পাঠ প্রতিক্রিয়া : কাচ কাটা ভোর – Nobobarta

আজ শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:০৭ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম:
রাজাপুরে ইয়াবা ট্যাবলেটসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৮ রাজাপুরে পরিবার কল্যাণ সেবা ও প্রচার সপ্তাহ অনুষ্ঠিত মহিউদ্দিন সভাপতি, আবু বকর সম্পাদক উদয় সমাজ কল্যান সংস্থার ১২ তম ওয়াজ মাহফিল সম্পন্ন ১০ ডিসেম্বর উপাচার্যের দুর্নীতির ক্ষতিয়ান প্রকাশ করবে আন্দোলনকারীরা মার্শাল আর্ট ‘বিচ্ছু’ নিয়ে আসছেন সাঞ্জু জন আজ উদয় সমাজ কল্যান সংস্থা সিলেটের ১২তম ওয়াজ মাহফিল দলীয় কার্যালয় সম্প্রসারণের লক্ষে আগৈলঝাড়া রিপোর্টার্স ইউনিটির প্লট উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের কাছে হস্তান্তর যবিপ্রবিতে ইয়ুথ এন্ডিং হাঙ্গার বাংলাদেশের নতুন কমিটি গঠন আটোয়ারীতে পরিবার কল্যাণ সেবা ও প্রচার সপ্তাহ উপলক্ষে এ্যাডভোকেসি সভা অনুষ্ঠিত
পাঠ প্রতিক্রিয়া : কাচ কাটা ভোর

পাঠ প্রতিক্রিয়া : কাচ কাটা ভোর

ফরিদ আহমেদ (ব্লগার দেবদাস) : সুনীলের স্মৃতিচারণমূলক বিভিন্ন রচনাগুলোতে শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে অবলীলায় যেভাবে গল্পের পর গল্প বলে যেতেন তা পড়ে আমার বুকটা কেঁপে উঠত! শক্তি ছিল সুনীলের বন্ধু। আম পাঠকের নিকট শক্তি চট্টোপাধ্যায় একজন শক্তিমান কবি। একই মানুষ সমন্ধে দুজন মানুষের অভিব্যক্তি সম্পুর্ণ ভিন্ন। দু দিন পূর্বে লুৎফর রহমান পাশা রচিত একটি উপন্যাস হাতে নিয়ে আমার বারবার সুনীলের কথা মনে পড়ছিল। কিন্ত আমি তো সুনীল নই। তবুও একজন অপরিচিত অজানা আমপাঠক হিসেবে বইটির মলাট এবং লেখক পরিচিতিকে বেমালুম ভুলে পড়তে শুরু করেছিলাম ‘কাচ কাটা ভোর’।

উপন্যাসটির শুরুতে মোটেই চমক নেই, কিন্ত কয়েক পাতা পড়ার পর মনে হলো শুরুটা চমকের চাইতেও অধিক কিছু। গল্প বলার স্টাইল, উপস্থাপনা, পরিবেশকে পাঠকের সামনে তুলে ধরা, কথার পিঠে কথা দিয়ে কাহিনীকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে একজন নবীন ঔপন্যাসিক হিসেবে যথেষ্ট মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন বলেই আমি একজন পাঠক হিসেবে দ্ব্যার্থহীনভাবে বলতে পারি। উপন্যাসের শুরুতে দেখতে পাই পান সিগারেটের দোকানদার রেজাউল সাহেবকে। যিনি কিনা এক যুগের কিছুকাল অধিক সময় পূর্বে সরকারী ডাক্তার হিসেবে কর্মরত ছিলেন সিলেট পৌরসভায়। থাকতেন সরকারী স্টাফকোয়ার্টারে। বড় কোয়ার্টার, বিভিন্ন শ্রেণির লোকের সহাবস্থান। এই একই কোয়ার্টারে থাকতেন গবেষক কাম কৃষি কর্মকর্তা মালিহা। গল্পের কেন্দ্রিয় চরিত্র মালিহা বিবাহিতা। স্বামী নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।

