আজ বৃহস্পতিবার, ২২ অগাস্ট ২০১৯, ০১:৪৯ পূর্বাহ্ন

দিল্লির চিঠি : বাংলাদেশকে ভারতের প্রয়োজন কোনো অংশে কম নয়

দিল্লির চিঠি : বাংলাদেশকে ভারতের প্রয়োজন কোনো অংশে কম নয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  

বাংলাদেশের আজ ভারতকে যতটা প্রয়োজন, বাংলাদেশকে ভারতের প্রয়োজন তার চেয়ে কম নয়। ২০১৪ সালে ভারতে লোকসভা নির্বাচনের সময় নরেন্দ্র মোদি কলকাতায় গিয়ে বাংলাদেশ থেকে বেআইনিভাবে প্রবেশকারী মানুষের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় সোচ্চার হন। তখন নরেন্দ্র মোদি বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। বিরোধী নেতা। দিল্লির তখতে তখনো বসে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। এখনো মনে আছে, ভোটের এই অনুপ্রবেশবিরোধী বক্তব্যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

পরদিন সকালে বাংলাদেশের এক সংবাদ চ্যানেল দিল্লির জনপথ হোটেলে স্কাইপের সাহায্যে এক সাক্ষাৎকারের আয়োজন করে। ভারতে তখন ভোট রঙ্গ তুঙ্গে। ভারতীয় সাংবাদিক হিসেবে ডাকলে সেদিন ঢাকার উত্তেজনা প্রশমিত করে বলেছিলাম, মোদি যা-ই বলুন, আমি নিশ্চিত, ভোটে মোদি জিতলেও এ ব্যাপারে কোনো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন না। এসবই প্রাক-নির্বাচনী রাজনৈতিক স্লোগান। ভোটের আগে বিজেপি নামক রাজনৈতিক দলকে এ ব্যাপারে সরব হতেই হবে। কলকাতা গিয়েও নরেন্দ্র মোদি অনুপ্রবেশের মতো বিষয়ে নীরব থাকবেন, তা কি হয়?

সেদিন এ কথাও বলেছিলাম, বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তন ভারতের তুলনায় ক্ষুদ্র হলেও তার ভূ-কৌশলগত অবস্থান যে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে কথা মোদির মতো দীর্ঘদিনের পোড়খাওয়া রাজনৈতিক নেতা জানেন না এমনটা তো হতেই পারে না। তাই মোদি চাইবেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যেন কোনো দুর্যোগ না আসে। এখন ২০১৯ সালে আবার ভারতে আরেকটি লোকসভা নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। আবার অনুপ্রবেশ নিয়ে শুধু পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতারাই নন, স্নায়ুকেন্দ্র দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘও অনুপ্রবেশ নিয়ে উত্তেজিত। আবার শুরু হয়ে গেছে রাজনৈতিক ছলাকলা। যাকে বলা হয় ভোটব্যাংকের রাজনীতি। আমি আবার বলছি, এ হলো প্রাক-নির্বাচনী অভ্যন্তরীণ কৌশল। আর তাই সংসদে নাগরিকত্ব বিল এনে দেশজুড়ে হৈচৈ তৈরি করার কৌশল নিয়েছে বিজেপি। আসামে এই বিলকে অস্ত্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণের রাজনীতি শুরু হয়েছে। এই রাজনীতির জন্য আসামে বিজেপি শাসকদল হলেও অগপ তার সঙ্গ পরিত্যাগ করেছে ভোটের আগে।

শ্রীহট্ট—অর্থাৎ কাছাড়-শিলচর এলাকায় বসবাসকারী বাঙালিদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। আশঙ্কা দেখা দিয়েছে আসাম থেকে ফের বাঙালি বিতাড়নের। পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরায়ও এই রাজনীতির ঝড় এসে পড়েছে। আসলে অনুপ্রবেশ পৃথিবীজুড়েই মস্তবড় এক ইস্যু। আমরা তো দিল্লিতে রসিকতা করে বলি, ইউরোপ থেকে আমেরিকা—সব দেশ আরএসএসের মতো স্বদেশি হয়ে উঠছে। অভিবাসনকে প্রচারের বিষয় করছে। ট্রাম্প আর মোহন ভাগবত এক হয়ে উঠছে। কিন্তু আসলে আর্থ-সামাজিক সমস্যার সমাধান না করে শুধু স্লোগান দিয়ে বিরোধিতা করে ভোটের রাজনীতি করে কি অনুপ্রবেশ সমস্যার সমাধান হবে? হবে না। সেটা মোদিও জানেন।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনের আগেও এই নাগরিকত্ব বিল নিয়ে শঙ্কা দেখা দেয় ঢাকার রাজনৈতিক মহলে। দিল্লিতে অনেকে বলেন, ঢাকায় শেখ হাসিনা এবং সরকারের বিদেশনীতির চাপও যথেষ্ট ছিল ভারত সরকারের ওপর। আর তাই তর্জন-গর্জন যা-ই হোক, ঢাকার ভোটের আগে বিজেপি এই আইন প্রণয়নে সেভাবে সক্রিয় হয়নি। ঠিক এখানেই ভারত ও বাংলাদেশ দুই প্রতিবেশী সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা। বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনেও শেখ হাসিনাকে প্রতিপক্ষ চাপের মধ্যে ফেলার চেষ্টা করে ভারতবিরোধিতার তাস ব্যবহার করে। জামায়াতের মতো শক্তি এ ব্যাপারে কতখানি সক্রিয় ছিল, তা তো ঢাকার ভোটের সময় আমরা দেখেছি।

