রথম ধাপেই অর্থাৎ শিশুকাল থেকেই ক্রীড়া বা খেলাধুলার প্রতি মনোযোগী করা এবং সে পরিবেশ সৃষ্টি করা। যে শিশু খেলাধুলা করে, হাসিখুশি ও চটপটে থাকে তার দেহ-মন দুটিই ভাল থাকে। তাই হয়ত বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানবজীবনের প্রথম কাজ জীবিকার জন্য নয় বরং সর্বপ্রথম প্রয়োজন সুস্থতা আর সুস্থতার জন্য প্রয়োজন ক্রীড়া ও ক্রীড়াযুক্ত নানামুখী কর্মকা-।

আমাদের দেশে শিক্ষকের চেয়ে অভিভাবকরাই বেশিরভাগ অসচেতন। ডাক্তার হতে হবে, ইঞ্জিনিয়ার বানাতে হবে-এই ধরনের চিন্তাধারা আমাদের অধিকাংশ বাবা-মার মাঝে দেখা যায়। তাই সত্যিকারের শিক্ষা গ্রহণ ও মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার বিপরীতে কে কত নম্বর বেশি পেয়েছে, কার বাসায় কয়টা জিপিএ-ফাইভ এসেছে- যেন এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা রীতিমতো শিক্ষার্থীদের মাঝে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। পছন্দমতো শিক্ষা, শিক্ষার পরিবেশ, পাঠদানে সহযোগিতা, ভারমুক্ত বা ফ্রি চিন্তা থেকে পড়ার আগ্রহের বিপরীতে রীতিমতো বাধ্য হয়েই পাঠদান গ্রহণ করে যা সঠিকভাবে জানার ও বোঝার আগ্রহ হারিয়ে মুখস্থ বিদ্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে। ভয় আর আতঙ্কের কারণেই শিক্ষার্থীরা এদিকে ধাবিত হয়।

আর এটা অভিভাবকদের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়, অধিকাংশ শিক্ষকের মাঝেও প্রতীয়মান। জোর করে পাঠদান, মুখস্থ বিদ্যা, সিলেবাস অনুযায়ী পড়াশোনার পদ্ধতিগুলো আমাদের সবারই জানা। কারণ, আমরা এ শিক্ষা পদ্ধতির মাঝেই বড় হয়েছি। শিক্ষকের উল্লেখিত প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়ে শিক্ষকের বেতের আঘাত সহ্য করেনি-এমন শিক্ষিত মানুষ খুব কম আছে বলেই আমার ধারণা। সেই সঙ্গে শারীরিক শাস্তিও সবার মনে থাকার কথা।

তৃতীয় বিশ্বের চতুর্থশিল্প বিপ্লবের এই সময়ে শিক্ষা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশই এখন আর শুধু পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষার উপর জোর দিচ্ছে না, শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কীভাবে মানবসম্পদ করে গড়ে তোলা যায়, কীভাবে প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজেই এক-একটা উদ্যোগতা হয়ে উঠতে পারে-এটার উপর গবেষণা করে সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে প্রতিটি মানুষই যাতে কর্মদক্ষ হয়ে গড়ে উঠতে পারে- এদিকেই সবার লক্ষ্য।আমাদেরই সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার সময়ে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। মানসম্মত ও টেকনোলজি বেইজড শিক্ষা পদ্ধতি করতে হবে।

কিন্তু সে ব্যাপারে আমাদের পরিকল্পনা কী? আমাদের শিক্ষকদের দক্ষতা কেমন? পাঠদানের পরিবেশ তথা শিক্ষা মান কেমন-এই ধরনের প্রশ্ন এখন আর অবান্তর নয়। কারণ, ২০০৮ সালেই মুখস্থবিদ্যার বদলে শিক্ষার্থীরা বুঝে পড়বে ও শিখবে, নোট-গাইড বা অনুশীলন বই থাকবে না-এমন পরিকল্পনা থেকেই সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়। কিন্তু এক দশক পর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর তদারক করে বলেছে, প্রায় ৪২ শতাংশ শিক্ষক পুরোপুরিভাবে সৃজনশীল প্রশ্নই করতে পারেন না। তার মানে এখানে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের পর্যাপ্ত অভাব দেখা যাচ্ছে।

মাধ্যমিক স্তরটির অবস্থা আরও নড়বড়ে। কার্যকরভাবে পাঠদান না করানোর পাশাপাশি ইংরেজী ও বিষয়ভিত্তিক পাঠদানে আন্তরিকতার অভাব ও পাঠাভ্যাসেও আছে তাদের শিক্ষকদের অনুপস্থিত। যে কারণে শিক্ষার্থীদের মাঝে কাক্সিক্ষত দক্ষতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। শিক্ষাকেও সেবামূলকভাবে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিভিন্ন লিফলেট, রং মাখিয়ে, ঢং সাজানো বিজ্ঞাপনগুলো দেখলে মনে হয়, শিক্ষা আজ পণ্য বিপণন ব্যবস্থায় দাঁড়িয়েছে। যার কারণে সমাজ, জাতি, প্রগতির মূল্যায়নে শিক্ষার চাহিদা আজ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। একদল শিক্ষক দলাদলি ও তেলবাজিতে নিজেদের নিয়োজিত রাখে, আরেকদল আছে ইতিহাস বিকৃতি করে শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কে কীভাবে ইনস্টল করা যায়-এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