স্বাভাবিক ভাবেই সবকিছু চলছিল যেমন চলে মানুষের দৈনন্দিন জীবন। এক পর্যায়ে বিভিন্ন ঘটনা দূর্ঘটনায় ডাক্তার রেজাউল এবং কৃষি কর্মকর্তা মালিহার মধ্যে পরিচয় হয়। পরিচয় পরিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সময় অতিবাহিত হয়। উপন্যস অর্ধেকের বেশী পড়া হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ আমার শিরধারা বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। আমি বেশ অবাক হই। অবিবাহিত ডাক্তার রেজাউল ধীরে ধীরে মালিহার প্রতি আসক্তি অনুভব করে এবং সেটা ক্রমশই সীমা অতিক্রম করার জন্য উদ্ধত হতে চায়। আমি আসলে সত্যিকার ভাবে আরেকটু পরে বড় ধাক্কাটা খাই যখন দেখি উচ্চ শিক্ষিতা কৃষিকর্মকর্তা মালিহার মনে এক পৃথিবী সমান মাটিচাপা দেয়া কামশক্তি ডাক্তার রেজাউলকে গ্রাস করে নেয় মুহুর্তেই। এবং মালিহার মনে এটাই ছিল পূর্বরচিত অভিলাষ। তখন আমার মনে পড়ে জ্যেতিরিন্দ্র নন্দীর ‘গিরগিটি’ গল্পের কথা। নারীর মন আসলে কি চায় তা পূর্ববৎ অনুমান করা যায় না। এভাবে দিনের পর দিন অতিবাহিত হয়। মালিহার অভিলাষ সুনিপূনভাবে চরিতার্থ হবার পর সে ধীরে ধীরে পূর্বাবস্থানে ফিরতে চায়। হঠাৎ মালিহার এই টার্নিং-এ খেই হারিয়ে ফেলে ডাক্তার রেজাউল। কোন এক বিয়ের আসরে মালিহা এবং তার বান্ধবী শান্তার গোপন অট্টহাসির অপর প্রান্তেই ততোধিক গোপনীয়তার অন্তরাল থেকে ডাক্তার রেজাউল দেখতে পায় তার নিজের অবস্থান, কিভাবে তাকে ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলা হয়েছে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে।

উপন্যাসের পার্শ্বচরিত্রগুলো, যেমন; মিজান, সবুর, মালি এবং স্টাফকোয়ার্টারের বিভিন্ন শ্রেণির বাসিন্দাদের মনোভাব উপস্থাপন, বাচনভংগি, ভাষা সবকিছু সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে লেখক সমর্থ হয়েছেন। একজন নবীন লেখক হিসেবে তার লেখার মুল্যায়ণ করলে আমার নিশ্চিত ভূল হতো। আর এ জন্যই আমি শুরুতেই বইটির মলাট এবং লেখক পরিচিতিকে বাদ দিয়ে শুধু লেখাটাকেই নিয়েছিলাম। কয়েকটি বানান এবং যৎসামান্য মূদ্রণত্রুটি ব্যাতিত বইটি যেকোন পাঠকের সমালোচনাকে উৎরানোর দাবী রাখে বলে বিশ্বাস করি।

বইটি পড়তে যেয়ে আমি বেশ কটি লাইনের নীচে দাগ কাটতে বাধ্যে হই যা থেকে ভবিষ্যত পাঠককে নিরাশ করতে চাই নাঃ-
“শিক্ষিত মার্জিত জনগোষ্ঠীও যখন বড়দের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন তখন তাতেও একটা শ্রী থাকে যা অন্তত শ্রূতিকটু হয় না।“

“মানুষ আসলে ঐ পাহাড়ের মতো। পাহাড়ের গা থেকে কান্না নেমে আসলে তাকে ঝর্ণা মনে করে। প্রবাহিত পানিকে নদী নামে অভিহিত করে কেউ কেউ এর উৎস খোজে বেড়ায়। আসলে খুব কম মানুষই এর সুত্র খুঁজে পায়। মানুষ পাহাড়ের চেয়ে অসীম অটল। মানুষের বুকের ভেতরে যে সুর বাজে তার তাল লয়ের উৎস কোনদিন মানুষ খুঁজে পায়না। কেবল উপলব্ধি করতে পারে মাত্র।“