আজ ঢাকার ভোটে বিপুল জয়লাভের পরও কিন্তু ভারতের বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে বৈ কমেনি। সেদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ এক বিশিষ্ট কূটনীতিকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল বাংলাদেশ নিয়ে। তিনি আমাকে বলছিলেন, ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক নির্বাচনটাকে ভুললেও চলবে না। পাকিস্তানে ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ভারতের সঙ্গে বিপুল সংঘাতের কথা বলেছিলেন। এরপর ভোটে জেতার পর ইমরান তো বটেই, এমনকি পাকিস্তান সেনাবাহিনীও ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা বলছে। ওই কূটনীতিক বলেন, কিন্তু পাকিস্তানকেও ভারত জানিয়ে দিয়েছে, ২০১৯-এর ভোটের আগে আর যা-ই হোক, পাকিস্তানের সঙ্গে কথাবার্তা বলা অসম্ভব।

শুধু অ্যাক্টিভিস্ট পলিসি রূপায়ণের জন্য নয়, আজ গোটা বিশ্বের রাজনীতিতে যেভাবে ভারতের আরেক প্রতিবেশী চীন আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে, যেভাবে চীন-রাশিয়ার অক্ষ তৈরির চেষ্টা হচ্ছে, যেভাবে বাংলাদেশের সঙ্গেও উন্নয়ন ও পরিকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে কূটনৈতিক চাপে দরকষাকষি তৈরির চেষ্টা করছে, যেভাবে পাকিস্তান জামায়াতকে অক্সিজেন দিয়ে ভারতকে আবার কোণঠাসা করতে উদ্যত, তাতে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে নবকলেবরে ভারতকে তার দায়বদ্ধতা প্রদর্শন বিশেষ জরুরি।

তিস্তা চুক্তি রূপায়ণের ব্যর্থতায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সব সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দোষী সাব্যস্ত করলেও আমি মনে করি, এই ব্যর্থতা কিন্তু হয়েছিল মনমোহন সিংয়ের কংগ্রেস জমানাতেই। বরং অনুপ্রবেশ নিয়ে ভোটের আগে যা-ই বলুন না কেন, নরেন্দ্র মোদি কিন্তু ঢাকায় গিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। সেবার আমি ঢাকা গিয়ে দেখেছিলাম, মোদি তাঁর হোটেলে মমতাকে ডেকে পাঠিয়ে বৈঠক করে তাঁর গাড়িতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নিবাসে যান। আসলে কূটনীতিতে সহিষ্ণুতার প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য। নেতিবাচক দিকটিকেই বড় করে দেখলে আর যা-ই হোক, কূটনৈতিক প্রগতি আরো অসম্ভব হয়ে যায়।

শেখ হাসিনার সরকার এখন ভোটের পর নিরাপদ। ২০১৯ বরং নরেন্দ্র মোদির কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। ভারতের ভেতর মোদিবিরোধী জোট রাজনীতি টগবগ করে ফুটছে। অনিশ্চয়তা বাড়ছে মোদির। কিন্তু এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত, বিজেপি মুখে যা-ই বলুক না কেন, মোদি জিতলে বাংলাদেশের সঙ্গে সখ্য আরো বাড়ানোর চেষ্টাই করবেন। অনুপ্রবেশ নিয়ে বিজেপির রাজনীতি তো নতুন নয়, একদা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে লালকৃষ্ণ আদভানি নিজেও এ ব্যাপারে সোচ্চার হন। আজ রাজনাথ সিংহও একই সুরে চিৎকার করেন। অতীতে ভারতের মহারাষ্ট্র নামক রাজ্যে মুম্বাই শহরে প্রয়াত বাল ঠাকরে ও তাঁর দল শিবসেনা বাংলাদেশি বিতাড়নের কর্মসূচি নেন। হাওড়া স্টেশনে (পশ্চিমবঙ্গ) বহু বাঙালিকে ধরে ধরে পাঠানো হয়। দিল্লির তৎকালীন প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী মদনলাল খুরানা বহু বঙ্গবাসীর মাথা ন্যাড়া করে কলকাতায় পাঠান। তখন ঢাকার চেয়েও পশ্চিমবঙ্গে তৎকালীন শাসকদল সিপিএম সোচ্চার হয়। আজ আবার ২০১৯ সালে আরেকটি লোকসভা নির্বাচন। আবার হিন্দু শরণার্থী এবং মুসলমান অনুপ্রবেশকারী বিভাজনের রাজনীতি শুরু। এ হলো ভোটের রাজনীতি। মেরুকরণের রাজনীতি। কিন্তু এসব রাজনীতিতে যতটা গর্জন, ততটা বর্ষণ হবে না। নরেন্দ্র মোদি এতখানি অবিবেচক, অনভিজ্ঞও নন যে তিনি জানেন না, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ভারতকে যতটা প্রয়োজন, ভারতের বাংলাদেশকে প্রয়োজন তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক

লাইক দিন এবং শেয়ার করুন


Leave a Reply