দেশে উন্নীত করতে হলে দুর্নীতিকে জিরো ট্রলারেন্সে নিয়ে আসা বড় চ্যালেঞ্চ – Nobobarta

আজ মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ০৭:০১ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম:
দেশে উন্নীত করতে হলে দুর্নীতিকে জিরো ট্রলারেন্সে নিয়ে আসা বড় চ্যালেঞ্চ
নবগঠিত আওয়ামীলীগ সরকারকে

দেশে উন্নীত করতে হলে দুর্নীতিকে জিরো ট্রলারেন্সে নিয়ে আসা বড় চ্যালেঞ্চ

অধ্যাপক আজিজুর রহমান আযম : হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য, ত্যাগী, দুরদর্শী ও জীবনেরর ঝুকি নিয়ে সাহসী নেতৃত্বে বাঙালি জাতি দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশ্রস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লক্ষ শহীদদের রক্তের ও ২ লাখ মা-বোনের স¤্রম হারানোর বিনিময়ে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে সম্পূর্ন পরাস্থ করে ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করে স্বাধীনতার লাল সূর্য্যকে ছিনিয়ে এনেছিল। হাজার বছরের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি প্রথম একটি স্বাধীন রাষ্ট্র লাভ করল। এই জাতির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর অবদান ও আত্মত্যাগ চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। ইহাও লক্ষনীয় যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার আগেই প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তাঁহাকে পোয়েট অব পলিটিক্স বা রাজনীতির কবি অভিধারায় ভূষিত করিয়াছিল। শুধু তাহাই নয়, কয়েক বছর আগে বিবিসি পরিচালিত জনমত জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসাবে শীর্ষে স্থান পাইয়াছে তাঁর নাম।

কিন্তু স্বাধীনতার এই সোনার হরিনকে ছিনিয়ে আনার জন্য সেই সময়ে সমগ্র বাঙালী জাতি যেমন কৃষক, কামার, কুমার, জেলে-তাতী, আদিবাসী জনগণ, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, চিকিৎসক, কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবি, সহ সমগ্র পেশাজীবী,দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী, নৌ-বাহিনী, বিমান বাহিনী, ই.পি.আর, পুলিশ, আনসার, তৎকালীন সময়ে বাঙালি বেসামরিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ তৎকালীন প্রায় সকল রাজনীতিবিদ ও সাধারণ খেটে খাওয়া নারী পুরুষ বঙ্গবন্ধুর আহবানে ঐ মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু কেন এই জীবন বাজি রেখে ৩০ লাখ শহীদের পবিত্র রক্তের বিনিময়ে ও দুই লাখ মা বোনের সম্ভ্রম হানির মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা ছেয়েছি? এই স্বাধীনতার মহান নায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল এই ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ছোট দেশটিকে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা।

বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে মাথা উচু করে দাঁড়াবে। সাধারণ মানুষ দু’বেলা পেট ভরে তাদের অন্ন সংস্থান করতে পারবে। ও মানুষের যে পাঁচটি মৌলিক অধিকার যেমন অন্নের সাথে সাথে বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত হবে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও আমরা বর্তমানে কি দেখছি? যেমন একটি দেশের উন্নতির জন্য প্রথম প্রয়োজন গণতন্ত্রের সুসংহত করা অর্থাৎ বাংলাদেশকে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সেই প্রচেষ্টায় অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছি। এই গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকী করনের জন্য যখন যেই দল ক্ষমতায় এসেছে সেই দলই গণতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত ছিল। বিরোধী দল ও সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মত ছায়া সরকার হিসেবে কাজ করে নাই। যখনই যে দল ক্ষমতার মসনদে আসীন হতো তখনই বিরোধী দল লাগাতার সংসদ বর্জন করে এই মহান জাতীয় সংসদকে অকার্য্যকর করে রেখেছিল। এটা যেমন বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ করেছিল তারই ধারাবাহিকতায় বিএনপি ও করেছিল। কিন্তু একটা দুঃখের বিষয় হলো সংসদে না গিয়ে জনগণের সুখ দুঃখের কথা তাদের নিজস্ব সংসদীয় আসনের বিভিন্ন দাবী ও দাওয়া তারা সংসদে না তুলেই ঠিকই জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তাদের ষোল আনা পাপ্য যেমন তাঁদের সম্মানী, বিদেশ ভ্রমণ, লাল পাসপোর্ট, বিনা শুল্কে বিশ্বের নামি দামি ব্যান্ডের গাড়ি আমদানি ও প্লট বরাদ্দ সহ যাবতীয় সুযোগ সুবিধা তারা অনৈতিকভাবে ভোগ করে আসছিল। এটা কি একটি দেশের সত্যিকারের সাংসদীয় রাজনৈতিক নমুনা?

