চীন চাইলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব - Nobobarta

আজ শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:৩৫ পূর্বাহ্ন

চীন চাইলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব

চীন চাইলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব

রোহিঙ্গাদের ফেরত না নেয়া বা তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে মিয়ানমারের অবস্থান এমন শক্ত কিসের জোরে, সে বিষয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। উল্লেখ্য চীন, ভারত, রাশিয়া ও জাপান, যাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো, তাদের প্রত্যেকেই মিয়ানমারকে শক্তভাবে সমর্থন করায় পশ্চিমা বিশ্ব তথা জাতিসংঘের তোড়জোড়ে মিয়ানমার মোটেই বিচলিত নয়। আমাদের দুই নিকটতম প্রতিবেশী ভারত এবং চীন কার্যত মিয়ানমারের পক্ষেই রয়েছে। গত ২২ আগস্ট বাংলাদেশ যখন ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিল, তখন সেখানে চীনা দূতাবাসের প্রতিনিধির উপস্থিতি চীনের সহযোগিতার কিছু বার্তা দিলেও মিয়ানমারে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে তেমন মনে হয়নি। চীনের রাষ্ট্রদূত চেন হাই মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সিনিয়র জেনারেল অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মিয়ানমারের ওপর বিভিন্ন বিষয়ে যতই চাপ আসুক, চীন পাশে থাকবে। এ বক্তব্যই পরিষ্কার করে চীনের অবস্থান।

কারন বাস্তবতা হচ্ছে, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) এশিয়ায় অন্যতম খুঁটি মিয়ানমার। চীনের কথিত সামুদ্রিক সিল্ক রুটের গন্তব্য শেষ হয় দক্ষিণ রাখাইনের বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের মিলনস্থলে। এখান থেকে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের শুরু। ওই অঞ্চলে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ শেষের পথে এবং তেল-গ্যাস পাইপলাইন কার্যকর করা হয়েছে। রেললাইন প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শুরু হওয়ার পথে রয়েছে।

মিয়ানমারে চীনের অর্থনৈতিক উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম আরেকটি উদ্যোগ মাইটসন হাইড্রো-ইলেকট্রিক বাঁধ। এই বাঁধ তৈরি হওয়ার কথা ইরাবতী নদীর পানির উৎস মালি এবং ন’মাই নদীর সংযোগস্থলে। প্রকল্পটির আনুমানিক খরচ ২০১৭ সালে ধরা হয়েছিল ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু ওই সময়ে স্থানীয় মানুষের চাপে বাতিল করা হয়েছিল। এখন (২০১৯) চীন মিয়ানমারকে নতুন করে এই প্রকল্পে রাজি করাতে পেরেছে বলে জানা গেছে। নতুন খরচ দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার। এই খরচের মধ্যে স্থানীয়দের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও রয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রতিবছর ৩০ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, যার ৯০ শতাংশ চীনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজন হবে। চীনের এই অঞ্চলে ব্যাপক বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে, যে কারণে চীন এই প্রকল্পের জন্য মরিয়া হয়ে রয়েছে।

একটু পিছনে যেতে চাই,
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু মুসলিমরা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছিলো। তাই বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। প্রায় তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা আগে থেকেই বাংলাদেশে ছিলেন। ২০১৬ সালের অক্টোবরে মিয়ানমারের একটি সীমান্তচৌকিতে জঙ্গি হামলা হলে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নয়জন সদস্য নিহত হন। তারপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে অভিযান শুরু করে। ওই সময়ে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর নিষ্ঠুর নিপীড়ন চালানো হয়। ওই সময়ে ৭৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।

তারপর ২০১৭ সালের আগস্টে একইভাবে মিয়ানমারের সীমান্তচৌকিতে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ১১ জন সদস্য নিহত হন। এ ঘটনার জের ধরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করে। অভিযানে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায় সেনারা। তাদের হত্যা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, নারীদের ধর্ষণসহ নানা ধরনের নিষ্ঠুর নিপীড়ন চালায়। জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গারা দলে দলে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে থাকে। ওই সময়ে মানবিক কারণে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেয়। গত চার মাসে সাড়ে ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে বর্তমানে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখের বেশি।

এমনিতেই আমরা ঘনবসতির দেশ জায়গা কম তারপর এত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করায় পরিবেশ, জনশক্তি রফতানি, স্বাস্থ্য সেবা, পর্যটনসহ সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পরছে। রোহিঙ্গারা যেমন নিজেদের মধ্যে সহিংসতায় জড়াচ্ছে তেমনি স্থানীয় জনগণের সাথেও তাদের সম্পর্ক দিন দিন বৈরী হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফেরত পাঠানো। দ্বিতীয়ত মিয়ানমারে ফেরত না যাওয়া পর্যন্ত তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা।

বর্তমানে এমন পরিস্থিতিতে চীন যে মিয়ানমারের অবস্থানকেই শক্তভাবে সমর্থন করে যাবে, তা পরিষ্কার। আমাদের জন্য চীন মিয়ানমারের ওপরে তেমন চাপ দিতে পারবে বলে মনে হয় না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, প্রচণ্ড চাপের মাধ্যমে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের মৌলিক দাবিগুলো মানাতে না পারলে এ সংকটের সমাধান শুধু কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় হবে বলে মনে হয় না। তথাপি এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে আরও চাপ প্রয়োগ করা ছাড়া বিকল্প নেই। একই সঙ্গে যে দাবিটি উঠতে পারে সেটি হলো, রোহিঙ্গাদের গোত্র পরিচয়ে নাগরিকত্ব, যা মিয়ানমারে একসময় তাদের ছিল, ফিরিয়ে দেওয়া।

এমাসের ১৭ তারিখ থেকে শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের ৭৪তম সাধারণ অধিবেশন, বাংলাদেশের সুযোগ রোহিঙ্গাদের মানবিক দিক বিবেচনায় জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলোকে সাথে নিয়ে তীব্র জনমত তৈরি করা এবং বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায় করে নেয়া।

মোঃ কাইফ ইসলাম
শিক্ষার্থী, মাস্টার্স ইন গভার্নেন্স স্টাডিজ,রাস্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


Leave a Reply



Nobobarta © 2020। about Contact PolicyAdvertisingOur Family DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com