জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ৭১তম জন্মবার্ষিকী আজ - Nobobarta

আজ শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৯:১৩ অপরাহ্ন

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ৭১তম জন্মবার্ষিকী আজ

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ৭১তম জন্মবার্ষিকী আজ

হুমায়ূন আহমেদ
গল্পের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ

আজ বুধবার ১৩ নভেম্বর, নান্দনিক লেখক, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদের ৭১তম জন্মবার্ষিকী। যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো চলে এসো এক বরষায়/ ঝরঝর বৃষ্টিতে জলভরা দৃষ্টিতে…হুমায়ূন আহমেদের লেখা এই গানটি গেয়েছিলেন তার স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন। গানের ছলে হয়তো হুমায়ূন আহমেদ শাওনকে বলেছিলেন যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো। প্রিয় মানুষের জন্মদিনে নিশ্চয় মন কাঁদছে স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনসহ লাখো হুমায়ূন ভক্তের। কিন্তু আজ তাকে কোথায় খুঁজে পাবে তারা? গুণী এ লেখক বাংলা সাহিত্যে অভূতপূর্ব পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। সমকালীণ বাংলা সাহিত্যের নন্দিত কথাসাহিত্যিক, জনপ্রিয় নাট্যকার ও খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা লাখো ভক্ত ও প্রিয় স্বজনকে কাঁদিয়ে কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গত ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বেলভ্যূ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ঠিক আজকের এই দিনেই তিনি ময়মনসিংহের নেত্রকোনায় জন্মগ্রহণ করেন। বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ১৯৬৫ সালে মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে তিনি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় পাস করেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। রসায়নে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি বিএসসি (অনার্স) ও এমএসসি ডিগ্রী অর্জন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিমান রসায়নে পিএচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি ২০১২ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশ মিশনে বিশেষ উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগ লাভ করেন। তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, জয়নুল আবেদিন গোল্ড মেডেল, লেখক শিবির পুরস্কার, শেলটেক পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

বাংলাসাহিত্যের কিংবদন্তি লেখক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি শুধু বাংলাদেশে নয়, উপমহাদেশের অনেক লেখকদের চেয়ে জনপ্রিয়। নাটক, গান ও বাংলা চলচ্চিত্রে তার অবদান ভোলার নয়। তিনি না থাকলেও তার সৃষ্টির মধ্য দিয়েই আমাদের মাঝে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন চিরকাল। হুমায়ূন আহমেদ। বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী কথাশিল্পী ও নন্দিত নাটক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা তিনি। একের পর এক সৃষ্টি করেছেন চমত্কার সব গল্প-সাহিত্য-নাটক-চলচ্চিত্র। শুধু লেখালেখিতেই নয়, নাটক-চলচ্চিত্র-ছবি আঁকা, হুমায়ূন আহমেদ যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন। আমাদের প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যেসব চলচ্চিত্র দেখেছে, তার মাঝে নিঃসন্দেহে প্রথম দিকে থাকবে হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ এবং ‘শ্যামল ছায়া’। ‘আগুনের পরশমণি’ চলচ্চিত্রটি প্রথমবার দেখার পর যেভাবে দেশপ্রেম গভীরভাবে অনুভূত হয়, আজ প্রায় ষোল বছর পরও তা দেখার পর সেই চিরচেনা অনুভূতি নাড়া দিয়ে যায় সবাইকে। তাই তো আজও বাংলাদেশের প্রতিটি বিশেষ বিশেষ দিবসে কোনো না কোনো চ্যানেলে প্রদর্শিত হয় তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রসমূহ। ঈদের সময় হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখার জন্য বাসার মানুষজন উদ্বেল হয়ে থাকবেন না, এ যেন হতেই পারে না! ঈদের দিন হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখার জন্য সবাই সবধরনের কাজ নির্দ্বিধায় ফেলে রেখে ছুটে যায় টিভি পর্দার সামনে। যত বিজ্ঞাপনই দিক না কেন, কেউ এক মুহূর্তের জন্যও উঠতে চায় না টিভির সামনে থেকে, পাছে যদি নাটকের কোনো একটা দৃশ্য মিস হয়ে যায়। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের জনপ্রিয় চরিত্র বাকের ভাইয়ের যাতে ফাঁসি না হয় সে জন্য দেশের রাস্তাঘাটে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মিছিল পর্যন্ত হয়েছে! এতটাই জনপ্রিয় ছিল তাঁর সৃষ্টি। তাঁর রচিত নাটক-চলচ্চিত্রগুলো একদিকে যেমন আমাদের আনন্দ-বিনোদন দিয়েছে, একইসাথে দিয়েছে দেশপ্রেম আর মনুষ্যত্বের শিক্ষা।