এই গণতন্ত্রের কথা বলে বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদগণ ও দূর্নীতিবাজ আমলারা সহ বাংলাদেশকে দূর্নীতির চরম শিখরে নিয়ে গেছেন। এখানে না বললে নয় ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তৎকালীন চারদলীয় জোট অর্থাৎ বি.এনপি ও জামায়াতের সময়ে ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ দূর্নীতিতে চার চার বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, সা¤প্রদায়িকতা তখনকার সময় ব্যাপক মাথা ছাড়া দিয়ে উঠেছিল।

হাওয়া ভবন প্রতিষ্ঠা করে তারেক রহমান, গিয়াস উদ্দিন আল মামুন, ডঃ খন্দকার মোশারফ হোসেনসহ অনেক ডাক সাইটে বিএনপি নেতা দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে দিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে তখন আইনের শাসনের সুষ্ঠ প্রয়োগ ছিলনা। বর্তমান সরকারের সময়েও দেশে আইনের শাসণের সঠিক বাস্তবায়ন নেই। ক্রস ফায়ারের নামে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড চলছেই। এই মুহুর্তে দেশে নির্দিষ্ট কোন আইন নেই সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষেত্রে। বিচার বিভাগের জন্য স্বাধীন সচিবালয় গড়ে উঠে নাই। সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের নিয়োগ ও অপসারণের তা ছাড়া সর্বোচ্চ আদালতে অতিরিক্ত বিচারপতিদের নিয়োগ স্থায়ীকরণ, জৌষ্ঠতা প্রদান, আপিল বিভাগে নিয়োগ পদোন্নতি, প্রধান বিচার পতিদের নিয়োগ লাভ সব কিছুই চলছে প্রতিষ্ঠানিক পদ্ধতির বদলে সম্পূর্ন একক ব্যক্তির সিদ্ধান্তে। এমন কি এখন কোন আইন ছাড়াই চলছে সর্বোচ্চ আদালত ও বিচারকদের অবমাননার বিচার। কোন আইন ছাড়াই ৪৭ বছর ধরে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকরদের নিয়োগ দেওয়া মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। অথচ স্বাধীন বিচার বিভাগ হচ্ছে গণতন্ত্রের অমূল্য সম্পদ।

গণতন্ত্রের নামে এক নায়ক তন্ত্র বিরাজ করছে। দেশে প্রচলিত রাজনীতিক দলগুলোর মধ্যে কোন গণতান্ত্রিক চর্চা নেই, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কেউ তার দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ হারাতে হয়। সংবিধানের আলেকে এখন পর্যন্ত নেপাল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। যিনি প্রধানমন্ত্রী তিনি তার দলেরও প্রধান পদটি দখল করে আছেন এটাকে কোন মতেই সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পর্যায়ে ফেলা যায় না। যে দেশে দরিদ্র জনগণের ট্যাক্সের টাকায় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিবসহ সকল স্তরের কর্মকর্তাদের বেতন, বাসস্থান,গাড়ি, বিদেশ ভ্রমন, তাদের পাপ্য সকল কিছু বরাদ্ধ দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁরা যদি কোন দূর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে তার বিচার হয় না সেই দেশ কখনও উন্নত দেশ থাক দূরের কথা মাঝারি আয়ের দেশ ও হতে পারবে না। এ জন্য দূর্নীতি দমন কমিশন’কে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বর্তমান সরকারের প্রভাবমুক্ত হয়ে সঠিকভাবে তাঁদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবশ্যই আদায় করবেন বলে আমরা মাননীয় নবনির্বাচিত অর্থমন্ত্রীর আ হ ম মুস্তফা কামালের নিকট বিনীত অনুরোধ জানাই। এছাড়া ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকেও সঠিক কাঠামোর দাঁড় করানোর আবেদন জানাই। এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বলতে চাই দেশের প্রায় ৫০ লাখ লোক ইনকাম ট্রাক্স দেওয়ার যোগ্যতা আছে, তাঁদেও থেকে সঠিকভাবে সে ট্র্যাক্স আদায় করে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা।