“পৃথিবীর আজ কান্না পেয়েছে ভীষন। আঝোর ধারায় ঝরেই চলছে। একটা ছান্দসিক জলের পতন আছে কিন্ত বিরতি নাই। দূরে কাছে বৃক্ষগুলো ঝড়ে আর জলে জুবুথুবু হয়ে আছে, পৃথিবী আজ পন করেই তবে ছেড়েছে তার কান্না থামবেনা। এ কান্না সুখ কি অসুখের সে বিবেচনায় আনার সময় কোথায়।“

“জীবনের সাথে হৃদয় বোধের যে বাধন তাতে সীমারেখা থাকেনা হৃদয়ের, থাকেনা সময়ের। সামাজিক কিংবা নিয়মের ধার ধারার সময় কোথায়? এখানে শুধু উপলব্ধি আর বোধের বিষয়। যেখানে জীবন মেপে চলে, সেখানে হৃদয়ের স্পন্দনের কাটা কোন পথে চলে তার পথের সীমা রেখা খুঁজে পায়না সেখানে হাতকড়া পড়াবার মতো হাতই বা কোথায়? গলায় রজ্জু পরাবার মতো কন্ঠই বা কোথায়? সে কন্ঠের জলের মালা তখন হীরের চাইতেও দামী হয়ে উঠে।“

“নারীর জ্বালানো আগুন বড় বেপরোয়া, পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে যায়। একবার যখন আগুন লাগে তা নেভানোর মতো কোনো জল পাওয়া যায় না। পুড়তেই থাকে। যতক্ষন জ্বালানীতে জীবনি শক্তি থাকে ততক্ষন। যখন পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে যায় তা আর কোন কাজে লাগেনা। ছাই ভষ্ম শুধু স্থান দখল করে মাত্র।“

এরকম অন্তর ছুয়ে যাওয়া অনেক কথা আছে বইজুড়ে। লেখক গল্পটা শেষ করেছিলেন এইভাবে- “মানুষ ভালবাসতে চায়। ভালোবাসা পেতে চায়। কিন্ত আসলে ভালোবাসা মানুষকে কি দেয়? একবুক বিরহ। একরাশ যন্ত্রনা। মানুষ সুখের আশায় ভালবাসার বালুচরে ঘর বাধে। বালির নীচে চোরা স্রোতে একে একে নুড়ি সরতে থাকে। তখনও সে আশায় বুক বাধে। এক সময় পায়ের নিচ থেকে পুরো পৃথিবী সরে যায়।

মানুষ আসলে বেদনা চায়। মিছে মিছি ভালবাসার নাম করে একবুক বেদনা বুকে ধারন করে পৃথিবীতে অমরত্ব লাভ করার লোভ করে।“ এক কথায় বলতে গেলে ‘কাচ কাটা ভোর’ আমাদের বর্তমান সমাজের প্রতিচ্ছবি। পেশাগত দ্বায়িত্ব পালনের কারনে,পরিবারের বন্ধন ছিন্ন করে অন্যত্র বসবাস, অর্থনৈতিক লোভ-লালসা চরিতার্থ করতে যেয়ে সংসার ধর্মকে দূরে ঠেলে শুধুই উপরে উঠার অভিপ্রায়ে জীবনের মৌলিকতাকে অবহেলা করে একটা সময়ে অন্ধকারে ডুবে যাওয়ারই ফ্লাশব্যাক আলোচ্য উপন্যাস।
আলোচিত উপন্যাস কাচ কাটা ভোর এর প্রচ্ছদ করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর। প্রকাশ করেছে স্বরচিহ্ন প্রকাশনী। বইটি পাওয়া পাওয়া যাচ্ছে রকমারি ডট কম এ।


Leave a Reply