টেলিভিশনের জন্য একের পর এক দর্শক-নন্দিত নাটক রচনার পর হুমায়ূন আহমেদ ১৯৯০-এর গোড়ার দিকে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। তাঁর পরিচালনায় প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে। ২০০০ সালে ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ও ‘দুই দুয়ারী’ চলচ্চিত্র দুটি দর্শকদের কাছে দারুণ গ্রহণযোগ্যতা পায়। ২০০৩-এ নির্মাণ করেন ‘চন্দ্রকথা’ নামে একটি চলচ্চিত্র। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেন ‘শ্যামল ছায়া’ চলচ্চিত্রটি। এটি ২০০৬ সালে ‘সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র’ বিভাগে একাডেমি পুরস্কারের জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। এ ছাড়াও চলচ্চিত্রটি কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে প্রদর্শিত হয়। তাঁর সব চলচ্চিত্রে তিনি নিজে গান রচনা করেছেন। ২০০৮-এ ‘আমার আছে জল’ চলচ্চিত্রটি তিনি পরিচালনা করেন। ২০১২ সালে তার পরিচালনার সর্বশেষ ছবি ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। এ ছাড়াও হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র। এর মধ্যে ২০০৬ সালে মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত ‘দূরত্ব’, বেলাল আহমেদ পরিচালিত ‘নন্দিত নরকে’ এবং আবু সাইদ পরিচালিত ‘নিরন্তর’। ২০০৭-এ শাহ আলম কিরণ পরিচালিত ‘সাজঘর’ এবং তৌকীর আহমেদ নির্মাণ করেন বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘দারুচিনি দ্বীপ’।