বিশ্বদ্যিালয়গুলোর দিকে নজর দিলে, গত ১০ বছরে ১০৩টি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৫২টির অনুমোদন হয়েছে। ৪২টি সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে গত ১০ বছরে হয়েছে ১৪টি। উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধি করা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিবিড় তদারকি জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রতিষ্ঠা করেন। এই উচ্চশিক্ষা দেখভালের দায়িত্বে থাকলেও আইনী সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক প্রভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা প্রভৃতি কারণে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার ইউজিসির হাতে তেমনটা নেই। বাস্তবায়নের ক্ষমতা না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনিয়মের ব্যাপারেও সেই অর্থে তেমন কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না। এমনকি, এ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নিয়োগ হলেও সেখানে কাউন্সিলরের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি অংশ আবার বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেয়ার বিধান থাকলেও অনেকেই এ নিয়ম মানে না। এমন শিক্ষকও আছেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়ার অনুমতি নিয়ে একাধিক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করছে।

এলোমেলো শিক্ষাক্রমের মাঝেও আমাদের পাস করার প্রতিযোগিতা আমাদের শিক্ষার মানকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। আর তাই ২০০৯ সালে পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। প্রাথমিক সমাপনীতে পাসের হার ২০১৩ সালে ছিল ৯৮.৫৮। আর এখনও প্রায় উনিশ-বিশ। জেএসসিতে সর্বশেষ পাসের হার ৮৫ শতাংশের ওপরে। এইচএসসিতে পাসের হার বেড়ে ৭৬.৫০ শতাংশ পর্যন্ত উঠলেও ২০১৮ সালে এটি কমে হয়েছে ৬৪.৫৫ শতাংশ। আর এসএসসিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের কাছাকাছি বিদ্যমান আছে।

কিন্তু এসএসসি-এইচএসসিতে ভাল ফলাফল করলেও উচ্চশিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বরও অর্জন করতে পারেনি অধিকাংশ শিক্ষার্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (সম্মান) ‘গ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় মাত্র ১১ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছে। উপরের পরিসংখ্যানে পাসের প্রতিযোগিতায় আমাদের অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরের সহযোগী বলে প্রতীয়মান। কিন্তু শিক্ষার্থীরা কতটুকু জেনেশুনে জ্ঞান অর্জন করছে- এটা নিয়ে তাদের তেমন কোন মাথাব্যথা নেই। অনলাইনে চাকরির বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান ‘বিডিজবস’ থেকে জানা যায়, একাডেমিক শিক্ষা সনদ থাকলেও অনেকে চাকরির দরখাস্ত পর্যন্ত করতে পারে না। অর্থাৎ শিক্ষা থাকলেও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে।

আর এই মানসম্মত শিক্ষার জন্যই শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করা জরুরী হয়ে পড়েছে। অভিজ্ঞ শিক্ষক তৈরিতে শিক্ষকদের দেশী-বিদেশী প্রশিক্ষণদানের ব্যবস্থা করতে হবে। আর প্রশিক্ষিত বা অভিজ্ঞ শিক্ষরাও প্রতি মাসে না হলেও প্রতি দুই মাসে বা তিন মাসে একবার করে মাধ্যমিকস্তরের শিক্ষার্থীর অভিভাবদের সঙ্গে মতবিনিময় করাসহ অভিভাবদেরও প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে।

‘আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে, আমি যেন সেই কাজ করি ভাল মনে’-কবির দৃষ্টিভঙ্গিতে এই ভাল মন বা বোধশক্তি শিক্ষার্থীর মাঝে সৃষ্টি করতে সর্বপ্রথম পরিবার ও শিক্ষককে আন্তরিক হতে হবে। আমরা যদি শৈশব থেকেই মানুষ, মানবতা আর দেশপ্রেম আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে গেঁথে দিতে পারি, মাটিকে ভালবাসতে শেখাতে পারি, এদেশের সুন্দর ইতিহাস-কৃষ্টি-সংস্কৃতির কথা জানাতে পারি, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এ দেশ স্বাধীন হওয়ার কথা, ৫২-এর মাতৃভাষা বাংলা চাই আন্দোলনের কথা তুলে ধরতে পারি; একদিন তারাই বিশ্বকে জয় করবে।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)


Leave a Reply



Nobobarta © 2020। about Contact PolicyAdvertisingOur Family
Design & Developed BY Nobobarta.com