আজ বৃহস্পতিবার, ২২ অগাস্ট ২০১৯, ০২:৪৪ পূর্বাহ্ন

দলীলসহ জেনে নিন জিলহজ মাসের আমলসমূহ

দলীলসহ জেনে নিন জিলহজ মাসের আমলসমূহ

  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
    3
    Shares

অত্যাসন্ন মহা ফযিলতময় জিলহজ মাস। এই মাসের প্রথম ১০দিন ইবাদতে বান্দার অধিক সওয়াব অর্জন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ মৌসুম। কুরআন ও বিভিন্ন হাদীসে এই ১০দিনের ফযীলত সুপ্রমাণিত। এই দশদিনে যে আমলগুলোর কথা হাদীসে এসেছে, তা দলীলসহ নিম্নে প্রদত্ত হলো–

১। বেশী বেশী যিকির করা : বেশী বেশী সুবহানাল্লাহ, আল-হামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার পাঠ করা। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারীম (সা.) এরশাদ করেন-

ما من أيام أعظم عند الله ولا أحب إليه من العمل فيهن من هذه الأيام العشر فاكثروا فيهن من التهليل والتكبير والتحميد

অর্থ: আল্লাহ তাআলার নিকট আশারায়ে জিলহজ্বের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং অধিক প্রিয় অন্য কোনোদিনের আমল নেই। সুতরাং তোমরা সেই দিবসগুলোতে অধিক পরিমাণে তাহলীল(লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর(আল্লাহু আকবার)ও তাহমীদ(আলহামদুলিল্লাহ) পাঠ করো।–ত্বাবারানী, হাদীস নং: ১১১১৬; মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং: ৫৪৪৬

২। চুল, নখ, মোচ ও অন্যান্য পশম না কাটা : যারা কুরবানী করবে তাদের জিলহজ্বের ১ তারিখ তথা জিলক্বদের শেষ দিনের সূর্যাস্ত থেকে ১০জিলহজ্বের কুরবানীর পূর্ব পযন্ত চুল, নখ, মোচ ও অন্যান্য পশম না কাটা। উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্নিত-

أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِذَا رَأَيْتُمْ هِلَالَ ذِي الْحِجَّةِ، وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ، فَلْيُمْسِكْ عَنْ شَعْرِهِ وَأَظْفَارِهِ.

অর্থ: নবী কারীম (সা.) বলেছেন, যখন জিলহজ্বের দশক শুরু হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে কুরবানী করবে সে যেন তার চুল নখ না কাটে।-সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৭৭; জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫২৩। অনুরুপভাবে যারা কুরবানী করতে সক্ষম নয় তারাও এগুলো কাটা থেকে বিরত থাকবে। এর দ্বারা তারাও পরিপূর্ণ কুরবানীর সাওয়াব পাবে ইনশাআল্লাহ্। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্নিত-

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِرَجُلٍ: أُمِرْتُ بِيَوْمِ الْأَضْحَى عِيدًا جَعَلَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لِهَذِهِ الْأُمَّةِ، فَقَالَ الرَّجُلُ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ أَجِدْ إِلَّا مَنِيحَةً أُنْثَى أَفَأُضَحِّي بِهَا؟ قَالَ: لَا، وَلَكِنْ تَأْخُذُ مِنْ شَعْرِكَ، وَتُقَلِّمُ أَظْفَارَكَ، وَتَقُصُّ شَارِبَكَ، وَتَحْلِقُ عَانَتَكَ، فَذَلِكَ تَمَامُ أُضْحِيَّتِكَ عِنْدَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ.

অর্থ: নবী কারীম (সা.) বলেছেন,আমাকে কুরবানীর দিবসে ঈদ (পালনের) আদেশ করা হয়েছে। যা আল্লাহ এ উম্মতের জন্য নির্ধারণ করেছেন। এক সাহাবী আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি আমার কাছে শুধু একটি মানীহা থাকে (অর্থাৎ অন্যের থেকে নেওয়া দুগ্ধ দানকারী উটনী) আমি কি তা কুরবানী করতে পারি? নবী কারীম (সা.) বললেন, না, তবে তুমি চুল, নখ ও মোঁচ কাটবে এবং নাভীর নিচের পশম পরিষ্কার করবে। এটাই আল্লাহর দরবারে তোমার পূর্ণ কুরবানী বলে গণ্য হবে।-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৮৯; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৪৩৬৫