১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য নাটক রচনা শুরু করেন তিনি। এটি তাকে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তোলে। তার অন্যতম নাটকগুলো হলো—’একদিন হঠাত্’, ‘এবং আইনস্টাইন’, ‘আজ জরির বিয়ে’, ‘আজ রবিবার’, ‘একটি অলৌকিক ভ্রমণ কাহিনী’, ‘এই বৈশাখে’, ‘এই বর্ষায়’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘অয়োময়’, ‘অন্তরার বাবা’, ‘আংটি’, ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’, ‘বাদল দিনের গান’, ‘ব্যাংক ড্রাফট’, ‘ভূত বিলাস’, ‘বিবাহ’, ‘বন কুমারী’, ‘বন বাতাসি’, ‘বৃহন্নলা’, ‘বহুব্রীহি’, ‘বন্য’, ‘বউ বিলাস’, ‘চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক’, ‘চেরাগের দৈত্য’, ‘চিপা ভূত’, ‘ছেলে দেখা’, ‘চোর’, ‘চৈত্র দিনের গান’, ‘চন্দ্রগ্রহণ’, ‘চন্দ্র কারিগর’, ‘চন্দ্রগ্রস্ত’, ‘দূরত্ব’, ‘দুই দুকোনে চার’, ‘একা’, ‘এ কী কাণ্ড’, ‘এনায়েত আলীর ছাগল’, ‘গণি সাহেবের শেষ কিছুদিন’, ‘গন্ধ’, ‘গৃহসুখ প্রাইভেট লিমিটেড’, ‘গুণীন’, ‘হাবিবের সংসার’, ‘হাবলঙ্গের বাজার’, ‘হামিদ মিয়ার ইজ্জত’, ‘হিমু’, ‘ইবলিশ’, ‘জহির কারিগর’, ‘জীবন যাপন’, ‘জোত্স্নার ফুল’, ‘জুতা বাবা’, ‘জুতার বাক্স’, ‘জইতুরি’, ‘যমুনার জল দেখতে কালো’, ‘জল তরঙ্গ’, ‘জলে ভাসা পদ্ম’, ‘কালা কইতর’, ‘কাকারন্ড’, ‘খোয়াব নগর’, ধারাবাহিক ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘কন্যা দেখা’, ‘কুহুক’, ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’, ‘মেঘ বলছে যাব যাব’, ‘মিসকল’, ‘মফিজ মিয়ার চরিত্র’, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন’, ‘নাট্য মঙ্গলের কথা’, ‘নিম ফুল’, ‘নগরে দৈত্য’, ‘নীতু তোমাকে ভালোবাসি’, ‘নূরুদ্দিন স্বর্ণপদক’, ‘অচীন রাগিনী’, ‘অনুসন্ধান’, ‘ওপেন্টি বায়োস্কোপ’, ‘অপরাহ্ন’, ‘অতঃপর শুভ বিবাহ’, ‘পাপ’, ‘পাথর’, ‘প্রজেক্ট হিমালয়’, ‘পদ্ম’, ‘পুষ্পকথা’, ‘রুমালী’, ‘রূপকথা’, ‘রুপার ঘণ্টা’, ধারাবাহিক ‘রুপালি রাত্রি’, ‘সোনার কলস’, ‘সবাই গেছে বনে’, ‘শওকত সাহেবের গাড়ি কেনা’, রুবিক্স কিউব’, ‘রুপালি নক্ষত্র’, ‘স্বপ্ন এবং স্বপ্ন ভঙ্গ’, ‘সুরি’, ‘আমরা তিন জন’ ইত্যাদি। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বহু প্যাকেজ নাটক নির্মাণ করেছেন। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের বেশকিছু জনপ্রিয় গানও উপহার দিয়েছেন। মূলত তিনি গান রচয়িতা বা গীতিকার নন। কেবল নাটক ও চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে তিনি গান রচনা করেছেন। তার অনেকগুলো গান বেশ জনপ্রিয়। এসবের অ্যালবামও প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে এই নন্দিত কথাশিল্পীর লেখা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন সাবিনা ইয়াসমীন, সুবীর নন্দী, এন্ড্রু কিশোর, মমতাজ, কুমার বিশ্বজিত্, আগুন, সফি মণ্ডল, আঁখি আলমগীর, ফজলুর রহমান বাবু, হাবিব, কণা, কোনাল ও কিশোর। কেবল সাহিত্যেই নন, সংগীতেরও পরশপাথর ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। তা যেমন তাঁর লেখা গানের জনপ্রিয়তায় স্পষ্ট, তেমনি তাঁর গানের শিল্পীদের উজ্জ্বল উপস্থিতিতেও। হুমায়ূন আহমেদের লেখা জনপ্রিয় কয়েকটি গান হলো—’ও আমার উড়াল পঙ্খীরে’, ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’, ‘বরষার প্রথম দিনে’, ‘আইজ আমরার কুসুম রানির বিবাহ হইবো’, ‘চাঁদনী পসর রাইতে কে আমারে স্মরণ করে’, ‘সোহাগপুর গ্রামে’, ‘চাঁদনী পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়’, ‘আমার আছে জল’, ‘বাদল দিনে মনে পড়ে’, ‘যে থাকে আঁখি পল্লবে’, ‘মাথায় পরেছি সাদা ক্যাপ’, ‘গরুর গাড়ির দুই চাকা’, ‘ঢোল বাজে দোতারা বাজে’, ‘হাবলংগের বাজারে’, ‘যদি মন কাঁদে চলে এসো এক বরষায়’ প্রভৃতি। সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক (১৯৯৪), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮১), হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), মাইকেল মধুসূদন দত্ত পুরস্কার (১৯৮৭), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩ ও ১৯৯৪), বাচসাস পুরস্কার (১৯৮৮) ইত্যাদি পেয়েছেন।


Leave a Reply



Nobobarta © 2020। about Contact PolicyAdvertisingOur Family DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com