বার্লিন ভিত্তিক ট্রান্সফারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক প্রকাশিত দূর্নীতির ধারণা সূচক অনূযায়ী বাংলাদেশে দূর্নীতি বেড়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে দূর্নীতিগ্রস্থ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪তম। আগের বছর ছিল ১৬তম স্থানে। বৈশ্বিক অবস্থানের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার ৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দূর্নীতিগ্রস্থ দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ট্র্যান্সফারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যে সব কারণে এই অবনতি তার মধ্যে রয়েছে দূর্নীতি প্রতিরোধ ও দমনের দায়িত্ব অর্পন করে প্রতিষ্ঠিত দুদকের কার্যকারিতা ও স্বাধীনতা খর্ব করার অপপ্রয়াস যেমন অব্যাহত রয়েছে তেমনি দুদকের নিজস্ব স্বকীয়তা, দৃঢ়তা ও নিরপেক্ষতার মাপকাঠিতে আস্থার সংকট রয়েছে চলমান। ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপি ও ব্যাংক গুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা কাঠামে ভেঙে পড়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি যাওয়া, রেলওয়ে নিয়োগ বানিজ্য, শেয়ার বাজার কেলেংকারি, হলমার্ক ও ডেসটিনির মত রুই কাতলা শ্রেণির দূর্নীতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সরাসরি প্রভাব মুক্ত হয়ে দুদক দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে এমন ধারণা সৃষ্টি হয়নি।

ব্যাংকিং খাতে দূর্নীতি ও জালিয়তির মহোৎসবের শীর্ষে সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেসিক ব্যাংক সহ আরও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে দূর্নীতির এক ধরনের মিছিল। রানা প্লাজার ঘটনার ব্যাপারে শৈথিল্য, ক্ষমতাবানদের বৈধ আয়ের সাথে সামঞ্জস্যহীন সম্পদের বৃদ্ধি, খেলাপী ঋণের দৌরাত্ব, নিয়োগ বাণিজ্যের রাজনীতিকরণ, ক্ষমতাবানদের একাংশের প্রত্যক্ষ বা প্ররোক্ষ অংশগ্রহণ বা যোগসাজশে ভূমি, বনাঞ্চল, নদী, জলাশয় দখল থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রকার টেন্ডারবাজিসহ আইনের শাসন পরিপন্থি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের উর্ধ্বেই রয়ে গেছে। দূর্নীতির মাধ্যমে ও অবৈধ পথে অর্থ পাচারকারী দেশ হিসাবে বাংলাদেশের নাম আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেয়েছে। মালয়েশিয়ার তথাকথিত সেকেন্ড হোম প্রকল্পের সুবিধাভোগী ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম স্থান দখল করেছে। এখন দূর্নীতি যে বেড়েছে এতে দ্বিমতের কোন সুযোগ নেই। এর অবনতির কারণ হলো দুদক ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। দূর্নীতি বন্ধের জন্য আমাদের মানসিকতাকে পরিবর্তন করতে হবে। মানসিকতা পরিবর্তন না হলে কখনই দেশ থেকে দূর্নীতি দূর হবে না। আর এ জন্য আগে দরকার সরকারের মানসিকতা পরিবর্তন। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে দূর্নীতি কমে যাবে। বিশেষ করে দলীয়ভাবে যদি চিন্তা করি সবার আগে দেশ, দেশ বাঁচলে দল থাকবে, সরকারও থাকবে।

বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা ডটার অব পিস, মাদার অব হিউমিনিটি, মাদার অব এডুকেশন, বিশ্বের উন্নয়নের রোল মডেল জননেত্রী শেখ হাসিনা ও বর্তমান বর্তমান কেবিনেটে এক যাঁক তরুন মেধাবী এবং প্রবীনদের সমন্বয়ে যে সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে তাঁদের প্রতি বাঙালি ১৭ কোটি জনগণের প্রাণের দাবি দূর্নীতিকে সমাজের একাবারেই উপরের স্তর থেকে নিচের স্তর পর্যন্ত নির্মূল করে জিরো ট্রলারেন্সে নিয়ে আসতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যেম আয়ের দেশও ২০৪১ সালের মধ্যে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় উন্নত রাষ্ট্রের পর্যায়ে পৌঁছবে বলে সকলে দৃড়ভাবে আশাবাদী।


Leave a Reply