মোটকথা, কুরবানীদাতা এবং কুরবানী করতে অক্ষম উভয়েই এই দশকে চুল, নখ ইত্যাদি কাটবে না। কুরবানীদাতার জন্য তা সুন্নত এবং কুরবানী করতে অক্ষম ব্যক্তি এর দ্বারা একটি পরিপূর্ণ কুরবানীর সাওয়াব পাবে। তবে কুরবানীদাতার জন্য এটা একটা তাকীদপূর্ণ সুন্নত।উল্লেখ্য যে, এই আমল করতে হলে জিলকদের শেষ দিকে চুল, নখ ইত্যদি কেটে নিবে অন্যথায় তা অনেক বড় হয়ে যাবে যা খিলাফে সুন্নত।

৩। জিলহজের প্রথম নয় দিন রোযা রাখা : এই দশকের আরেকটি গুরুত্তপূর্ন আমল হল প্রথম নয় দিন রোযা রাখা। হাদীস শরীফে বর্নিত আছে-

كان رسول الله -صلى الله عليه وسلم- يصوم تسع ذى الحجة ويوم عاشوراء وثلاثة أيام من كل شهر أول اثنين من الشهر والخميس.

অর্থ: রাসূলে কারীম (সা.) জিলহজের প্রথম নয় দিন, আশুরার দিন, প্রতি মাসে তিন দিন এবং মাসের প্রথম সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখতেন।- সুনানে আবু দাউদ হাদীস নং:-২৪৩৯।অন্য আরেকটি হাদীসে রাসূলে কারীম (সা.) ইরশাদ করেন-

ما من أيام أحب إلى الله أن يتعبد له فيها من عشر ذي الحجة يعدل صيام كل يوم منها بصيام سنة وقيام كل ليلة منها بقيام ليلة القدر(قلت وان كان في سنده مقال لكنه صالح للعمل)

অর্থ: জিলহজের দশ দিনের চেয়ে অধিক প্রিয় এমন কোন দিন আল্লাহর নিকট নেই। যে দিন আল্লাহ তাআলা তার জন্য ইবাদত করা পছন্দ করেন। এই দিনগুলোর প্রতি দিনের রোযা এক বছর রোযা রাখার সমান। এবং প্রতি রাতের নামাজ লাইলাতুল কদরের নামাজের সমান।– জামে তিরমিযী হাদীস নং: ৭৫৮।

বিশেষভাবে ৯ই জিলহজ রোযা রাখা : জিলহজের নয় তারিখে রোযা রাখা মুস্তাহাব ।এই দিন রোযা রাখলে আল্লাহ তাআলা পূর্বের ও পরের মোট দুই বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন। হযরত আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন-

صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ، أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ، وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ.

অর্থ: আরাফার দিন (৯জিলহজ্ব) রোযার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, তিনি এর দ্বারা এর আগের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন।-সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬২; জামে তিরমিযী, হাদীস ৭৪৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৪২৫। তবে হাজিদের জন্য এই দিন রোযা না রাখা মুস্তাহাব।- সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১২৩। মাসআলাঃ কুরবানীর দিন ও তার পরের তিন দিন রোযা রাখা হারাম।

৪। এই দশকের রাতগুলোতে সাধ্যমত ইবাদত করা : এই রাতগুলোতে বেশী বেশী নামায, তেলাওয়াত, জিকির ও তাসবীহ-তাহলীল পড়া। একাধিক হাদীসে এই রাতগুলোর বিশেষ ফযীলত বর্নিত হয়েছে।-শুআবুল ঈমান হাদীস নং: ৩৭৫৮

৫। তাকবীরে তাশরীক পড়া : মাসআলাঃ ৯জিলহজ ফজর থেকে ১৩জিলহজ আছর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরয নামাযের পর তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব। পুরুষ- মহিলা, মুকীম-মুসাফির, একাকি নামায পড়া ব্যক্তি ও জামাতে নামায পড়া ব্যক্তি সকলের উপরেই ওয়াজিব। তাকবীরে তাশরীক এই–

الله أكبر، الله أكبر، لا إله إلاالله والله أكبر، الله أكبر ولله الحمد

–মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা,হাদীস ৫৬৯৬-৯৯; রদ্দুল মুহতার ২/১৭৭

মাসআলাঃ তাকবীরে তাশরীক একবার পড়তে হয় তিন নয়। মাসআলাঃ পুরুষদের জন্য তাকবীরে তাশরীক উচ্চসরে পড়া ওয়াজিব। আস্তে পড়লে এ ওয়াজিব পরিপূর্ণভাবে আদায় হবে না। মহিলারা নিম্ম আওয়াজে পড়বে। -রদ্দুল মুহতার ২/১৭৮। মাসআলাঃ ইমাম তাকবীর বলতে ভুলে গেলে মুকতাদীগন নিজেরাই শুরু করবে। ইমামের জন্য অপেক্ষা করবে না। মাসআলাঃ তাকবীরে তাশরীক পড়তে ভুলে গেলে এর কোন কাফফারা নেই। পরে শুধু ইস্তেগফার করবে।

মাসআলাঃ প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর কথা-বার্তা বা অন্য কোন কাজ শুরু করার আগেই তাকবীরে তাশরীক পড়বে। এমনকি হাজীগন আগে তাকবীরে তাশরীক পড়বে অতঃপর তালবিয়া পড়বে। তাকবীর পড়তে বেশী দেরি হয়ে গেলে তাকবীরের হক আদায় হবে না।
মাসআলাঃ তাকবীরে তাশরীকের ২৩ ওয়াক্তের কোন ওয়াক্তের নামাজ কাজা হয়ে গেলে এবং তা এই ২৩ ওয়াক্তের মধ্যেই আদায় করলে কাজা নামাজের পরও তাকবীরে তাশরীক পড়বে। পরে পড়লে তাকবীর বলবে না।

৬। ঈদের রাত্রে জাগরণ ও ইবাদত বন্দেগী করা

عن أبي أمامة عن النبي صلى الله عليه و سلم قال ” من قام ليلتي العيدين محتسبا لله لم يمت قلبه يوم تموت القلوب”

অর্থ: হযরত আবু উমামা (রা.) হতে বর্ণিত রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাত্রি আল্লাহর নিকট সাওয়াবের আশায় জাগরণ করবে (ইবাদত বন্দেগীতে কাটাবে) তার অন্তর মরবে না যেদিন সমস্ত অন্তর মারা যাবে। অথচ এই দুই রাত প্রায়ই উদাসীনতায় কেটে যায়। এই দুই রাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করা যাতে এর সঠিক মুল্যায়ন করা যায়। রাত্রে নামায, তিলাওয়াত, ইস্তেগফার, জিকির-আজকার ইত্যাদি করা যায়।

৭। কুরবানী করা : যারা নেসাবের মালিক তাদের জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব। কুরবানীর জন্য জ্ঞান সম্পন্ন ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া শর্ত। হযরত যায়েদ বিন আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত-

قُلْتُ أَوْ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا هَذِهِ الْأَضَاحِيُّ قَالَ سُنَّةُ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ قَالُوا مَا لَنَا مِنْهَا قَالَ بِكُلِّ شَعْرَةٍ حَسَنَةٌ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ فَالصُّوفُ قَالَ بِكُلِّ شَعْرَةٍ مِنْ الصُّوفِ حَسَنَةٌ

অর্থ: সাহাবায়ে কেরাম (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এই কুরবানী কি? রাসূলে কারীম (সা.) বললেন, এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এর সুন্নাত। তারা বললেন, এতে আমাদের জন্য কি লাভ রয়েছে? তিনি বললেন এর (কুরবানীর পশুর) প্রতিটি চুলের বিনিময় সাওয়াব রয়েছে। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! পশম! (এর বিনিময় কি লাভ?) তিনি বললেন, প্রতিটি পশমের বিনিময়ে সাওয়াব রয়েছে।-মুসনাদে আহমাদ হাদীস নং: ১৯২৮৩

৮। হাজী সাহেবদের ইস্তেকবাল করা : জিলহজ মাসের আরেকটি আমল হলো, বাইতুল্লাহর যিয়ারতকারীদের তাদের নিজ ঘরে ফেরার পূর্বে ইস্তেকবাল করা এবং তাদের কাছে নিজের গুনাহ মাফের দুআ চাওয়া। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন-

إِذَا لَقِيتَ الْحَاجَّ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ وَصَافِحْهُ وَمُرْهُ أَنْ يَسْتَغْفِرَ لَكَ قَبْلَ أَنْ يَدْخُلَ بَيْتَهُ فَإِنَّهُ مَغْفُورٌ لَهُ

অর্থ: যখন তুমি (আল্লাহর ঘর থেকে আগমনকারী) কোন হাজীর সাক্ষাত করবে তখন তার নিজ ঘরে প্রবেশের পূর্বেই তাকে সালাম দিবে এবং তার সাথে মুসাফা করবে। আর তোমার জন্য তাকে ইস্তেগফার করতে বলবে। নিশ্চয়ই সে ক্ষমাপ্রাপ্ত।-মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ৬১১২ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে জিলহজের প্রথম ১০দিনে আমলগুলো করার এবং তাঁর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমীন।

লাইক দিন এবং শেয়ার করুন


Leave a Reply